চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

একাত্তরের ঈদ ও এক বছরে তিন ঈদ

হিজরি সনে এক বছরে দুটি ঈদ পড়ে রমজান ও কোরবানীর ঈদ। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা এভাবেও বলা হয়। খ্রিষ্ট্রীয় সন (যা ইংরেজি সন হিসেবেও আমাদের কাছে পরিচিত) হিজরি সনের চেয়ে ১০ দিন বেশি। জানুয়ারি মাসে প্রথম দশ দিনে যদি ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আজহা পড়ে, তাহলে বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরের শেষ ১০ দিনে আরেকটি ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আজহা পড়বে এটাই স্বাভাবিক। জানুয়ারির প্রথম ১০ দিনে ঈদুল ফিতর হলে তার দুই মাস ১০ দিন পর মার্চে ঈদুল আজহা পড়বে।

এটা ঘটে ৩২ বছর পর পর। ১৯৬৮ সালের ৩২ বছর ২০০০ সালে আমরা দুটি ঈদুল ফিতর ও একটি ঈদুল আজহা দেখেছি। আবার যে বছর জানুয়ারির প্রথম ১০ দিনের মধ্যে ঈদুল আজহা পড়ে, সে বছর দুটি কোরবানীর ঈদ এবং একটি ঈদুল ফিতর পালিত হয়।

বিজ্ঞাপন

আমার বিশেষভাবে মনে পড়ছে ১৯৬৮ সালের কথা। সে বছর তিনটি ঈদ পড়েছিল। ওই বছর আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। আইয়ুব খানের পতনের আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ের সূচনা ঘটে ওই বছরে। এ কারণে বছরটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে তার আগে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বছরের ঈদের কথা বলি। আমি কয়েক মাস আগেই সশস্ত্র যুদ্ধের ট্রেনিং নিয়েছি ত্রিপুরার পালাটানায়। সেখানে কুমিল্লা অঞ্চলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ঘটে। তখন আমাদের অবস্থান ছিল মেলাঘরে। কর্নেল খালেদ মোশাররফ, মেজর হায়দার, ক্যাপ্টেন মালেক সব পরিচিত নাম আমাদের পরিচালক। ঢাকায় একের পর সফল গেরিলা অভিযান চালিয়ে পাকিস্তানি হানাদারদের নাকানি চুকানি খাওয়ানো বিখ্যাক ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্যরাও আছেন সেখানে।

কয়েকদিন পর পড়াশোনার কারণে নতুন পরিচিত শহর ঢাকা, না-কি নিজ জেলা বরিশাল কোথায় হানাদারদের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধের জন্য যাব, সে অপসন চাইলে বরিশালের কথা বলি। এ কারণেই আমাকে চলে আসতে হয় সাতক্ষীরা সীমান্তের কাছাকাছি বাগুনদিয়া বা বেগুনদিয়া নামক স্থানে। শীতের আগমন বার্তার মধ্যেই এক বিকেলে পৌঁছাই সেখানে। পালাটানা-মেলাঘরের মতো এখানেও ভূমিশয্যা। কেউ কেউ আশপাশের বাড়ি থেকে ধানের খড় সংগ্রহ করে বিছানা বানিয়েছে। খাবার জোটে দু’বেলা, সঙ্গে সকালের নাস্তা। থালার সঙ্কটের কারণে ৪-৫ জনের জনকে এক থালায় খেতে হয়। ভাত, খিচুরি বা রুটির সঙ্গে সবজি কিংবা মাষকলাইয়ের ডাল। এমন খাবার পেয়েও আমরা খুশি থেকেছি।

এটাও বলে রাখি ১৯৭১ সালে ২১ দিন আমি সামরিক ট্রেনিং নিই। ট্রেনিং শেষে প্রতিদিন এক টাকা হিসেবে ২১ টাকা দেওয়া হয়। আর যুদ্ধ শেষে অস্ত্র জমা দিয়ে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরত আসি তখন পাই ৫০ টাকা। ১৯৭১ সালে আমার মোট উপার্জন ছিল ২১+৫০=৭১ টাকা। বিষয়টি কাকতালীয়, তবে এখনও এক ধরনের আনন্দ অনুভব করি।

বাগুনদিয়ায় আসার পরদিন থেকেই আমাদের সীমান্তের কাছে পাঠানো হতে থাকে ইছামতী নদীর অপর তীরে শত্র“কে টার্গেট করে মাঝেমধ্যে গুলি চালানো। এক বিকেলে ফল-ইন করানো হলো বড় একটি দলকে। তারপর মার্চিং অর্ডার এলো। ইছামতী নদী পার হয়ে বাংলাদেশের ভেতরে কয়েক কিলোমিটার গিয়ে কুলিয়া নামের একটি স্থানে পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান আমরা পরিচালনা করি।

প্রত্যক্ষ যুদ্ধে জয়ের অভিজ্ঞতা এটাই প্রথম। কয়েক হাত দূরেই পাকিস্তানি বাহিনী। যারা এ অভিযানে যেতে পারেনি, তাদের মন খারাপ। এ অবস্থাতেই এক দুপুরে আমাদের মাঠে বসিয়ে কলাপাতায় গরম ভাত পরিবেশন করা হয়। সঙ্গে এক টুকরা করে খাসির মাংস। কেন এ বিশেষ ভোজ, সে প্রশ্ন করায় উত্তর আসেÑ আজ ঈদ। ইংরেজি তারিখ ধরলে যত দূর মনে পড়ে ২০ নভেম্বর।

ঈদ রণাঙ্গনে, এ এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। অনেকেই অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়ে। বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ে, যাদের অনেকেই রয়েছেন হানাদার বাহিনী কবলিত মৃত্যু উপত্যকায়। কেমন আছে তারা?

ওই রাতেই আমাদের খাদ্য তালিকা আগের মতো মাষকলাই ডাল, সঙ্গে রুটি, ভারত বা খিচুরি। ঈদ যেতে না যেতেই আসে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশে সিদ্ধান্ত পাকিস্তানিদের সম্মুখ সমরে পরাজিত করার চূড়ান্ত সংকেত।

এবারে ১৯৬৮ সালের কথা বলি। জানুয়ারি মাসের প্রথম বা দ্বিতীয় দিনে ছিল ঈদুল ফিতর বা রমজানের ঈদ। আমি তখন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে ছিল কোরবানীর ঈদ। ছোটবেলা থেকেই বাবা আমাদের তিন ভাইকে সুজনকাঠি গ্রামে মজিবর রহমান চান মিয়া, নাজেম মুন্সি, আক্কেল আলী মুন্সি, আশরাফ সরদারসহ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির বাড়িতে ঈদ পালন করতে নিয়ে যেতেন। ওই বছর জানুয়ারি ও মার্চের দুই ঈদেও ব্যতিক্রম ছিল না। তৃতীয় ঈদ ডিসেম্বরে, তখন আমি ঢাকায়।

বিজ্ঞাপন

জুলাইয়ে পরীক্ষার ফল বের হয়। আমি ভর্তি হই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রসায়ন বিভাগে। পরিবারের স্বচ্ছলতা না থাকায় টিউশনি করেই ভর্তির টাকা সংগ্রহ করি। বৃত্তি পাব নিশ্চিত ছিলাম, কিন্তু সেটা পাওয়া যাবে এক বছর শেষে।

ক্লাস শুরুর কয়েকদিন পরেই অক্টোবরের শেষ দিকে আইয়ুব খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। জানুয়ারির প্রথম দিকে যেহেতু রোজার ঈদ ছিল, তাই ডিসেম্বর শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি রোজার ঈদ পড়েছিল। আমরা জানতে পারি, ঈদের ছুটির পরপরই ডিসেম্বরের ২৬ বা ২৭ তারিখ ক্লাস চালু হবে।

কিন্তু ডিসেম্বরের প্রথম দিকেই রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ন্যাপ নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানি ৬ ডিসেম্বর বিকেলে পল্টন ময়দানে জনসভা ডাকেন। আমি সে সভায় উপস্থিত ছিলাম। হিজরি ১৩৮৮ সনের ১৫ রমজান ছিল ৬ ডিসেম্বর, শুক্রবার। শীতের সময় দিন ছোট হয়। সভার শেষ দিকে মওলানা ভাসানি দুটি কর্মসূচি ঘোষণা করেন পল্টনের সভা শেষে পাশের লাটভবন বা গবর্নর হাউস ঘেরাও এবং পর দিন ৭ ডিসেম্বর ঢাকা শহরে হরতাল। তিনি রোজা রাখতেন। তিনি কী মঞ্চে ইফতার করেন? সেটা ঠিক স্মরণ করতে পারছি না। লাটভবন ঘেরাও করতে গিয়ে বিপুল সংখ্যক জনতা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। লাঠিচার্জ হয়, কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হয়। তারাবির নামাজ এবং তারপরেও দীর্ঘ সময় ঢাকার কেন্দ্রস্থলে চলে এ সংঘর্ষ।

পরদিন ৭ ডিসেম্বর ঢাকায় আমার জীবনের প্রথম হরতাল দেখার অভিজ্ঞতা। পুলিশের গুলিতে অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়। আমি নিজেও কাঁদানে গ্যাসের শিকার হই।

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান সে দিন ঢাকায় ছিলেন। হোটেল শাহবাগে (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির সমাবেশে তিনি অভিযোগ করেন বিরোধী দলগুলো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত রয়েছে।

মওলানা ভাসানি ছাড়াও আওয়ামী লীগসহ আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দল ৮ ডিসেম্বর হরতাল আহ্বান করে। মওলানা ভাসানি দুপুরের দিকে বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটের খোলা এলাকায় গায়েবানা জানাজা পড়ার চেষ্টা করেন। তার সঙ্গে ছিলেন পাকিস্তানের সাবেক এয়ার মার্শাল আসগর খান। পুলিশ কিছুতেই তাদের রাজপথে নামতে দেবে না। আশপাশে বিপুল সংখ্যক মানুষ তখন। আমিও ছিলাম সে দলে।

মাওলানা ভাসানি ১০ ডিসেম্বর রাজধানী ঢাকা বাদ রেখে পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য এলাকায় হরতাল ডাকেন। ১৩ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকে। হরতালের সময়সূচি বলা হয়Ñ সকাল থেকে ইফতার পর্যন্ত। সে দিন ছিল শুক্রবার, ২২ রমজান। হরতাল সমর্থনকারী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীও ছিল। আওয়ামী লীগ তাদের দাবির মধ্যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বাতিল, স্বায়ত্তশাসনের ছয় দফা মেনে নেওয়া এবং দলের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল রাজবন্দির মুক্তির দাবি সামনে আনে। তবে মওলানা ভাসানির দলসহ কয়েকটি দলের এ দাবি নিয়ে আপত্তি ছিল। তারা কেবল পার্লামেন্টারি ডেমোক্রাসি ও সাধারণ নির্বাচনের দাবি তোলে। এ দিনের হরতাল অভাবনীয়ভাবে সফল হয়। তখনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। হরতালের আগের দিন আমরা একদল ছাত্র তৎকালীন ইকবাল হলের ক্যান্টিনের সামনে সভা করে পরদিন কীভাবে পিকেটিং করা যায়, সেটা নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনের কারণে পিকেটিংয়ের তেমন দরকার পড়েনি।

হরতালের সময় মিছিল ও পিকেটিং করার অভিযোগে অন্তত এক হাজার লোককে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

২১ ডিসেম্বর ছিল হিজরি ১৩৮৮ সনের শাওয়াল মাসের প্রথম দিন। এ বছরের রমজান মাসে পূর্ব পাকিস্তানে পাঁচটি রাজনৈতিক হরতাল আহ্বান করা হয় । জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী, কাউন্সিল মুসলিম লীগ প্রভৃতি রাজনৈতিক দলও হরতাল আহ্বানের সঙ্গে ছিল। রমজান মাস, শুক্রবার- এ সব প্রশ্ন তারা তুলেছে বলে শুনিনি।

১৯৬৮ সালের ডিসেম্বরে মাওলানা ভাসানি পূর্ব পাকিস্তানের গ্রামাঞ্চলে ফের হরতাল ডাকেন। এ হরতালের দিন নরসিংদীর হাতিরদিয়া নামক স্থানে কৃষকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছিল। সে সময়ে মওলানা ভাসানির সমর্থক ও পরে বিএনপির মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূইয়া ছিলেন হাতিরদিয়ায় হরতাল সফল করার আন্দোলনের অন্যতম নেতা।

১৯৬৮ সাল শেষ হতে না হতেই শুরু হয় আইয়ুব খানের দুঃশাসন অবসানের চূড়ান্ত আন্দোলন। সামনে চলে আসে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ডিসেম্বরের আন্দোলনে সামনে ছিল রাজনৈতিক দল, কিন্তু জানুয়ারিতে সামনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদভুক্ত চারটি ছাত্র সংগঠন। আন্দোলনের কেন্দ্র ইকবাল হল ও মধুর ক্যান্টিন। প্রধান নেতা তোফায়েল আহমদ, ডাকসুর ভিপি। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা দাবি ছাত্র-জনতা গ্রহণ করে নেয়। তবে মানুষের কাছে মুখ্য দাবি হয়ে ওঠে শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বাতিলেল দাবি। প্রবল আন্দোলনের মুখে আইয়ুব খান মামলা প্রত্যাহার করে ২২ ফেব্রুয়ারি তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন। ২৩ ফেব্রুয়ারি তাকে অভিষিক্ত করা হয় বঙ্গবন্ধু হিসেবে। এর ঠিক দু’ বছর পর ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে তিনি বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। জনগণ তাকে অভিষিক্ত করে জাতির পিতার সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)