চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনাক্রান্তির সাংবাদিকতায় তাইরেসিয়াসের সত্যোচ্চারণ

গণমাধ্যম কী? শিক্ষার্থীদের এই প্রশ্নের উত্তরে আমি গ্রিক পৌরাণিক চরিত্র তাইরেসিয়াসের দিকে তাকাতে বলি।

‘তাইরেসিয়াস’ ছিলো থুড়থুড়ে এক বুড়ো। গ্রিক নাট্যকার সফোক্লেসের বিখ্যাত ট্র্যাজেডি ‘রাজা ইদিপাস’ নাটকের চরিত্র। এই বুড়ো ত্রিকালদর্শী আর সর্বজ্ঞ। গ্রিসবাসীর পাপ-পুণ্যের হিসাবরক্ষক তিনি। অন্ধ, তবুও কিছুই তাঁর চোখ এড়ায় না। তাঁর ছিলো ভয়হীন হৃদয় আর প্রজ্ঞাবান চরিত্র; যিনি রাজা ইদিপাসের পাপের কথা উচ্চারণ করেছেন খোদ রাজার মুখের উপর। রাজ্যের ঘোর অমানিশায় তাইরেসিয়াসের কিছু নির্ভীক সাহসী উচ্চারণ নাটকের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। দ্বিধাহীন চিত্তে, বলিষ্ট কণ্ঠে রাজা ইদিপাসের পাপের কথা বলে দেয় এই বুড়ো। রাজার ভয়কে উপেক্ষা করে তাইরেসিয়াসের সত্য উচ্চারণের কারণে এই গ্রিকপুরাণ আজ অনন্য! তাইরেসিয়াসের ভূমিকাও প্রশংসনীয়। কিন্তু আজ করোনাক্রান্তির এই অতিমারির সময়ে আমরা কী দেখছি? আসুন কিছু ঘটনার দিকে চোখ ফেরাই।

বিজ্ঞাপন

কৃষ্ণাঙ্গ হত্যার প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রে চলমান ঘটনা সরাসরি সম্প্রচারের সময় সিএনএন-এর লাইভ টিমের সদস্যদের তুলে নিয়ে গেছে পুলিশ। সিএনএন জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে তাদের তিন সংবাদকর্মীর হাতে হাতকড়া পরিয়ে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। (সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন, ৩০ মে )

এবার চোখ ফেরাই ভারতের পশ্চিমবঙ্গের এক কোটি সাতাশি লাখ সার্কুলেশনের পৃথিবীর সবচেয়ে পপুলার বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার দিকে। গতকাল টানা ৬ ঘণ্টা হেয়ার স্ট্রিট থানায় বসিয়ে রেখে জেরা করা হল সম্পাদক অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়কে। (সূত্র: সন্ময় বন্দোপাধ্যায়, কলকাতার প্রাক্তন সাংবাদিক)

আনন্দবাজারে যোগাযোগ সূত্রে খুব কাছ থেকে সম্ভ্রম নিয়ে কিছুটা দূরত্ব রেখে দেখেছি এই মানুষটিকে অসম্ভব বিনয়ী, ভদ্র, শিক্ষিত এবং পড়েছি তাঁর ক্ষুরধার লেখনি। আগাগোড়া প্রগতিশীল মানুষটি সরকারি কোপানলে পড়ে রাজ্যপালের হস্তক্ষেপে ছাড়া পান। রাজ্যপালের টুইটার হ্যান্ডল খুঁজলে ঘটনাতে তাঁর হস্তক্ষেপের বর্ণনা দেখি আমরা।

কিছুদিন আগে বাংলাদেশে একজন কার্টুনিস্ট এবং রাষ্ট্রচিন্তা’র ওয়েব টেকনেশিয়ানকেও গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে। এবার চোখ ফেরাই বাংলাদেশে! মুুুন্সীগঞ্জে সাংবাদিক পরিবারের ওপর হামলা (প্রথম আলো, ১৪ এপ্রিল), বিডিনিউজ ও জাগোনিউজ সম্পাদকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল আইনে মামলা (প্রথম আলো, ১৭ এপ্রিল), গণমাধ্যমে কথা বলতে নার্সদের প্রতি নিষেধাজ্ঞা (যুগান্তর, ১৮এপ্রিল), ডিজিটাল আইনে দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা, একজন কারাগারে (প্রথম আলা, ২৫ এপ্রিল), চট্টগ্রামে সাংবাদিককে মারধর, কনস্টেবল প্রত্যাহার (যুগান্তর, ১৪ এপ্রিল), সাংবাদিক তুহিনকে পুলিশের মারধর (মানবজমিন, ১৫ এপ্রিল), সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন পুলিশ কনস্টেবল (সমকাল, ১৫ এপ্রিল, বাগেরহাটে মাইটিভির সাংবাদিক নিগ্রহের খবর), সোনাগাজীতে কালের কণ্ঠের সাংবাদিককে প্রাণনাশের হুমকি (নয়াদিগন্ত, ৩ এপ্রিল), করোনার খবর নিতে গিয়ে সাংবাদিকরা নির্যাতিত হচ্ছেন (প্রথম আলো, ২৯ এপ্রিল)।

বিজ্ঞাপন

গত ৩ মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তনিও গুতেরেস বলেছেন, একদিকে যখন বিশ্বে ভাইরাসের মহামারী চলছে, তখন ভুল তথ্য, ক্ষতিকর স্বাস্থ্য পরামর্শ এবং উদ্ভট ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ঢেউ ‘মহামারীর মতো’ ছড়িয়ে পড়ছে। সেই মহামারীর বিরুদ্ধে প্রতিষেধক হল মুক্ত সংবাদমাধ্যম! অথচ আজ আমরা কী দেখছি?

করোনাকালেও সাংবাদিকতা আক্রান্ত হচ্ছে! পৃথিবী বদলে গেলেও শাসকশ্রেণী সাংবাদিক দলন ও মতপ্রকাশের বাধা হয়ে উঠছে। করোনাক্রান্তির এই দুঃসময়ে সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলা এবং হুমকি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের পথে বাধা। অগণতান্ত্রিক সমাজ থেকে এবার চোখ ফেরাই মিথলজির সমাজে।

মহাভারত মিথোলজির প্রথম দিকে অদ্ভুত দুই জন সাংবাদিক পাই আমরা। একজন নারদ; ধ্বনিচিত্র সম্প্রচারক (অডিওভিডিও টেলিকাস্টার), অপরজন সঞ্জয়; সরাসরি সম্প্রচারক (লাইভ টেলিকাস্টার)। স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল জুড়ে যে বিশেষ প্রতিনিধি খবর সংগ্রহ ও পরিবেশন করতেন তিনি নারদ! হিন্দিতে “নারাহ” মানে স্লোগান, সেই অর্থে নারা+দ= নারদ। “দ” মানে “যে দেয়”। অর্থাৎ, যিনি স্লোগান দেন বা ধ্বনি দেন। তাই নারদ হলেন মিথলজির ইতিহাসে প্রথম ধ্বনিচিত্রের সম্প্রচারক! এদিকে হস্তিনাপুরে বসে সুদূর কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সরাসরি বর্ণনা দিয়েছিলেন সঞ্জয়। অন্ধ মহারাজা ধৃতরাষ্ট্রের অনুচর সঞ্জয়। সঞ্জয়ের কাজ ছিল রাজসভায় বসে চোখ বন্ধ করে প্রতিদিন যুদ্ধের লাইভ আপডেট দেয়া। সঞ্জয় হুবহু পক্ষপাতহীন বর্ণনা দিয়েছিলেন যুদ্ধের। তাই গীতায় শ্লোকে শ্লোকে বলা আছে “সঞ্জয় উবাচ”। সেই হিসেবে সঞ্জয় ইতিহাসের প্রথম সরাসরি সম্প্রচারক।

সংবাদ প্রচারে ভুল হলে নারদ ‘ক্ষমা’ চাইতেন। নারদ দেবতাদের পক্ষ নিতে গিয়ে সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতাও হারাতেন মাঝে মধ্যে। তবে সঞ্জয় ক্লান্তিহীনভাবে অপ্রিয় যুদ্ধ বৃত্তান্ত রাজাকে শুনিয়েছেন। বিভিন্ন সময় নারদ আর সঞ্জয় বারবার অসুর আর ধৃতরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু তারা কানে নেননি। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে অসুরদের, ধ্বংস হয়েছে ধৃতরাষ্ট্রের গুষ্টি। মহাভারত তথা মিথলজি পাঠের প্রাসঙ্গিকতা এখানেই যে আজকের পৃথিবীর বুকে ‘দেবতা’ বা ‘অসুর’ কেউই গণমাধ্যমের সমালোচনায় সতর্ক হচ্ছেন না। গণমাধ্যম (নারদ বা সঞ্জয়) উপেক্ষিত! ফলে যা হওয়ার হবে! গোষ্ঠীনাশ, ভাতৃঘাতী সংঘাত, রাজ্যনাশ এবং বংশনাশ। অন্ধ রাজা বিলাপ করবে, হায় শতপুত্র, হায় শতপুত্র বলে বলে…!

সারা পৃথিবীতেই ভয়াবহ করোনাক্রান্তি চলছে। পৃথিবীর জ্বর এখন। এই জ্বরের মধ্যেও রাষ্ট্রীয় আক্রমণের বাইরে নয় সাংবাদিকতা। করোনা যখন নতুন মানবিক পৃথিবীর ইঙ্গিত দিচ্ছে, তখন এসব ঘটনা আমাদের হতবাক করছে। সারা দুনিয়ায় এখন এমন একটা যুদ্ধ চলছে এবং সভ্যতার ইতিহাসে এটাই প্রথম কোন যুদ্ধ, প্রত্যেকটা দেশ যার যার মিত্রপক্ষ! রোগতত্ত্ব, সমাজবিজ্ঞান, যোগাযোগবিদ্যা আর চিকিৎসাশাস্ত্রের সকল সমীকরণ উল্টে দিয়ে নয়া রোগের বিশ্বায়ন জারি হয়েছে পৃথিবীতে। এই অভিনব যুদ্ধের আঁচ পড়েছে সমাজের সবকিছুতেই। বাদ পড়েনি সাংবাদিকতা। একদিকে শাসকশ্রেণী আরেকদিকে কভিড-১৯ তথা করোনাভাইরাস; দুই ফ্রন্টেই লড়ে যাচ্ছে সাংবাদিকতা!

লেখাটি শুরু করেছিলাম গ্রিক ট্র্যাজেডির তাইরেসিয়াসকে নিয়ে। আজ করোনাক্রান্তির ঘোর অমানিশায় আমরা যেন সফোক্লেসের অদ্ভুত ভৌতিক সময়ে ফিরে গেলাম। যদি সত্য কথা চরম প্রতিকূল সময়ে মুখের ওপর বলা যেতে পারে, তবেই জাতির ট্র্যাজিক মুহূর্তে ত্রাতার ভূমিকায় তাইরেসিয়াসের মতো অবতীর্ণ হতে পারবে গণমাধ্যম। এখন পুরানকাল নয়, কলিকাল; তাই আমাদের তাইরেসিয়াস নাই, সঞ্জয় নাই, দুয়েকটা নারদ মুণি যারা আছেন; তাঁদের ওপর কথায় কথায় চলছে হুমকি, আক্রমণ আর দমনপীড়ন!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)