চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

এক্সট্র্যাকশন: গল্পের গরু আকাশে ওড়ে

ফিকশনকে যারা প্রচণ্ড গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবের সঙ্গে মেলাতে চাচ্ছেন, তাদেরকে এমন দাবি কতোটা যৌক্তিক তা ভেবে দেখার অনুরোধ রইলো…

গল্পে তো কতো কিছুই হয়, হতে পারে। গল্পে নাকি গরু আকাশেও উড়তে পারে! আর সেই গল্প নিয়ে যদি সিনেমা নির্মিত হয়, তাহলে আকাশে গরু ওড়ার দৃশ্য দর্শকরা বড় পর্দাতেও দেখতে পারবেন। মূলত-গল্পের গরু আকাশে ওড়ে- বিষয়টি রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে কল্পনাতে অনেক রকমের কাণ্ডই ঘটতে পারে।

যিনি গল্প লেখেন এবং যে গল্পটি বাস্তব ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত নয়, যা কি না সম্পূর্ণ কল্পনাপ্রসূত, একেবারেই গল্পকারের ভাবনা- সেটাইতো ফিকশন। আর সেই গল্প থেকে সিনেমা নির্মিত হলে সেটাইতো ফিকশনাল সিনেমা। এই ধরনের সিনেমা দেখতে অধিকাংশ দর্শকই পছন্দ করেন। বাংলাদেশের ‘ঢাকা অ্যাটাক’, ‘আয়নাবাজি’, বলিউডের ‘কৃষ’, ‘দাবাং’, দক্ষিণ ভারতের ‘মাগাদিরা’ কিংবা হলিউডের ‘অ্যাভেঞ্জার্স’ সবই তো ফিকশন!

বিজ্ঞাপন

ফিকশন গল্পে ও সিনেমায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- কোনো ব্যক্তি, স্থান, কাল ও পাত্রের যে ঘটনা বা পরিস্থিতি দেখানো হচ্ছে, সেই ঘটনা বা পরিস্থিতির সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল থাকে না। আর তাই তামিল, বলিউড, হলিউড এমনকি বাংলাদেশের সিনেমার নায়ককে অনেক অসম্ভব কাণ্ড করতে দেখা যায়। এমনকি কোনো স্থান, কাল ও পাত্র সম্পর্কে যদি বাস্তব থেকে ভিন্ন চিত্র বা তথ্য দেখানো হয়, তাই সত্য বলে মনে করার কোনো কারণ নেই।

বিজ্ঞাপন

যেমন ধরুন শাকিব খান অভিনীত ‘সম্রাট’ ছবিটি। যেখানে দেখা যায় শাকিব খান অভিনীত চরিত্রটি থাইল্যান্ডে বসেই ঢাকার চোরাকারবার সামলায়। মিশা সওদাগর যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন, সেও মাদক-অস্ত্র ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আয় করার মনোবাসনা রাখেন। কিন্তু আদতে কী বাংলাদেশের পরিস্থিতি এমন? দেশের আইন ও শৃঙ্ক্ষলা কি এতই দুর্বল?

এবার আসা যাক এক্সট্র্যাকশন ছবিটির ব্যাপারে। গত ২৪ এপ্রিল নেটফ্লিক্সে মুক্তি পায় ছবিটি। যেখানে বাংলাদেশ এবং ঢাকা শহরের নামের সম্পৃক্ততা রয়েছে। দৃশ্যের মাধ্যমেও ঢাকাকে বোঝাবার চেষ্টা রয়েছে। মুক্তির পরপরই শোরগোল উঠেছে যে, সিনেমাটিতে বাংলাদেশ বা ঢাকা শহরকে ভালো করে নয় বরং ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিবিসি বাংলা- এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছে।

ছবিটির অনেক দুর্বল দিক-গল্প, চিত্রনাট্য, সংলাপ- নিয়ে বিশ্লেষকেরা এরইমধ্যে আলোচনা করেছেন। দর্শকদের মধ্য থেকেও অনেকে সুন্দর যুক্তি উপস্থাপন করেছেন দুর্বলতা নিয়ে। কিন্তু ফিকশন ব্যাপারটাকে যারা প্রচণ্ড গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবের সঙ্গে মেলাতে চাচ্ছেন, তাদেরকে এমনটি না করার এবং না ভাবার অনুরোধ রইল।

ফিকশনে শুধু ঢাকা কেন আমেরিকা, লন্ডন, রাশিয়া, চীন, জার্মান, সব শহর ও দেশকে কুপোকাত করে দেয়া সম্ভব। হলিউডের বিভিন্ন ছবিতে এগুলো দেখাও যায়। তা না হলে জোকারের মতো ভিলেন সেখানে ঘুরে বেড়ায় কীভাবে?

এছাড়াও এক্সট্র্যাকশনে ঢাকার আইন ও শৃঙ্খলা যেভাবে দেখানো হয়েছে তা কেবল ফিকশন বলেই সম্ভব। এখানে গল্পের মধ্যেকার যে বাস্তবতা তার সঙ্গে প্রতিটি ঘটনার যোগসূত্র কতটা যৌক্তিক ও মজবুত সেটা দেখাই বেশি জরুরী। বাস্তবে সেই ঘটনা কীভাবে ঘটে তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার অবকাশ ফিকশনে নেই।

ভারতে নির্মিত ‘সাহো’ সিনেমার একটা উদাহরণ টানা যেতে পারে। একজন গ্যাংস্টার যিনি, ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নিজের অবৈধ কাজ বিস্তার করে রেখেছেন। ছবিতে যে তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে তা বিশ্বাস করার কোনো কারণ ও যৌক্তিকতা নেই। এমনকি এও মনে করা ও বিশ্বাস করা যাবে না যে ভারতসহ ঐদেশগুলো মন্দ কাজের আখরা। গল্পটি তৈরি করা হয়েছে ফিকশন আকারে। এখন এই ফিকশন যদি কারো ভালো লাগে তো ভালো, না হলে খারাপ।

একইভাবে এক্সট্র্যাকশনে বাংলাদেশ, দেশের আইন-শৃঙ্ক্ষলা বাহিনীর যে নমুনা দেখানো হয়েছে তা দেখে বিমর্ষ হওয়া অযৌক্তিক। এই ঘটনা কোনো সরকারি দপ্তরে রেকর্ড হবে না। বরং বাস্তবতা অনেক কঠিন ফিকশনের চেয়ে। যেমন হলি আর্টিজেন।

তবে হ্যাঁ, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাকে কেন গল্পের প্লট হিসেবে ব্যবহার করা হলো-সেটি নিয়ে অনেক আলোচনা এবং রাজনীতির বিশ্লেষণ হতে পারে। দেশের নামকরা নির্মাতা মাসুদ হাসান উজ্জ্বল এরইমধ্যে ‘এক্সট্র্যাকশন: কনটেন্ট বাণিজ্যের নগ্ন রাজনীতি’ শিরোনামের একটি লেখাও লিখেছেন। সেখানে তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেছেন কনটেন্টের বাণিজ্যটা কীভাবে হয় এবং ঢাকাকে নিয়ে তা কীভাবে হয়েছে। অনেকে যারা মনে করছেন যে, এক্সট্র্যাকশন টিমের গবেষণা কম- তারা কেন ভুল ভাবছেন, তার উত্তরও পাবেন মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের লেখা থেকে।

এছাড়াও চ্যানেল আই অনলাইনে প্রকাশিত সংবাদে বলা হচ্ছে, ‘বাংলাদেশ ও ভারতের প্রেক্ষাপট নিয়ে হলিউডের এই ছবির পেছনে প্রধান উদ্দেশ্য নেটফ্লিক্স-এর বাজার দখল! আরো খোলাসা করে বলতে গেলে, বাংলাদেশ ও ভারতকে টার্গেট করে নেটফ্লিক্স তার বাণিজ্য বিস্তারের সুদূরপ্রসারী বীজের ফসলই হলো ‘এক্সট্র্যাকশন’!’

তাই বাণিজ্য, কনটেন্ট রাজনীতি এমনকি এক্সট্র্যাকশন ছবির বৈচিত্র‌্যময় অ্যাকশন দৃশ্য নিয়ে কথা হতে পারে। বিশ্লেষণ করা যেতে পারে যৌক্তিক কারণ। কিন্তু ফিকশনাল গল্পে কেন ঢাকাকে মন্দভাবে উপস্থাপন করা হলো? আইন শৃঙ্খলার কোনো তোয়াক্কা কেন করা হলো না? এসব প্রশ্ন তোলা বা এসব ভেবে মনে মনে কষ্ট পাওয়া বোকামিই হবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)