চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনাকালে বদলে যাওয়া শাকিবের গল্প

করোনাকালে চিত্রনায়ক শাকিব খানের দৈনন্দিন জীবন কেমন কাটছে?

এক শাকিব খানের বিকল্প তিনি নিজেই। বিগত দশক থেকে শাকিবকে নিয়ে এমন মিথে মুখর চিত্র সমালোচকরা। কিন্তু আজও এ নায়কের বিকল্প তৈরি করতে পারেনি ঢাকাই সিনেমা। নায়ক আসে যায় কিন্তু সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি আছেন বহাল তবিয়তে। নিজ ক্যারিশমায় শাসন করছেন চলচ্চিত্রের সাম্রাজ্য। তাই লম্বা এ সময়ে তিনি হয়ে উঠেছেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের একমাত্র নির্ভরযোগ্য তারকা।

নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি আদর্শ। তাকে ঘিরে মন্দার বাজারে কোটি টাকা লগ্নী করতেও পিছু ভিড়েছেন প্রযোজকরা। তাদের কথা, শাকিব মানেই যেন ‘মানিব্যাক গ্যারান্টি’।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্টরা এজন্যই শাকিবকে ‘কিং খান’, ‘সম্রাট’, ‘নবাব’, ‘ভাইজান’, ‘সুপারস্টার’ এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে বাংলাদেশি মেগাস্টার হিসেবেও সম্বোধন করা হয়।

তবে সময়ের বিবর্তন ও টেকনোলোজিতে পিছিয়ে থাকায় চলচ্চিত্র খুব একটা সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, শাকিব যেহেতু চলচ্চিত্রের কাণ্ডারি তিনিই পারবেন সুবাতাস আনতে।

তবে শাকিবের এই লম্বা পথচলা মোটেও সুখকর ছিলো না। শত প্রতিকূলতাও তাকে দমাতে পারেনি। বরং তিনি দেশের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গে মাত্র ৫টি সিনেমায় কাজ করে সেখানকার সুপারস্টারদের বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছেন। একথা নিজে স্বীকার করেছেন পশ্চিমবঙ্গের এসকে মুভিজের কর্ণধার ও নামী প্রযোজক অশোক ধানুকা।

গত দেড় বছরে করোনায় ঘরবন্দী শাকিব খান। তবে রিস্ক নিয়েও গত বছর নবাব এলএল.বি’র মতো বড় আয়োজনের সিনেমা করেছেন। বহু টেকনিশিয়ান ও কলাকুশলী শাকিব কাজে ফেরায় বেকারত্ব ঘুচিয়েছেন। শাকিবের ঘনিষ্ঠজন ও প্রতক্ষ্যদর্শীদের দাবী, শাকিব খান আর আগের মতো নেই, পুরোপুরি বদলে গেছেন। শুধু লুকে নয়, মানসিকতায়ও বদলেছেন শাকিব।

চারবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া এ নায়কের কাছের মানুষদের কথা, শাকিব আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন কীভাবে চলচ্চিত্রে সুবাতাস ফেরানো যায়। আগামীর কাজগুলোর প্রতি এখন সবচেয়ে বেশি যত্নশীল শাকিব খান।

গত ১৫ বছরের তুলনায় শাকিবের মধ্যে সেই আন্তরিকতার ছাপ তুলনামূলক এখন বেশি। লম্বা পর্যালোচনা ও বিভিন্ন সময়ে আলাপে স্পষ্ট বোঝা গেছে, আসলেই বদলে গেছেন শাকিব খান। তার কোটি ভক্তরাও এমন শাকিবকেই চাইতেন। সেই বদলে যাওয়ার কিছু ঘটনার মধ্যে রয়েছে, শাকিব খানের নিয়মতান্ত্রিক জীবন যাপন। ঘড়ির কাটার সঙ্গে তালমিলিয়ে চলেন তিনি।

কাক ডাকা ভোরেই শাকিবের দিন শুরু। পরে নিজ অফিসে দুই ঘণ্টা শরীর চর্চা করেন। পরের রুটিনটা আরও চমকপ্রদ। দেশ বিদেশের বিভিন্ন লেখকদের লেখা পড়েন। শাকিব খানের অফিসে বুক শেলফে সংগ্রহে রয়েছে দার্শনিক প্লেটোর ‘অ্যাপোলজি’, যেটি উপজীব্য অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের কুফল ও যাপিত-জীবনের সুফল। এছাড়া চার্লস ডিকেন্সের ‘গ্রেট এক্সপেক্টেশন’, মারিও পুজোর ‘দ্য গডফাদার’, বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, সেলিনা হোসেনের ‘যাপিত জীবন’, জীবনানন্দ দাশের ‘কবিতাসমগ্র’, হুমায়ুন আহমেদ, সমরেশ মজুমদার, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের বহুমুখিতায় ও স্বপ্নচারিতায়সহ, সৈয়দ শামসুল হক, ইমদাদুল হক মিলন, রাবেয়া খাতুন, আনিসুল হক ও সমসাময়িক একাধিক লেখকদের অসংখ্য বই।

শাকিব খান জানান, দৈনিক বই পড়া তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। উপরের সবগুলো বই তিনি পড়েছেন।

পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সিনেমা দেখা শাকিব খানের আরেকটি নতুন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। যেটি আগেও ছিল। শাকিবের কথা, লকডাউনে এই অভ্যাস আরও বেড়েছে। কিছু সিনেমার নাম উল্লেখ করে শাকিব জানান, টার্কিশ ‘মিরাকল ইন সেল নাম্বার সেভেন’, কোরিয়ান সিনেমা ‘স্প্রিং সামার ফল উইন্টার এন্ড স্প্রিং’সহ ইটারনাল সানশাইন অব এ স্পটলেস মাইন্ড, ক্যাপটেন ফিলিপ, চিলড্রেন অব মেন, ডেড পোয়েট সোসাইটি, দ্য ট্যাক্সি ড্রাইভার, সিরিজ ‘দ্য কুইন্স গ্যামবিট’ ছাড়া ওটিটি মাধ্যম থেকে বাংলাদেশ ও ইন্ডিয়ার বিভিন্ন সিনেমা ওয়েব সিরিজ দেখেছেন।

সেই সঙ্গে দেশ, বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়েও সোচ্চার শাকিব। সমকালীন রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ে ভাবনাগুলো তার সঙ্গে আলাপ না করলে অনেকটা অবিশ্বাস্য মনে হবে!

এর পাশাপাশি দিনের একটা সময়ে রাজধানীর নিকেতন ও পূবাইলে শাকিব খান তার নতুন বিলাসবহুল বাড়ি তৈরির তদারকি করেন ভার্চুয়ালি। অন্যান্য ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর কারণে শাকিব তার মিটিংগুলো অফিসেই সারছেন। আর সিনেমা হলের বিকল্প হিসেবে ওটিটি মাধ্যম নিয়ে তিনি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন বলেও তার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে।

নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান এসকে ফিল্মসের আসন্ন সিনেমাগুলোর প্রি-প্রোডাকশনের কাজ আগাচ্ছেন শাকিব। যেখানে তিনি নিজে নয়, কাজ করাবেন অন্য নায়ক-নায়িকারাদের দিয়ে। শাকিব খান ‘এসকে এন্টারটেনমেন্ট’ নামে তার নতুন ডিজিটাল কনটেন্ট প্রযোজনার উদ্যোগ নিয়েছেন। যেখানে নতুন নতুন কনটেন্ট ও বিশেষ দিবসগুলোতে থাকবে আয়োজন।

জানান, শিগগিরই এসবের কাজগুলো শুরু হবে। নতুন শাকিব খানের আগমনী সংকেত পাওয়া গেল তার আসন্ন ‘অন্তরাত্মা’ ও ‘লিডার আমিই বাংলাদেশ’ সিনেমা দুটিতে। ইতোমধ্যে অন্তরাত্মার ডাবিং শেষ করেছেন। সিনেমা দেখে নিজেই মুগ্ধ হয়েছেন তিনি। শাকিবের আশা, ‘অন্তরাত্মা’ রুচিশীল দর্শকদের বেশি নাড়া দেবে। যেসব দর্শক তাকে ভিন্ন ঘরানার সিনেমাতে চাইতেন, বিশেষ করে তারা এ সিনেমা থেকে চোখ সরাতে পারবেন না। একই কথা বলেছেন ‘অন্তরাত্মা’ সিনেমার প্রযোজক সোহানী হোসেন।

‘অন্তরাত্মা’র প্রযোজক সোহানী হোসেনের সঙ্গে…

তিনি বলেন, করোনা না থাকলে আগেই সিনেমা মুক্তি পেত। তাছাড়া ঈদ লাগে না, শাকিবের ছবি যে কোনো সময় হিট করে। কিন্তু করোনার মধ্যে সিনেমা ইউনিটের শত মানুষের রুজির কথা ভেবে শাকিব নিজে আন্তরিকতার সঙ্গে সিনেমাটি করেছেন। সত্তার পর আবার দর্শক শাকিবকে অন্যভাবে গ্রহণ করবে। কাজের সময় বারবার অনুভব করেছি আমরা শাকিব খানকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারিনি। তার যে মেধা ও সঠিক সাপোর্ট দিলে শাকিব হয়তো বিশ্বজয় করতে পারতো।

‘লিডার আমিই বাংলাদেশ’ সিনেমার নির্বাহী প্রযোজক ও আরটিভি’র অনুষ্ঠান প্রধান দেওয়ান শামসুর রকিব বলেন, শুটিংয়ে প্রতিদিন শাকিব খান সময় মতো উপস্থিত হয়েছেন। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় দিয়ে দিয়েছেন। তার কাছ থেকে যতটুকু আশা করেছিলাম তার চেয়ে বেশি সাপোর্ট দিয়েছেন। কাজের ক্ষেত্রে শাকিব অত্যন্ত আন্তরিক এবং সহযোগিতামূলক আচরণ করেছেন। লকডাউনের কারণে আমাদের সামান্য শুটিং রয়ে গেছে যা লকডাউন উঠে গেলেই আমরা করে ফেলবো।

এর আগে শাকিব খান একাধিকবার বলেছেন, তার মধ্যে পরিবর্তনবোধ এসেছে করোনাকালে। নিজের অতীত ভবিষ্যৎ নিয়ে এতোটাই ভেবেছেন যা তাকে বদলে যেতে বাধ্য করেছে।

বুঝেছেন, কিছু কিছু পথচলা বা সিদ্ধান্তে তার ভুল ছিল। শাকিবের এই বদলে যাওয়ার সুফল হয়তো আগামীতে পাবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র। যে ভুলগুলোর জন্য দায়ী তার সীমাহীন ব্যস্ততা এবং চারপাশের গুটি কয়েক সুযোগ সন্ধানী মানুষের গণ্ডি! তবে পুরাতন গ্লানি ভুলে একেবারে নতুন শাকিব খানকে যে দর্শক পেতে যাচ্ছে তা মোটামুটি নিশ্চিত। অন্তত তার সাথে কথা বলে তেমনটাই অনুমেয়।

বিজ্ঞাপন