চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

একালের ইমদুরা কী বিপদ ডেকে আনবে?

আপনাদের কি ইমদু নামটি মনে আছে? ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এইচ এম এরশাদের ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার করা হয়েছিল গাজীপুর জেলার কালিগঞ্জের এই সন্ত্রাসীকে। তখন প্রেসিডেন্ট পদে আসীন বিচারপতি আবদুস সাত্তার। জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের কয়েক মাস পর তিনি বিএনপির মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন ড. কামাল হোসেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফেরেন ১৭ মে, ১৯৮১। দলের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর দ্রুতই তিনি দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। প্রায় ৬ বছর আগে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডে বিপর্যস্ত আওয়ামী লীগে নতুন প্রাণ সঞ্চারিত হয়। জিয়াউর রহমান ৩০ মে চট্টগ্রামে দলীয় বিরোধ মেটাতে গিয়ে নিহত হন। এইচ এম এরশাদ তখন সেনাবাহিনী প্রধান। তিনি জিয়াউর রহমানের উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে ক্ষমতা সংহত করতে পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করেন। তার প্রত্যক্ষ ভূমিকার কারণেই বয়োবৃদ্ধ এ ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পেয়েছিলেন। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাজও তার পক্ষে করা হয়েছিল। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরপরই ক্ষমতা দখলে নিলে ‘খুনি’ বদনাম কপালে জুটতে পারে, সে বিষয়ে সচেতন ছিলেন তিনি। এ জন্য কিছুটা সময় চাইছিলেন। এ জন্য বিচারপতি সাত্তারের চাইতে উপযুক্ত ব্যক্তি আর কে-ই বা হতে পারেন।

তারপরও অজুহাত চাই ‘নিজ দেশ দখলের’। পাকিস্তানের আইয়ুব খান এবং বাংলাদেশের জিয়াউর রহমান একই পথে চলেছেন। রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারকে যে জাতীয়তাবাদী যুবদল নেতা ও যুব প্রতিমন্ত্রী আবুল কাসেম ‘পিতা’ বলে সম্বোধন করতেন, তার বাসসভবন থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ইমদু নামের টপটেররকে। এর আগেই এইচ এম এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতায় সেনাবাহিনীর সরাসরি হিস্যা চাই দাবি তুলে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। দেশ সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণয় হয়েছে, মন্ত্রীর বাসায় নিরাপদ আশ্রয় মেলে সন্ত্রাসীদের এমন পরিবেশে সামরিক শাসন ছাড়া উপায় কী? রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাত্তারও প্রকাশ্যে বললেন বিএনপি নেতা ও কর্মীদের অনেকেই দুর্নীতিবাজ। দলটি দেশকে ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে এসেছে।
এটা ওপেন সিক্রেট ছিল যে ‘ইমদু নাটকের’ পেছনে এইচ এম এরশাদের হাত ছিল। তবে তাকে বাহবা দিতে হয় সময়ের কাজটি সময়মতো করতে পারার কারণে। এক ইমদুকে ব্যবহার করে আন্ডারওয়ার্ল্ড তছনছ করে বিএনপিকেও দুর্বল-হতাশ করতে পেরেছিলেন তিনি। আমরা জানি, তার শাসনামলেও অনেক ইমদু তৈরি হয়েছিল। প্রবল গণবিক্ষোভের মুখে ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে ক্ষমতা ছাড়ার সময় তার দলের অনেক নেতা-কর্মী ভয়ে পালিয়েছিলেন। দুর্নীতি-অনিয়মই এর কারণ ছিল।

বিজ্ঞাপন

বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১-৯৬ সালে ক্ষমতায় থাকার সময় মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। সে সময়ে দলের এক বর্ধিত সভায় যুবদল নেতা গয়েশ্বর রায় বক্তব্য দিচ্ছিলেন। বক্তৃতা শেষ করার ঘণ্টা বাজালে তিনি বলে ওঠেন ‘ঘণ্টা বাজাইয়েন না। দুর্নীতি-অনিয়ম বেগম জিয়ার বিদায় ঘণ্টা বাজাইতেছে।’

প্রধানমন্ত্রী২০০১-২০০৬ সময়ের শাসনকালে হাওয়া ভবনের দুর্নীতি ছিল ব্যাপক আলোচনায়। এ ভবন ছিল বিএনপির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সরাসরি তত্ত্বাবধানে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি আমলে নেননি। উপরন্তু প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ শেখ হাসিনা ও তার দলকে চিরকালের জন্য দৃশ্যপট থেকে ছিটকে ফেলতে ২১ আগস্টের মতো ভয়ঙ্কর গ্রেনেড হামলারও অনুমোদন দেন তিনি। এসবের খেসারত তিনি দিয়েছেন, এটাই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত। এক যুগের বেশি ক্ষমতার বাইরে তার দল। ক্ষমতায় ফিরে আসার জন্য ২০১২-২০১৪ সালের দিকে গণআন্দোলনের ওপর জোর দেন। কিন্তু শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কৌশলের কাছে টিকতে না পেরে হঠকারিতার পথ ধরেন। গণআন্দোলনের পরিবর্তে প্রাধান্য পেয়ে যায় পেট্রল বোমা। রাজনীতিতে এ ধরনের ভুল সংশোধনের অযোগ্য হয়ে থাকে।

বিএনপির বিপর্যয়ের আরও একটি কারণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কেবল উপেক্ষা নয়, যারা চিরকালের জন্য বাংলাদেশকে এ পথ থেকে সরিয়ে দিতে চায় সেই আলবদর-রাজাকারদের দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে স্ট্র্যাটেজিক ঐক্য পড়ে তোলা। জেএমবি-নব্য জেএমবি কিন্তু এই অপশক্তির উত্তরসুরি। ত্রিশ লাখ মানুষের আত্মদানে অর্জিত বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অস্বীকার এবং জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে মুছে ফেলার অপচেষ্টা অব্যাহত রেখে গণতান্ত্রিক ধারায় রাজনীতি করা যায় না।

বিজ্ঞাপন

জিকে শামীম, ইসমাইল সম্রাট, খালেদ না-কি অন্য কেউ হয়ে উঠতে পারেন একালের ইমদু? বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোতে এখন প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকা জমা আছে। এক দশকে আমানত বেড়েছে প্রায় ৬ গুণ। কিছু ব্যক্তি বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে ফেরত দেয় না। খেলাপি ঋণের কলঙ্ক তাদের বিব্রত করে না। সরকারি কাজের ঠিকাদারি ব্যবসা থেকে যারা বিপুলভাবে লাভবান হচ্ছেন, তারাও বেপরোয়া। জাতীয় বাজেটের আকার বড় হচ্ছে। প্রবাস থেকে বছর বছর আসছে ১৪-১৫ শ’ কোটি ডলার। আমদানি-রপ্তানি খাত এখন যথেষ্ট বড়। ব্যাংকে এক কোটি টাকা বা তার বেশি অঙ্ক জমা রাখা ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় এক লাখ। এমন বাস্তবতায় কারও বাড়ির ভল্টে কিংবা অন্য কোনো আস্তানায় ৫-১০ কোটি টাকা মেলা অস্বাভাবিক কিছু নয়। গ্রামের ছাত্রনেতারাও তো ৫ লাখ টাকার মোটর সাইকেল দাপিয়ে বেড়ায়! এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে সহ-অংশগ্রহণকারীকে দেখেছি চারজন ‘গানম্যান’ নিয়ে হাজির হতে। তিনি আলোচনায় পারদর্শী, এমন নয়। কিন্তু টক-শোয়ের আয়োজকদের কাছে কদর আছে সেটা বুঝতে সমস্যা হয় না।

কয়েকদিন ধরে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে চলমান শুদ্ধি অভিযান কি রাজনৈতিক? নাকি ‘অনৈসলামিক’ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে? মদ-জুয়ার আখড়া বা পতিতালয় ভাঙার অভিযান তো কম দেখিনি। উন্মত্ত জনতা পতিতাদের তাড়াচ্ছে, এমন ছবি সংবাদপত্রে এসেছে। রেইন-ট্রি হোটেলে নারী নির্যাতনের সুবাদে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান বেশি দিনের পুরানো ইস্যু নয়। ইয়াবা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান হয়েছে একাধিকবার। টেন্ডারবাজিতে যুক্তরাও মাঝেমধ্যে সতর্কবার্তা পেয়েছে। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে যে শাসক দলের দলীয় অফিসে নেতা-কর্মীদের ভিড় থাকে না, যিনি সরকারি কাজ বণ্টন করার ক্ষমতা রাখেন তার বাসা বা অফিস লোকে লোকারণ্য। ব্যবসা করা অপরাধ নয়। ব্যবসায়ে অনিয়ম-দুর্নীতিও কমবেশি সব দেশে স্বীকৃত। কিন্তু মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে বিপদ। ইমদু-শামীমদের অভ্যুদয় সেটাই জানান দেয়।
এ কালের ইমদুরা রাজনৈতিক ক্ষমতা চায়। সংসদে কিংবা ন্যূনমভাবে স্থানীয় সরকারের পদ চায়। মানি-মাসেলের জোরে জয়ী হওয়ার কৌশল তাদের জানা। দলের পদও চায়। গঠনতন্ত্রে কী আছে, সেটা দেখার দরকার কী? নিজের জন্য মূল দল বা অঙ্গ সংগঠনের নামে একটি পদ লিখে নিলেই হলো। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের একবার কেন্দ্রীয় কমিটির ‘সহসম্পাদক’ পদধারীদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ্যেই ব্যক্ত করেছিলেন।

সামনে দলের কেন্দ্রীয় সম্মেলন। জেলা-উপজেলা-ইউনিয়নেও সম্মেলন। ২০২০ সাল ‘মুজিব বর্ষ’। পরের বছর স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী। দলকে রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত করার জন্যই কি আগেভাগে এমন শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে? সেটা হয়ে থাকলে কত দূর যেতে চাইছে হাইকমান্ড? কিংবা কত দূর যেতে পারবে? ‘সুফলভোগী’ সংখ্যা নেহাত কম নয়, এটা ওপেন সিক্রেট। তারা বাধা দেবে। পরিস্থিতির সুযোগ বা মওকা নিতেও উৎসাহী মহলের অভাব হবে না। জনমত স্পষ্ট প্রধানমন্ত্রীর ওপর আস্থা আছে। তিনি দৃঢ় সংকল্পে এগিয়ে যাবেন, এটাই প্রত্যাশা। ‘বাঘে ধরলে রেহাই মিলতে পারে, শেখ হাসিনা ধরলে রক্ষা নাই। দেখেন নাই, ইউনুস সাহেব রক্ষা পান নাই’ সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এ কথা ঐশী বাণীর মতো মুখে মুখে ঘুরছে।
নির্বোধদেরও দেখা মিলবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বগুড়া শাখার কর্মকর্তাদের বাতিল নোট টুকরা টুকরা করে প্রকাশ্য স্থানে ফেলার পদক্ষেপকে এ ছাড়া আর কী-ই বা বলা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব ট্রাক আছে। পৌরসভারও ট্রাক আছে। কিন্তু কুচি কুচি করা টাকা ফেলা হয় ভাড়া করা ট্রাকে। ‘শুদ্ধি অভিযান’ চলাকালে ট্রাক বোঝাই ছেঁড়া টাকা সবাই দেখতে পেলে তার যে বিকৃত ব্যাখ্যা হবেই, সেটা বোঝার মতো বাংলাদেশ ব্যাংকে কি কেউ ছিলেন না? মতলববাজ সংবাদপত্র যে আছে, সেটা কেন বিবেচনায় ছিল না? বগুড়া পৌরসভাই বা কি করছিল? এ প্রতিষ্ঠানের মেয়র বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা। কোন সময়ে কোন কাজটি করতে হয়, সেটা জানতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বগুড়া পৌরসভা একসঙ্গে যদি বদমতলব নিয়ে কিছু করে থাকে?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View