চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কত দুঃখ মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টদের মনে?

করোনাকালে বাংলাদেশের হঠাৎ করে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট নামক পেশার মানুষেরা আলোচনায় চলে এসেছেন। আমি প্রায় নিশ্চিত করোনা ঢেউ দেশে আঘাত হানার পর এই পেশার নাম শোনেননি এমন মানুষ খুব কম। পাশাপাশি আমি এটাও নিশ্চিত, করোনা আসার আগে এই পেশার নাম শুনেছেন এমন মানুষের সংখ্যা গুটিকয়েক।

মহামারির এই সময়ে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টরা আলোচনায় এসেছেন তিনটি ইস্যুতে। প্রথম ইস্যু, সরকারী হাসপাতালে টেকনোলজিস্টদের সংকট। এই সংকটের ফলে সাধারণ মানুষের করোনার নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা নিরীক্ষা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এ কথা বিভিন্ন সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে স্বীকারও করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

দ্বিতীয় ইস্যু নিয়োগ নিয়ে। তিন হাজার মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সংকটের পাশাপাশি এই ঘোষণাও সংবাদের বড় জায়গা দখল করেছে।

তৃতীয় কারণ, এরপরও মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টরা আন্দোলন করে যাচ্ছেন। তারা গত দশ পনেরো দিন ধরে প্রায় প্রতিদিনই জড়ো হচ্ছেন মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সামনে। দাবি দাওয়ার কথা প্রকাশ করছেন মিছিলে, স্লোগানে। আবার বেলা বাড়ার সাথে সাথে চলে যাচ্ছেন যার যার কর্মস্থলে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরও কেন মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টরা রাজপথে? কী এমন দুঃখ তাদের মনে?

সবার আগে জনমনে প্রশ্ন জাগে, কারা এই মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট। তাদের কাজটাই বা কী? চিকিৎসাসেবায় তাদের গুরুত্ব কতটুকু? এটা কি নতুন কোনো পেশা, নাকি আগেও ছিল? হঠাৎ করে তারা আলোচনায় কেন? তাদের এত কিসের দুঃখ?

কারা এই মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট?
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৬৩ সালে ঢাকার মহাখালীতে প্যারামেডিকেল ইন্সটিটিউট নামে একটি প্রতিষ্ঠানের পথচলা শুরু হয়। যা ১৯৮০ সালে ‘ইন্সটিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি (আইএইচটি)’ নামকরণ করা হয়। এসময় ল্যাবরেটরি মেডিসিন, ফিজিওথেরাপি, রেডিওলোজী, রেডিওথেরাপি, ডেন্টাল ও ফার্মেসি- এই ছয়টি অনুষদে মেডিক্যাল ডিপ্লোমা শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়। এই ছয়টি অনুষদে ডিপ্লোমা পাশকৃতদের বলা হয় মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট। বর্তমানে বাংলাদেশে ১৪ টি সরকারি ইন্সটিটিউটের পাশাপাশি বেসরকারি প্রায় ৬৫টি মেডিক্যাল টেকনোলজি ইন্সটিটিউট আছে। প্রতিবছর সরকারি আইএইচটি থেকে প্রায় চার হাজার এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পাঁচ-সাত হাজার মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট পাস করে বের হচ্ছে।করোনাভাইরাস

তাদের কাজ কী?
আমরা চিকিৎসা সেবা বলতে বুঝি ডাক্তার ও নার্স। জীবনে কখনো হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন এমন মানুষের জ্ঞান আরেকটু বেশি। তারা চিকিৎসা সেবা বলতে ডাক্তার, নার্সের পাশাপাশি ওয়ার্ডবয় আর আয়াদের চিনে থাকেন।

অথচ আমরা চিকিৎসা নিতে গেলে প্রথমে যাই ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার কিন্তু আমাদের দেখই ওষুধ লিখে দেন না। ব্লাড ও ইউরিনসহ বেশকিছু টেস্ট দেন। এক্সরে/সিটি স্ক্যান করতে দেন। এই যে ব্লাড/ইউরিন টেস্ট করার জন্য যার কাছে যাই তিনিই মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট। আইএইচটিতে ল্যাবরেটরি মেডিসিনে পড়া প্যাথলজিস্ট তথা ল্যাব টেকনিশিয়ানরাই দক্ষ হাতে আমাদের স্যাম্পল কালেকশন থেকে শুরু করে পরীক্ষা ও রিপোর্ট তৈরির কাজটা করেন। একইভাবে এক্সরে কিংবা সিটি স্ক্যান যিনি করেন তিনি রেডিওলোজী অনুষদে পড়া রেডিওলজিস্ট তথা মেডিকেল টেকনোলজিস্ট।

ডাক্তার রিপোর্ট দেখে প্রেসক্রিপশন করেন। আমরা ছুটে যাই ফার্মেসিতে। যিনি ডাক্তারদের দুর্বোধ্য ভাষার প্রেসক্রিপশন পড়ে ওষুধ দেন এবং ডোজসহ সবকিছু বলে দেন তিনিই আইএইচটি থেকে পাশকরা ফার্মাসিস্ট। রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় কাউকে ফিজিওথেরাপি নিতে হয়। কাউকে ছুটতে হয় দাঁতের ডাক্তারের কাছে। এখানেও রোগীকে শরণাপন্ন হতে হয় আইএইচটি থেকে পাশকরা ডেন্টাল কিংবা ফিজিওথেরাপি টেকনোলজিস্টের কাছে।

চিকিৎসাসেবায় তাদের গুরুত্ব
চিকিৎসাসেবায় তাদের গুরুত্ব লিখে শেষ করা যাবে না। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর মনে চিকিৎসা সেবা সঠিকভাবে পরিচালিত করতে প্রতি একজন ডাক্তারের বিপরীতে তিনজন নার্স ও পাঁচজন মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ডাক্তার, নার্স ও টেকনোলজিস্টদের রেশিও হওয়া উচিত ১:৩:৫। বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারী ডাক্তার আছে ৩০ হাজার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবমতে, বর্তমানে দেশে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট থাকার কথা এক লাখ ৫০ হাজার।

কিন্তু মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট আছে মাত্র পাঁচ হাজার। হ্যাঁ আপনি ঠিকই শুনেছেন। দেড় লাখ প্রয়োজন যেখানে সেখানে আছে মাত্র পাঁচ হাজার। ঠিক এই কারণেই করোনার এই সময়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে স্যাম্পল কালেকশন ও টেস্ট করা নিয়ে। অদক্ষ ও নন-টেকনোলজিস্ট দিয়ে স্যাম্পল সংগ্রহ করায় অনেক স্যাম্পল টেস্ট করার উপযোগিতা হারায় বলেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সব মিলিয়ে করোনাকালে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টদের সংকট জনসম্মুখে চলে এসেছে।

এটা কি নতুন কোনো পেশা, না আগেও ছিল?
এতক্ষণে নিশ্চয় বুঝেছেন এই পেশা বাংলাদেশের জন্মের আগে থেকেই ছিল। কিন্তু তাদের প্রয়োজন উপলব্ধি করতে পারিনি বলে আমরা পেশাটার নামও শুনিনি। করোনা এসে অনেক নতুন নতুন শব্দ ও পেশার পাশাপাশি স্বাস্থ্যখাতের অতি গুরুত্বপূর্ণ এই পেশার বিষয়ে মানুষকে আগ্রহী করে তুলেছে। তারাও চলে এসেছে টেলিভিশন টকশো, সংবাদ ও পত্রিকার হেডলাইনে। এমন কী প্রধানমন্ত্রীর মুখেও এখন তাদের নাম।

মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টরা আন্দোলনে কেন? তাদের কিসের এত দুঃখ?
কঠিন প্রশ্ন। প্রতিদিন যখন তিন চার হাজার মানুষ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন, মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন ত্রিশ-চল্লিশজন করে। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া মানুষ বের হচ্ছেন না ঘর থেকে। এড়িয়ে চলছেন ভিড়। তখন কেন মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টরা একত্রিত হয়ে আন্দোলন করছেন? স্লোগান, মিছিল ও মানববন্ধন হয়ে উঠছে তাদের নিত্যদিনের রুটিন?

বিজ্ঞাপন

এর পেছনে বেশকিছু কারণ রয়েছে। যার সবচেয়ে বড় কারণ “বেকারত্ব”। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, যে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টদের দিকে তাকিয়ে আছে পুরো জাতি, সেই টেকনোলজিস্টরাও বইছে বেকারত্বের অভিশাপ। তাদের ঘাড়ে চেপে বসেছে কর্মহীনতার কালসাপ। এর কারণ হলো, সরকারি পর্যায়ে সর্বশেষ মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টদের নিয়োগ হয়েছিল ২০০৮ সালে।

গত ১২ বছরে আর কোনো নিয়োগের মুখ দেখেনি তারা। প্রতি বছর যেখানে আট দশ হাজার টেকনোলজিস্ট ডিপ্লোমা শেষ করে বের হচ্ছে সেখানে ১২ বছর কোনো নিয়োগ নেই। বর্তমানে বেকার মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের সংখ্যা প্রায় ২২ হাজার। ডিপ্লোমা পড়ার কারণে এরা দেশের অন্য কোনো নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে না। ফলে বেকারত্বের অভিশাপ বয়ে বেড়ানো ছাড়া তাদের দ্বিতীয় উপায় নেই।

তাদের আরেকটি দুঃখের নাম, ‘তৃতীয় শ্রেণি’। যেখানে পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট থেকে ডিপ্লোমা সনদধারীরা সরকারি চাকরিতে দশম গ্রেডের বেতন ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদ মর্যাদার অধিকারী সেখানে সমপরিমাণ শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টরা এগারতম গ্রেডের বেতন ও তৃতীয় শ্রেণির পদমর্যাদার অধিকারী।

উপরোক্ত দুইটি বিষয়সহ বর্তমানে মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের সুনির্দিষ্ট প্রধান সাতটি দুঃখ বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। তাই সাতটি দাবি নিয়ে তারা করোনার সাথে যুদ্ধের পাশাপাশি দেশের প্রচলিত ‘সিস্টেমের’ বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন। তাদের দাবিগুলো নিম্নরূপ:

১) মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টদের দ্বিতীয় শ্রেণিসহ দশম গ্রেড।

২) মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টদের নতুন পদ সৃষ্টি।

৩) ডিপ্লোমা মেডিক্যাল এডুকেশন বোর্ড গঠন।

৪) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাফিলতির কারণে বয়স উত্তীর্ণ মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টদের বয়স প্রমার্জনা সাপেক্ষে অবিলম্বে ২০ হাজার বেকার মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টকে নির্বাহী আদেশে নিয়োগ প্রদান।

৫) অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ১৮৩ জন মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট স্থায়ী নিয়োগের সুপারিশের আলোকে ১৪৫ জন নিয়োগ পাওয়াদের নিয়োগপত্র বাতিল এবং অনিয়মের সাথে জড়িতদের শাস্তি।

৬) স্বেচ্ছাসেবক/অস্থায়ী/মাস্টাররোল এর মাধ্যমে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট পদে নিয়োগ বন্ধ করে স্থায়ী নিয়োগের দিকে জোর প্রদান।

৭) সুপ্রিম কোর্টের আদেশ এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সুপারিশ মোতাবেক ওয়ান আমব্রেলা কনসেপ্ট বাস্তবায়ন এবং কারিগরি শিক্ষাবোর্ড সংশ্লিষ্টদের মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কারিগরি শিক্ষাবোর্ড থেকে পাশকৃতদের স্বাস্থ্য বিভাগে নিয়োগ বন্ধ।

উপরোক্ত সাতটি প্রধান দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক ও জনবান্ধব। দাবিগুলো মেনে নিলে সরকারের কোনো ক্ষতি তো হবেই না বরং দেশের জনগণ ও সরকার উপকৃত হবে। অতএব সরকারের উচিত দেশের বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে অতিদ্রুত দাবিগুলো মেনে নেওয়া।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)