চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

এক অর্জনে আরেক আক্ষেপ ভুলেছেন সুপ্তা

‘১৩০ নট আউট, এটাও আমার কাছে কম না’

প্রথম বল থেকে শেষ পর্যন্ত লড়াই। মেয়েদের ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটার হিসেবে পা রাখা সেঞ্চুরির চৌকাঠে। কিন্তু প্রতিপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়ানডে স্ট্যাটাস’ না থাকায় শারমিন আক্তার সুপ্তার অর্জন আন্তর্জাতিক রেকর্ডে বিবেচিত হয়নি।

তাতে অবশ্য একদমই হতাশ নন টাইগ্রেস ওপেনার। আইসিসি ইভেন্টে ১৩০ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলার তৃপ্তির পর আক্ষেপ সেভাবে ছুঁতে পারেনি ওয়ানডেতে বাংলাদেশের প্রথম ফিফটির রেকর্ড গড়া ক্রিকেটারকে।

ওয়ানডে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করে জিম্বাবুয়ে থেকে দেশে ফেরা বাংলাদেশ নারী দলের ক্রিকেটাররা রয়েছেন পাঁচ দিনের হোটেল কোয়ারেন্টাইনে। মুঠোফোনে চ্যানেল আই অনলাইনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সু্প্তা কথা বললেন বাংলাদেশের পরের ধাপের চ্যালেঞ্জে সফল হওয়ার পথ নিয়েও।

কোয়ারেন্টাইন কেমন কাটছে?
সুপ্তা: আমরা যেখান থেকে এসেছি সেখানে করোনা পরিস্থিতি তেমন ভালো না। আফ্রিকা অঞ্চলে নতুন ভ্যারিয়েন্টের কারণে আমাদের খেলাটা স্থগিত হয়েছে। হঠাৎ করে দেশে ফেরা টুর্নামেন্ট শেষ না করে, এজন্য একটু মন খারাপ লাগছে। কোয়ারেন্টাইন দেশে এসে পালন করতে খুব একটা যে খারাপ লাগছে তা বলব না। সবচাইতে বড় ব্যাপার কোয়ারেন্টাইন করায় পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে পারব। সময়টা যাচ্ছে এটা ভেবে যে আমাদের জন্য পরিবারের কোনো ক্ষতি হবে না। এখানে ছোট্ট একটা ভুলের জন্য অনেক বড় কিছু হতে পারে। তেমন একটা কষ্ট হচ্ছে না, খারাপও লাগছে না। কারণ দীর্ঘদিন বায়ো বাবলে থাকতে থাকতে বলতে পারেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসটি ছিল ৭৫ রানের। সেটি ছাপিয়ে আপনার ১৩০ রানের অপরাজিত ইনিংস। তিনঅঙ্ক ছোঁয়ার অনুভূতি কেমন ছিল?
সুপ্তা: অন্যান্য স্কোর থেকে ভিন্ন। কারণ সেঞ্চুরি তো অনেকসময় অনেক ভালো ইনিংস খেললেও পাওয়া যায় না। সেঞ্চুরি জিনিসটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেঞ্চুরি যখনই করি প্রিমিয়ার লিগে কিংবা অন্যকোনো জায়গায়, সেটি মধুর স্মৃতি হয়ে জমা থাকে। অন্যান্য স্কোর থেকে এটি অবশ্যই এগিয়ে থাকবে।

বিজ্ঞাপন

ছেলেদের ক্রিকেটে প্রথম সেঞ্চুরিয়ান মেহরাব হোসেন অপি। তার নামটা বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে জড়িয়ে থাকবে চিরকাল। আপনার নামও সেভাবেই থাকতে পারত যদি সেটি আন্তর্জাতিক রেকর্ড হিসেবে গণ্য হতো। কিছুটা আক্ষেপ নিশ্চয়ই আছে?
সুপ্তা: আমার কাছে খুব একটা হতাশা কাজ করেনি। আমি আসলে এটা বিশ্বাস করি নসিবে থাকলে যেকোনো জিনিসই হবে। আর ‘১৩০ নট আউট’ এটাও আমার কাছে কম না। কারণ আইসিসি টুর্নামেন্টে প্রথম কোনো সেঞ্চুরি। এটাও আমার কাছে বড় অর্জনই। বাংলাদেশের প্রথম হাফ সেঞ্চুরি করেছিলাম। সেক্ষেত্রে তো স্বপ্নটা আছে প্রথম সেঞ্চুরিয়ান হওয়ার। বড় দলের বিপক্ষে করলে হয়ত বেশি ভালো লাগবে।

জিম্বাবুয়েকে সিরিজে হোয়াইটওয়াশের পর সেই ধারাবাহিকতায় বাছাইপর্বে প্রথম দুই ম্যাচ যেভাবে খেলেছেন, তাতে মনে হয়েছে এই দল হারতে জানে না, থাইল্যান্ডের কাছে হারের কারণ কী?
সুপ্তা: আবহাওয়া, উইকেট, কন্ডিশন ফ্যাক্ট ছিল। যদিও এসব দোষারোপ করাও বোকামি। থাইল্যান্ড পার্টিকুলার ওই দিনটায় ভালো খেলেছে। টিম স্পিরিট আমাদের একই ছিল। বৃষ্টিতে খেলা বন্ধ না হলে আমরা জিততেও পারতাম! হারের পরও মনোবল আমরা হারাইনি। সবাই সবার সঙ্গে কথা বলেছি, আত্মবিশ্বাস ছিল পরের ম্যাচ থেকেই ঘুরে দাঁড়ানোর ব্যাপারে। মাঝপথে বাছাইপর্ব স্থগিত না হলে আমরা আরও নিজেদের মেলে ধরতে পারতাম।

বাছাইপর্বের মাঝপথে যখন জানলেন প্রথমবার ওয়ানডে বিশ্বকাপে খেলা নিশ্চিত, কেমন লেগেছিল?
সুপ্তা: মাত্র আটটি দল খেলে সেখানে নিজেদের স্থান দেখতে পারাটা অনেক আনন্দের। আর সেখানে পাঁচ নম্বর র‌্যাঙ্কিং নিয়ে আমরা যাচ্ছি, এটা অনেক বড় ব্যাপার। সব থেকে আনন্দের দিনের মধ্যে একটি। অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো না।

পাঁচ নম্বর র‌্যাঙ্ক ধরে রাখা কতটা কঠিন হবে সামনে, যখন বড় বড় দলের সামনে পড়বেন?
সুপ্তা: বিশ্ব ক্রিকেটে টপ ফাইভ যদি দেখেন, তাদের সবকিছুই ভিন্ন। অন্য একটা লেভেলের। সুযোগ-সুবিধা বলেন, পরিকল্পনা বলেন, পেশাদারিত্ব বলেন, সবক্ষেত্রেই এগিয়ে। যদি ওই লেভেলে যেতে চান বা টিকে থাকতে চান তাহলে সবকিছুই আপডেট করতে হবে। খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে আপডেট করতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি ওই লেভেলে খেলার মতো যোগ্যতা আমাদের আছে এবং আমরা আগে যা খেলেছি তার চেয়ে বেশি ভালো ক্রিকেট খেলতে হবে। তা না হলে ওই লেভেলে খেলাটা সাময়িক হয়ে যাবে। দীর্ঘস্থায়ীভাবে থাকার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে আগাতে হবে। বিশ্বাস করি বিসিবি আমাদের নিয়ে অনেক চিন্তা করছে। শেষ দুই বছর করোনো মধ্যেও বিসিবি আমাদের নিয়ে যেভাবে এগিয়েছে, আমার শতভাগ বিশ্বাস যারা দায়িত্বে আছেন সুন্দরভাবে পরিকল্পনা করছেন। আমরা খেলোয়াড়রা আমাদের জায়গা থেকে চেষ্টা করবো বাস্তবায়ন করার জন্য।

পারফর্ম করেও ২০১৭ সালে আপনি ভারত সফরের দল থেকে বাদ পড়েছিলেন। দুই বছর জাতীয় দলের বাইরে ছিলেন। কীভাবে নিজেকে ফেরালেন?
সুপ্তা: দেশের হয়ে খেলতে না পারাটা আক্ষেপের। খারাপ লাগা কাজ করে। সব থেকে বড় ব্যাপার মানসিকভাবে শক্ত হওয়াটা জরুরি ছিল। সালাউদ্দিন স্যার সবসময় সহযোগিতা করেছেন। ক্রিকেট নিয়ে অনেক কথা হতো তার সঙ্গে। আমি ক্রিকেট দেখা অনেক পছন্দ করি। ছেলেদের ক্রিকেট, মেয়েদের ক্রিকেট। যখন দর্শক হিসেবে ক্রিকেট দেখবেন, খেলোয়াড় হিসেবে কী করা উচিত শিখবেন। সালাউদ্দিন স্যারের সঙ্গে সম্পর্ক পরিবারের মতো। বিকেএসপিতে কাজ করেছি, মাসকো-সাকিব একাডেমিতে স্যারের অধীনে কাজ করেছি। সে সুযোগটা আমাকে করে দিয়েছেন। বিকেএসপিকে ধন্যবাদ। স্যার বলতেন পারপাস ছাড়া কোনো কাজ করে লাভ নেই। মানসিকভাবে যেখানে থাকব খেলাও সেখানেই থাকে। কোয়ালিটি প্র্যাকটিস বড় বিষয়। তিনি সবসময় বলেন, যে জিনিসটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তা হল সাহস। টেকনিক তো সবার মধ্যেই থাকে। একজনের টেকনিক একেকরকম। বিরাট কোহলি অনেক বড় খেলোয়াড়, বাবর আজমও অনেক বড় খেলোয়াড়, কেউ কারো টেকনিক ফলো করে না। স্যার সবসময় সব ক্রিকেটারকেই বলেন, সাহসটা যেন থাকে। খেলার জন্য যেন না খেলি। পারপাসটা যেন টিমের জন্য থাকে। টিমমেট হিসেবে খেলতে পারি। ১ রান করি বা ১০০ রান করি, দলের জন্য খেললে পজিটিভ ভাইব আসে, তখন খেলাটা সহজ হয়ে যায়। অভিভাবক হিসেবে সব ধরনের সহযোগিতা করেছেন সালাউদ্দিন স্যার। তার ইতিবাচক কথায় আশাবাদী হয়েছি।

ওপেনিংয়ে একটা সময় ধুঁকত বাংলাদেশ। সেটি কাটিয়ে উঠছে মেয়েদের ক্রিকেটে। কয়েকবছর ধরে মুর্শিদা খাতুন খুব ভালো করছে। যে ম্যাচে সেঞ্চুরি করলেন সেখানে ওপেনিং জুটিও প্রায় শতরানের।
সুপ্তা: ২০১৭ সাল থেকে মুর্শিদা খেলছে। ৪-৫ বছর হয়ে গেছে। ওর যে খেলার ধরন নতুনদের মধ্যে গত চার পাঁচ বছরে যারা খেলেছে তাদের মধ্যে সবচাইতে প্রতিভাবান ও সম্ভাবনাময়। যেকোনো দলের বিপক্ষে ওপেনিং জুটিতে আমাদের ভালো খেলার সম্ভাবনা আছে। আমার কাছে মনে হয় যে প্রস্তুতি নিয়ে জিম্বাবুয়ে গিয়েছিলাম তার শতভাগ দিতে পারিনি। আরও ভালো কিছু দিতে পারি আমরা। ভালো করার তো শেষ নেই। চেষ্টা করছি যেন ধারাবাহিকভাবে আমরা ওপেনিংয়ে ভালো করতে পারি। দলের সবকিছু মিলে একটা পরিবর্তন আসছে। ভালো করার তাগিদ সবার মধ্যে রয়েছে। কম্বিনেশন যদি দেখেন, আমার দেখা মেয়েদের সেরা দল এটি। আমাদের অনেক দূর যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরবর্তী ধাপে যাওয়ার শুরুর পথে দাঁড়িয়ে আমরা।

বিজ্ঞাপন