চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনাকালে শিক্ষাব্যবস্থায় সংকট

শিক্ষা এমন এক সর্বোত্তম সম্বল/অবলম্বন যার মাধ্যমে জ্ঞানের বিকাশ ঘটে, সৃজনশীল ও সৃষ্টিশীল আচরণের বহি:প্রকাশ ঘটে থাকে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যেমনভাবে গুরুত্ব বহন করে ঠিক তেমনিভাবে ব্যবহারিক ও সামাজিক শিক্ষার মেলবন্ধন একজন নাগরিককে পরিপূর্ণ মানুষের রূপ প্রদান করে থাকে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে নতুন নতুন ভাবনা চিন্তার আবির্ভাবের পাশাপাশি জ্ঞান সৃজন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার আগ্রহ জন্ম নেয় এবং সেটি সমাজের কাঙ্খিত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অগ্রণী/ সহায়ক হিসেবে কাজ করে।

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেয় যে, করোনার প্রাদুর্ভাবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থায় স্থবিরতা নেমে আসছে। অনলাইন পাঠদানের ব্যবস্থাপনায় শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা কতটুকু যৌক্তিকতা বহন করে তার কার্যকারণ নির্ণয় করার চেষ্টা করা হয়েছে।

অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থার কার্যক্রম নিয়ে আলোচনার পূর্বে অনলাইন সুযোগ থাকায় শিক্ষার্থীরা যেভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সেটা নিয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনার প্রয়োজন। অপরাধবিজ্ঞানের রুটিন কার্যক্রম তত্ত্বানুযায়ী; তিনটি উপাদানের সমন্বয় ঘটলে অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে। এদিকে, মোবাইল ব্যবহারের সুযোগ এবং সঙ্গে ইন্টারনেটের প্রতুলতা থাকায় স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরা নানা ধরনের গেমসে আসক্ত হয়ে পড়ছে। অভিভাবকেরা এ সংক্রান্তে তেমন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছেন না, কিছু বললেই প্রতিউত্তরে শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাশের দোহাই দিয়ে বসে। অনলাইনে ভিডিও গেমসের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা অনেক সময় ব্যয় করে থাকে এবং এর প্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীরা নেতিবাচক নানা ধরনের অনুসঙ্গের সন্ধান পায় এবং সেগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছে ব্যাপকভাবে। উল্লেখ করার মতো বিষয় হচ্ছে, করোনাকালিন সময়ে কিশোর অপরাধের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এলাকাভেদে কিশোর গ্যাং এর সক্রিয়তা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে সংবাদ প্রচারিত হয়েছে। কিশোরদের মধ্যে অপরাধ সংঘটিত করার যে ধরনের মানসিকতার সৃষ্টি হচ্ছে সেটি কিন্তু অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দিবে ভবিষ্যতে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চলমান থাকলে কিশোররা অপরাধের দিকে ততটা ঝুঁকতে পারতো না কেননা শিক্ষকদের অনুশাসনে শিক্ষার্থীরা সঠিক পথের সন্ধান পেতো।

বিজ্ঞাপন

কাজেই, রুটিন কার্যক্রম তত্ত্বানুযায়ী বলা যায়, মানুষ মাত্রই অপরাধের সুযোগ পেলে অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠে। প্রথমত: শিশু কিশোররা বিশেষ করে স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা করোনাকালিন সময়ে অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে বিভিন্ন কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার সুযোগ পায়। যোগাযোগের ভিত্তিতে শখের বশেই হোক কিংবা কারোর প্ররোচনায় হোক না কেন শিক্ষার্থীটি অপরাধ করার জন্য আগ্রহী হয়ে উঠে। অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা অপরাধ করার জন্য মটিভেশন পেয়ে মটিভেটেট হয়ে অপরাধ সংঘটিত করতে উৎসুক হয়ে উঠে। দ্বিতীয়ত; অনলাইনে যেহেতু গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে অপরাধ করার সুযোগ সৃষ্টি হয় সে ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের উপর অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণ প্রায় থাকে না বললেই চলে। তৃতীয়ত: অপরাধ করার নিমিত্তে উপযুক্ত টার্গেটকে সহজেই সুনির্ধারণ করতে পারে। এ তিনের সমন্বয়েই শিক্ষার্থীরা ক্রমশ অপরাধপ্রবণ হয়ে পড়ে এবং করোনাকালিন সময়ে এটি একটি মারত্নক সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

পাঠদান প্রক্রিয়াটি মূলত দৃষ্টি সংযোগের মাধ্যমে হয়ে থাকে, যেখানে শিক্ষকের উপস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ রক্ষা করা হয়ে থাকে। কিন্তু প্রাথমিক ও মাধ্যমিক এমনকি কলেজ পর্যায়ে শিক্ষকেরা ভিডিও করে শিক্ষার্থীদের নিকট লেকচার সরবরাহ করে থাকে। এখানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও মনোযোগ উপেক্ষিত হয়ে থাকে। কেননা যেখানে সরাসরি ক্লাশের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ রক্ষা করা কষ্টসাধ্য বিষয় সেখানে কোন ধরনের নজরদারি ছাড়া শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাশে মনোযোগের বিষয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করা দুঃসাধ্য বটে। আবার সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেবার বিষয়ে পত্র পত্রিকায় দেখেছি, কম্পিউটারের দোকান থেকে একই ডকুমেন্ট অনেক শিক্ষার্থী প্রিন্ট আউট করে জমা দিচ্ছে। আবার এও লক্ষ্য করা যাচ্ছে, করোনা শুরুর দিকে পাঠদান করার বিষয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়েছিল ক্রমান্বয়ে সেটি তলানির দিকে যাচ্ছে। এ সকল কিছুই অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের ত্রুটি বিচ্যুতি।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মাঝেও হতাশা পরিলক্ষিত হচ্ছে, শুরুতে অনলাইন ক্লাশের প্রতি তাদের আগ্রহ এখন অনেকটা ভাটার দিকে। সত্যিকার অর্থে, অনলাইন ক্লাশ দিয়ে উন্মুক্ত ক্লাশের কার্যকারিতা যাচাই বাছাই করা যায় না। তাছাড়া অনেক শিক্ষার্থীই শেষ বর্ষে আছেন, কারোর দু কোর্সের পরীক্ষা আবার এমনো রয়েছে কারোর এক কোর্সের পরীক্ষা শেষ হলেই শিক্ষাজীবন শেষ হয়, তাদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। প্রকৃতঅর্থে শিক্ষাব্যবস্থা করোনাকালিন সময়ে একটি ক্রান্তিকাল বিরাজ করছে, এর শেষ কোথায় সেটি কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। তথাপি সংকট উত্তরণে শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষক সমাজের সমন্বিত প্রয়াসের প্রয়োজন রয়েছে। যেহেতু জাতীয় দুর্যোগ সেহেতু সকল পক্ষকে আন্তরিকতা ও আগ্রহ নিয়ে সংকটকাল উত্তরণে কাজ করে যেতে হবে। তাহলেই কিছুটা মুক্তি পাওয়া সম্ভব হবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

বিজ্ঞাপন