চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনাভাইরাস: কৃষি নিয়ে নিয়মিত ব্রিফিং চাই

করোনা বিপর্যয়ে বিশ্বব্যাপী দুটি প্রতিষেধকের সন্ধান চলছে। একটি এ রোগের নিরাময় ও পুনরাবির্ভাব বন্ধের জন্য, অন্যটি অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের জন্য। নিষ্ঠুর সত্য হলো করোনার শেষ কখন, সেটা যেমন জানা নেই; তেমনি অর্থনীতির ক্ষতি কতটা হবে, তার হিসাব কষাও কার্যত অসম্ভব। বাংলাদেশকেও এ নিষ্ঠুর সত্য মেনে নিতে হবে। সময় অনেক প্রশ্নের জবাব দেবে।

তবে বাংলাদেশের কৃষি কিন্তু সময়ের জন্য অপেক্ষা করবে না। আপনি শিল্পে উৎপাদন বিলম্বিত করতে রফতানি শিপমেন্ট তারিখ পিছিয়ে দিতে পারেন; শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছুটি দিতে পারেন। কিন্তু বোরো ধান কাটা এমনকি একদিনও স্থগিত রাখতে পারবেন না। হাওর এলাকায় বোরো ধান কাটা শুরু হবে মধ্য এপ্রিলে, পহেলা বৈশাখের আশাপাশে। মোটামুটি বৈশাখ মাস জুড়েই দেশের নানা প্রান্তে চলবে বোরো ধান কাটা।

বিজ্ঞাপন

ইতিমধ্যে উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় গম ফসল তোলা শুরু হয়েছে। আর বোরো উঠতে না উঠতে শুরু হবে পাট বীজ বপণ। আউশ ধান বোনার জন্যও প্রস্তুতি তখনই শুরু হবে। সঙ্গে বর্ষাকালীন নানা শাক-সবজি নিয়েও ভাবতে হবে। পাটের বীজের পর্যাপ্ত মজুদ আছে তো? করোনার সর্বগ্রাসী আতঙ্ক ও লকডাউনের সময় কৃষক ও কৃষির সঙ্গে যুক্তদের কী করণীয়, সেটা নিয়ে নিয়মিত ব্রিফিং হতেই পারে। সংবাদপত্র অনেক এলাকায় পৌঁছাতে সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু বেতার-টিভি-অনলাইনে তো আছে।

বিজ্ঞাপন

গত বছর বাংলাদেশে ২ কোটি ৪ লাখ টনের মতো বোরো চাল উৎপন্ন হয়েছিল। আমন, বোরো ও আউশ মিলে মোট চাল উৎপাদন ছিল ৩ কোটি ৮২ লাখ টনের মতো। হাওর অধ্যুষিত প্রধান তিন জেলা: সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জে গত বছর (২০১৯) বোরো চাল হয়েছিল ২২ লাখ টনের মতো। হাওরে মূলত বোরো ধান জন্মায়, বছরের বাকি সময় পানিতে তলিয়ে থাকার কারণে আউশ-আমন চাষ সম্ভব হয় না। সঙ্গত কারণে হাওর এলাকা মূলত এক ফসলী। তবে বছরের অর্ধেকটা সময় পানিতে তলিয়ে থাকার কারণে প্রচুর মিঠা পানির মাছ উৎপাদন হয়। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলছেন, করোনার কারণে পরিবেশ কিছুটা হলেও উন্নত হচ্ছে। এ কারণে মাছের উৎপাদন বাড়তে পারে, যা প্রকৃতই ঘটলে খানিকটা স্বস্তি মিলবে।

কৃষক-মজুর ও কৃষিবিদরা জানেন, বোরো ধান পাকার পর ৩-৪ দিনের মধ্যে কেটে ফেলতে হয়। অন্যথায় ধান ঝরে জমিতে পড়ে যায়। উচ্চফলনশীল জাতের ধান ফলনে বেশি বেশি হয়। এ কারণে সামান্য বাতাসেও ধান গাছ জমিতে নুইয়ে পেড়ে। এ সব বড় উদ্বেগের কারণ।

হাওরে বোরো ধান কাটা ও মাড়াইয়ের মৌসুমে ২০-২৫ হাজার দিনমজুর আসে অন্য জেলাগুলো থেকে। এখন করোনা-লকডাউনের সময়। ধান কাটা দাওয়ালরা আসবে কীভাবে? বিষয়টি নিয়ে প্রশাসন-আইন শৃঙ্কলা বাহিনী ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের দ্রুত সিদ্ধান্তে আসতে হবে। হাওরের ধানকাটা শেষ হলে দিনাজপুর-রংপুর-রাজশাহীসহ অন্য অঞ্চলে ছুটবেন মজুররা। কী করে যাবেন না তারা? কে তাদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে? ধান কাটার সময় দাওয়ালরা ১৫-২০ দিন এমনকি এক মাস পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট এলাকায় থাকে। তারা করোনায় যদি আক্রান্ত হয়? অন্য রোগ-ব্যাধি যদি পেয়ে বসে?

ধান কাটার সময় কৃষকরা সাধারণত দূরত্ব বজায় রেখে চলে। কিন্তু তারা একসঙ্গে থাকে এবং একত্রে খাওয়া-দাওয়া করে। রাতে ও অবসরে গান করে জটলা বেঁধে। কৃষি ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে এ সব নিয়ে ভাবতে হবেই।

বিজ্ঞাপন

এখন পর্যন্ত যা খবর, বোরো ধান ভাল হয়েছে। সেচের পানি বা সার সংকটের কথা শোনা যায়নি। সরকার ইতিমধ্যে ধান-চাল সংগ্রহ মূল্য ঘোষণা করেছে। সিদ্ধ চাল কেনা হবে ৩৬ টাকা কেজি দরে, ধানের জন্য দেওয়া হবে প্রতি কেজি ২৬ টাকা। গত বোরো মৌসুমে সরকার ১৪ লাখ টন চাল ও ৪ লাখ টন ধান সংগ্রহ করেছিল। সরকারের ধান-চাল সংগ্রহ করার লক্ষ্য দুটি, কৃষকদের ন্যায্য মূল্য প্রদান এবং আপতকালীন মজুদ বজায় রাখা। কিন্তু দশকের পর দশক একই অভিজ্ঞতা। সরকার ঘোষিত সংগ্রহ মূল্যের চেয়ে বাজারে ধানের দাম কম থাকলে বেশিরভাগ কৃষক তার সুফল পায় না, ফায়দা লোটে চালকল মালিক এবং ফড়িয়ারা। ‘জনপ্রতিনিধি’ ও তাদের আশপাশে থাকা রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা এর সুবিধা লোটে। তারা সরকারের কাছে ধান বা চাল জমা দেওয়ার ‘স্লিপ’ পায়। এমনকি জমি না থাকলেও পায়। ‘কৃষকবান্ধব’ বেগম মতিয়া চৌধুরী উৎপাদন বাড়াতে সফল হলেও ফসলের ন্যায্য দাম পাবার ক্ষেত্রে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করতে পরেননি, বর্তমান কৃষিমন্ত্রী পারবেন কি? কাজটি কঠিন, কিন্তু করোনা-বিপর্যয়ে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করতে না পারলে দুঃসময় প্রলম্বিত হবে। আমাদের জানা আছে, কর্মক্ষম প্রায় ৪৫ শতাংশ নারী-পুরুষ কৃষির সঙ্গে জড়িত। কৃষক ধানের ন্যায্য মূল্য পেলে এই বিপুল জনগোষ্ঠী সরাসরি উপকৃত হবে।

বিপুল সংখ্যক কৃষক ধান কাটার পরপরই বিক্রি করে দেয়। লকডাউনে হাটবাজার বন্ধ। কৃষক কোথায় যাবে ধান নিয়ে?

পেটের জোগান ঠিক থাকলে আমরা অন্য সমস্যা নিয়ে কিছুটা নিশ্চিস্তেভাবতে পারব। বাংলাদেশের কৃষি খাত ও পরিবেশ-প্রকৃতি আমাদের জন্য দারুণ এক সুযোগ সৃষ্টি করে রেখেছে। অর্থনীতির নানা খাত যখন ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম উদ্বেগে, তখন যদি চাল-আলু-সবজি-মাছে ঘাটতি থাকে, ভাবতে পারেন বিপর্যয় কত গভীর হবে! আমরা প্রতিদিন স্বাস্থ্য নিয়ে বুলেটিন শুনি। দুর্ভাগ্য, কৃষিমন্ত্রী বা কৃষি সচিব অর্থনীতির অতি গুরুত্বপূর্ণ এই খাত নিয়ে গণমাধ্যমে আসেন না। বোরো ধান দ্রুত কেটে ফেরতে হয়, নইলে ফসল ঝরে যায়। অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত দিনমজুর পাওয়া যায় না। সঙ্গত কারণেই ব্যবহার বেড়েছে ধানকাটা মেসিনের। এ মেসিন আমদানি বা দেশে তৈরির ক্ষেত্রে কিছু সুবিধাও সরকার দিয়েছে। তবে এ বছর রাজধানী ঢাকা ও অন্য শহর থেকে যে সব দিনমজুর-রিকশাচালক ও অন্য ভাসমান কর্মী এমনকি কলকারখানার শ্র্রমিকরা গ্রামে গিয়েছে, তাদের একটি অংশ ধানকাটার মজুরের বাজারে হাজির হবে। এতে মজুরের সংকট কমতে পারে, কিন্তু মজুরির হার কমে যেতে পারে। মজুরি কমলে উৎপাদকদের সুবিধা, কিন্তু ভূমিহীন মজুরদের মাথায় হাত। কৃষি খাত পরিচালনভার যাদের হাতে, নিশ্চয়ই এ সব নিয়ে ভাবেন তারা।

এবারের বোরো মৌসুম এসেছে ব্যবসায় চরম মন্দার সময়। এ সময় ধানের দাম যদি পড়ে যায় (এমনকি ধসের শঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না), সর্বনাশের কিছু বাকি থাকবে না। আরও শঙ্কা আছে। করোনার ঝুঁকি ও লকডাউনের কারণে পর্যাপ্ত মজুর না পাওয়া। ধান কাটতে গিয়ে কেউ করোনায় আক্রান্ত হলে মজুররা প্রচণ্ড ভয় পেতে পারে। মহামারীর সময় ক্ষেতের ফসল নষ্ট হওয়ার অনেক ঘটনা রয়েছে আমাদের সাহিত্যে। নিশ্চয়ই সংশ্লিষ্টরা তা পড়েছেন।

কৃষকরা ধানের ন্যায্য মূল্য না পেলে ধান-চাল ব্যবসায়ীদের পোয়াবোরো হতেই পারে। ২০১৭ সালে হাওর এলাকায় অকাল বন্যায় মাত্র ১০-১২ লাখ টন চাল উৎপাদন কম হয়েছিল। কিন্তু বিপুল ফসলহানির গুজব রটিয়ে ব্যবসায়ীরা চালের দাম প্রায় দ্বিগুণ করে দেয়। আমদানি করা হয় প্রায় ৬০ লাখ টন চাল-গম। সরকার আমদানি শুল্ক-কর ২৮ থেকে ২ শতাংশে নামিয়ে আনে। কিন্তু তার এক দানা সুফলও বেশিরভাগ মানুষ পায়নি। মুষ্টিমেয় ব্যবসায়ী এ সূত্রে বিপুল লাভ করে। এ ব্যবসায়ীরা কতটা শক্তিশালী সে বোঝার জন্য একটি ঘটনার পুনরুল্লেখ করছি। সে সময়র বাণিজ্যমন্ত্রী চালের বাজার অস্থির করার জন্য কুষ্টিয়ার এক বড় ব্যবসায়ীকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু দেখা গেল, ওই ব্যবসায়ী নিজ জেলায় শাসক দলের এক কেন্দ্রীয় নেতার ছাত্রছায়ায় দিব্যি ব্যবসায় করছেন।

কৃষি আমাদের বড় সম্পদ। অর্থনীতির অন্যান্য শাখার তুলনায় অভিন্ন বৈশিষ্ট্যের। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, প্রতি ইঞ্চি জমি কাজে লাগাতে। আমরা যেন এ সুবিধাকে হেলায় না হারাই। একদানা চালও যেন নষ্ট না হয়। ধান, পাট, শাক-সবজ-মাছসহ সব কিছুর উৎপাদন যে যতটা সম্ভব বাড়িয়ে নিতে পারি। আর এটা নিশ্চিত করার জন্য কৃষকদের সঙ্গে অব্যাহতভাবে কথা বলুন। গণমাধ্যমের সুবিধা কাজে লাগিয়ে বার বার কথা বলুন। এতে কৃষকরা উপকৃত হবে, কিন্তু যতটা উপকৃত হবে তার বহু গুণ পিরিয়ে দেবে দেশকে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)