চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘একজন হিরো শুধু ফাইট আর গান গাইবে তাতো হতে পারে না’

সম্প্রতি দেশের সিনেমা হলগুলোতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে সাধারণ দর্শক। কারণ, ‘ঢাকা অ্যাটাক’। টানা তিন সপ্তাহ দেশের প্রায় বেশীর ভাগ সিনেমা হলেই চলেছে ছবিটি। শোনা গেছে, ছবিটি বাণিজ্যও করেছে বিস্তর। আয়নাবাজির পর বাংলা সিনেমা নিয়ে দর্শকের এমন আগ্রহ দেখার মত। এই ছবিতে কোনো ‘নায়ক’ নেই, ছবির নায়ক মূলত কাহিনী! এমনটি বলা হলেও ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন চিত্রনায়ক আরিফিন শুভ। তখনো ‘ঢাকা অ্যাটাক’ মুক্তি পায়নি। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতে এফডিসিতে চলমান চিত্রনায়ক আলগীরের পরিচালনায় ‘একটি সিনেমার গল্প’-এর শুটিং নিয়ে এফডিসিতে ব্যস্ত ছিলেন শুভ। এক ফাঁকে চ্যানেল আই অনলাইনের মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। কথা বলেছিলেন ক্যারিয়ার, বাংলা চলচ্চিত্র আর একটি সিনেমার গল্প ছবিতে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে। এমনকি ‘ঢাকা অ্যাটাক’ ছবি নিয়ে যেরকম আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন, দেখা গেল ছবিটির মুক্তির তিন সপ্তাহ পরে এসে তা অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেল-

‘একটি সিনেমার গল্প’-তে এখন ব্যস্ত আপনি। তো এই সিনেমায় আপনার ইনভলপমেন্ট ও আলমগীর ভাইয়ের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন উপভোগ করছেন?
আমার ধারনা যে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি শিল্পী অসংখ্য কাজ করে। কিন্তু এই কাজটা এমন একটা কাজ, নিঃসন্দেহে আমি ভাগ্যবান। এইজন্য যে, এরকম একটা গল্পের প্লাটফর্মে আমি কাজ করতে পারছি। গল্পটা একদমই ট্রাডিশনাল নয়। আলমগীর স্যারের ডিরেকশান, উনাকে সহশিল্পী হিসেবে পাওয়া এবং ঋতুপর্ণার মতো এতো বড় শিল্পীর সঙ্গে অভিনয় সব মিলিয়ে দুর্দান্ত। আর আমাদের এখন যেরকম সিনেমা করছি বা হচ্ছে, এর মাঝখানে সবথেকে বেশী যেটা মিস করেছি আমার এই অল্প সময়ের ক্যারিয়ারে সেটা হচ্ছে অ্যাটমসফেয়ার। ইউনিট, লোক, অ্যাটমসফিয়ারটা অই টানটা খুব একটা আমি পাইনি। কিন্তু ‘একটি সিনেমার গল্প’ করতে গিয়ে সেই পরিবেশটা অুনভব করেছি। পুরো ইউনিটের মাঝখানে সেটা দেখিছি। গল্পে সবার যে ইনভলপমেন্ট সবকিছু মিলিয়ে খুব ভালো লাগছে। যে অল্প কয়টা সিনেমা করেছি, আমি এরকম খুব একটা আগে দেখিনি। অভার অল আমার মনে হচ্ছে, আমি যখন থাকবো না তখন ‘একটি সিনেমার গল্প’ নিয়ে হয়তো কথা হবে। এটা এরকম একটা কাজই আমার কাছে মনে হচ্ছে।

বর্তমানে আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে গল্প ও ভালো নির্মাতার অভাব বলেই মনে করছেন অনেকে। আপনিতো ঢাকাই চলচ্চিত্রে বেশ কয়েক বছর। এমনটা কি আপনি ফিল করছেন কখনো?
সত্যিকার অর্থে একজন অভিনয় শিল্পী যতো বড় আর ভালো শিল্পীই হোক না কেন, তাকে প্রেজেন্ট বা দেখানোর কাজ কিন্তু তার নিজের নয়। সে কাজটা পরিচালকের, প্রযোজকের, টিমের। প্রত্যেকটা লোকের কন্ট্রিবিউশন থাকে একজন বড় শিল্পী হওয়ার পেছনে। আমাদের এখানে শিল্পী হয়তো আছে, কিন্তু গল্পের ঘাটতিও আছে। আমি নতুন হয়েও ফিল করছি, যে ধরনের গল্প শুনি বা যেগুলো এখন কাজ করছি মনে হচ্ছে যে মনের ক্ষিধেটা মিটছে না। এর থেকে বেশী বোধয় আমরা চাইলে করতে পারি। কিন্তু আমরা কোথায় যেন আটকে আছি। একজন শিল্পীর কাজ কিন্তু একজন শিল্পীকে দেখানো না। সেটা পরিচালকের কাজ হয়।

আপনি নিজেওতো এখানকার প্যারালাল সিনেমাগুলোতেও কাজ করেছেন। ফারুকী, রাজ, রনির সঙ্গেও কাজ করেছেন, আবার মেইনস্ট্রিম সিনেমাতেও কাজ করেছেন। কিন্তু আপনার কমফোর্টের জায়গা আসলে কোনটা?
দেখুন, একটা সময় ছিল যখন যারা একদম মেইনস্ট্রিমে কাজ করতো, তখন দেখা গেছে তারা একই ধাঁচের ছবিতে কাজ করছেন। আবার যারা প্যারালাল ফিল্মে কাজ করছেন তারা শুধু সেটাই করছেন। এখন কিন্তু ইন্টারনেশনালি যদি দেখেন, বা আমাদের পাশের দেশগুলাতেও তাকান তাহলে দেখবেন সেই প্রবনতা খুব কমেছে। প্রত্যেকটা শিল্পীর মধ্যেও অই কনসেপ্টটা কমেছে। অন্তত আমার কাছে মনে হয় যে, একজন হিরো শুধু ভিলেনের সাথে ফাইট করবে, আর নায়িকার সাথে গান গাইবে সেটা হতে পারে না। আমার মনে হয় এসব থেকে অনেকটাই বেরিয়ে এসেছি আমরা। সে কারণেই আমি প্রচণ্ড আশাবাদী এই সময়টা নিয়ে। একই সাথে আমরা মেইনস্ট্রিমে সর্ব সাধারণের সঙ্গে কাজ করছি, আবার কিছু কাজ হচ্ছে সেখানেও আমরা কাজ করছি সো কলড কনভেনশনাল ফিল্মের মধ্যে পড়ে না। আমরা চেষ্টা করছি। আমারতো খুব ভালো লাগে। ব্যক্তিগতভাবে আমার নিজেকে হিরো বলার থেকে অ্যাক্টর পরিচয় দিতে বেশী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। শুধু হিরো ইমেজটা বা হিরো হয়েই আমাকে বাঁচতে হবে সেটাতে আমি একমত নই।

‘ঢাকা অ্যাটাক’-এ নতুন কী দেখবে দর্শক?
অ্যাকশন বলতে আমরা স্বাভাবিকভাবে বাঙালি দর্শক এতোদিন যেটা জেনে আসছি যে, মারামারি, হ্যান্ড টু হ্যান্ড ফাইট বা গান ফাইট! ‘ঢাকা অ্যাটাক’ বোধয় আমাদের টাইমে প্রথম ছবি যেখানে অ্যাকশানের যে ডেফিনেশন সেটা নতুনভাবে দেখানো হয়েছে। সিচুয়েশনই এতো অ্যাকশান অরিয়েন্টেড যে অডিয়েন্স একটু নতুন ধরনের অ্যাকশান মুভি দেখবে। যেখানে টানটান উত্তেজনা আছে, রহস্য আছে, পুরো ছবিতেই কী হবে কী হবে একটা ব্যাপার! অডিয়েন্সের জন্য এটা বাংলা সিনেমায় খুবই নতুন একটা বিষয় হতে পারে। অ্যাকশন বলতে আমরা যেটা বুঝি, এই ছবিটা আমি আশা করছি অ্যাকশান সম্পর্কে মানুষকে নতুন ধারনা দিবে। অ্যাকশান মানে যে মারামারি নয়, লাফিয়ে পড়া নয়, এক ঘুষিতে দশজনকে ফেলে দেয়া নয় সেই আমেজটা মানুষ ‘ঢাকা অ্যাটাক’ থেকে নিবে।

বিজ্ঞাপন

দীপঙ্কর দীপনের প্রথম সিনেমা ‘ঢাকা অ্যাটাক’। এই ছবি দিয়ে তাকে যদি মূল্যায়ন করতে বলা হয় আপনাকে…?
দীপন দা’র স্টোরি, কনসেপ্ট সব ভালো। কিন্তু ফিল্মে যেহেতু তিনি একদমই নতুন, এই বিষয়টা আমিও আগেও বলেছি। যে জন্য ‘ঢাকা অ্যাটাক’ করতে আমাদের বেশ সময় লেগে গেছে। সবার অনেক প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হয়েছে যে, কেনো এতো সময় লেগেছে! দীপন দা যদি আরেকটু গুছিয়ে কাজ করেন, তাহলে সেটা উনার নিজের জন্যই বেশ মঙ্গলজনক হবে। ভালো হবে। উনি আরো ভালোভাবে কাজ করতে পারবেন। কিন্তু ডিরেক্টর হিসেবে উনি অসাধারণ, গল্পের প্রয়োজনে উনি মারাত্মক ইনভলপড! আমাদের সিনেমার ক্রাইসিস মুহূর্তে তিনি নতুন কনসেপ্ট নিয়ে আসছেন, এজন্য উনাকে শুভেচ্ছা জানাই। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া।

‘ঢাকা অ্যাটাক’ ছাড়াও অক্টোবরেই আরো অন্তত চার,পাঁচটি সিনেমা মুক্তির কথা। এমনটা হলে কি ‘ঢাকা অ্যাটাক’ ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে?
একদমই না। একটা জিনিষ কি, এগুলো আমাদের ইন্ডাস্ট্রির কথা। কিন্তু আপনি যদি আমাদের দর্শকের কথা ভাবেন, দেখবেন দর্শক ছবি দেখতে চায়। ভালো ছবি হলে দর্শক সেটা দেখবেই। যে খাদ্য রসিক তাকে আপনি যতো ভালো ভালো খাবার দিবেন, দেখবেন সব সে খেয়ে ফেলছে। না করবে না। এখন দর্শক ভয়ঙ্কর ক্ষুধার্ত। অনেকদিন ধরে তারা ভালো সিনেমা দেখতে পারছে না, সো আমার একদমই মনে হয় না যে একটি সিনেমার জন্য অন্য আরেকটি সিনেমা ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়বে? আর যে সিনেমাগুলো অক্টোবরে চলবে, তার সবগুলোই কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন কাহিনীর। এরমধ্যে ফারুকী ভাইয়ের ‘ডুব’ আসবে, এই ছবিটি নিয়ে আমি খুবই আশাবাদী। আমি নিজেও হলে গিয়ে ছবিটি দেখবো।

কিন্তু আমাদের সিনেমাহলতো খুবই কম। তাও যদি কয়েকটা সিনেমার মধ্য দিয়ে ভাগাভাগি হয়ে যায় তাহলে বিনিয়োগ তোলাটা রিস্কি হয়ে যাবে না?
সেটাতো আরো ভালো হল। তখন ব্যবসাটা নির্ভর করবে ছবির মেরিটের উপর। যার ছবি যতো ভালো হবে, দর্শকের কাছে ভালো লাগবে সে ছবি বেশীদিন হলগুলোতে চলবে। যার ছবি ভালো হয়নি বা দর্শকের পছন্দ হয়নি তার ছবি চলবে না।

চ্যানেল আই অনলাইনের পাঠকদের প্রতি…
চ্যানেল আই অনলাইনের পাঠক, দর্শকদের অনেক অনেক শুভেচ্ছা। আপনারা সব সময়ই আমাদের সাপোর্ট করেছেন। আমরা ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে খুব ক্রাইসিস মুমেন্টের মধ্যে আছি। আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করছি ইন্ডাস্ট্রিকে আবারও আগের জায়গায় নিয়ে যেতে। দুশো, আড়াইশো হল থেকে আগের মতো বারো’শ, তেরো’শ হলে নিয়ে যেতে। আমরা সেভাবেই কাজ করছি। সেভাবেই প্রমান করার চেষ্টা করছি। আগের থেকে এখন কাজও কিন্তু ডিফারেন্ট হচ্ছে। সবাই হতাশ না হয়ে আমাদের একটু সাপোর্ট দিন। হলে এসে সিনেমা দেখবেন। তাহলেই আমাদের ইন্ডাস্ট্রিটা আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।

বিজ্ঞাপন