চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

এখানে থেমো না: চলচ্চিত্রের মত একটি উপন্যাস 

‘এখানে থেমো না’ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনভিত্তিক উপন্যাস হলেও আমার কাছে তা একটি যাদুই চলচ্চিত্র। শুধু নিখুঁত বর্ণনার মাধ্যমে এই চলচ্চিত্র পাঠকের মগজে নির্মাণ করেছেন কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক। অসংখ্য তথ্য আছে এই বইয়ে। কিন্তু তথ্যগুলোকে ফিকশনের সঙ্গে তাল মেলাতে বাধ্য করেছেন লেখক। তাই এটি তথ্যচিত্র না হয়ে—হয়েছে উপভোগ্য পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের মত উপন্যাস।

চলচ্চিত্র ও নাটকের মতো এই উপন্যাসেও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দৃশ্যের বর্ণনা করে পাঠকের সামনে সেই দৃশ্যের ভার্চুয়াল ইমেজ তৈরি করা হয়েছে। একটি দৃশ্যের বর্ণনা এমন, ‘সকাল দশটার করমচা রোদ পুব-দক্ষিণের জানালা দিয়ে এসে বইয়ের র‌্যাকে পড়েছে, বার্নার্ড শর একটা হার্ড বাইন্ডিং বইয়ের অতি মসৃণ মলাটে আলো পড়ে তার প্রতিবিম্ব এসে পড়ছে মুজিবের নাকে-গোঁফে।’

বিজ্ঞাপন

বলা হচ্ছে, ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত দেশকালের ছবি আঁকা হয়েছে এই উপন্যাসে। তবে সেই ছবির মুখটি বঙ্গবন্ধুর। বাংলাদেশের ওই সময়ের ঘটনা-প্রবাহ আমাদের কম বেশি জানা। কিন্তু উপন্যাসটি পড়া শেষে মনে হবে নতুন করে জানলাম—আসলে অনুধাবন করলাম। উপন্যাস-ভ্রমণ শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে লঞ্চ ভ্রমণ দিয়ে। তাঁরা যাচ্ছেন গোপালগঞ্জ। ওই লঞ্চে পাঠক নিজেও কখন যে উঠে পড়েন—মনে থাকে না।

বিজ্ঞাপন

অসাধারণ সব সংলাপ উপন্যাসটিকে করেছে প্রাণবন্ত। যেমন, বঙ্গবন্ধু বলছেন, ‘শুধু বাংলা রাষ্ট্রভাষা হবে না। বাংলা ভাষার রাষ্ট্রও হবে’, ইয়াহিয়া বলছেন, ‘হয় কুকুরটা খতম করবে গোঁয়ারটাকে, না হয় গোঁয়ারটা খতম করবে কুকুরটাকে। আর তা না হলে সিংহ সাবাড় করবে দুটোকেই’, রেনু (শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব) বলছেন, ‘শোনো, তোমার সামনে লক্ষ মানুষ, তাদের হাতে লাঠি। তোমার পেছনে বন্দুক। এই লক্ষ মানুষ যেন হতাশ না হয়’।

কিছু সংলাপ পড়ে চোখ পানিতে ভরে ওঠে, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে রেনু বলছেন, ‘না। তুমি পালাবা না।’ লেখক যোগ করছেন, ‘রেনু চোয়াল করে বললেন।’ একই রাতে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছেন তাজউদ্দীন। দৃশ্যটা মনে ছাপ ফেলে যায়, তাজউদ্দীন বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে বলছেন, ‘মুজিব ভাই, আপনার কী হবে? আপনি যদি না থাকেন, আমাদের কী হবে?’ বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমি থাকলেও বাংলাদেশ স্বাধীন হবে, আমি না থাকলেও বাংলাদেশ আরও বেশি করে স্বাধীন হবে।’

বিজ্ঞাপন

এই উপন্যাসে আবেগঘন দৃশ্যের পাশাপাশি হাস্যরসের খোরাকও আছে, যেমন—ইয়াহিয়ার বন্যা-দর্শনের কাহিনীটি। করুণ রসের মধ্যেও এমন দৃশ্য হাসায়।

আনিসুল হক যেহেতু একজন কবিও তাই তাঁর গদ্যেও রয়েছে মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো অসংখ্য পঙক্তি। যেমন, ‘যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে জেগে উঠেছে পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইল’, ‘স্বাধীনতা, স্বাধীনতা…পাখিরা ডেকে উঠল নীড়ে নীড়ে’, ‘লাশে লাশে ছেয়ে ছেয়ে গেল বুড়িগঙ্গা, যেন মাছের মড়ক লেগে গেছে’ ইত্যাদি। শেষের লাইনটি ২৫ মার্চের ভয়াবতা বুঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে। বইয়ের ৬৭ নম্বর পরিচ্ছদ থেকে শেষতক নিপুনভাবে ২৫ মার্চের বর্ণনা করেছেন লেখক। সংলাপের অনেক জায়গায় আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। যা উপন্যাসটিকে বাস্তবধর্মী থাকতে সাহায্য করেছে।

গল্পটির প্রায় পুরোটাই লেখক বলছেন। মাঝে মাঝে কিছু কিছু অংশ গল্পের চরিত্রগুলোও বলে দিচ্ছে। আবার কখনো বলছে ব্যাঙ্গমা ও ব্যাঙ্গমি। ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমি পাখি দুটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বটগাছে থাকে। মঞ্চনাটকের বিবেকের মতো এই পাখি দুটি মাঝে মাঝে উপন্যাসে হাজির হয় এবং অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের ঘটনা বয়ান করে। তাই লেখক পাখি দুটিকে ‘ত্রিকালদর্শী’ হিসেবে শুরুতেই পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। তাদের দিয়ে লেখক পাঠককে এমন সব তথ্য দেন যে তথ্যগুলো লেখক সরাসরি দিতে গেলে গল্পের প্রবাহ বাধাগ্রস্থ হতে পারতো। পাখির মুখে সেসব তথ্য জানতে অস্বাভাবিক ঠেকে না। অবলীলায় পাখি দুটি বলে যায়। তবে হ্যাঁ, ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমিকে দিয়ে পত্রিকায় ছাপা হওয়া সাক্ষাৎকার নির্ভুলভাবে পড়িয়ে শোনানোর বিষয়টি মেনে নিতে মন সায় দেয় না। আবার ধাক্কা লাগে, যখন ৭ই মার্চের ভাষণের মঞ্চের কথা বলতে গিয়ে হঠাৎ করেই লেখক বর্তমানে ফিরে আসেন, ‘ এখন যেখানে শিশুপার্ক, তার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ছিল সেই মঞ্চটি‘।

বঙ্গবন্ধু, ইয়াহিয়া, রেনু, তাজউদ্দীন, ভুট্টো, ভাসানী, হাসু, রেহানা, রিমি, রিপি, ড. কামাল, আমীরুল ইসলাম, ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলোকে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে উপন্যাসে দাঁড় করিয়েছেন লেখক। পাশাপাশি মওদুদ আহমেদ ও আর্চার ব্লাডের মতো কম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলো তৈরিতেও যত্নবান ছিলেন তিনি। এই উপন্যাসে গল্পের ধারাবাহিকতার লাগাম ধরে রাখা ছিল চ্যালেঞ্জ। আনিসুল হক তাতে উত্তীর্ণ। ইতিহাসের বাস্তব ছোট-বড় চরিত্রগুলোর নানা ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে—ধারাবাহিকতা অটুট রেখেই। বিভিন্ন স্মৃতিচারণ, দিনলিপি ও আত্মজীবনী থেকে উপাদান নিয়ে ইতিহাসের একটি ফিল্মের সঙ্গে আরেকটি ফিল্ম জোড়া দিয়েছেন তিনি। এজন্য তাঁকে কতটা পরিশ্রম করতে হয়েছে তা জানতে পড়তে হবে এবছর বের হওয়া ‘এখানে থেমো না’।

শেষে উপন্যাসের একটি বিশেষ অংশ নিয়ে বলতে চাই। দশ বছর ধরে কবি মনিরউদ্দীন ইউসুফ ইরানের কবি ফেরদৌসীর ‘শাহনামা’ অনুবাদ করছেন। ২৫ মার্চ সকালে তিনি শাহনামার সেই অংশটি অনুবাদ করতে বসেন যেখানে শত্রুরা রাতের অন্ধকারে ইরান আক্রমণ করছে। তখন কবি মনিরউদ্দীনের মনে হলো, ‘আজ রাতেই পাকিস্তানি সৈন্যরা ঝাঁপিয়ে পড়বে বাঙালির ওপরে।’ কবির মনের মধ্যে, ‘যুদ্ধ, আক্রমণ, আর্তনাদ, হুংকার; তা ইরানের মহাকাব্যগ্রন্থের পাতা থেকে বেরিয়ে আসছে—তরবারি, ঢাল, বল্লম, বর্ম, অশ্ববাহিনী, অশ্বখুরধ্বনির বদলে ট্যাংক, কামান, মর্টার, মেশিনগান…’ অসামান্য একটি অংশ। আমাদের ২৫ মার্চ এবং শাহনামার ওই অংশটুকু হাতেহাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছে যেন—যেন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। এমন একটি অমূল্য চিত্রকল্প সৃষ্টির কারণে এই উপন্যাসের ‌‌সাত খুন মাফ করে দেওয়া যায়!