চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কক্সবাজারে এনজিও বনাম বিজিবির মানহানি মামলা

দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভারত ও মিয়ানমার লাগোয়া বিস্তীর্ণ দুর্গম পাহাড়ি সীমান্ত নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ বেড়েই চলেছে। এটা সেই সীমান্ত, যা পাহারা দিতে ১৭৫৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ক্ষমতা নেয়ার পরপরই একটি সীমান্তরক্ষী বাহিনী প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য হয়। ১৭৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রামগড় ব্যাটালিয়ন। এই বাহিনীরই উত্তরসূরি আজকের ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ’। বাংলাদেশজুড়ে তরুণ প্রজন্ম ধ্বংসকারী মাদক ইয়াবার সিংহভাগ চালান আসে এই অরক্ষিত সীমান্ত দিয়েই। আর এই আগুনে ঘি ঢেলেছে সাম্প্রতিক রোহিঙ্গা সংকট।

২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত নাগরিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী দ্বিতীয় দফায় বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার পর কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করে দেশি-বিদেশি এনজিওগুলো। কক্সবাজারের স্থানীয় সাংবাদিকদের ধারণা, রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে অস্ত্র ও মাদক পাচারসহ নানা অপরাধের নেপথ্যে কতিপয় এনজিওয়ের ভূমিকা উড়িয়ে দেয়া যায় না। ২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়কের রেজুখাল সংলগ্ন বিজিবি চেকপোস্টে তল্লাশি চালিয়ে ১০ হাজার পিস ইয়াবাসহ ২জন মাদক কারবারিকে আটক করে বিজিবি। এ সময় মাদক কারবারিদের ব্যবহৃত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চলাচলের অনুমতিপ্রাপ্ত বেসরকারি এনজিও সংস্থা “ব্র্যাক” এনজিওর স্টিকারযুক্ত একটি গাড়ি জব্দ করা হয়।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

এর আগে গত ৮ অক্টোবর প্রাথমিক তল্লাশিতে অসহযোগিতা করলে ইয়াবা পাচারকারী সন্দেহে এক এনজিও কর্মীকে দমদমিয়া চেকপোস্টে নামিয়ে আবারও তল্লাশি করা হয়। অটোরিকশা যাত্রী বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)-এর কর্মী ফারজানা আক্তারকে তল্লাশি করেছিলেন বিজিবির নারী সদস্যরাই। এরপরও তল্লাশি শেষে তিনি বিজিবি সদস্যদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনেন। এনজিও চক্রের সূত্রের বরাত দিয়ে দুয়েকটি পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে খবরটি প্রকাশিত হয়। এ প্রেক্ষিতে গত ১০ নভেম্বর ২০২০ তারিখে কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে ব্লাস্ট এনজিওকর্মীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি ৫০০ ধারায় ১০০ কোটি টাকার মানহানির মামলা দায়ের করে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় উত্তরাধিকার সুশৃঙ্খল বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ।

ধর্ষণের অভিযোগকারী এনজিওকর্মী

বিজ্ঞাপন

গত ২২ নভেম্বর আদালতে বিজিবি’র চাঞ্চল্যকর মানহানি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে পুলিশ। তদন্ত প্রতিবেদনে ধর্ষণের কোন আলামত পাওয়া যায়নি। পরে আসামীর বিরুদ্ধে সমন জারি করেন আদালত। পরের তারিখে আসামী আত্মসমর্পণ করলে আদালত তাকে জামিন দেন।

চাঞ্চল্যকর মামলাটির বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে।

১. ভবিষ্যতে মামলাটি আদালতে নিস্পত্তি সাপেক্ষে মামলাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে আলোচনায় আসবে।
২. অক্টোবরে ধর্ষণবিরোধী সমাবেশকে সরকার পতনের আন্দোলনে রূপান্তর করার বিভিন্ন পক্ষ এই মামলায় সক্রিয়, এমন ধারণাও অমূলক নয়। অভিযোগকারী নারী ব্লাস্ট নামের যে এনজিওতে চাকরি করেন— যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতাকারী বিতর্কিত সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানের স্ত্রী ও গণফোরাম নেতা ড. কামাল হোসেনের মেয়ে ব্যারিস্টার সারা হোসেন সেই প্রতিষ্ঠানে নির্বাহী পরিচালক। সরকারকে বিপাকে ফেলার বহুমাত্রিক নীল নকশার অংশ হিসেবে এই ধর্ষণের নাটক মঞ্চস্থ করেছে ব্লাস্ট, এমন ধারণাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। একটা শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ রাষ্ট্রবিরোধী প্রোপাগান্ডারই অংশ বলা যেতে পারে।

৩. সংগঠনের ওয়েবসাইটে দেয়া প্রেস রিলিজে ব্লাস্ট মামলাটিকে ‘হয়রানিমূলক’ ও ‘ঔপনিবেশিক’ বলে মন্তব্য করেছে। আর বিজিবি সূত্র বলছে, নারী এনজিওকর্মীকে ব্যক্তিগতভাবে হয়রানির উদ্দেশ্যে মামলা দেয়া হলে জামিন অযোগ্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেই দেয়া যেত। সরকারি কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগ আনলে এতোদিনে আসামী গ্রেফতার হতো। বিজিবির অবস্থান খুবই পরিষ্কার— আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে সে ২২৫ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী বাহিনীর সম্মানহানির প্রতিকার চায়।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)