চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনাকাল: ধনী আরও ধনী হবে, গরিব আরও গরিব

গত কয়েকমাসে করোনা বিশ্বজুড়ে বহু মানুষের অন্নের সংস্থান নষ্ট করেছে। দিনমজুর, কারখানার শ্রমিক, রিকশা-ভ্যান-সিনএনজি-পাঠাও-উবার-ক্যাব-বাস চালক, রেস্টুরেন্ট, দোকান, পার্লার ও সেলুনে কাজ করা কর্মচারীসহ বহু পেশার মানুষদের ধুকতে হচ্ছে রুটিরুজি জোগাড় করতে গিয়ে। গত দুমাস ধরে আয়ের পথ আটকে থাকলেও তাই বলে যে তাদের নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় ব্যয় বন্ধ ছিলো তা নয়। দুবেলা ডাল-ভাত, স্বল্প পরিসরে হলেও যাতায়াত, নিকট পরিজনের সাথে দরকারী আলাপন ব্যয়, করোনা থেকে বাঁচতে সাবান-মাস্ক কেনা ইত্যাদির জন্য হলেও তাদের ন্যুনতম টাকা খরচ করতে হয়েছে। এতে তারা আরো নিঃস্ব হয়েছে। কৃষক তার সর্বস্ব দিয়ে চাষ করা ফলমূল ও সবজির মূল্য পায়নি সব বন্ধ থাকায়। এ নিয়ে অনেকগুলো সংবাদও চোখে পড়েছে। স্থানীয় ও ব্যাবসায়ীদের আয়ের পথও বন্ধ ছিলো। ফলে এটা খুবই দৃশ্যমান যে এই নিম্ন আয়ের মানুষগুলোর কাছে নতুন করে টাকা আসেনি বরং তাদের হাতে থাকা সর্বশেষ টাকাগুলোও খরচ হয়ে গেছে। খরচ হয়ে যাওয়া ওই টাকাগুলো গিয়েছে তাদের পকেটেই যাদের আগে থেকেই অঢেল আছে। অর্থাৎ সেই ব্যাবসায়ী, মধ্যস্বত্বভোগী বা বড় বড় কোম্পানি ওয়ালাদের পকেটে।

যদি কেবল নিজের কথাই চিন্তা করি, গত দুমাসে আমি বাজারে গিয়েছি মাত্র দুবার। তাও ঠেকায়পড়ে। বাকি সময়টাতে অনলাইনেই অর্ডার করেছি। তারা দাম বেশি রেখেছে ওই সময়টাতে, কিন্তু কিছু করার ছিলো না। নিজেকে ভাইরাসের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য ওই এক্সট্রা দাম গুনতে হয়েছে। এছাড়া অনলাইনে ক্লাস নেয়া, প্রতিনিয়ত পরিবার পরিজনদের খোঁজ খবর রাখা, ইন্টারনেট ইত্যাদির জন্য অপারেটর কোম্পানিকে দিতে হয়েছে প্রচুর টাকা। যা দিয়ে প্রায় আমার এক মাসের খাবারের টাকা হয়ে যেতো। চিন্তা করে দেখেন, কেনো বলা হয় ক্যাপিটালিজম নিজেই আসলে অন্ধ! করোনার এই মহামারীর সময়ে নেটওয়ার্ক অপারেটর কোম্পানিগুলো কিন্তু ওই ভিখিরির কাছ থেকেও বিল নিয়েছে, মাফ করেনি। কারণ নেটওয়ার্ক চেনে না কে ভিখিরি, কে কোটিপতি! বা মাফ করেনি করোনা আর আম্পান উভয়ের তান্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত ওই উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষদের অন্যের বেঁচে থাকার খবরটা নেয়ার বিল।

বিজ্ঞাপন

গার্মেন্টস শিল্পকে বাঁচাতে প্রণোদনা দিল সরকার অথচ এখনো অনেক কারখানায় শ্রমিকরা বকেয়া বেতনই পেলো না। লকডাউন তুলে দেবার পর পরিবহন খাতকে বাঁচানোর জন্য ভাড়া বাড়ানো হল ষাট শতাংশ। একে তো সাধারণ দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষগুলো গত দুমাসে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে আছে, তার উপর এই বর্ধিত ভাড়া যেনো মরার উপর খাড়ার ঘা!

বিজ্ঞাপন

গত ২৮ মে ২০২০, প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি রিপোর্ট বলছে গত দশ বছরে ধনীর সংখ্যা বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ শীর্ষে অবস্থান করছে। রিপোর্টে আরো বলা হয় যে হারে ধনীর সম্পদ বাড়ছে, সে হারে দরিদ্র লোকের আয় বাড়ছে না। সম্পদের পাহার জমছে একদিকে আর অন্যদিকে দরিদ্রকে যুদ্ধ করতে হচ্ছে মৌলিক চাহিদাটুকু পূরণে। অর্থাৎ আয়ের ব্যবধান ও বৈষম্য বাড়ছে যা একটি দেশের জন্য কখনোই ইতিবাচক হতে পারে না।

সম্প্রতি ফোর্বসের প্রতিবেদন বলছে তাদের হিসাব অনুযায়ী, গত দুই মাসে বিশ্বের শীর্ষ ২৫ ধনী আয় করেছে ২৫৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ সবার থেকে এগিয়ে। দ্বিতীয় বেশি আয় করেছে আমাজন ফাউন্ডার ও সিইও জেফ বেজোস। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই ২৫ এর মধ্যে থাকা সম্পদশালীদের অধিকাংশেরই ব্যবসা ইন্টারনেট ও প্রযুক্তি ভিত্তিক। যেমন ফেসবুক, আমাজন, ওয়ালমার্ট, মাইক্রোসফট, ইন্টারনেট মিডিয়া, ই-কমার্স, গুগল, টেলেকম ইত্যাদি। ফলে এটা বোঝাই যাচ্ছে আগামী দিনগুলোতে অর্থ কাদের দিকে ছুটবে।

এটা স্পষ্ট যে করোনা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষকে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে বেকার করে দেবে। ইতোমধ্যে ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক ফোরামের রিপোর্টে বলা হয়েছে এই কোভিড-১৯ এর ফলে ৪৯ মিলিয়ন মানুষ চরম দারিদ্রতার মধ্যে পরে যাবে, আইএমএফ বলছে এবছর গ্লোবাল জিডিপি কমে যেতে পারে কমপক্ষে তিন শতাংশ। আবার অন্যদিকে বিভিন্ন দেশের সম্পদশালীরা, বিশ্বের বড় বড় ধনীরা আবার আরো ফুলে ফেঁপে উঠবে। এই মুহূর্তে যদি দেশগুলো গরিবের পাশে না দাঁড়ায় তবে আগামীর পৃথিবী হবে আরো নিষ্ঠুর ও স্বার্থপর।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)