চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনাভাইরাস: কোয়ারেন্টাইনের শিক্ষা

দুঃশ্চিন্তা আর আতংকের প্রহর পেরিয়ে এক একটা দিন কেটে যাচ্ছে। সবাই বলছে বাসায় থাকুন, নিরাপদ থাকুন, নিরাপদ রাখুন। করোনা মহামারীকে রুখে দেয়ার এই একটাই মোক্ষম উপায় এখন পর্যন্ত মানুষের আয়ত্বে আছে, যতদিন পর্যন্ত না এর কোন প্রতিষেধক বাজারে আসছে। এখন আমরা আসলে বায়ুসমুদ্রে ভাসমান করোনার জালের মধ্যে বেঁচে আছি। কখন যে করোনার কারেন্ট জাল কার গলার ফাঁস হবে কেউ বলতে পারে না। আর এই জাল কে বড় আর কে ছোট সেই বাছ বিচার করছে না। শত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা এবং সাবধানতাও এই জীবাণুর প্রাদুর্ভাব রুখতে পারছে না। জানি না কোথায় গিয়ে এর শেষ হবে। তবে আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে মহামারীর আসল রূপটা এখনও আমাদের সামনে আসেনি। এখন পর্যন্ত এটা বিস্তারের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। আমি কল্পনা করতেও ভয় পাই মানুষ তখন কতটা অসহায় হয়ে যাবে।

এরমধ্যেও আমাদের অফিস চলছে পুরোদমে। কারণ কনস্ট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রি যেকোন দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। আর এই কথাটা অস্ট্রেলিয়ার জন্য আরো বেশি সত্যি। অবশ্য অফিসে যথাযত নিয়ম মেনে চলা হচ্ছে। এমনিতে অফিসে আমাদের তলায় মানুষগুলো আমরা বসি অনেক দূরে দূরে তাই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাটা খুব একটা সমস্যা হচ্ছে না। এছাড়াও অফিসে ঢোকার দরজা এবং টয়লেটে যাওয়ার দরজা এখন সারাক্ষণই খুলে রাখা হচ্ছে ইট দিয়ে ঠেকনা দিয়ে। আর অফিসে ঢোকার মুখেই রাখা আছে স্যানিটাইজারের বোতল যাতে বাইরে থেকে কেউ আসলে সবার আগে সেটা দিয়ে হাত জীবাণুমুক্ত করে নেয়। এছাড়াও অফিসে একটা তালিকা টানিয়ে দেয়া হয়েছে কে কখন পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাবে। সেই মোতাবেক আমরা সবাই রুটিন করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখছি।

বিজ্ঞাপন

এরই মধ্যে গত সপ্তাহের বুধবার যেতে হলো সাইট পরিদর্শনে। প্রত্যেক মাসেই সাইটের কাজের অগ্রগতি দেখতে যেতে হয়। পারামাটা স্টেশনের পরিবর্ধনের কাজ চলছে। আজ থেকে বছর পাঁচেক আগে যারা পারামাটা স্টেশনকে দেখেছেন এখন তারা আর সেটা চিনতে পারবেন না। পরিবর্ধনের কাজকে অনেকগুলো স্লটে ভাগ করে কাজ চলছে। আমাদের কোম্পানি তার মধ্যে চারটা স্লটের ম্যাশনারির (রাজমিস্ত্রির) কাজ পিয়েছিলো। দুটোর কাজ ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে এখন চলছে বাকি দুটোর কাজ। পারামাটা সিডনি শহরের অন্যতম ব্যস্ত এলাকা। স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম লোকে লোকারণ্য থাকে সবসময়। সেই পারামাটা স্টেশনে এখন কজন মানুষ ট্রেনের অপেক্ষায় আছে সেটা আঙুলের কর গুণেই বলে দেয়া যায়। পারামাটা স্টেশনের ভিতরে যাওয়া এবং বাহিরে যাওয়া পথের পাশে স্যানিটাইজার রেখে দেয়া হয়েছে। এছাড়াও সাইটগুলোতে রাখা হয়েছে স্যানিটাইজার।

বিজ্ঞাপন

পারামাটা সাইট পরিদর্শন শেষ করে যেতে হলো সিডনির প্রানকেন্দ্রে। সেখানে যেয়ে রীতিমতো অবাক হয়ে গেলাম। সারা রাস্তার ফুটপাত একেবারে ফাঁকা যেখানে আগে হাটতে বেগ পেতে হতো এখন সেখানে হেলেদুলে হাঁটলেও কারো সাথে ধাক্কা খাওয়ার সুযোগ নেই। সিডনি শহরে নতুন বেশকিছু ট্রামলাইন বসানো হয়েছে কিন্তু মানুষ আগের মতোই ইতিউতি ট্রামলাইনগুলো পার হতো বলে জরিমানা পর্যন্ত করা হয়েছে। যেকোন সেখানে কোন জনমনিষ্যি  নেই। আমি উইনার্ড স্টেশনে নেমে হেটে হেটে সাইটে যাচ্ছিলাম আর আশেপাশে দেখছিলাম। ফুটপাতে বসা উদ্বাস্তু মানুষগুলোও নেই। শুধুমাত্র মার্টিন প্লেসের ঝর্ণার পাশে এক ভদ্রলোক পোজ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। উনার সেদিনের বিষয়বস্তু ছিলো উনি দেশের বাইরে যাচ্ছেন। উনার দান হাতে একটা ছোট স্যুটকেস ধরা বাতাসে উনার গলার টাই পিছনে উড়ে যাচ্ছে আর উনি ত্রস্তে পা ফেলছেন। ঠিক এই ভঙ্গিমায় বেশিক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা যায় না তাই উনি একটু পরপর সোজা হয়ে সামনে রাখা বাক্সে মানুষদের ফেলা কয়েন গুণে গুণে পকেটে রাখছেন। আমার কাছে কোন নগদ টাকা না থাকাতে উনাকে কোন প্রকার সাহায্য করা সম্ভব হলো না।

শহরের সাইট পরিদর্শন শেষ করে ট্রেনে করে সিডনির প্রধান ট্রেন টার্মিনাল সেন্ট্রালে ফিরে আসলাম। সেন্ট্রাল স্টেশন সবসময়ই লোকজনের ভীড়ে গমগম করে কিন্তু সেদিন সেখানে কোন ভিড়ই চোখে পড়লো না। প্ল্যাটফর্মে আসা যাওয়ার সিঁড়িতে মানুষের সাথে অবধারিত ধাক্কা লাগে কিন্তু সেদিন আর কোন ধাক্কা লাগার ভয় ছিলো না। আমি এলিজাবেথ স্ট্রিটের দিকে বের হয়ে আসলাম। এলিজাবেথ স্ট্রিট পার হয়ে আমাদের অফিসে যাওয়ার বসে উঠতে হয়। এই রাস্তা পার হবার সময় অনেক ভিড় থাকে। অনেকগুলো মানুষ দুদিক থেকে একসাথে রাস্তা পার হয় তাই খুব সাবধানে রাস্তা পার হতে হয়ে নাহলে অন্য দিক থেকে আসা মানুষের সাথে ধাক্কা লেগে মাঝরাস্তায় পপাত ধরণীতল হবার সুযোগ থাকে কিন্তু সেদিন আমি একেবারে আয়েশ করে রাস্তা পার হলাম আর মাত্র দুজন মানুষের সাথে।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে বাসাতে সবাই মোটামুটি অবরুদ্ধ দিন পার করছে। নিয়ম অনুযায়ী আপনি পার্কে যেতে পারবেন কিন্তু সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। অনেকেই সেটাকে বুঝেছে যে অকারণে বাইরে যাওয়া নিষেধ। আমিও তেমনটাই বুঝালাম তাই শুধুমাত্র বাজারঘাট আর আমার এবং বাচ্চাদের চুল কাটানো ছাড়া বাইরে যাচ্ছি না। অন্যদিকে গিন্নী প্রতিদিন হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে আগে গোসল করে তারপর বাচ্চাদের ধরে। কারণ চিকিৎসা করতে যেয়ে তাকে প্রায় দিনই করোনা আক্রান্ত রোগীদের সংস্পর্শে আসতে হয়। গত শুক্রবারে সে এবং তার রেজিস্টার হাসপাতালে করোনার পরীক্ষার জন্য রক্ত জমা দিয়েছিলো। চব্বিশ থেকে আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে ফলাফল দেয়ার কথা। যদি পজিটিভ হয় তাহলে কল দিবে আর যদি নেগেটিভ হয় তাহলে ক্ষুদেবার্তা দিবে। শনিবারেও কোন উত্তর আসলো না হাসপাতাল থেকে রবিবার আমি তাই জিজ্ঞেস করলাম। উত্তরে সে বললঃ হাসপাতাল থেকে ক্ষুদেবার্তা দিয়েছে ফলাফল নেগেটিভ। আমরা অনেকটা হাফ ছেড়ে বাচলাম কিন্তু কতদিন নেগেটিভ থাকা যাবে জানি না কারণ প্রাদুর্ভাব এখন পর্যন্ত মহামারীর রূপ নেয়নি।

বাচ্চাগুলো যেহেতু বাইরে যেতে পারছে না তাই বাসায় বসে বসে বিরক্ত হচ্ছে। কতক্ষণ আর ঘরে বসে থাকতে ভালো লাগে। অনেকেই বাচ্চাদের সাথে বিভিন্ন ধরণের নতুন নতুন খেলাধুলা করছে। কেউ হয়তোবা খেলছে আমাদের শৈশবের চোর পুলিশ খেলা আবার কেউই হয়তোবা বসে গেছে লুডু নিয়ে আবার কেউ বসে গেছেন ক্যারম নিয়ে। আমাদের বাসায় খেলাধুলার এইসবগুলো উপকরনের পাশাপাশি ফুটবল, বাস্কেটবল, ক্রিকেট র‌্যাকেট খেলার সরঞ্জামও আছে কিন্তু চার বছরের রায়ানকে এর কোনকিছুর সাথেই যুক্ত করা যায় না কারণ সে এক মুহূর্তের জন্যও কোথাও স্থির হয়ে বসে না। এমনকি আমি একদিন রাস্তা সাইকেলের একটা পুরোনো টায়ারও কুড়িয়ে নিয়ে এসে রেখেছিলাম। আমার মেয়ে তাহিয়া সেটা বেশ  ক’দিন চালিয়েওছিলো। এছাড়াও ঘরের মধ্যে লাফালাফি করার জন্য ছোট একটা সি-স কিনে এনে রাখা হয়েছে। আমাদের দুজনের যেহেতু অফিস চলছে তাই বাধ্য হয়ে ওদেরকেও স্কুলে এবং চাইল্ড কেয়ারে যেতে হচ্ছে কিন্তু স্কুলে উপস্থিতির হার একেবারে কমে এসেছে। আমার মেয়েটার স্কুলে মোট তিনশ বিশ জন ছাত্রছাত্রীর মধ্যে এখন সর্বসাকুল্যে বিশজন আসে আর ওদের ক্লাশে এখন হাতেগোণা দুই তিনজন আসে। তাই আপাতত মেয়েটাকে এখন আমাদের প্রতিবেশী বড় ভাই আশফাক ভাই দিশা আপুদের বাসায় রাখা হচ্ছে। তাহিয়া সারাদিন ওখানেই থাকে আর উনাদের মেয়ে আলিশা এবং ছেলে দৃপ্তর সাথে খেলাধুলা করা। আর রায়ান যথারীতি কেয়ারে যাচ্ছে।

কোয়ারেন্টাইনের এই সময়ে সবাই মোটামুটি বাসবন্দী। যারা হোম অফিস করছে তারাতো বাসাতেই আছেন। এছাড়াও যারা অফিস করছেন তারাও সপ্তাহান্তের দুটো দিন এখন বাসাতেই কাটাচ্ছেন পরিবারের সাথে। এতেকরে পরিবারে অনেকটাই ছন্দ ফিরে আসতে শুরু করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে আমি সবসময়ই অসামাজিক বানানোর যন্তরমন্তর ঘর বলি। ইদানিং বিষয়টা এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছিলো মানুষের স্বাভাবিক জীবন হুমকির মুখে পড়েছিলো। কোয়ারেন্টাইন মানুষকে আবারও বাস্তব জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে। অবসরে পরিবারের সাথে সময় কাটানোর পাশাপাশি এখন দূর দূরান্তে থাকা আত্মীয়স্বজনদেরও তারা খোঁজ নিতে পারছে অফুরান সময়ের প্রভাবে। যাদের সাথে বহুদিন কথা হয়নি তাদের পর্যন্ত খোঁজ নেয়ার সময় পাওয়া যাচ্ছে। যারফলে বাস্তব জীবনের স্বাভাবিক সামাজিকতা ফিরে আসতে শুরু করেছে। এছাড়াও কোয়ারেন্টাইনের এই কঠিন সময়ে মানুষ যখন নিজেদের ঘরে সবকিছু মজুদ করতে শুরু করেছে তখন অনেকেই আবার নিজেদের জীবন বিপন্ন করে এগিয়ে এসে মানবতার জয়গান গাইছে।

কোয়ারেন্টাইনের দিনগুলোতে পৃথিবী কিছুটা হলেও তার হারানো সৌন্দর্য ফিরে পেতে শুরু করেছে। ঢাকা শহরের ফুটপাত এবং রাস্তার মাঝের দ্বীপগুলোতে লাগানো গাছগুলো ধুলার পুরো আস্তরণে সবসময় আবৃত থাকতো তাই ঠিক বুঝা যেতো না সেগুলো জীবিত না মৃত। এখন সেগুলোতে বসন্তের আগমনী বার্তা দেখা যাচ্ছে। ফুলেফুলে গাছের শাখাগুলো ভরে উঠেছে। অস্ট্রেলিয়াতে সবাই বাসার বাইরে বাগানের পরিচর্যায় মনোযোগী হয়ে উঠেছে। শম্পা আপু আর নাসের দুলাভাই আরো একটু বড় পরিসরে তাঁদের কাজ শুরু করেছে। উনারা পুরো বাসার ল্যান্ডস্কেপিং বদলে দেয়ার প্রজেক্ট হাতে নিয়েছেন। যার ফলে বাসার সৌন্দর্য বহুগুণে বেড়ে যাচ্ছে। উনারা সময়ে সময়ে আমাদেরকে বুদ্ধি দিয়ে যাচ্ছেন আমরা আমাদের বাসার সামনে পিছনে আর কি কি ফুল ফলের গাছ লাগাতে পারি।

যাইহোক দুঃস্বপ্ন এবং দুর্ভাবনাকে সাথে করে জীবনের এক একটা দিন তার নিজস্ব নিয়মে চলে যাচ্ছে। আর আমরা আশাবাদী হচ্ছি একদিন এই মহামারী কাটিয়ে উঠে আমরা আবারও স্বাভাবিকভাবে চলা ফেরা করতে পারবো। ইতোমধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার একদল বিজ্ঞানী দাবি করেছেন, তারা করোনার টিকা আবিষ্কার করে ফেলেছেন। এখন চলছে তার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ। একসময় এই টিকা বাজারে চলে আসবে সেদিন হয়তোবা আর বেশিদূরে নয় ততদিন আমাদেরকে একটু কষ্ট করে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। অবশ্য কোয়ারেন্টাইনে থাকাটা একেবারে খারাপ না কারণ অনেক বন্ধন নতুন করে জোড়া লাগছে। কোয়ারেন্টাইনের এই দিনগুলোতে আমাদেরকে ভুলে গেলে চলবে না যে আমাদের পাশেই অনেক মানুষ অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। আমরা প্রত্যেকেই যদি আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের পাশে দাঁড়ায় তাহলে আবারও আমরা সবাই সম্মিলিতভাবে করোনার এই মহামারী কাটিয়ে সুন্দরভাবে বাঁচতে পারবো আর পাশাপাশি প্রকৃতির সাথেও বিমাতাসুলভ আচরণ করা থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে কারণ একটা প্রাকৃতিক, সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সুন্দর পৃথিবী গড়তে হলে আমাদের সবাইকেই একসাথে কাজ করতে হবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)