চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

এত সস্তা মানবজীবন!

ফেসবুকে সরকারবিরোধী লেখার জের ধরে সন্দেহ এবং এরপর শিবির সন্দেহে মেরে ফেলা হয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক শিক্ষার্থীকে। নিহত ওই শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ, তিনি ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। ৬ অক্টোবর রাতে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বুয়েট শাখার কয়েকজন নেতা।

বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, রোববার রাত আটটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ নেতারা আবরারকে ডেকে পাঠান। ওইসময় লেখাপড়ায় ব্যস্ত থাকা আবরারকে সঙ্গে সঙ্গেই যেতে হয়। এ সম্পর্কে চ্যানেল আই অনলাইনকে বুয়েট ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক আশিকুল ইসলাম বিটু বলেন, আবরারকে শিবিরকর্মী সন্দেহে রাত ৮টার দিকে হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নেয়া হয়। সেখানে তার মোবাইল ফোনে ফেসবুক ও মেসেঞ্জার পরীক্ষা করে দেখেন তারা। ওই সময় ফেসবুকে বিতর্কিত কিছু পেইজে তার লাইক দেয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। আবরার কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগও করেছিলেন, যেখান থেকে তার শিবির সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়। বিটুর ভাষ্যমতে, আবরারকে ‘জিজ্ঞাসাবাদ’ করেছিলেন বুয়েট ছাত্রলীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক ও কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মুজতবা রাফিদ, উপ-সমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল এবং উপ-আইন সম্পাদক অমিত সাহা; এরপর খবর দেওয়া হয় ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন এবং তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার সেখানে যান। ‘একপর্যায়ে আমি রুম থেকে বের হয়ে আসি। এরপর হয়তো ওরা মারধর করে থাকতে পারে। পরে রাত তিনটার দিকে শুনি আবরার মারা গেছে,’ এমনই দাবি বুয়েট ছাত্রলীগের এই সহ-সম্পাদকের। ছাত্রলীগের এই নেতার ভাষ্যমতে আবরার ফাহাদকে নির্যাতন করা হয়েছে এবং এই নির্যাতনেই যে তার মৃত্যু হয়েছে সেটাও পরিস্কার। এর আরও প্রমাণ পাওয়া যায় বুয়েটের দায়িত্বরত চিকিৎসক ও পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রাথমিক বক্তব্যে।

বিজ্ঞাপন

কথা হলো, ছাত্রলীগ নেতারা শিক্ষার্থীদের মধ্যে কে শিবির, কে ছাত্রদল, কে ছাত্র ইউনিয়ন-এসব যাচাইয়ের কোন কর্তৃপক্ষ? এমনটা যাচাইয়ের কোন অধিকার তাদের থাকার কথা নয়। তবু তারা সেটাই করেছেন, এবং এটা করতে গিয়ে এক পর্যায়ে একজন শিক্ষার্থীকে মেরেই ফেলেছেন। ছাত্রলীগের একজন দায়িত্বশীল নেতার জবানিতে জানা যায়, তারা আবরার ফাহাদকে ‘জিজ্ঞাসাবাদ’ করছিলেন। এই জিজ্ঞাসাবাদ শব্দটি ছোট্ট হলেও এর অর্থের ব্যাপকতা সম্পর্কে তাদের ধারণা আছে কি না জানি না। এও জানি না এই ছাত্রলীগ নেতারা জানেন কি না যে জিজ্ঞাসাবাদ তাদের কাজ না। নিহত যে শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ তাদের মতই একজন শিক্ষার্থী, তাদের মতই একজন নাগরিক দেশের। তারও অধিকার আছে নিজস্ব মতামত প্রকাশের, তারও অধিকার আছে সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে লেখালেখি করার।

যে ছাত্রলীগ নেতারা নিহত শিক্ষার্থীকে শিবির সন্দেহে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিলেন তারা যে ‘প্রকৃত’ ছাত্রলীগ সে নিশ্চয়তা কে দেবে? কেবল সংগঠনের নেতৃত্ব বা পদ-পদবি পেলেই যে এই সময়ে দলের ‘প্রকৃত’ নেতা হওয়া যায় এই ধারণায় পলেস্তারা জমেছে। ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের থেকে শুরু করে বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির অনেক নেতার বিরুদ্ধেই জামায়াত-বিএনপির অতীত সম্পৃক্ততার অভিযোগ খোদ ছাত্রলীগ নেতারাই করে আসছেন। এছাড়া আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতাদের কপালেও জুটছে ‘অনুপ্রবেশকারী’র তকমা। এমন অবস্থায় তাদের নিজেদের পরিচয়ই ত প্রশ্নের মুখে। এই প্রশ্নের মুখে থাকা সংগঠনটির নেতারা ‘শিবির’ খোঁজার নৈতিক অধিকার রাখেন বলে মনে হয়না।

এর বাইরে দেশের কেউ শিবির করলে তাকে এভাবে মেরে ফেলাটাও আইন-আদালতকে অবজ্ঞা করার সামিল। আওয়ামী লীগ সরকার টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসীন, এই দীর্ঘ সময়ে দেশের মধ্যে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি ওঠলেও সরকার এটাকে গুরুত্ব দেয়নি। আইনি কিংবা প্রশাসনিক নির্দেশে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতিও নিষিদ্ধ করেনি। আওয়ামী লীগ সরকার যেখানে দেশে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করেনি সেখানে দলটির ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের শিবির সন্দেহে কাউকে হেনস্তা করাটা অন্যায়, আর মেরে ফেলাটা ভয়াবহ অপরাধ। শিবির নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো সংগঠন যদি হতো তবে এই সংগঠনের কোন কর্মী কিংবা নেতাকে এভাবে মেরে ফেলাটাও আইন-আদালতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর সামিল। উদাহরণ ত অনেক আছে- এই দেশে হিজবুত তাহরির বা জামায়াতুল মুজাহিদিন কিংবা একই আদর্শের কিছু সংগঠনকে রাষ্ট্র নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও তাদের ধৃত কোন কর্মী-নেতাকে কেউ পিটিয়ে মারে না, পুলিশও মারেনা, দেশের আইন-আদালতও সেটাকে সমর্থন করেনা।

বিজ্ঞাপন

এ প্রসঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি গড়ে ওঠে গণআন্দোলন গণজাগরণের অন্যতম সংগঠক মাহমুদুল হক মুন্সির একটা ফেসবুক স্ট্যাটাস চোখে পড়েছে, যেখানে যুদ্ধাপরাধীদের সাইনবোর্ড খ্যাত গোলাম আজম আন্দোলনের সূতিকাগার থেকে মাত্র শ’খানেক দূরত্বে থাকলেও আইন নিজের হাতে না নেওয়ার কথাটাই বলেছেন। মানব আর দানবের মধ্যকার পার্থক্য নিরূপণে মুন্সি লিখেন, “চাইলে তো আমরা গোলাম আজমরেও পিটিয়ে মারতে পারতাম, শাহবাগ থিকা তো ১০০ গজ দূরত্বেও ছিল না। প্রতি রাতে দাঁতে দাঁত চেপে তার কেবিনের সামনের করিডর দিয়ে হেঁটে যেতাম। কিন্তু অপরাধের সবচেয়ে বড়টা, গণহত্যা করার পরও, কাউকে বিনা বিচারে হত্যা করা যায় না। তাহলে আপনার আর গোলাম আজমের ভেতর কোন পার্থক্য নেই। তাহলে যে কারণে তাকে ঘৃণা করা যায়, সে একই কারণে আপনাকেও ঘৃণা করা যায়। শিবির করলে তারও বিচার পাবার অধিকার আছে। নইলে আপনার আর একজন শিবিরের ভেতর পার্থক্য কি রইলো? আপনি যখনই শিবির বলেই একজনকে পিটিয়ে মারেন, তখন আপনার ও শিবিরের মাঝে আসলে কোন পার্থক্যই থাকে না। দুজনই হয়ে যান ঘৃণ্য দানব। পশু। জানোয়ার।”

বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করার পর সেখানকার ছাত্রলীগ নেতাদের বক্তব্যের সমর্থনে অনেকেই এই হত্যাকে জায়েজ করতে আবরারের ফেসবুক লাইক নিয়েও কথা বলছেন। অনেকে বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর সদ্য সমাপ্ত ভারত সফরের প্রতিক্রিয়ায় লেখালেখি নিয়েও। ফেসবুকে লাইক, এবং ফেসবুক এক্টিভিটি যদি একজন মানুষের বেঁচে থাকা আর মরে যাওয়ার কারণ হয়ে থাকে তবে এরচেয়ে বড় অরাজকতা, এরচেয়ে বড় নৃশংসতা, এরচেয়ে বড় অপরাধ আর কিছু হতে পারেনা। এই অরাজকতা প্রশাসনকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে, সরকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে, সমাজকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে, এমনকি এটা রাষ্ট্রের চরিত্রকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।

আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড আমাদের বাক স্বাধীনতাকে আরও একবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই দেশে ভিন্ন মতাবলম্বী মানুষদের হত্যাকাণ্ডের ধারাকে ফের ফিরিয়ে এনেছে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবি, ধর্ম নিয়ে নানামুখী বিশ্লেষণসহ মুক্তচিন্তক লেখকদের লেখালেখি এই দেশের একশ্রেণির মানুষদের ক্ষুব্ধ করেছিল। তারা চাপাতি হাতে নিয়ে ঘাড়-গলা কেটেছে অগণন মানুষের। প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মান্ধ, উগ্রচিন্তার মানুষদের শূন্যস্থান অদ্য পূরণে নেমেছে ছাত্রলীগ। জঙ্গিবাদের দীক্ষা নেওয়া সেইসব প্রতিক্রিয়াশীলেরা অদ্য সওয়ার হয়েছে ছাত্রলীগে। প্রতিক্রিয়াশীলেরা যেমন ভিন্ন মত সহ্য করতে পারত না এই সময়ের ছাত্রলীগও সেটা পারছে না। এ দুই দলের মধ্যে পার্থক্য কমে এসেছে, অথবা আদৌ কোনও পার্থক্য আর থাকছে না!

বুয়েটের যে শিক্ষার্থী সহপাঠী ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের দ্বারা নিহত হলেন সে হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। এই চাওয়া পূরণ হবে কি না জানি না। তবু দাবি জানাচ্ছি বিচারের। আমরা দেশের আইন-আদালতের প্রতি শেষ পর্যন্ত আস্থা রাখতে চাই বলে আমাদেরকে বিচারের দাবি করতেই হবে।

কয়েকটা ফেসবুক স্ট্যাটাস কিংবা ফেসবুকে দেওয়া সামান্য লাইক যদি কারও মৃত্যুর কারণ হয় তবে আরও একবার ভাবতে হয় আমাদের সস্তা মানব জীবন নিয়ে। এত সস্তা, এত সস্তা; এত সস্তা মানবজীবন, মানবজন্ম!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।) 

Bellow Post-Green View