চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ঐক্যফ্রন্টের জনসভা থেকে কী বার্তা এলো?

সংলাপে সরকার কোনো দাবি মানেনি মন্তব্য করে তুমুল আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট৷ জনসভায় বক্তারা বলেন: দাবি না মানলে লংমার্চ, রোডমার্চ হবে, জনসভা হবে, নির্বাচন কমিশন অভিমুখে পদযাত্রা হবে, লড়াই হবে, গণতন্ত্রের মুক্তি, খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা হবে৷

শুক্রবার রাজশাহীর মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত বিভাগীয় জনসভায় এমন হুঁশিয়ারি দিয়ে বক্তব্য রাখেন ঐক্যফ্রন্টের নেতারা৷

প্রধান অতিথি ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন অসুস্থতার কারণে জনসভায় অংশ নিতে পারেননি৷ তবে তিনি ঢাকা থেকে মোবাইলে বক্তব্য রাখেন।

ড. কামাল বলেন: আমরা সরকারের সাথে আলোচনায় গিয়েছিলাম। বলেছিলাম, অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান করুন৷ দেশের ১৬ কোটি মানুষের কথা ভাবুন৷ নির্বাচন যেন গ্রহণযোগ্য হয় সে পদক্ষেপ নিন৷ কিন্তু আমাদের কথা উপেক্ষা করে তড়িঘড়ি করে তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে৷তারা তড়িঘড়ি করে নির্বাচন করতে চায়৷ ১৬ কোটি মানুষকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। সংবিধান পরিপন্থী কাজ করছে।

জনসভার প্রধান বক্তা মির্জা ফখরুল বলেন: আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ ঐক্যফ্রন্টের ৭ দফা দাবি আদায় করতে হবে।

তিনি বলেন: আমরা সরকারকে খুব স্পষ্ট কথা বলেছি। ৭ দফা দাবি মেনে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংকট সমাধানের কথা বলেছি। আমরা ঐক্য করেছি। শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংলাপে গিয়ে ৭ দফা দিয়েছি৷ আমরা বলেছি সংসদ ভেঙে দিতে হবে, বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে, তার মুক্তি ছাড়া নির্বাচন হতে পারে না। কিন্তু তারা মানেনি।

এসময় সরকার দাবি না মানলে গণতন্ত্রের জন্য খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য জীবন দিয়ে হলেও আন্দোলন করতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন ফখরুল।

জেএসডি সভাপতি আ স ম আব্দুর রব বলেন: তড়িঘড়ি করে তফসিল ঘোষণা করেছেন, যেন আমরা নির্বাচনে যেতে না পারি। সাবধান! দেশের ৯০ ভাগ মানুষ আমাদের সাথে আছে৷

তিনি বলেন: সংলাপে গিয়েছিলাম। দেশকে, জাতিকে বাঁচাতে গিয়েছিলাম। সংঘাতে যেতে চাই না। আমরা নির্বাচনে আসতে চাই। বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি দিন, গায়েবী মামলা, মিথ্যা মামলা তুলে নিন, সংসদ ভেঙে দিন৷ আমাদেরকে উস্কানি দেবেন না। দাবি মানেন, মানতে হবে। মরতে হলে মরবো, দাবি আদায় করতে হবে। মানুষ আমাদের সাথে আছে৷ আল্লাহ আমাদের সাথে আছে। জেলের ভয় দেখাবেন না আমাকে। আমি ১০ বছর জেলে ছিলাম৷ আমার ফাঁসি হয়েছিলো। আমি ৬ বার মারা গিয়েছিলাম।

রব বলেন: লড়াই হবে,এই লড়াই গণতন্ত্রের। দাবি না মানলে, তফসিল যদি না পেছান, লড়াই হবে। লংমার্চ হবে, রোডমার্চ হবে, সভা হবে, নির্বাচন কমিশনে পদযাত্রা করবো৷ ভয় দেখাবেন না। 

কাদের সিদ্দিকী তার বক্তৃতায় বলেন: বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য ঐক্য ধরে রাখতে হবে৷ খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য ছটফট করতে হবে না। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখতে না চাইলে লড়তে হবে। লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হোন৷ আজকে এখানে যে পরিমাণ নারী এসেছেন তার অর্ধেক পাশে পেলে আমি মাত্র ৩ দিনে শেখ হাসিনার পতন ঘটাতাম।

তিনি বলেন: খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার আগে নেতাকর্মীদের বলেছিলেন, আমি যদি মরেও যাই তবু হরতাল দেবে না। মানুষকে কষ্ট দিবে না৷ তার একথা মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছে। আমি মনে করি, বাংলাদেশের রাজনীতি বলতেই খালেদা জিয়া৷ বাংলাদেশ বন্দী থাকতে পারে না। বেগম খালেদা জিয়া বন্দী থাকতে পারে না।

Advertisement

কাদের সিদ্দিকী বলেন: আমি বঙ্গবন্ধুর জন্য রাজনীতিতে এসেছিলাম৷ আমি আজীবন বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে যাব। আমি কথা দিচ্ছি,বঙ্গবন্ধু এবং জিয়াউর রহমানের মধ্যে দ্বন্দ্ব বেঁধে যারা দেশকে লুটেপুটে খাচ্ছে তাদের থেকে এই দেশকে মুক্ত করবো। আমি জিয়াউর রহমান এবং বঙ্গবন্ধুর দ্বন্দ্ব মুছে দেব৷

এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল অলি আহমদ বলেন: আমরা নির্বাচনে যাব কিনা সে সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে সে সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাকে মুক্ত করতে হবে।

নির্বাচন কমিশনকে হুঁশিয়ারি দিয়ে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন: এখনও সময় আছে। নির্বাচনের তফসিল পেছান৷ আমরা স্পষ্ট বলতে চাই, এখনো পর্যন্ত ঐক্যফ্রন্ট কোনো সংঘাতের রাজনীতি চায় না। আমরা কোনো ষড়যন্ত্র করিনি। আমরা বলেছি দুই সংসদ একসাথে রাখা যায় না।

তিনি বলেন: আমরা সামরিক শাসন চাই না। শেখ হাসিনাকেও চাই না। শেখ হাসিনা আপনাকে সরে যেতে হবে৷ তারপর নির্বাচন হবে। আপনি দূর থেকে দেখবেন। নির্বাচনে দাঁড়ালে দাঁড়াবেন। ভোট দেবেন। কিন্তু ক্ষমতার ডাণ্ডা আমাদের উপর চালাতে পারবেন না।

মান্না বলেন: আমরা যদি আমাদের দাবি আদায়ের জন্য একদিন মানুষকে বলি, টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া সমস্ত গাড়ি বন্ধ করে দেই, তখন কী করবেন? সময় আসবে।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন: আমরা ৭ দফা দাবি নিয়ে সংলাপ করেছি। কিন্তু সরকার মানেনি। আমাদের সংলাপ সফল হয়নি৷ প্রধানমন্ত্রী একটি কথা দিয়েছিলেন, গ্রেপ্তার করবেন না। সভা সমাবেশে বাধা দেবেন না। কিন্তু ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কথার বরখেলাপ করেছেন। তিনি আমাদের নেত্রীকে ভালো চিকিৎসা দেয়ার কথা বলেছিলেন৷ কিন্তু কথা দেয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমাদের নেত্রীকে চিকিৎসা না দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছেন। এই সরকার কথা রাখে না। তা প্রমাণ হলো।

তিনি বলেন: যতদিন খালেদা জিয়ার মুক্তি হবে না ততোদিন আমাদের আন্দোলন চলবে। আমাদেরকে প্রস্তুত থাকতে হবে। বিনা চ্যালেঞ্জে তাদেরকে এবার ২০১৪ সালের মতো নির্বাচন করতে দিতে পারি না।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৭ দফা দাবিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন। একটি দাবিও মানেননি। শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে গেলে শেখ হাসিনা আজীবন প্রধানমন্ত্রী, খালেদা জিয়া আজীবন কারাগারে থাকবেন, তারেক রহমান দেশে আসতে পারবেন না। শেখ হাসিনা, নুরুল হুদাকে নামান। তারপর নির্বাচনের কথা বলুন। তা না হলে আপনারা ভোট দিতে পারবেন না। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে নির্বাচন নয়। 

শুক্রবার দুপুর ১টা ৫০ মিনিটে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত, ত্রিপিটক, গীতা, বাইবেল থেকে পাঠের মধ্যদিয়ে শুরু হওয়া জনসভায় সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী বিএনপির নেতা ও চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু।

জনসভায় বক্তব্য রাখেন বিএনপি, গণফোরাম, জেএসডি, নাগরিক ঐক্য, এলডিপি, কৃষক শ্রমিক জনতালীগ সহ বিভিন্ন দলের স্থানীয় ও জাতীয় নেতৃবৃন্দ।

জেএসসি পরীক্ষার কারণে মাদ্রাসা মাঠ বন্ধ ছিলো ১২টা পর্যন্ত। মূলত পরীক্ষা শেষে মাঠে প্রবেশের অনুমতি দেয় পুলিশ৷ এরপর রাজশাহীর বিভিন্ন জেলা থেকে নেতাকর্মীরা মিছিলে মিছিলে জনসভায় আসতে থাকেন। বিকেল ৩টার মধ্যে মাদ্রাসা মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে আশপাশের সড়কে ছড়িয়ে পড়ে।

আয়োজকদের অভিযোগ, জনসভাকে সামনে রেখে অঘোষিত ধর্মঘট ডাকে সরকার৷ ঢাকার সঙ্গে রাজশাহীর বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়৷

পুলিশের বেঁধে দেয়া সময় ৫টার ভেতর শেষ হয় জনসভা।