চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

একটি ভালো কাজেই হোটেলে জুটবে বিনামূল্যে খাবার

ভালো কাজের হোটেল

রাজধানীর কমলাপুর আইসিডি কাস্টম হাউসের পাশে গড়ে ওঠেছে ভালো কাজের হোটেল। এ হোটেলে খেতে কোনো টাকা লাগবে না শুধু করতে হবে একটি ভালো কাজ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভালো কাজে উৎসাহ জোগাতে শিশু ও বয়স্কদের মাছ-মাংস, ডিমসহ উন্নতমানের খাবার বিনামূল্যে তারা পরিবেশন করেন। ভবিষ্যতে কার্যক্রমের পরিধি আরও বাড়ানোর ইচ্ছা রয়েছে সংগঠনটির।

২০০৯ সালের দিকে কয়েকজন বন্ধু মিলে ‘ভালো কাজের বিনিময়ে একবেলা খাবার’ বিতরণ শুরু করেন। ২০১২ সালে সাংগঠনিক রূপ দিতে ফেসবুকে শুরু করেন ‘ইয়ুথ ফর বাংলাদেশ’ নামের প্ল্যাটফর্ম।

বিনামূল্যে এই খাবার মিললেও পূরণ করতে হয় একটি শর্ত, একটি ভালো কাজ করতে হবে। খাবার খেতে এসে যদি কেউ সেদিন কোনো ভালো কাজ করার কথা বলতে না পারেন, তাকেও ফিরিয়ে দেয়া হয় না। ভালো কাজ করার জন্য তাকে উদ্বুদ্ধ করা হয়, উৎসাহিত করা হয় পরদিন দুটি ভালো কাজ করতে। তারপর হাতে তুলে দেওয়া হয় খাবারের প্যাকেট।

সংশ্লিষ্টরা জানালেন, প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৭০০ মানুষের জন্য রান্না করি। খোলা ফুটপাতে অসহায় মানুষগুলো আসে, বসে এবং পেট ভরে খেয়ে যায় একটি ভালো কাজের কথা বলেই। শখ করে মাসে দু-একবার  খাওয়ালে চেয়ার টেবিল পেতে, সাজ সজ্জা করে খাওয়াতে পারতাম। কিন্তু পেট ভরানোটাই আমাদের মূল লক্ষ্য, সাথে কিছু ভালো কাজ করানো। তাই অন্যদিকে টাকা খরচ না করে সেই টাকায় কয়েকজন মানুষকে বেশী খাওয়ানোর চেষ্টা করি আমরা। ডিম খিচুরী, ভাত, ডিম, সবজি এবং সপ্তাহে দু’দিন চিকেন তেহারী খেয়েই তৃপ্তির ঢেকুর তুলেন আমাদের হোটেলে আসা অতিথিরা।

ভালো কাজের স্বেচ্ছাসেবকরা জানালেন, ‘‘এত মানুষের আয়োজন, কিন্তু নেই কোন তাড়াহুড়ো, বিশৃঙ্খলা কিংবা খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি। কারণ প্রতিদিনের ধারাবাহিকতায় তাদের অভ্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে পেরেছি আমরা। দোয়া করবেন যেন এভাবেই নিরবে কাজ চালিয়ে যেতে পারি আমৃত্যু।’’

বিজ্ঞাপন

ভালো কাজের হোটেলের সিনিয়র স্বেচ্ছাসেবক সাকিব হাসান শাওন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, দুস্থ, অবহেলিত মানুষ, ছিন্নমূল শিশুদের মুখে খাবাব তুলে দিতেই এই উদ্যোগ। আমাদের এখানে খাবার খেতে কোন টাকা লাগে না, শুধু শর্ত একটাই দিনে ‘একটা ভালো কাজ’ করতে হবে। তাহলেই মিলবে খাবার। মূলত সমাজে ভালো কাজ ছড়িয়ে দিতে ও তাদের দিয়ে ভালো কাজ করাতে এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ২০১২ সাল থেকেই ভালো কাজের বিনিময়ে আমরা খাওয়ানোর এ কার্যক্রম শুরু করি। ২০১৯ সালের ৫ ডিসেম্বর থেকে আমরা সপ্তাহে এক দিন করে খাওয়াতাম। পরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হলে প্রতিদিন খাওয়ানোর কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে রাজধানীর তিনটি পয়েন্টে বর্তমানে দুপুরে ও রাতে প্রতিদিন খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। দুপুর ১২টা থেকে আড়াইটার মধ্যে বনানী ১১ নাম্বারের কড়াইল বস্তিতে এবং দুপুর আড়াইটা থেকে চারটা পর্যন্ত পর এফডিসির পাশে হাতিরঝিল সড়কে। এছাড়াও রাতে প্রতিদিন সাড়ে ছয়টা থেকে সাড়ে নয়টা পর্যন্ত কমলাপুর রেলস্টেশনে খাবার বিতরণ করা হয়।

প্রতিদিন কী ধরনের ভালো কাজ বেশি থাকে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অন্ধ বা শিশুকে রাস্তা পারাপারে সহায়তা, রিকশা ভাড়া না নিয়ে অসহায় মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু বিশেষ করে কাচের টুকরো, ইট-পাথর, পিন সরিয়ে ফেলা এবং কাঁধে বোঝা বহন করতে কষ্ট হলে সহায়তা করার মতো অনেক ভালো কাজ করেন অনেকে।

শাওন বলেন, প্রতিদিন প্রায় ৭০০-৮০০ মানুষের জন্য খাবার রান্না হয়। সংগঠনটির ব্যাটারিচালিত একটি ছোট্ট ভ্যানগাড়ি আছে। রান্না শেষে এই ভ্যানগাড়ির মাধ্যমেই খাবারের প্যাকেট নিয়ে যাওয়া হয় ভালো কাজের হোটেলে, যেখানে আগে থেকেই অপেক্ষায় শতাধিক অসহায়-ছিন্নমূল মানুষ।

জানা যায়, খাবার দেওয়ার আগে তাদের নাম, বয়স, কী কী ভালো কাজ করল তা লিখে রাখা হয়। কেউ যদি মিথ্যা কথা বলে তাকেও ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। তাকে বোঝানো হয় সত্য কথা বলাও একটা ভালো কাজ। লিখে রাখা তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে তাদের উৎসাহ দেওয়া হয় ভালো কাজ করার।

ভালো কাজের হোটেলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে জানতে চাইলে সাকিব হাসান শাওন বলেন, ‘যদি সুযোগ হয় এই কার্যক্রম আরো বৃহৎ আকারে করার পরিকল্পনা আছে আমাদের। মূলত আমরা এই কাজটি করি আত্মতৃপ্তির জন্য, নিজেদের ভালো লাগার জন্য।’

বিজ্ঞাপন