চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনাকালে হাসপাতালে ডিউটি এবং একজন চিকিৎসকের গল্প

২৮ এপ্রিল ২০২০। বাসায় স্ত্রী’কে কিছু না জানিয়েই মহাখালি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে এলাম। ডা. বেলাল হোসেন স্যার, পরিচালক (প্রশাসন) কে আমার ইচ্ছার কথা জানালাম। স্যার বললেন, তুমি নিশ্চিত তো? আমি জানালাম – স্যার আমি শতভাগ নিশ্চিত।

বাসায় চলে এলাম। ইফতারের একটু আগেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস বিভাগ থেকে মেসেজ পেলাম-আমার মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পোস্টিং অর্ডার হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ। আমি সরকারি চিকিৎসক হিসেবে শিক্ষা ছুটিতে একটা নন ক্লিনিকাল কোর্সে আছি। কিন্তু লকডাউনের কারণে আপাতত অনলাইনে ক্লাস ব্যাতীত কোন কাজ না থাকায় আমি হতাশ হয়ে পড়ছিলাম। কেননা, একজন চিকিৎসক হিসেবে আমার এখন করোনা রোগীদের পাশে থাকা উচিত। আর সেজন্যই শিক্ষা ছুটিতে থাকার পরও করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে কাজ করার পোস্টিং অর্ডার এর জন্যই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আজ পরিচালক (প্রশাসন) স্যারকে অনুরোধ করেছিলাম।

বিজ্ঞাপন

এবার আমার জন্য কঠিন পরীক্ষা, বাসায় স্ত্রী’কে জানানো। তাকে বললাম যে, করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে আমার পোস্টিং অর্ডার হয়েছে আজ। তোমার পুরোপুরি সমর্থন চাই। অল কোয়ায়েট ইন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট! তার চোখের পানি মুছে কিছুক্ষণ পর বললো-দেশের মানুষের জন্য এমন সেবা করার সুযোগ তুমি পেয়েছো, তাই তোমার জন্য আমার পুরো সমর্থন আছে। আমি হাফ ছাড়লাম। ভেবেছিলাম সে খুব কান্নাকাটি করবে। কিন্তু চিকিৎসক না হয়েও সে এই পেশার মহত্ব বোঝে। তাই, চোখের পানি আড়াল করেই উল্টো আমাকে সাহস যোগালো। একটু পরই শাশুড়ির ফোন। রিসিভ করেই শুনতে পেলাম হাউমাউ করে কান্নার শব্দ। “বাবা তোমার চাকরি করতে হবে না, তুমি চাকরি ছেড়ে দাও।” আমি তাকে বোঝালাম-আম্মা এখন যদি আমি মৃত্যুর ভয় পেয়ে চাকরি ছেড়ে দেই, তাহলে চিকিৎসক হিসেবে আমি কখনোই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবো না। তাই, আপনি শুধু দোয়া করেন, আমি যেন সুস্থ থেকে করোনা রোগীদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পারি। আম্মার কান্নার প্রকোপ একটু কমলো। একটু পরই আমার সেজ ভাইয়ার ফোন-“আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ তোকে করোনা রোগীদের সেবা করার সুযোগ দিছেন। ইনশাআল্লাহ তিনিই তোকে সুস্থ রাখবেন”। কথাগুলো ভাইয়া এক নিঃশ্বাসে বললেও টের পেলাম তার ভেজা গলার স্বর। একে একে আরো অনেক ফোন আসতে লাগলো।

বিজ্ঞাপন

ডিউটি শুরুর আগেই এক চিকিৎসক বন্ধু নিজের সংগ্রহ থেকে আমাকে অরিজিনাল একটা এন-95 মাস্ক পাঠালো। চিকিৎসক বড় ভাইয়া খুলনা থেকে দুই সেট পিপিই পাঠালো, আরেক স্কুল বন্ধু দিলো মাস্ক, পিপিই, ফেসশিল্ড। এবার আমি প্রস্তুত করোনা রোগীদের সেবার জন্য!

প্রথম দিন মর্নিং ডিউটি। সকাল ৮ টার একটু আগেই পৌঁছে গেলাম আমার কর্মস্থলে। নাইটের ডাক্তারের কাছ থেকে হ্যান্ডওভার বুঝে নিলাম। মর্নিং এর অন্য ডাক্তাররাও ততক্ষণে চলে এসেছেন। আমাদের টিমের লিডার সহকারি অধ্যাপক ডা. ওমর ফারুক স্যার আমাদের ব্রিফ করলেন, আমরা কিভাবে কাজ করবো। এর মধ্যেই আমাদের রুমের বাইরে থেকে একজনের কান্না শুনতে পেলাম। ডিউটি রুম থেকে বের হলাম। এক রোগীর স্বজনকে দেখতে পেলাম। তার ৬ মাসের বাচ্চার তীব্র শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, এখনই যেন আমরা তার বাচ্চাকে দেখতে যাই। তখনও আমরা কেউই পিপিই (পার্সোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট) পরিধান করি নাই। তাকে বললাম যে, আপনি রোগীর কাছে যান, আমরা আসছি। কিন্তু রোগীর বাবা হাউমাউ করে কেঁদেই চলেছে! শেষমেশ টিম লিডারের অনুমতি নিয়ে আমিই খুব দ্রুত পিপিই পরে ছুটলাম বাচ্চাকে দেখতে। তীব্র (সিভিয়ার) নিউমোনিয়া সাথে করোনা পজিটিভ। বিছানায় শুয়ে ছটফট করছে বাচ্চাটা। অক্সিজেন ঠিকভাবে নিতে পারছে না। দ্রুত ডিউটি নার্সকে ডেকে ইনজেকশন দেবার ব্যবস্থা করলাম, মাস্ক দিয়ে হাই ভলিউমে অক্সিজেন দিলাম। যেখানে করোনা রোগীদের খুব কাছে যাবার ব্যাপারে আমাদের একটু বিধিনিষেধ আছে, তবুও সব ভুলে বাচ্চাটাকে একটু সুস্থ করার জন্য আমি প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগলাম। এমনকি বাচ্চার বুকে হাত দিয়ে শ্বাসের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করলাম, যেহেতু স্টেথেসকোপ কাছে ছিলো না। আধা ঘন্টা পর বাচ্চাটা একটু স্বাভাবিক হলে আমি বাচ্চার মাকে করণীয় বুঝিয়ে দিয়ে আমার ডিউটি স্টেশনে এসে অন্য রোগীদের কাজ শুরু করলাম। এক মুহূর্তের জন্য বসতে পারি নাই সেদিন। এর মধ্যেই আরো দুইবার সেই বাচ্চার জন্য ডাক আসছিলো। দুইবার যেয়েই দেখে এলাম বাচ্চাকে। শেষবার আসার সময় বাচ্চার মায়ের কি আকুতি-স্যার আপনি চলে গেলে আর কেউ কি এভাবে আমার বাচ্চা কে দেখবে! আমি বললাম, অবশ্যই দেখবে। আপনি টেনশন করবেন না। দুপুর ১২ টার পর আমার পিপিই খুলে অফ হয়ে যাবার কথা থাকলেও রোগীদের চাপে পারি নাই অফ হইতে। এমনকি ডিউটি ২ টায় শেষ হইলেও আমার কাজ শেষ করতে ৩ টা বেজে গিয়েছিল। হাসপাতাল থেকে বের হবো, তখন সেই বাচ্চার বাবা আমার কাছে এসে আমার মোবাইল নম্বর চাইলে আমি তাকে নম্বর না দিয়েই চলে আসি। ভাবি, নম্বর দিলেই তো একটু পর পর ফোন দিয়ে জ্বালাতন করবে! কিন্তু কে জানতো, নম্বর না দিয়ে সারা জীবনের জন্য আমিই জ্বলবো! বাচ্চার কথা এবং সেই সাথে চিকিৎসক হিসেবে আমার অপরাগতার কথা ভেবে সিএনজিতে ফেরার সময় হাউমাউ করে কান্না করলাম কিছুক্ষণ। সিএনজি ড্রাইভার অবাক হয়ে পিছনে ফিরে কিছু না বলে আবার ড্রাইভিং করতে লাগলো। বাসায় ফিরেও শান্ত হতে পারছিলাম না। নামাজ পড়তে যেয়ে বাচ্চার কথা ভেবে আরো বেশি কান্না আসছিলো। স্ত্রীকে বললাম বাচ্চাটার জন্য দোয়া করতে। আর আফসোস হচ্ছিল, আমার মোবাইল নম্বরটা দিলে অন্তত অসহায় বাবা একটু আস্বস্ত হতে পারতো। ঠিক করলাম, আগামীকাল নাইট ডিউটিতে যেয়েই আগে বাচ্চাটাকে দেখতে যাবো এবং আমার নম্বর দিয়ে আসবো।

বিজ্ঞাপন

পরদিন ডিউটির ১ ঘন্টা আগেই হাসপাতালে পৌঁছাই। বাচ্চার খোঁজ নিতে গেলাম আগে। কিন্তু বাচ্চাটা যে বেড এ ছিলো, সেটা ফাঁকা। নতুন রোগী এসেছে সেই বেডে। নার্সেস স্টেশনে গেলাম। বাচ্চার কথা বলতেই যে উত্তর শুনলাম, তার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। বাচ্চাটা আজ সকালেই মারা গেছে, কোন চিকিৎসাই বাচ্চাটাকে করোনার বিরুদ্ধে বেঁচে থাকার এই যুদ্ধে জয়ী করতে পারলো না! মনে হলো আমার নিজের বাচ্চাকেই বোধহয় আমি হারালাম! সারারাত অন্য রোগীদের জন্য নিজেকে ব্যস্ত রেখে বাচ্চাটার কথা ভোলার চেষ্টা করলাম!

একদিন পর ইভনিং ডিউটি ছিলো। ডিউটিতে আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই এক রোগীর লোক আমাদের ডক্টরস রুমের খুব কাছে এসে দুই হাত জোড় করে সাহায্য চাচ্ছিলো তার গর্ভবতী স্ত্রী’র জন্য। যেহেতু আমরা কেউই তখনও পিপিই পরিধান করি নাই, তাই তাকে রোগীর কাছে যেতে বললাম। দ্রুত করে আমরা দুইজন মেডিকেল অফিসার পিপিই পরে নিলাম। রোগীকে নিয়ে তার স্বজনরাই ট্রলি ঠেলে আমাদের ডিউটি স্টেশনে সরাসরি নিয়ে এসেছে। ৪০ সপ্তাহের ফুল টার্ম প্রেগন্যান্ট এবং করোনা পজিটিভ রোগী। আমার সহকর্মী ডা. আতিক রোগীকে প্রাথমিকভাবে দেখে আমাদের টিম লিডার স্যারকে জানালো। স্যার আমাদের হাসপাতালের গাইনী বিভাগের টিমকে রেডি হয় আসতে বললো। তারাও দ্রুত এসে রোগীকে জরুরি সিজার করার জন্য অপারেশন থিয়েটার এ নিলো। মাত্র আধা ঘন্টার নোটিশেই অপারেশন এর আয়োজন এবং বাচ্চা পৃথিবীর আলো দেখতে পেল। অপারেশনের পর আবারো আমাদের টিমের হুড়াহুড়ি। রোগীর গর্ভবস্হায় ডায়াবেটিস ছিলো, অপারেশন এর পর এখন তা অনেক বেড়ে গেছে। রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। টিম লিডার এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট ডা. ফারুক স্যার রোগীকে দেখে চিকিৎসা শুরু করলেন। এদিকে বাচ্চা ও একটু কম শ্বাস নিচ্ছে। টিমের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. পরিমল দাদা এবার বাচ্চাকে চিকিৎসা দিলেন। কিছুক্ষনের মধ্যেই মা এবং বাচ্চার অবস্থা উন্নতি হলে আমরা একটু হাফ ছেড়ে বাঁচি! একটু পর বাচ্চার গর্বিত বাবা বাচ্চাকে নিয়ে আসে আমাদের টিমের সাথে ছবি তোলার জন্য। সে এতই কৃতজ্ঞ যে পারলে আমাদের পা ছুঁয়ে সালাম করে। তবে, এবার আমি আরো সাবধান হই। আর ভুল করি না। রোগীর স্বামীকে আমার মোবাইল নম্বর দিয়ে বলি, যখনই কোন প্রয়োজন হবে, আমাকে কল করবেন।

‌দ্বিতীয় নাইট ডিউটিতে যখন হাসপাতালে ঢুকলাম, তখন রাত ৯ টা ২০ বেজে গেছে। অর্থাৎ আজ ২০ মিনিট লেট আমি। তাই টিম লিডারের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে দ্রুত পিপিই পরে নিলাম। কেবিন ব্লকে নতুন রোগী এসেছে। তাই ফাইল নিয়ে তাড়াতাড়ি চলে গেলাম ১২৩৯ নম্বর কেবিনে। রোগী একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি ছিলো। করোনা টেস্ট পজিটিভ আসায় সেই হাসপাতাল থেকে রেফার করে দিলে সে এই সরকারি হাসপাতালে এসে ভর্তি হয়। দেখলাম শ্বাস কষ্ট হচ্ছে রোগীর। তাড়াতাড়ি নার্সকে দিয়ে অক্সিজেন এর পরিমাণ মাপালাম। ৫ লিটার অক্সিজেন দিয়েও শরীরে অক্সিজেন এর পরিমাণ ৮৫%। এই ধরনের রোগীদের সাধারণত আইসিইউ সাপোর্ট লাগে। আমাদের হাসপাতালের আইসিইউতে যোগাযোগ করলাম। কোন বেড ফাঁকা নাই। রোগীর সাথে তার স্ত্রী এবং মেয়ে ব্যতীত আর কেউ নাই। তারা এই রাতে রোগীকে অন্য কোথাও নিতে অপারগ।

অগত্যা, পরমকরুনাময়ের নামে চিকিৎসা শুরু করলাম। শরীরে অক্সিজেন এর ঘাটতি কিছুটা কমে আসছে দেখে একটু শান্তি লাগছে। আরো কিছু সাপোর্টিভ ট্রিটমেন্ট দেবার পর রোগীর স্যাচুরেশন (শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণ) ১০ লিটার অক্সিজেনসহ এখন ৯৩%।আলহামদুলিল্লাহ। রোগী একটু বেটার ফিল করায় একটা আইসিইউ রিকোয়েস্ট রেখে চলে আসছিলাম। কানে আসলো, রোগীর স্ত্রী রোগীকে কি খাওয়াবেন রাতে সেটা নিয়ে চিন্তিত। আমি একটু দাঁড়ালাম। রাত তখন ১১ টা। বাইরের হোটেল এমনিতেই আগের থেকে বন্ধ। তারা আমার কাছে জানতে চাইলো-কিভাবে রোগীর খাবার যোগাড় করা যেতে পারে। উপয়ান্তর না পেয়ে আমি একটা প্রস্তাব দিলাম। বললাম যদি আপনাদের আপত্তি না থাকে, তাহলে সেহেরি করার জন্য আমার স্ত্রী ফ্রাইড রাইস রান্না করে দিছে, সেটা আমি পাঠাতে পারি রোগীর জন্য। একটু চুপ থেকে তারা আমার এই প্রস্তাবে রাজি হলে, আমি ওয়ার্ড বয়কে দিয়ে রোগীর জন্য আমার খাবারসহ হটপট পাঠিয়ে দেই। ভাবলাম, একদিন সেহেরি না খেয়ে রোজা রাখলে এমন কোন সমস্যা হবে না! তবুও রোগী অন্তত খাবার খেয়ে ভালো থাকুক। একটু গভীর রাতে আবার রোগীকে দেখতে গেলাম। অবাক হয়ে শুনলাম, কেবিনে এই ক্রিটিকাল রোগীকে একা রেখে স্ত্রী এবং মেয়ে বাসায় চলে গেছে! তাদেরও যদি করোনা আক্রান্ত করে-এই ভয়ে! অথচ ডিউটিরত নার্স এই ক্রিটিকাল রোগীকে আধা ঘন্টা পর পর এসে দেখে যাচ্ছে।

করোনা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, অতি আপনজনদেরও আমরা করোনার ভয়ে হাসপাতালে একা ফেলে বাসায় চলে যাচ্ছি! করোনা আক্রান্ত মা’কে সন্তানেরা রাতের আঁধারে জঙ্গলে ফেলে যাচ্ছে, করোনায় মৃত বাবার লাশ নিতে ছেলে অস্বীকার করছে! এ কেমন মানবতা আমাদের? করোনা সংক্রমিত রোগ হলেও মানবিকতা আরো বেশি সংক্রমিত হওয়া দরকার, যাতে করোনায় আক্রান্ত এই রোগীদের পাশে আমরা স্বাস্থ্য কর্মীসহ সকলেই মমত্ব বোধের হাত বাড়িয়ে দেই। দোষারোপের সময় এখন নয়, এখন সময় মানবিক হবার।এখন সময় মানবিকতার পরিচয় দেবার।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)