চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

এপ্রিলে ৩৯৭ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪৫২

করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় এপ্রিল মাসের শুরু থেকেই চলাচলে বিধিনিষেধ জারি করে সরকার। তবে চলমান বিধিনিষেধেও থেমে নেই সড়ক দুর্ঘটনা। গত এপ্রিলে বিধিনিষেধ চলাকালে ৩৯৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় মোট ৪৫২ জন নিহত হয়েছেন। এ সময়ে আহত হয়েছেন ৫১৯ জন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন সেলের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

পরিসংখ্যানে আরও বলা হয়েছে,নিহতের মধ্যে নারী ৫৪, শিশু ৪৭। ১৪৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ১৫৮ জন, যা মোট নিহতের ৩৪.৯৫ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৩৭.৫৩ শতাংশ। দুর্ঘটনায় ৯৬ জন পথচারী নিহত হয়েছে, যা মোট নিহতের ২১.২৩ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৭৩ জন, অর্থাৎ ১৬.১৫ শতাংশ।

সময়ে ৯টি নৌ-দুর্ঘটনায় ৪২ জন নিহত এবং ১১ জন আহত হয়েছে, ৪ জন নিখোঁজ রয়েছে। ৭টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ৫ জন নিহত হয়েছে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ৭টি জাতীয় দৈনিক, ৫টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।

দুর্ঘটনায় যানবাহনভিত্তিক নিহতের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ১৫৮ জন (৩৪.৯৫%), বাস যাত্রী ৫ জন (১.১০%), ট্রাক-পিকআপ-ট্রাক্টর-ট্রলি-লরি যাত্রী ৬০ জন (১৩.২৭%), মাইক্রোবাস-প্রাইভেটকার-এ্যাম্বুলেন্স-জীপ যাত্রী ১১ জন (২.৪৩%), থ্রি-হুইলার যাত্রী (সিএনজি-ইজিবাইক-অটোরিকশা-অটোভ্যান-টেম্পু) ৮৯ জন (১৯.৬৯%), নসিমন-ভটভটি-পাখিভ্যান-মাহিন্দ্র-টমটম ২২ জন (৪.৮৬%), বাইসাইকেল, প্যাডেল রিকশা, পাওয়ারটিলার, ইটভাঙ্গার মেশিন গাড়ি ১১ জন (২.৪৩%) নিহত হয়েছে।

দুর্ঘটনা সংঘটিত সড়কের ধরণ:

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ বলছে, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ১৫৬টি (৩৯.২৯%) জাতীয় মহাসড়কে, ১৩৭টি (৩৪.৫০%) আঞ্চলিক সড়কে, ৬৬টি (১৬.৬২%) গ্রামীণ সড়কে, ৩১টি (৭.৮০%) শহরের সড়কে এবং অন্যান্য স্থানে ৭টি (১.৭৬%) সংঘটিত হয়েছে।

দুর্ঘটনার ধরণ:

দুর্ঘটনাসমূহের ৫৭টি (১৪.৩৫%) মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১৯২টি (৪৮.৩৬%) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ১০৮টি (২৭.২০%) পথচারীকে চাপা/ধাক্কা দেয়া, ৩৪টি (৮.৫৬%) যানবাহনের পেছনে আঘাত করা এবং ৬টি (১.৫১%) অন্যান্য কারণে ঘটেছে।

বিজ্ঞাপন

দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত/দায়ী যানবাহন:

দুর্ঘটনার জন্য দায়ী- ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-পিকআপ ৩১.৬৬ শতাংশ, ট্রাক্টর-ট্রলি-লরি ৭.২৯ শতাংশ, মাইক্রোবাস-প্রাইভেটকার-এ্যাম্বুলেন্স-জীপ-পাজেরো ৫ শতাংশ, যাত্রীবাহী বাস ৩.০৭ শতাংশ, মোটরসাইকেল ২৮.৫৯ শতাংশ, থ্রি-হুইলার (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-টেম্পু-মিশুক-স্কুটার) ১৫.৯৩ শতাংশ, নসিমন-ভটভটি-আলমসাধু-পাখিভ্যান-টমটম-মাহিন্দ্র-বাইসাইকেল-প্যাডেল রিকশা ও ভ্যান ৭.৪৮ শতাংশ এবং অন্যান্য (মাটিকাটা ট্রাক্টর-রোড রোলার-পাওয়ারটিলার-ইটভাঙ্গা মেশিন গাড়ি) ০.৯৫ শতাংশ।

দুর্ঘটনায় আক্রান্ত যানবাহনের সংখ্যা ৫২১টি। (ট্রাক ১১৮, বাস ১৬, কাভার্ডভ্যান ১৩, পিকআপ ৩১, লরি ১১, ট্রলি ১৭, ট্রাক্টর ৮, ট্যাঙ্ক লরি ২, মাইক্রোবাস ১১, প্রাইভেটকার ৯, এ্যাম্বুলেন্স ৩, জীপ ও পজেরো ৩, পুলিশ পিকআপ ৩, মোটরসাইকেল ১৪৯, ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-টেম্পু-মিশুক-স্কুটার ৮৩, নসিমন-ভটভটি-আলমসাধু-পাখিভ্যান-টমটম- মাহিন্দ্র ২৯, বাই-সাইকেল ৬, প্যাডেল রিকশা, রিকশাভ্যান ৪, রোড রোলার ১, ইটভাঙ্গা মেশিন গাড়ি ১, পাওয়াটিলার ১ এবং মাটিকাটা ট্রাক্টর ২টি।

দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুর্ঘটনাসমূহ ঘটেছে ভোরে ৫.২৮%, সকালে ৩১.২৩%, দুপুরে ২১.৯১%, বিকালে ১৭.৩৮%, সন্ধ্যায় ৯.৫৭% এবং রাতে ১৪.৬০%।

দুর্ঘটনার জেলা ও বিভাগওয়ারী পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা বিভাগে দুর্ঘটনা ২৮.২১%, প্রাণহানি ৩০.৩০%, রাজশাহী বিভাগে দুর্ঘটনা ১৪.১০%, প্রাণহানি ১৭.৬৯%, চট্টগ্রাম বিভাগে দুর্ঘটনা ১৯.৩৯%, প্রাণহানি ১৭.৯২%, খুলনা বিভাগে দুর্ঘটনা ৯.৮২%, প্রাণহানি ৮.৮৪%, বরিশাল বিভাগে দুর্ঘটনা ৮.৮১%, প্রাণহানি ৬.৬৩%, সিলেট বিভাগে দুর্ঘটনা ৫.০৩%, প্রাণহানি ৪.৬৪%, রংপুর বিভাগে দুর্ঘটনা ৬.০৪%, প্রাণহানি ৫.৭৫% এবং ময়মনসিংহ বিভাগে দুর্ঘটনা ৮.৫৬%, প্রাণহানি ৮.১৮% ঘটেছে।

ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে। ১১২টি দুর্ঘটনায় নিহত ১৩৭ জন। সবচেয়ে কম সিলেট বিভাগে। ২০টি দুর্ঘটনায় নিহত ২১ জন। একক জেলা হিসেবে ঢাকা জেলায় সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে। ২৬টি দুর্ঘটনায় ৩৪ জন নিহত। সবচেয়ে কম পঞ্চগড় জেলায়। ২টি দুর্ঘটনা ঘটলেও কেউ হতাহত হয়নি।

আহত ও নিহতদের বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, নিহতদের মধ্যে পুলিশ সদস্য ৪ জন, সাবেক বিজিবি সদস্য ১ জন, বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-মাদরাসার শিক্ষক ১১ জন, প্রকৌশলী ২ জন, আইনজীবী ৩ জন, পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তা ১ জন, পল্লী চিকিৎসক ১ জন, স্থানীয় সাংবাদিক ৩ জন, ব্যাংক কর্মকর্তা ৩ জন, এনজিও কর্মকর্তা-কর্মচারী ৯ জন, ঔষধ ও বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী বিক্রয় প্রতিনিধি ২১ জন, স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যবসায়ী ৪২ জন, স্থানীয় সিএনজি চালক সমিতির সেক্রেটারী ১ জন, পরিবহন শ্রমিক ২ জন, পোশাক শ্রমিক ৪ জন, ওয়ার্কশপ শ্রমিক ১ জন, ইটভাটা শ্রমিক ৩ জন, মাটিকাটা শ্রমিক ২ জন, কৃষি শ্রমিক ৫ জন, রাজমিস্ত্রি ৬ জন, নৈশ প্রহরী ২ জন, মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধি ৩ জন, উপজেলা ছাত্রলীগ নেতা ২ জন, বিএনপি নেতা ১ জনসহ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ১৩ জন এবং দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৬৪ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে।

দেশে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণসমূহ:

১. ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন; ২. বেপরোয়া গতি; ৩. চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা; ৪. বেতন ও কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট না থাকা; ৫. মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল; ৬. তরুণ ও যুবদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো; ৭. জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা; ৮. দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা; ৯. বিআরটিএ’র সক্ষমতার ঘাটতি; ১০ গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি।

রিপোর্টে সুপারিশসমূহ হিসেবে চালক তৈরির উদ্যোগ, চালকের বেতন ও কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট করা, বিআরটিএ’র সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ নানা বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।

গত মার্চ মাসে ৪০৯টি দুর্ঘটনায় ৫১৩ জন নিহত হয়েছিল। গড়ে প্রতিদিন নিহত হয়েছিল ১৬.৫৪ জন। এপ্রিল মাসে প্রতিদিন নিহত হয়েছে গড়ে ১৫.০৬ জন। এই হিসেবে এপ্রিল মাসে প্রাণহানি কমেছে ৮.৯৪ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন