চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

এখন আর কেউ ডেকে তোলে না সাহরীতে

ইবাদতের মাস রমজান। সারা পৃথিবীর মুসলিমের মতো আমারাও হিজরী সনের এই রমজান মাসে ঝাঁপিয়ে পড়ি গোনাহ্ মাফ ও পুণ্যি সঞ্চয়ের আশায়। তবে আমোদ প্রিয় জাতি হিসেবে রমজানের ভাব-গাম্ভীর্য বজায়ে রেখে ছোটবেলা থেকেই এই মাসে রগে রগে বয়ে চলে এক ধরনের আনন্দ বান। যদিও এখন সময় অনেক বদলে গেছে। বদলে গেছে আমাদের মানসিকতা।

তবে আমি এখনো স্মৃতি হাতড়ে খুঁজে ফিরে শৈশবের রমজান মাস। আনন্দের প্রধান কারণ ছিলো রমজান আসলেই বোঝা যেতো ঈদ আসছে। আর ঈদুল ফিতরের চেয়ে আনন্দের কিছু নেই আমার জীবনে। স্কুল বন্ধ থাকতো পুরো এক মাস। এ আনন্দও কম ছিলো না। সাহরীতে উঠে দল বেঁধে বেরিয়েছি হাঁক-ডাকে। সকালে খুব বেশী পড়তে হতো না। কেননা মা বলতেন আহারে আমার ছেলেটা রোজা আছে, থাক আর পড়তে হবে না আজকে।

বিজ্ঞাপন

মায়ের এই নির্দেশনা পাওয়ার পর কোথা থেকে যেন অশুরের শক্তি চলে আসতো গায়ে। ছুটে বেরিয়ে যেতাম বাসা থেকে। তারপর থেকে টানা আসরের নামাজ পর্যন্ত বাড়ীতে আর খোঁজ পড়তো না। খাওয়া-দাওয়ার ঝামেলাও নেই। সব বন্ধুরা এসে জুটতো এক জায়গায়। এখানে বসতো ক্যারাম তো অন্য খানে দাবার আসর। মধ্যখানে কেবল নামাজের বিরতি। আর নামাজও ছিলো কমপক্ষে ৪০ জনের দল। কোনায় কোনায় ঈদ কার্ডের দোকান। বেঁচাকেনা যাই হোক আইয়ুব বাচ্চু, জেমস আর হাসানের গানে সব সময় সরব থাকতো ওই দোকানগুলো। আসরের পরে আবার সৌখিন ঈফতারের দোকানে আড্ডা। মাগরিবের পরে গোল্ডলিফ সিগারেট আর দুধ চা না খেলে ইফতার পূর্ণতা পেতো না কখনোই।

আর এই রমজান মাসেই সন্ধ্যার পর বাইরে থাকা যেতো তারাবির অযুহাতে। যদিও তারাবি পড়তাম না একদিনও। জানি না আল্লাহ ক্ষমা করবেন কিনা। তবে সে বয়সে সব কিছুই মানানসই ছিলো। এভাবেই এগিয়ে চলতো বাঙালি কিশোরের রমজান মাস। সময় এগিয়ে যেতে থাকতো আর আমাদের আনন্দ বান বাড়তে থাকতো। কারণ ঈদ চলে আসছে। আসছে নতুন জামা জুতার হাতছানি। তবে এই আনন্দে খুব বেশি আনন্দিত হতে পারতেন না মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবা-মা। একে তো রমজানের খরচ তার মধ্যে ঈদের খরচ। অবুঝ আমরা তো পারলে প্রথম রমজানেই কেনাকাটা করতে চলে যেতাম। বাবা কেন যাচ্ছেন না এই নিয়ে বিরক্তও হতাম ঢের। তবে এখন আমি সব বুঝি। ভীষন লজ্জাও পাই এই ভেবে কেন তখন এই সামান্যটুকু বুঝিনি। তবে সব শেষে চাঁদ রাতের আগেই মিলে যেতো নতুন জুতো জামা।

বিজ্ঞাপন

শুধু আমার নয়, বাসার কাজের মেয়েটি পর্যন্ত পেয়ে যেতো সব। বাকী থাকতেন একজন। তিনি ছিলেন বাবা। এই নিয়ে মায়ের সাথে তুমুল ঝগড় চাঁদ রাতে। আমার মনে হয় এটা মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে খুব কমন দৃশ্য ছিলো। অবশেষে হয়তো কাছের কোন দোকান থেকে কিনে আনা হতো বাবার ঈদের পাঞ্জাবি। পূর্ণতা পেতে রমজান, পূর্ণতা পেতে ঈদ।

প্রতিবছর একই ভাবে আসে রমজান। আসে ঈদ। প্রতি সাহরীতে একই খাওয়া। একই ইফতার, একই দোয়া-দরুদ। শুধু এক নয় সময়। অনেক বদলে গেছে সময়। এখন আর কেউ ডেকে তোলে না সাহরীতে, ডেকে তোলে মোবাইল নামের এই যন্ত্র। হয়না বাবার সাথে ঈফতারের আগে আল্লাহর দরবারে পানাহ চেয়ে হাত তোলা। টিভিতে জোরে ভলিউমে মোনাজাত শুনি। ইফতারের সময় আসে না কোন রোজদার শরিক হতে। মুড়ি পেঁয়াজুও মাখায় না কেউ। খুঁজে পাই না কোন বন্ধুদেরও। সবাই খুব ব্যস্ত। বসে না অলিগলিতে ঈদ কার্ডের দোকান। বাজে না আর সেই বাংলা ব্যান্ডের গান।

খুব চুপচাপ এসে চলে যায় ঈদ। চেষ্টা করি বাচ্চাদের পরিপূর্ণ রমজান ও ঈদের আনন্দ বোঝানোর । নিজেও হাসি খুশি থাকি। কাউকে বোঝাতে চাই না আমি এই সংসারের না। রমজান এলেই মনে পড়ে আমার শৈশব আমার কৈশর। মনে পড়ে আমি অন্য কোন পরিবারের। যাদের কেউ দূরে… কেউ বা অনেক দূরে। আমি এখন নতুন সংসার পেতেছি। যা পরের প্রজন্মের। সৃষ্টকর্তার কাছে একটাই ফরিযাদ রমজানে দোয়া প্রার্থনায় ভালো থাকুক সব প্রজন্ম। সবাইকে রমজান মাসে সংযমী হবার তৌফিক দান করুন আল্লাহ।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)।