চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনাকালে বাসের ভাড়া বৃদ্ধি কতোটা যৌক্তিক?

করোনাকালে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ঈদুল ফিতর৷ ঈদের ছুটিতে শহরের মানুষ হুমড়ি খেয়ে ছুটলো গ্রামের দিকে৷ এতে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ল গ্রামগুলো৷ সরকার গণপরিবহন বন্ধ করে দিল আবার প্রাইভেট কার চালু করে তাদের ঘরে ফেরাকে করল ব্যয়বহুল ও করোনা ঝুঁকিপূর্ণ৷ গণপরিবহনে ঢাকার বাইরে যেতে বাধা কিন্তু ব্যক্তিগত পরিবহনে ঢাকার বাইরে যেতে বাধা নেই। সরকারী নির্দেশনায় বলা হলো৷ ঈদের ছুটি কাটাতে এবারে প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস বা যেকোনো ব্যক্তিগত পরিবহনে ঢাকার বাইরে যেতে বা ঢাকার ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে ভিআইপি ও সাধারণ মানুষ।

তবে কোন গণপরিবহনকে এসব পথে চলাচল করতে দেয়া হবে না। এতে করে কি কতিপয় ভিআইপিদের জন্য সাধারণ মানুষ আর্থিক ঝুঁকিতে পড়লো না? আর গোটা দেশ জুড়ে বাড়লো না করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি?

বিজ্ঞাপন

এই নির্দেশনার পর ঢাকায় ঢোকা এবং বেরুনোর সড়কগুলো থেকে সকল চেকপোস্ট সরিয়ে নেয়া হয়৷ অথচ ১৭ মে ঢাকার বাইরে যাওয়া এবং প্রবেশের ক্ষেত্রে বাড়তি কড়াকড়ি আরোপ করে পুলিশ, যা ৩০ মে পর্যন্ত অর্থাৎ ‘সাধারণ ছুটি’ চলাকালীন অব্যাহত থাকার কথা ছিল। কিন্তু ঈদের আগে আগে এই নির্দেশনা পাল্টে গেল৷

বিজ্ঞাপন

কিন্তু এরপরেও অনেক মানুষ ঢাকায় যাওয়া আসা করায় আসন্ন ঈদে নিজস্ব অবস্থানস্থল না ছাড়ার পরামর্শ দেয়া হলো। বলা হলো মানুষ যেন গ্রামের বাড়ি না গিয়ে যে যেখানে আছে সেখানেই যেন থাকে। করোনা ইস্যুতে এক দেশে দুই ধরনের আইন কেন? ভিআইপিদের জন্য একরকম সাধারণের জন্য আরেকরকম৷ প্রাইভেটকারওয়ালা ভিআইপিদের গ্রামে যেতে বাধা নেই৷ গণপরিবহনে চড়া সাধারণদের যেতে বাধা! তবে সাধারণরা প্রাইভেটকারে চড়লে অসাধারণ হয়ে রাস্তা পেরোতে পারবে!

করোনাভাইরাসের আরও ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ঢাকা থেকে কাউকে বের হতে কিংবা ঢুকতে না দেয়ার এই নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। এই নির্দেশনার তিন দিনের মাথায় এবার কড়াকড়ি শিথিল করার কথা বলা হচ্ছে। তবে সেটা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত পরিবহনের ক্ষেত্রে।

বিজ্ঞাপন

তবে ব্যক্তিগত পরিবহনে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও প্রত্যেককে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ৷ গণপরিবহনে না চড়তে পেরে দ্বিগুন তিনগুন টাকা খরচ করে মানুষ গ্রামে ফিরল৷ এক্ষেত্রে যে যেখানেই আছেন সেখানেই থাকার নির্দেশনাটির কি ব্যত্যয় ঘটলো না? আসলে করোনা ইস্যুতে সরকারের ভূমিকা খুবই স্ববিরোধী দেখা গেলো৷ সরকার সাধারণের জন্য একরকম ভিআইপিদের জন্য আরেকরকম৷ সরকারি বেসরকারি অফিস আদালত বন্ধ করা হল আবার গার্মেন্টস খুলে দেয়া হলো৷ সাধারণের পরিবহন হলো গণপরিবহন৷ অথচ তা নিষিদ্ধ করায় তাদেরকে প্রাইভেট কারে যেতে হলো৷ কেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে কি গণপরিবহন চালু করা যেত না? ৩১ মে হতে গণপরিবহন চলবে৷ সেক্ষেত্রে যাদের প্রাইভেট কার নেই তারা কি এসময়ে প্রাইভেট কারে চলতে বাধ্য হলো না? তাদের কি অহেতুক অর্থদণ্ড হলো না?

করোনাভাইরাসবলা হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে গণপরিবহনে চলতে হবে৷ এটা কতোটা কার্যকর হবে? মানুষ সচেতন হলে কি আর সেনাবাহিনী ও পুলিশ নামাতে হতো? লকডাউনে সেনাবাহিনী ও পুলিশ ভূমিকা রাখল৷ লকডাউন খোলার পর কি অনূরূপ ভূমিকা বহাল থাকবে?এমনটি না হলে মনে হয়না মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানবে৷ বিমানবন্দর, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন ও নৌযান এলাকায় কড়াকড়ি সেনা অথবা পুলিশী ভূমিকা চাই৷ সেক্ষেত্রে এলাকার বিবেচনায় কোথাও পুলিশ কোথাও সেনাবাহিনী কিংবা কোথাও বিজিবি রাখা যেতে পারে৷

বিভিন্ন অফিস,আদালত,শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সামাজিক সংগঠন, মসজিদ মন্দির, চার্চ সকল কর্তৃপক্ষকেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কঠোর বার্তা দিতে হবে৷ আর তা পালনে কঠোর ভূমিকা রাখতে হবে পুলিশ সেনাবাহিনী কিংবা বিজিবিকে৷ এবার বোঝা যাবে লকডাউনে করোনা আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার বাড়ে না লকডাউন খুলে দেয়ার পর বাড়ে৷ ৩১ মে হতেই তা বুঝা যাবে৷ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ৩০ মে পর্যন্ত করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৪৪ হাজার ৬০৮ জন৷ মারা গেছেন ৬১০ জন৷ এখন লকডাউন খুলে দিলে কী হয় সেটাই দেখার বিষয়৷

সামাজিক দূরত্বের জন্য অনলাইনে রেলের টিকিট বিক্রি হবে৷ সেক্ষেত্রে বিমান ও বাসের বেলায় কী হবে? রেলের অর্ধেক যাত্রীর টিকিট কাটলে বিমান ও বাসেরও কী তাই? রেলের ভাড়া বাড়ছে না; বিমান, বাস অটো সিএনজির ভাড়ার বেলাতেও কি তাই হচ্ছে? সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের এ ব্যাপারে কঠোর ভূমিকা নেয়া উচিত৷ ঈদে বাড়ি ফেরা ও কর্মস্থলে ফেরায় মানুষকে অধিক টাকা গুনতে হয়েছে৷ মানুষকে বাধ্য হয়ে প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসে যাতায়াত করতে হয়েছে৷ করোনাকালের অসহায় বেকারত্বের সময়ে এমন আর্থিক চাপ কি সংগত? সম্প্রতি সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ৮০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধির জন্য মন্ত্রনালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে৷ মন্ত্রণালয় ৬০ শতাংশ বাড়িয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। ঢাকা জেলার বাস, মিনিবাস, সিটিং সার্ভিসসহ দূরপাল্লার তথা আন্তঃজেলার সব বাসের ক্ষেত্রে এই ভাড়া বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে তারা৷ এক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় কী করবে? তারা কি পারতো না ভাড়া বৃদ্ধির এই সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করতে? এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কি পারবে গণপরিবহন কর্মকর্তা কর্মচারী শ্রমিক ও যাত্রীদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বাধ্য করতে? আর স্বাস্থ্যবিধি না মানলে কি চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বে না জনস্বাস্থ্য?

যেখানে করোনাকালের জন্য রাষ্ট্রায়াত্ব ব্যাংক ও এনজিওর কিস্তি স্থগিত হয়েছে৷ মানুষকে বাঁচাতে নগদ টাকা ও চাল ডাল বিতরন করা হচ্ছে৷ সেখানে কেন মানুষকে অতিরিক্ত যান খরচে শহর হতে বাড়ি ফিরতে ও বাড়ি হতে শহরে ফিরতে বাধ্য করা হলো? আর এখন যদি গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ে তাও চরম দুঃখজনক নয় কি? রেল পথ মন্ত্রনালয় ভাড়া না বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে৷ এক্ষেত্রে বিমান, সড়ক পরিবহন ও নৌ মন্ত্রণালয়ের অনূরুপ ঘোষণা আবশ্যক৷ এবার ঈদে বাড়ি ফেরা ও বাড়ি হতে শহরে ফেরা মানুষগুলো পড়েছে চরম ভাড়া দুর্ভোগে৷ প্রতি ঈদেই অটো সিএনজির ভাড়া বাড়ে৷ এবারও তাই বেড়েছে৷ মানুষকে ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে বাড়ি পৌঁছাতেও অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হয়েছে৷ বিদ্যুত বিল স্থগিতের কথা বলা হয়েছে৷ কিন্তু ঈদের আগেই বাড়ি বাড়ি বিদ্যুত বিল পৌঁছে দেয়া হয়েছে অতিরিক্ত বিল৷ এসব ভুতুড়ে বিল কোথাও দ্বিগুণ কোথাও ত্রিগুণ ও কোথাও চারগুণ হয়ে গেছে৷ অসংখ্য মানুষ এ নিয়ে ক্ষোভের কথা বলছে সোশ্যাল মিডিয়ায়৷ করোনাকালে এমন চাপ কোন অবস্থাতেই কাম্য ছিল না৷ সেক্ষেত্রে মানুষ আর অতিরিক্ত ভাড়া দূর্ভোগে পড়তে চায় না৷ কর্তৃপক্ষের উচিত এখনই এবিষয়ে কঠোর বার্তা দেয়ার৷ সর্বস্তরের মানুষ এমনটিই প্রত্যাশা করছে৷

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)