চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

করোনাকালে চীনকে যেমন দেখেছি

হুয়াংহো নদীকে চীনের দুঃখ বলা হয়। লোককাহিনীতে তার অনেক বর্ণনা আছে। বহুভাবে। চীনে অবস্থান করার সুবাদে আমার একবার হুয়াংহোর পাশ দিয়ে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিলো। কিন্তু তার দুঃখকে অনুভব করতে পারিনি। কিন্তু ২০২০ সালের চীনের নতুন দুঃখের অংশ হয়ে গিয়েছি। সে দুঃখের রং নীল, যেমন হয় বেদনার রং। নতুন চীনের সে দুঃখের নাম করোনাভাইরাস।

চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে তখন উৎসবের প্রস্তুতি চলছিলো। বসন্ত উৎসবের প্রাক মুহূর্তে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অফিস-আদালত বন্ধ হয়ে যায়। অনেক চাইনিজ ও বিদেশীরা ছুটি ও বসন্ত উৎসব কাটাতে চীন ত্যাগ করেন। এই সময়টা চীনে অনেক পর্যটকের আনাগোনাও থাকে। বেইজিং এই সময় নীরব শহর। প্রচুর মানুষ যার যার নিজ শহরে চলে যায়। ঈদের সময়টায় ঢাকার যে রূপ আমরা দেখে অভ্যস্ত!

বিজ্ঞাপন

জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহ। হঠাৎ নোটিশ! আর চীনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ওই চ্যাটে তোলপাড় শুরু হয়। নতুন ভাইরাস আঘাত হেনেছে উহান শহরে। কী করবো, কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। সবার আগে আমার বিদেশী বন্ধুদের সাথে কথা বলি। তারপর পরিচিত দেশী যারা আছে তাদের সাথেও কথা বলি। এদিকে উৎসব নিয়ে প্রস্তুতি, তার রং ফিকে হয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

ধীরে ধীরে পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকে। ইতিমধ্যে আমার যারা প্রতিবেশী ছিলো প্রায় সবাই চীন ত্যাগ করেছে। অনেকেই আবার আমার মতো থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই প্রশ্নটা আমাকে অনেকেই করেছেন, কেনো আমি চীন ত্যাগ করিনি? এর উত্তর একটু পরে দেই, আপাতত সামনে এগিয়ে যাই।

উহান শহর পুরোপুরি লকডাউন। আর আমি আছি বেইজিং। দূরের পথ, তবু উহানের ঘটনাগুলো প্রতিনিয়ত দেখছি। আর আমার মাথায় একটি নাম ভেসে আসছিলো অ্যামি চু মিং। আমার কাজিনের বন্ধু। যিনি আমাকে চীনে আসার পর থেকে অনেক সহায়তা করেছেন। এমনকি ২০১৮ সালে আমি উহান শহরে গিয়েছিলাম চু মিংয়ের আমন্ত্রণে। ওর বাবা মা আমাকে অনেক স্নেহভরে আপ্যায়ণ করেছিলেন। সেসব স্মৃতি এই করুণ পরিস্থিতিতে আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠতে লাগলো। আমি বার বার ওকে ফোন দেই, কিন্ত ফোনে পাচ্ছিলাম না। হুনানে আমার পরিচিত কিছু বাংলাদেশি ছেলে ছিলো, যারা ওখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করতো। তারা সবাই দেশে চলে এসেছে। ওইচ্যাটে বাংলাদেশি একটি গ্রুপে জানতে পারি সরকার উহানে আটকে পড়া ছাত্রছাত্রীদের ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করেছে। যাক, এরমধ্যে চু মিং ফোন ধরেছে। ও সুস্থ আছে। কিন্তু ঘর থেকে বের হচ্ছে না। আমাকে ভিডিও কলে দেখাচ্ছিল মানুষশুন্য উহানের রাস্তাঘাট!

বিজ্ঞাপন

বেইজিংয়ে বাংলাদেশির একটি ক্লাব আছে। যেখানে বাংলার জাতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত প্রতিটি অনুষ্ঠান-উৎসব উদযাপন হয়। ক্লাবটির নাম ‘বেইজিং বঙ্গবাসী’। সেখান থেকে বার্তা আসে, এবার স্বরস্বতী পূজার অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। চীনের সরকার সকল প্রকার গণসমাবেশ অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। ফ্রেবুয়ারির ১০ তারিখে চীনে বসন্ত উৎসব শেষ হয়। উহান শহর ব্যতিত অন্য শহরগুলোতে মানুষজন নিজ নিজ পেশায় ফিরে যাওয়া শুরু করে। নিজের দেশের ক্যালেন্ডারের সঙ্গে মিল রেখে ১৩ তারিখে ফাগুন হাওয়া লাগাতে একটু সময়ের জন্য বের হয়েছিলাম। উদ্দেশ্য ছিলো বেইজিংয়ের ব্যস্ততম অ্যাভিনিউয়ে কফি খাওয়া। কফি নিয়ে বসবো হঠাৎ কফিশপ থেকে জানানো হলো, ‘এখানে বসতে পারবেন না। বাহিরে গিয়ে খেতে হবে।’ শুধু এই কফিশপ নয়, এমনকি অন্য অনেক পরিচতি কফিশপ, বার ও ক্লাবগুলোও বন্ধ। সিনেমাহলগুলো বন্ধ, কারাওকে বন্ধ। রাস্তায় সবাইকে দেখা গেলো মাস্ক পরা অবস্থায়। সাবওয়ে স্টেশনগুলোর প্রবেশদ্বারে ভিডিওস্ক্যানার মেশিন বসানো। প্রত্যেক এলাকার মোড়ে মোড়ে তথ্যডেস্ক বসানো। এমনকি ব্যাংক, বড় সুপারশপ ও অফিসগুলোতেও বসানে হয়েছে বডি চেকআপ আর তথ্যডেস্ক। শুধু বেইজিং নয়, সংবাদ মারফত দেখলাম এমন প্রতিরোধ ব্যবস্থা পুরো চীন জুড়ে!

করোনাভাইরাসের এই দুঃসময়ে চীনজুড়ে চিকিৎসা সেবাকারীদের অসাধারণ ভূমিকা দেখতে পেরেছি। উহানের অস্থায়ীভাবে তৈরী দুইটি হাসপাতাল ছিলো ধ্বংসের ভেতর বজ্রকণ্ঠ। ফ্রেবুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে চৌদ্দ’শ চিকিৎসাকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়, ছয় জন মারা যান। লি ওয়েংলিনের মৃত্যু একটা অনন্য উদাহরণ। উহান সেন্ট্রাল হাসপাতালের চক্ষুবিজ্ঞানের চিকিৎসক ডা. লি ছিলেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই সময় খুব অলোচিত ব্যক্তি। তিনি সেই ব্যক্তি যিনি ডিসেম্বরে করোনার শুরুতে তার সহকর্মীদের সর্তক করেছিলেন। তারপর চাইনিজ সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে তার পোস্ট ব্যাপক সাড়া ফেলে। অবশেষেও তিনি করোনার আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

কোথাও মহামারি কিংবা সংকট শুরু হলে অর্থনৈতিক একটা টানা পোড়েন শুরু হয়, অন্তত নিজের দেশের অভিজ্ঞতা তো এরকমই দেখেছি। ভেবেছিলাম, এরকম একটা অবস্থায় হয়তো পড়তে যাচ্ছে চীন। আমার দেখা, সোশাল মিডিয়া কিংবা চীনের সংবাদ মাধ্যমেও দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি কিংবা এরকম কৃত্রিম সংকটের বিষয়ে কিছু শুনিনি। অনেক দোকানপাট বন্ধ ছিলো, তবে দ্রব্যমূল্যের উঠানামা কিংবা সংকট দেখা যায় নি। ফ্রেবুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে দীর্ঘসময় বন্ধ থাকা মার্কেট ও সুপারশপগুলো খুলতে শুরু করে। তবে মাস্কের সংকট ছিলো চোখে পড়ার মতো। অনলাইন এ অন্যসবকিছু সহজে পাওয়া গেলেও মাস্কের ডেলিভারি হতো অনেক দেরিতে।

মানুষের মুখের কথা কখনো কখনো ফলে যায়। যদি সেটা বিশেষ মানুষ হয় তাহলে তো তথাস্তু। সময়েও ধরে রাখা যায় কখনো কখনো। করোনা চীনের মানুষকে সময়ের শব্দকে অনুভব করিয়েছে। অতিগতিময় সমাজের মানুষদের থমকে দিয়েছে। জীবন কত নৈঃশব্দের হতে পারে, করোনার সময়ে ঘরবন্দি মানুষেরা খুব ভালভাবেই টের পেয়েছে। আমিও অনুভব করেছি জীবনের গভীরের সুর। দুঃখের দিন শেষ হয়। তবে জগতের মানুষ কী বুঝবে, পৃথিবী শুধু ক্ষমতা, টাকা কিংবা দাম্ভিকতা নয় বন্ধুত্বেও টিকে থাকা যায়! যাকে চিনি না কখনো, দেখিনি; সেই কাল মানুষটা (প্রতিবেশী নাইজেরিয়ান) সবসময় পাশে ছিলো। মনোবল জুগিয়েছে। ডর্মিটোরির হেড মহিলা (চাইনিজ) একদিন দেরি করে ফিরেছিলাম দেখে সতর্ক করতে গিয়ে কেঁদে ফেলেছিলো এই করোনায়। রাশিয়ান সাদা ছেলেটি, যিনি ক্যাম্পাসের বাইরে রুম ভাড়া করে থাকেন, আমার জন্য কফি ও সিগারেট নিয়ে আসতো। কিংবা আমার চাইনিজ বন্ধু নোলেন, যিনি বাকিংহাম ইউনিভার্সিটিতে পড়তে গিয়েছিলেন। লন্ডনের অবস্থা খারাপ হওয়ায় ফিরে আসতে চেয়েছিলো। রাতের পর রাত জেগে তাকে বুঝেয়েছি। তাকে বলেছি, সারা পৃথিবীর অসুখ। তুমি কোথায় ফিরবে? এই সময়ে টিকে থেকে বুঝিয়ে দাও তুমিই অনন্য। তারপর সে মত বদলায়। সে ফিরে আসেনি। একই কারণে আমিও ফিরে আসিনি আমার প্রাণের বাংলায়।

ফিরবো না আরো কিছু কাল। ততোদিন ভালো থেকো প্রিয় ব্রহ্মপুত্র, টঙঘর, পল্লীর বৃষ্টিজল, কবিতা- আমার কাছের মানুষজন…

লেখক: ওবায়দুর চৌধুরী অজয়। ভিজিটিং ফেলো, ইন্টারন্যাশনাল জার্নালিজম অ্যান্ড কমিউনিকেশন ডির্পাটমেন্ট, কমিউনিকেশন ইউনিভার্সিটি অব চায়না, বেইজিং, চীন