চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনাভাইরাস: অন্য রোগীরা কেন চিকিৎসা পাবেন না?

করোনাকালে বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে চরম দায়িত্বহীনতার অভিযোগ উঠছে৷ মানুষ যথাযথ চিকিৎসা সুবিধা পাচ্ছে না৷ বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে মানুষ৷ এমনকি ৪ হাসপাতাল ঘুরে চিকিৎসা না পেয়ে গাড়িতেই আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যুর খবর সংবাদপত্রে এসেছে৷

১০ জুনের পত্রিকার খবরে এসেছে: ‘বুকে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের এক নেতা হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছোটাছুটি করলেও তাকে কেউ ভর্তি করেনি। অবশেষে গাড়ির মধ্যেই মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়েন তিনি। মৃত শফিউল আলম ছগীর (৫৮) বায়েজিদ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।’

বিজ্ঞাপন

অসুস্থ ছগীরকে প্রথমে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসার পরিবেশ না থাকায় পরে তাকে মেডিকেল সেন্টার নামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেয়া হয়। কিন্তু সেখানেও আইসিইউ বন্ধ ও চিকিৎসক না থাকার অজুহাতে তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। পরে জিইসি মোড় সংলগ্ন মেট্রোপলিটন হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখান থেকেও ফিরিয়ে দেয়া হয়৷ এরপর তাকে পাঁচলাইশের পার্কভিউ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানেও ভর্তি নিতে অপরাগতা প্রকাশ করে। অতঃপর নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের মাধ্যমে পার্কভিউ হাসপাতালে ভর্তির প্রক্রিয়া চলার মধ্যে গাড়িতেই ছগীরের মৃত্যু হয়।

বিজ্ঞাপন

তবে নিহত ছগীরের করোনাভাইরাসের কোন উপসর্গ ছিল না। তবুও নানা অজুহাতে তাকে ভর্তি করলো না হাসপাতালগুলো৷ অবশেষে বুকে ব্যথা নিয়ে চিকিৎসা সুবিধা না পেয়েই তাকে মরতে হলো৷

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও সাধারণ রোগীদের ফিরিয়ে দেয়ার একের পর এক অভিযোগ উঠছে হাসপাতালগুলোর বিরুদ্ধে৷ চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাচ্ছেন একের পর এক। এমনই কিছু খবর এসেছে সংবাদপত্রে। সেখানে বলা হয়েছে: হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে অ্যাম্বুলেন্সেই মারা গেলেন সদ্য ‘মা’ হওয়া তরুণী৷ শ্বাসকষ্ট নিয়ে চিকিৎসা না পেয়ে মারা গেলেন রাঙ্গুনিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রব চৌধুরী (৬৫)।তিনি মরার আগে করে গেলেন এক দুর্বিষহ ভর্তি যুদ্ধ। যে যুদ্ধ চিকিৎসা পাওয়ার যুদ্ধ৷ অথচ দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিকে কোভিড-১৯ এবং অন্যান্য সব ধরনের রোগীকে আলাদা ইউনিটে চিকিৎসা দিতে নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু কে মানে এই নির্দেশনা আর কে মানায়?

বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রাম নগর বিএনপির সহ-সভাপতি লায়ন মো. কামাল উদ্দিনও ভর্তিজনিত জটিলতায় মারা গেলেন৷ করোনার উপসর্গ নিয়ে প্রথমে তিনি যান নগরীর মা ও শিশু হাসপাতালে। সেখানে দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরও অক্সিজেন মেলেনি। এরপর পার্কভিউ, ম্যাক্স ও মেট্রোপলিটন হাসপাতালে নিয়ে গেলেও কেউ ভর্তি করলোনা তাকে। সবশেষে ট্রিটমেন্ট হাসপাতালে নিয়ে গেলে তার অক্সিজেন নেমে গিয়েছিলো ৭৮-এ। তখন তার প্রয়োজন ছিল আইসিইউ সাপোর্ট । কিন্তু ট্রিটমেন্ট হাসপাতালে তিনটি আইসিইউ শয্যার মধ্যে তিনটিতেই রোগী ভর্তি ছিলো। সব হাসপাতালে আইসিইউর খোঁজ করা হলেও কোথাও আইসিইউ মেলেনি। অতঃপর মারা যান এই বিএনপি নেতা৷ করোনা আওয়ামী লীগ, বিএনপি, বাম, ডান ধনী গরীব, মন্ত্রী,এমপি আমলা, চিকিৎসক ও সেনা পুলিশ সকলকেই আক্রান্ত করে চলছে৷

ক্রমশ আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা বেড়েই চলেছে৷ করোনা আক্রান্ত হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী, মন্ত্রীর স্ত্রী ও পিএস৷ মারা গেলেন সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী৷ মারা যাচ্ছেন ভিভিআইপি, ভিআইপি ও সাধারণ মানুষ৷ ভিভিআইপিদের খবর মিডিয়ায় আসে কিন্তু গরিব ও সাধারণদের খবর মিডিয়ায় আসে না৷ অনেকেই নিরবে ও বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছেন৷ কেউ করোনায় কেউ অন্য রোগে৷ একদিকে চলছে ভর্তি সংকট আবার অন্যদিকে অধিকাংশ হাসপাতালে রোগীবিহীন ফাঁকা শয্যা৷ কেউ ভর্তি হতে না পেরে মারা যাবে আবার হাসপাতালে সিট ফাঁকা থাকবে, কেন এই বৈপরীত্য? সরকারী অনুমোদন নিয়ে চালু হওয়া অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতালই সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে চলছে৷ দেশজুড়ে চলছে স্বাস্থ্যসেবার বাণিজ্যিকীকরণ৷

বিভিন্ন হাসপাতালে প্রথম সাক্ষাতে হাজার টাকা নিয়ে কিছু ওষুধ লিখে দ্বিতীয় সাক্ষাতে আরও কিছু ওষুধ লিখে দিয়ে বলে ৭ দিন পরে জানাবেন৷ অতঃপর তৃতীয় সাক্ষাতে দিতে হয় তাকে ১০০০ টাকা ফি৷ কারন তখন তিনি পুরনো হতে হয়ে যান নতুন রোগী! এভাবেই রোগী বাণিজ্য চলছে। এসব বাণিজ্য সম্পর্কে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কী বলবে? তাদের হাসপাতাল চালিয়ে যাওয়ার অনুমোদন দেয়ার সময় কি কোনো নির্দেশনা দেননি?

আরেকটা লক্ষ্যণীয় দিক হচ্ছে, অনেক ক্ষমতাধর মহারথীরাও অসুস্থ হলে বেসরকারী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন৷ তারা কেন নিজ সরকারের হাসপাতালের উপরই ভরসা করতে পারছেন না? তাহলে সরকারি হাসপাতাল কী রোগীসেবায় ব্যর্থ? অবস্থা দেখেতো তাই মনে হচ্ছে৷ যদিও মহামারীকালে এমনটা ভাবতে চাই না।

এরমধ্যেই একটি বেসরকারি টেলিভিশনে খবর বেরিয়েছে রাজধানী ঢাকার বেশকিছু হাসপাতালে রোগীর সিট ফাঁকা৷ এজন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী করছেন জনবলকে৷ কিন্তু এই জনবল না থাকার দায় কার? বেকাররা চাকরি পাবে না আর এদিকে থাকবে জনবল সংকট৷ এর যুক্তিটা কী? এই করোনাকালের চরম দুর্যোগময় মুহূর্তে স্বাস্থ্য দপ্তরের হযবরল অবস্থা দূর হওয়া দরকার। এ বিষয়ে এখনই মাস্টারপ্ল্যান হওয়া উচিৎ।  মানুষের প্রত্যাশা দেশের হাসপাতালগুলো সুশৃংখল স্বাস্থ্যনীতিতে পরিচালিত হোক৷ তাদের চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত হোক৷

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)