চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনাভাইরাস ঘোরাঘুরি করে স্কুল-কলেজে, মাদ্রাসায় ঢোকে না

দেশে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের একবছর পূর্ণ হলো আজ (১৮ মার্চ)। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় না বলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলতে পারতাম, কিন্তু যেহেতু কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু আছে সেজন্য তা বলা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশে গত ৮ মার্চ প্রথম করোনা ভাইরাসের রোগী শনাক্ত হলেও প্রথম মৃত্যুর খবর আসে ১৮ মার্চ। দিন দিন করোনা রোগী শনাক্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ায় নড়েচড়ে বসে সরকার। ভাইরাসটি যেন ছড়িয়ে পড়তে না পারে সেজন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সব সরকারি-বেসরকারি অফিস বন্ধ ঘোষণা করা হয়। করোনার বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যেই ৩১ মে থেকে দেশের সরকারি-বেসরকারি অফিস খুলে দেওয়া হয়েছে। এরপর থেকে দেশের সবকিছু স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি স্বাভাবিক, দেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে উপচে পড়া ভিড় ও নানা সামাজিক জমায়েতগুলো দেখলে অনন্ত তাই মনে হয়। বেশ কয়েক ধাপ বাড়ানোর পর আগামী ৩০ মার্চ স্কুল-কলেজ খুলে দেওয়ার কথা আছে, যদিও ধারণা করা হচ্ছে আবারও দীর্ঘ হচ্ছে ছুটি।

বিজ্ঞাপন

প্রাণঘাতী করোনা মহামারির কারণে গেল বছর ১৭ মার্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। সরকারের সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ২৯ মার্চের পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার সম্ভাবনা রয়েছিল। তবে বর্তমানে করোনা পরিস্থিতির অবনতির কারণে এ সিদ্ধান্তের রিভিউ হতে পারে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিক।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বিঘ্নিত হয়েছে গত এক বছর। সংক্রমণ পরিস্থিতিতে গত বছরের প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি সমাপনী পরীক্ষা এবং জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে।

গত বছরের এইচএসসি পরীক্ষাও হয়নি। পরীক্ষা না নিয়েই এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীদের মূল্যায়নের ফল গত জানুয়ারিতে ঘোষণা করা হয়। এছাড়াও প্রাথমিক, নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বার্ষিক পরীক্ষা ছাড়াই শিক্ষার্থীদের ওপরের শ্রেণিতে উত্তীর্ণ করা হয়েছে।

সামনে আবার রয়েছে এসএসসি এ এইচএসসি পরীক্ষা, সেই পরীক্ষা স্বাভাবিক নিয়ম হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সময়ও ঘোষণা করা হয়েছে। করোনাকালে সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে তাদের পরীক্ষার সিলেবাসও। কিছুদিন ক্লাস করে পরীক্ষা শুরুর সার্বিক প্রস্তুতিও সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু হঠাৎ করে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যু বাড়াতে আবারও শঙ্কায় শিক্ষার্থী ও স্কুল-কলেজ কর্তৃপক্ষ।

করোনাভাইরাস মহামারী শুরুর পর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ লকডাউনে পড়ে যায় এবং স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ১০০ কোটির অধিক শিশুর পড়ালেখা বন্ধ হয়ে পড়ে। এই শিশু শিক্ষার্থীদের সংখ্যাটি সবচেয়ে বেশি চীনে। আর দ্বিতীয় অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। এরপর ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইয়েমেন ও পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ। শিশুদের অধিকার ও কল্যাণ বিষয়ে কাজ করা দাতব্য সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন এ বিষয়ে একটি প্রতিবদেন প্রকাশ করেছে। সারাবিশ্বের প্রায় এক কোটি শিশু পুনরায় স্কুলে ফিরে আসতে না পারার ঝুঁকিতে পড়েছে বলেও জানিয়েছে তারা।

সেভ দ্য চিলড্রেন আরও জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে দেশগুলোর উপর করোনা সংকটের কারণে অর্থনৈতিক প্রভাব শিশুদেরকে প্রাথমিক পর্যায়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে বাধ্য করতে পারে। মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষতির মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে অনেকেই বাল্যবিয়ের হুমকির মুখোমুখি।

ওই সংস্থার জরিপ হয়তো শিক্ষা পরিস্থিতির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরেছে। আমরা যদি আমাদের চারপাশে একটু খেয়াল করি, তাহলে পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও পরিষ্কার হবে। গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে করোনাকালে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতিবাচক পরিস্থিতি, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও তাদের মানসিক অবস্থা নিয়ে নানা বিষয় উঠে এসেছে।

করোনার শুরুতে দেশের বেশিরভাগ মানুষের মনে নানা আতঙ্ক ও গুজবের প্রভাব ছিল, চিকিৎসা ব্যবস্থাও ছিলো এলোমেলো । একবছরে তা অনেকটাই দূর হয়েছে, করোনার সচেতনতার পাশাপাশি প্রচলিত চিকিৎসা ও যত্নের বিষয়ে প্রস্তুত দেশ। বিশ্বের বহু উন্নত দেশ যখন করোনা ভ্যাকসিনকে এখনও যোগাযোগ প্রক্রিয়ায় রেখেছে, তখন দেশে অর্ধকোটির কাছাকাছি মানুষ ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ গ্রহণ করেছে। এসব কারণে সরকারকে ধন্যবাদ দিতেই হবে। এছাড়া অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে ধরে রাখতে প্রণোদনা ও ব্যবসা-বাণিজ্য সচল রাখতে নানা কর্মসূচিও সারাবিশ্বে দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।

ধর্মীয় আচার প্রতিষ্ঠান মসজিদ-মন্দিরগুলো একসময় করোনা সংক্রমণের ভয়ে বন্ধ ছিল। সেগুলোও এখন পুরোদমে খোলা। এছাড়া দেশে গত একবছরে বহু স্থানীয়-জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেখানে প্রচুর গণজমায়েত হয়েছে। বসতে শুরু করেছে মেলা-উৎসব আয়োজন। আর লক্ষ করার মতো বিষয় হচ্ছে, দেশের বিপুল সংখ্যক কওমি মাদ্রাসা চালু আছে, যেখানে বহু শিশু শিক্ষার্থী নিয়মিত পড়ালেখা করছে। এনিয়ে সামাজিক মাধ্যমে অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করাসহ ট্রল করেছে, “করোনাভাইরাস কি শুধু স্কুল-কলেজে ঢোকে? মাদ্রাসায় ঢোকে না?” তাদের এই ক্ষোভ-হতাশা মাদ্রাসা খোলা নিয়ে নয়, বরং মূল ধারার শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে পড়ার বিষয়ে।

শুধু পিছিয়ে আছে দেশের সাধারণ শিক্ষা কার্যক্রম। অনলাইন ক্লাসের নামে কোনোরকমে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। যদিও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি বিরাট অংশ প্রযুক্তি সুবিধার বাইরে যারা একবছর আগেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আওতায় ছিল। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারিদের নানা সঙ্কট সামনে উঠে এসেছে গত একবছরে। শিক্ষা বিষয়ক উদ্যোক্তাদের অনেক চরম দূরাবস্থায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ নয়তো বিক্রি করে দিয়েছেন যে যার মতো। যদিও সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সুবিধার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সে পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

আরেকটি বিষয় বলতেই হয়, তা হচ্ছে শিশু শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে গিয়ে পড়াশোনার অভ্যাস প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠাসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাবার দৈনিন্দিন নিয়মকানুনের জীবন থেকে তারা বের হয়ে গেছে এবং প্রযুক্তির প্রভাবে নানা ধরণের নেতিবাচক আচার-আচরণের উদাহরণ এখন ঘরে ঘরে। যে শিশুটি স্কুল-কলেজের আগে কোনো ধরণের ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস ধরার কথা ছিল না, তারা এখন সারাদিনই অনলাইন ক্লাসের উসিলায় মোবাইল-কম্পিউটার-ট্যাব ধরে বসে থাকছে।

বিশ্বের বিভিন্ন করোনাক্লান্ত দেশগুলোতেও শিক্ষা কার্যক্রম চালুতে সেসব দেশের সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে, কারণ তাদের দাবি শিশুরা করোনায় স্বাভাবিক ইমিউনিটি পেয়ে থাকে। ওইসব দেশে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমিয়ে ধারাবাহিক শিক্ষা কার্যক্রমসহ পরীক্ষা কার্যক্রম মোটামুটি স্বাভাবিক বলা যায়। যেহেতু করোনার কারণে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে সেজন্য হয়তো বাংলাদেশ সরকার ওইপথে যায়নি। তারপরেও সীমিত আকারে স্বাস্থ্যবিধি মেনেই খোলা উচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তা না হলে শিক্ষা ব্যবস্থার এই ক্ষতি ভবিষ্যতে হয়তো জাতিকে বহন করতে হবে যুগের পর যুগ।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)