চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনাক্রান্তির গৃহবন্দীত্ব

গত তিন মাস ধরে পৃথিবী এক নতুন সংকটের মুখোমুখি। যার নাম নভেল করোনা ভাইরাস (কোভিড ১৯)। এ নিয়ে বিশ্ব পরিস্থিতি নজিরবিহীন উদ্বেগজনক। বাংলাদেশে এসে লেগেছে তার ঢেউ। কেউ আমরা ভাবিনি করোনা নামের এক অশরীরী শত্রু, এক অণুজীব প্রবল প্রতাপশালী মানবজাতিকে এমন ঘনঘোর দুর্বিপাকে ঠেলে দিয়ে সমাজবিচ্ছিন্ন করবে। অতীতের নানা মহামারির তুলনায় করোনা মহামারির মৃত্যুঘাতী প্রবণতা কম হলেও এর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা বিশ্বব্যাপী আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে।

করোনা রুখতে গিয়ে আমরা অসহায় হয়ে দেখছি এক অদৃশ্য জীবাণু কিভাবে এই সুদৃশ্য পৃথিবীকে অচল করে দিলো! কিন্তু প্রশ্ন হলো, পৃথিবী কি আসলেই সুদৃশ্য ছিলো? না। ক্যাপিটালিজম এই পৃথিবীতে যে গতি এনেছিলো, আজ সে নিজের কবর খুঁড়ছে। বহুল আলোচিত “ডিজাস্টার ক্যাপিটালিজম”র মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে। এই রোগের আপাত দাওয়াই হাত ধুয়ে স্বেচ্ছায় ঘরে বন্দী থাকা। নাগরিকরা এখন স্বেচ্ছায় ঘরবন্দী। অফিস চলে গেছে ঘরে ঘরে ল্যাপটপের মনিটরে। ঘর এখন সমাজ, সমাজই এখন ঘর।

বিজ্ঞাপন

পৃথিবীব্যাপী কোবিড-১৯ এর বিরুদ্ধে যুদ্ধটা আসলে ‘হোমো সেপিয়েন্স’ বনাম ‘ভাইরাস’র আন্তঃপ্রজাতিক যুদ্ধ। যোগাযোগবিদ্যার ভাষায় বলতে গেলে এই রোগ আসলে ‘সাম্যবাদী’ রোগ! জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য ভাইরাস নিশ্চিত করছে সে। এই রোগ এতটাই সাম্যবাদী যে, তার কাছে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান, আশরাফ-আতরাফ, ব্রাহ্মণ-শুদ্র, উঁচু-নিচু, সাদাকালো, হলুদ-খয়েরির কোনো ভেদাভেদ নেই। একজন গার্মেন্টস শ্রমিক যেখানে আক্রান্ত হবেন, তেমনি রাষ্ট্রপ্রধানগণেরও আশঙ্কা আছে। করোনার শিক্ষা এই, মানুষে মানুষে শ্রেণীভেদ প্রাকৃতিক নয়, কৃত্রিম। করোনাকে বিশেষ ধন্যবাদ, পুঁজিবাদ, মুনাফা, ডিজাস্টার ক্যাপিটালিজম এবং সমাজ বিচ্ছিন্ন গণসমাজের অসহায় আর্ত চিৎকারকে সহজেই পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য। করোনা শিখিয়ে গেলো, বিশ্বায়নের প্রবল প্রতাপের যুগে লোভ আর চাহিদার লাগাম টানতে না জানলে দরজা বন্ধ করে ‘হাত ধুয়ে বসে থেকে’ই ধুঁকে ধুঁকে মরতে হবে। শৌচকর্ম করার পর সাবান দিয়ে হাত ধোয়া শেখাতে বাঙালিকে মিনা কার্টুন সময় নিয়েছে ১২ বছর, যা করোনা এসে আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

অন্য দশজনের মতো আমাকেও বদ্ধ ঘরে করোনাক্রান্তিকাল কাটাতে হচ্ছে। সমাজবিচ্ছিন্ন সঙ্গনিরোধ ফেসবুক হয়ে উঠেছে সমান্তরাল সমাজ। ফেসবুকে এক বন্ধুর ‘মুভি চ্যালেঞ্জ’র মুখে পড়ে প্রিয় সিনেমা দেখতে বসি। অনেকটা করোনাক্রান্ত সময়কে নিয়েই বানানো এই সিনেমা। দক্ষিণ কোরিয়ার বিখ্যাত সারভাইবাল সিনেমা ‘দি ফ্লু’। সিনেমার প্রেক্ষাপট- কোরিয়াতে H5N1 ভাইরাসটির মারাত্মক মারাত্মক প্রবণতা বুন্দাং শহর গিলে খাচ্ছে। যেমনটি আজ সারা বিশ্বে প্রবল প্রতাপ বিস্তার করেছে কোভিড-১৯ তথা করোনা ভাইরাস। কোরিয়ার বুন্দাং শহর ছেয়ে গেছে অদ্ভুত এক রোগে।

বিজ্ঞাপন

মাত্র দেড় দিনেই এটি সংক্রমণ করে আর শহরের প্রায় সবাইকে মেরে ফেলে। প্রায় ১ মিলিয়ন জনসংখ্যার এলাকা হঠাৎ করে মুখোশ পড়ে ফেলে। পড়ে মৃত্যু ঝুঁকিতে পড়ে। সিনেমার স্থান সিউল থেকে দূরে একটি শহর। সেই শহরে সবাই এখন ‘হাঁচি দূরত্বের মধ্যে’ ভাইরাস বাহিত রোগের সংক্রমণে পড়েছে। একটি মারাত্মক বায়ুবাহিত ভাইরাস, এর মধ্যে একটি শিশুকে বাঁচানোর চেষ্টা। আমরা যারা সারভাইভাল মুভি দেখি বা মহামারী মুভিগুলো দেখেছি, তারা দেখি, আমেরিকান ধাঁচের সিনেমাগুলোতে সাধারণত সরকারকে দোষারোপ করা হয়, তেমনি এই মুভিও সরকারকে দোষ দেয়। সিনেমার শেষে সৈন্যরা একটি ছোট্ট মেয়েটিকে গুলি করতে চায়, সেখানেই আপনার হৃদয়টা মোচড় খাবে। সিনেমাটি কেবল ‘সারভাইবাল মুভি’ই নয়, একজন মানবিক মা-বাবার সাথে সন্তানের মধ্যে চমৎকার রসায়নের মুভি।

ফিরি করোনার আলাপে। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে সংস্পর্শে ছড়ায় এই রোগ। তাই গুনগুন স্বরে গাই- ‘তারে বলে দিও.. সে যেন আসে না আমার দ্বারে’…! হ্যাঁ, করোনাক্রান্ত ভয়াবহ দিন আসছে সামনে। এটা এমন এক ভয়াবহ সভ্যতাঘাতি, অচ্ছ্যুত, সম্পর্কচ্ছেদি রোগ, আপন হাতকেও যেখানে আমার বিশ্বাস নেই। নিজের হাত নিরাপদ রাখা আর অন্যের হাত থেকে দূরে থাকা ছাড়া যেন উপায় নেই। প্রেম যাদের অধরা, করোনা যেন তাঁদের জন্য অজুহাত! শৈশবে মহোৎসব/সংকীর্তনে গেলে খিচুড়ি মহাপ্রসাদ খেতে সবাই মাঠে সারিবদ্ধভাবে বসে থাকতাম। মাঠে বসে খিচুড়ির লম্বা লাইন পড়তো। সেই লাইনে বসে মাথা উঁচু করে দেখতাম, দূর থেকে একজন জল নিয়ে পাতে-পাতে আসছে। সেই জল দিয়ে জনে-জনে হাত ধুয়ে নিতাম। ধোয়া হাত কিছুক্ষণ পর শুকিয়ে আসতো। তারও কিছুক্ষণ পর দেখতাম, অনেক দূর থেকে ধীরপায়ে বালতি হাতে গরম খিচুড়ি নিয়ে আসছে একজন। পাতে-পাতে ঢালছে। সুরুৎ সুরুৎ করে তরল খিচুড়ি খেতাম ধুলোগড়াগড়ি মাঠে বসে। সঙ্গনিরোধ অবস্থায় আজ ঘরকে মনে হচ্ছে মহোৎসবের খিচুড়ি প্রসাদ খাওয়ার মাঠ।

আর ‘হাত ধুয়ে অপেক্ষা’কে মনে হচ্ছে খিচুড়ি বিলানো বালতির দিকে তাকিয়ে আছি, কবে পাবো মহাপ্রসাদ? কবে ঘটবে পাপমুক্তি? কেবল ‘হাত ধুয়ে’ই জীবন-জগৎকে রক্ষা করার এত বড় সরল মহাষৌধ আর কখনো দেখিনি। হাত ধুয়ে বসে আছি, অভিনব এক ভাইরাস ঠেকাতে! খিচুড়ির বালতির মত সুদিন কখন আসবে মহাপ্রসাদের রূপ নিয়ে? মন্দির, মসজিদ, গির্জা, প্যাগোডার ত্রাতারা দুয়ারে খিল এঁটে ঘুমুচ্ছেন। মেডিকেলের জরুরি বিভাগের ডাক্তারকে গিয়ে বলছি, ‘অবনী জেগে আছো’?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।