চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনাভাইরাস: বিশৃঙ্খলা বন্ধ করতেই হবে

করোনার চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল হবে শুনে শুরুতেই হলো ভাঙচুর। করোনা রোগীর দাফন হবে শুনে কবরস্থান বন্ধ। করোনা রোগী অছে সন্দেহে বাসায় হামলা। বিদেশীদের দলে দলে দেশত্যাগ৷ দোকানে পাওয়া যাচ্ছে না হেক্সিসল, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্ক। দেশে চলছে করোনা রোগীর টেস্ট সংকট৷ টেস্টের অভাবে যথাযথ করোনা রোগী শনাক্তও হতে পারছে না বলে অভিযোগ৷ নৈকট্য, চিকিৎসা, দাফন কোনোটাই হতে পারছে না৷ আদিভৌতিক বিশ্বাসের দোহাই দিয়ে করোনা ভাইরাসের মরণ-আঘাত থেকে বাঁচার চেষ্টাও চলছে৷

আবার কেউ বলছে, ‘ভাইরাস বলতে কিছু নেই, ছোঁয়াচে রোগ বলতে কিছু নেই, করোনায় মুসলিমদের কিছু হবে না, করোনা এসেছে কাফিরদের জন্য গজব হিসাবে’৷ এমন লিফলেট সাইয়্যিদুল আ’ইয়াদ শরীফ গেট, ৫/১ রাজারবাগ শরীফ, ঢাকা ১২১৭: কর্তৃক প্রচারিত হচ্ছে৷ এমন বক্তব্য প্রচলিত করোনা প্রতিরোধে সরকারের নির্দেশিকা ও বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এই বিভ্রান্তিমূলক প্রচার কি দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণে মারাত্মকভাবে সহায়ক হবে না?

বিজ্ঞাপন

পাকিস্তানে জামাতে নামাজ আদায়ের ব্যাপারে সরকারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করায় ৪৩ জন ইমামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জুমার নামাজে জামাতের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার অভিযোগে দেশটির সিন্ধু ও পাঞ্জাব প্রদেশ থেকে ইমামদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে ।

বিজ্ঞাপন

সরকার ঘোষণা করেছিল যে, কোভিড-১৯ এর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে নাগরিকদের ৫ এপ্রিল পর্যন্ত মসজিদে জুমার নামাজসহ জামাতে নামাজ পড়া যাবে না৷ জামাতে নামাজ নিষিদ্ধ হলো সৌদি আরবেও৷ ভারতে তাবলীগ জামাতে গিয়ে করোনা আক্রান্তের ঘটনা ঘটেছে৷ বাংলাদেশেও টোলারবাগে নামাজ পড়তে গিয়ে করোনা সংক্রমিত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটলো৷ জামাতে গা ঘেঁষে দাঁড়াতে হয়৷ এতে অবশ্যই করোনা সংক্রমনের মারাত্মক ঝুঁকি হয়৷

পাকিস্তানে ৩৫ জনকে পরীক্ষার পর ২৭ জনের করোনা পজিটিভ হয়েছে। এর মধ্যে ২৭ জন তাবলীগ জামাতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এদিকে, পুলিশকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে গেছেন তাবলীগ জামাতের এক সদস্য। করোনা আক্রান্ত তাবলীগ জামাতের সদস্যকে কোয়ারেন্টাইনে রাখার প্রচেষ্টা চালালে সেসময় পুলিশকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে৷ দেশে দেশে যুক্তিহীন ধর্মান্ধরা তৎপর রয়েছে৷ বাংলাদেশে এক ব্যক্তির একটি ভিডিওতে দেখলাম, মাস্ক না পরা ও সামাজিক দূরত্ব না মানার পক্ষে চরম উদাসীনতা ও ঔদ্ধত্যপনার। তার কথা- হায়াত, মউত, রিজিক, দৌলত আল্লাহর হাতে৷ তিনি করোনা সতর্কতা মানবেন না৷ তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী বললেও মাস্ক পরবেন না বলেন৷

বিজ্ঞাপন

করোনা কাফিরদের জন্য এলে তাবলীগ জামাতের লোকেরা কেন করোনা আক্রান্ত হলো? সৌদী আরবসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশে কেন করোনা গেল? তাহলে তো শুধু অমুসলিম দেশে করোনা যাওয়ার কথা৷ মসজিদ আল্লাহর ঘর সেখানে গিয়েও কেন করোনা আক্রান্ত হচ্ছে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা? পাকিস্তানের মতো উগ্রবাদী দেশেও করোনা নিয়ে সরকারী নিষেধাজ্ঞায় মসজিদে জামাত আদায় বন্ধ হলো কেন? বাংলাদেশে করোনা রোগীর বাসায় হামলার খবরও এসেছে। দাফন সংকটে পড়েছে করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি৷ সংক্রমণের ভয়ে কেউ কাছে যাচ্ছে না মৃত ব্যক্তির৷ অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, আইইডিসিআর এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাটিতে লাশ দাফনে কোনো ঝুঁকি নেই। করোনা কি তবে মানুষের মানবতাও কেড়ে নিলো?

কিন্তু কে শুনে এসব কথা? মৃতের দেহ থেকে সংক্রমণ ছড়ায় এই প্রচারণায় মানুষ আতঙ্কিত। তারা কেউ আপনজন ও প্রতিবেশীর দাফন-কাফনে যেতে চাচ্ছে না৷ করোনা ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষের মধ্যে নানারকম গুজব ডালপালা ছড়িয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে করোনা কবিরাজ গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে৷ কেউ কেউ করোনা রোগের দাওয়াই হিসাবে দোয়ার কথাও বলছে৷ কেউ বলছে থানকুনি পাতা খেলে করোনা হয় না৷ কেউ বলছে ঘন ঘন চা পান করলে কিংবা আদা অথবা রসুন দিয়ে গরম পানি খেলে করোনা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। আবার কেউ বলছে এ রোগ গরিবদের হয় ধনীদের নয়৷ কেউ বলছে, সৃষ্টিকর্তার প্রতি অবিশ্বাসীদের করোনা হয়। বিশ্বাসীদের হয় না৷ আবার কেউ বলছে ঠাণ্ডা লাগলে বা জ্বর হলে পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে। অন্ধত্ব আর গুজবে টালমাটাল হয়ে উঠছে দেশ৷

করোনা ভাইরাসকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ‘সবচেয়ে বড় সংকট’ বলে অভিহিত করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেন, এ সংকট এমন মন্দা নিয়ে আসতে পারে, সম্ভবত যার সমান্তরাল নজির সাম্প্রতিক ইতিহাসে নেই৷ এই মহাদুর্যোগ হতে বাঁচতে প্রয়োজন সতর্কতা ও মানবতা৷ প্রয়োজন অন্ধ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে বৈজ্ঞানিক সতর্কতার৷ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক বলেছেন, “প্রতিরোধের প্রথম সুযোগটি এর মধ্যেই হাত ছাড়া হয়ে গেছে। বিভিন্ন দেশ যে ‘তথাকথিত’ লকডাউন বা অবরুদ্ধ অবস্থার পথে হাঁটছে তাতে কিছু সময় হয়তো পাওয়া যাবে। কিন্তু সংক্রমণ পুরোপুরি ঠেকানো যাবে না। এই পরিস্থিতিতে নতুন আরেকটি সুযোগ কাজে লাগাতে সংস্থাটি রোগ শনাক্তকরণ জোরদার করাসহ ছয়টি পরামর্শ দিয়েছে৷ কিন্তু বাংলাদেশে কি জেলায় জেলায় রোগ সনাক্তকরণের সামর্থ্য আছে? লকডাউন না দিয়ে ছুটি দেওয়ায় আরও সংক্রমণ ঝুঁকি কি ছড়িয়ে গেল না?

গণপরিবহনে চড়ে এক এলাকা হতে অন্য এলাকায় যাচ্ছে৷ আবার ছুটির পরে সবাই গ্রাম ছেড়ে শহরে যাবে৷ এলাকায় এসে সংক্রমিত হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে৷ পরবর্তীতে এলাকা ত্যাগ করে কর্ম এলাকায়ও কি সংক্রমিত হওয়ার ভয় থাকছে না? এতে কি এলাকা ও এলাকা ত্যাগে উভয় এলাকায় সংক্রমণ ঝুঁকি বাড়লো না? ‘লকডাউন’ না করে ‘সামাজিক দূরত্ব’ নিশ্চিত করতে সারা দেশে ছুটির ঘোষণা দেওয়া হল৷ তারপরই ছুটি উপভোগ করতে হাজার হাজার মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়েলো রেল, বাস, নৌ স্টেশনে। অবস্থা সামাল দিতে ওই সব মন্ত্রণালয়কে রেল, নৌ-যান, গণপরিবহন বন্ধের ঘোষণা দিতে হয়েছে৷ এই ছুটিতে সংক্রমণ ঝুঁকি কি কমলো না বাড়ল? সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টির জন্য মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনী৷ তাদেরকে কঠোর হওয়ার ঘোষণাও দিতে হয়েছে। কিন্তু তারা এতে কতোটা সফল হবে, তা সময়ই বলে দেবে৷ এখন শঙ্কা হচ্ছে, ছুটি শেষে আবার জায়গা বদলের হিড়িক যেন না লাগে। এ হিড়িক লাগলে দেশময় ছড়িয়ে পড়বে সংক্রমণ ঝুঁকি? এজন্য বিশৃঙ্খলা বন্ধ করতেই হবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)