চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

একুশের প্রেক্ষাপটে সিনেমা নির্মাণ কতোটা সম্ভব?

একুশ আমাদের জাতীয় চেতনা, ভাষা চেতনার মহান অংশ। খুবই মর্মবেদনার স্টোরি আছে এতে। আছে সিনেমার প্রচুর উপাদান। কিন্তু কেন একুশ নিয়ে সিনেমা নির্মাণ হয় না, এর ব্যাখ্যা দেয়া খুব কঠিন। কিছু কারণের একটা কারণ হলো, যারা সিনেমায় লগ্নি করেন- হয়তো আমাদের মত নির্মাতারা একুশের গল্পটা সেইভাবে বা সেই ভাবনাটা তাদের মধ্যে জারিত করতে পারেন না। তারা হয়তো বোঝাতে পারেন না এই এই ভাবে একুশ নিয়ে একটা সিনেমা নির্মাণ করা যেতে পারে!

দ্বিতীয় কারণ হলো, একুশের ইতিহাস সেটা যদি কেউ রিসার্চ করতে যায়, বদরুদ্দিন ওমর থেকে শুরু করে। অনেক ইতিহাসে কিছু তথ্য তালাশ করলে দেখা যাবে যে কিছু ঘটনার সত্যতা আছে, আর কিছু ঘটনা মনগড়া বা বানানো। এখন ইতিহাসের একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে যদি একটি গল্প নির্মাণ করতে যান, তাহলে এটা নিয়ে যে পরিমাণ রিসার্চ করতে হবে যে পরিমাণ পড়াশোনা কিংবা এর পিছনের সময় দিতে হবে, হয়তো কমার্শিয়াল নির্মাতারা সেই পরিমাণ পরিশ্রম, সেই পরিমাণ গবেষণা করার ইচ্ছাটা তারা রাখে না, বিধায় একুশ নিয়ে সিনেমা নির্মাণে সবার এক ধরনের অনীহা আছে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

বলতে গেলে একুশ নিয়ে সিনেমা আমাদের হয়ইনি। নাই বলতে গেলে। কিংবা দেখা গেল একুশ নিয়ে একটা গান আছে কোনো সিনেমায়, কিংবা একটু প্রভাতফেরী থাকলো- এতোটুকুই। তবে জহির রায়হান সাহস করে একটু বেশি দেখিয়েছেন, এটুকুই। বাকিটা আমাদের সিনেমায় আসেনি। জহির রায়হান কিন্তু একুশ নিয়ে তার নিজের গল্পেই একটি সিনেমা বানাতে চেয়েছিলেন কিন্তু শেষে তিনি পিছিয়ে এলেন, কেন পিছিয়ে গিয়েছিলেন সেই ইতিহাস আমরা জানি না।

কিন্তু আমি মনে করি একুশ নিয়ে আমাদের গল্প নির্মাণ হওয়া উচিত, গল্প হওয়া উচিত। ২০১৯ সালের দিকে প্রথম আলো একুশ এর উপরে গল্প লেখার আয়োজন করে। তারমধ্যে জ্যোতিপ্রকাশ, সেলিনা আপাদের (সেলিনা হোসেন) মতো অনেকেই গল্প লিখেছেন। খুব ভালো ভালো সেসব গল্প।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু ভালো গল্প থাকলেই যে সিনেমা নির্মাণ করা যায়, তা কিন্তু না। সিনেমায় অর্থ শক্তি বলে একটা কথা আছে, এটা ছাড়া আপনি কিছু চিন্তা করতে পারবেন না। এই অর্থ শক্তির জোগান দেন প্রযোজকরা, সেখানে বাংলাদেশের পেক্ষাপটে একুশ নিয়ে তাদের উৎসাহ তৈরি করা খুব কঠিন। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, সেই সময়ের ঢাকা, সেই সময়ের একুশে ফেব্রুয়ারির যে প্রেক্ষাপট, পথঘাট, কৃষ্ণচূড়া- এমনকি কস্টিউম থেকে শুরু করে সবকিছু- খুবই কঠিনসাধ্য।কারণ এরজন্য প্রয়োজন বিশাল ফান্ডের। বিরাট আয়োজন ছাড়া সেই সময়কে তোলে ধরা সম্ভব না, সাপোর্ট কে দেবে? সেসময়ের অন্তত তিন হাজার পুলিশ, কাভার্ডভ্যান লাগবে, কেউ সাহস করতে পারবে না ব্যক্তিগতভাবে।

তারমানে পিরিয়ডিক্যাল বা ঐ সময়কার প্রেক্ষাপটে পৃথিবীতে কি সিনেমা হচ্ছে না? অবশ্যই হচ্ছে। প্রথম বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার গল্পগুলো নিয়ে বিশাল আয়োজনে এখনও সিনেমা হচ্ছে। আমরা দেখছি ওরা বিশাল এলাকায় সেট নির্মাণ করে ছবি করছে। তো সেটা কি আমাদের দ্বারা সম্ভব? হ্যাঁ, সেটাও সম্ভব- যদি সরকার উদ্যোগী হন একুশ নিয়ে সিনেমা নির্মাণের। নাহলে নয়। এই দেখেন, আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা করতে গেলেই কাঠের রাইফেল দেখাতে হয়! সেটা হয়তো চাষী সাহেব (চাষী নজরুল), মাসুদ রানা কিংবা খসরুরা ছিলেন বলে ‘ওরা এগারো জন’ কিংবা ‘সংগ্রাম’ সিনেমায় আমরা রিয়েল বিষয় দেখতে পেরেছি, তাদের পরবর্তী সময় আর কেউ সেটা পারেনি। এমনকি তানভীর মোকাম্মেল সাহেবও না। তাকেও মুক্তিযুদ্ধের সময়ের প্রেক্ষাপটে নির্মিত কোনো দৃশ্যে এফডিসির সেই কাঠের রাইফেলই দেখাতে হয়েছে। লং শটে নেয়ায় হয়তো সেগুলো কেউ ধরতে পারছে না। তো পিরিয়ডিক্যাল সিনেমা বিরাট আয়োজন ছাড়া আসলে পসিবল না।

লেখক: মতিন রহমান, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও শিক্ষক 

অনুলিখন: মিতুল আহমেদ