চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

একজন মাহফুজ আহমেদ: ভালোবাসার ঋণ শোধ হওয়ার নয়

জনপ্রিয় অভিনেতা মাহফুজ আহমেদের জন্মদিনে তাকে নিয়ে লিখেছেন নির্মাতা চয়নিকা চৌধুরী…

‘তোমাকে যে ছোট করে, সেই আসলে ছোট। বউদি, তুমি মানুষকে সম্মান দিতে জানো। তুমিই বড়!’-আমার জন্মদিনে টিভি লাইভে কথাগুলো বলেছিলেন প্রিয় অভিনেতা, প্রিয় নির্মাতা মাহফুজ আহমেদ। সেদিন চোখ ঝাপসা হয়েছিল। আসলে সত্যিই সহজ কথা যায় না বলা সহজে। তাকে চিনি ১৯৮৮ থেকে। ইমদাদুল হক মিলনের লেখা ফখরুল আবেদীন দুলালের ‘কোন কাননের ফুল’ নাটক থেকে তাকে প্রথম দেখি রির্হাসেলে। আমার বোন তমালিকা কর্মকার ঐ নাটকের আর্টিস্ট ছিল। আরো ছিল শমী কায়সার, মুনিরা ইউসুফ মেমী। আজিজুল হাকিমের বন্ধুর চরিত্রে, শখের ছোট অভিনয়। কী দারুণ স্পষ্ট উচ্চারণ!

তাকে আমি প্রথম জার্নালিস্ট হিসেবে চিনতাম। তারপর ১৯৯০ সালে অরুণ চৌধুরীর সাথে বিয়ের পর দেখেছি বহুবার। আমাদের বাসায় লম্বা আড্ডায় কখন যে সময় চলে যেতো! আমার ছেলে অনন্য প্রতীক চৌধুরীর মুখে প্রথম অন্নপ্রাশনের অনুষ্ঠানে তিনি ভাত ও খাইয়ে দিয়েছিলেন। ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের দারুণ অভিনয়ের সূত্র ধরেও অনেক বার দেখা হতো। এরপর আমাদের ফ্যামিলি মেম্বার হয়ে গেলেন। বিপাশা হায়াত, আবুল হায়াত, শিরি হায়াত- তাদের বাসায় সুন্দর আড্ডা, দুপুরের খাবার সহ কতো কতো স্মৃতি! তিনি মাহফুজ আহমেদ।

বিজ্ঞাপন

সবার কাছে একটি জনপ্রিয় নাম। কিন্তু তিনি আমার কাছে, আমার ক্যারিয়ার জীবনে, আমাদের ফ্যামিলি জীবনের সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষি। বটগাছ যেমন পথিককে ছায়া দেয়, তেমনি তিনি আমাকে সবসময় আলোর পথের কথা বলেন। এই গুণী মানুষটার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। দেখেছি তার বিনয়, ধৈর্য আর পরিশ্রম। আমার ক্যারিয়ার ও জীবনে কিছু ভাল মানুষের আশির্বাদের হাত মাথার উপর ছিল, আছে। তিনিও তাদের মধ্যে একজন এবং অন্যতম একজন ভালো বন্ধু।

মাহফুজ আহমেদের কাছে আমি ঋণী, কৃতজ্ঞ। এই কথা গুলো আমি তাকে শোনানোর জন্য কখনই বলিনি। আমি আমার আনন্দের জন্য, কৃতজ্ঞতা বোধ থেকেই বলি, ভালো লাগে। মন বড় হয়। মৃত্যুর পরেও এই কথা বলতে চাই বার বার। তিনি আমার চলার পথের গাইড। আজ এই প্রিয় মানুষটির জন্মদিন। অভিনন্দন তার গর্ভধারিণী মাকে। তার প্রতি রইল অভিনন্দন। শুভ কামনা চাই সুস্থতা।

মাহফুজ আহমেদকে কাছ থেকে দেখছি ৩৩ বছর। একটা কথা আমি সবসময় বলি আর বিশ্বাস করি। ‘কাউকে ছোট করে কেউ বড় হয় না। কাউকে বড় করলেই নিজে বড় হয়। কাউকে বড় করতে পারার ভেতরেই যত আনন্দ। তাতে মন বড় হয়।’

কথা হচ্ছিল সেদিন প্রিয় মানুষ, প্রিয় অভিনেতা প্রিয় নির্মাতা মাহফুজ আহমেদের সাথে। কোন একটা কথার রেশ ধরে মাহফুজ আহমেদ আমার চেয়েও একটা দারুণ সুন্দর কথা বললেন। তিনি বললেন, ‘আমাকে বড় করার জন্য তো তুমি কাউকে ছোট করতে পারো না। অর্থাৎ একজনকে বড় করতে গিয়ে আরেক জনকে ছোট করা অন্যায়, এটা ঠিক না। এতে তার চরিত্র এবং পরিবার বোঝা যায়। সত্যিই খুব সুন্দর আর পারফেক্ট একটা কথা। জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত মনে থাকবে আমার। আর আমি তা বিশ্বাস করতে চাই। বিশ্বাস করি। আমার আশেপাশের মানুষগুলো যদি তা মেইনটেইন করে জীবন আরও সুন্দর হয়।

এই চমৎকার মনের মানুষটির সহধর্মিনী ইশরাত জে কাদের, মানে আমাদের মিমি ভাবি আরও অনেক বেশি চমৎকার। বলতে গেলে আমি তার পারসোনালিটির ফ্যান। মিমি ভাবির সৌন্দর্য, তার ব্যবহার, তার রুচি, তার পড়াশোনা, তার জানার ভাণ্ডার সব কিছুই আলাদা সবার চেয়ে। যা আমার অনেক পছন্দ। বোঝাই যায় কত বড় পরিবারে তার বেড়ে ওঠা! তার ভদ্রতাবোধই সব বলে দেয়। এই প্রিয় মানুষ দুজন দীর্ঘ ১৯ বছর এক সাথে পথ চলেছেন। এত বছরে তারা সুখ দুঃখের সাথি। চলতে চলতে কত মান অভিমান, ভালোবাসা, আনন্দ! তাদের দুজনের প্রতি দুজনের শ্রদ্ধাবোধ তাদের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করেছে। অনেক কিছু শেখার আছে তার প্রতিও। তাদের জন্য রইল অনেক শুভ কামনা আর ভালোবাসা। সারা জীবন যেন একসাথে পথ চলতে পারে, তাদের সন্তানদের যেন সুন্দর করে মনের মত করে মানুষ করতে পারে, আর আরাধ্য আর অরিত্র যেন চিরসুখি হয় তাদের মা বাবাকে নিয়ে। হাসি আর খুশি নিয়ে যেন তাদের জীবন কেটে যায়। এই প্রার্থনা আমার এই আজকের দিনে।

মাহফুজ আহমেদের সঙ্গে নির্মাতা চয়নিকা চৌধুরী

মাহফুজ আহমেদ আর মিমি ভাবি তোমাদের অনেক ভালোবাসি। ভালো থেকো,সুন্দর থেকো। আবারও শুভ জন্মদিন মাহফুজ আহমেদ। যার ঋণ এই জনমে শোধ হবে না। আমি পৃথিবীতে থাকি আর না থাকি মাহফুজ আহমেদ থাকবেন তার সুন্দর কাজ, তার জনপ্রিয়তা, আর তার দারুণ নির্মাণের জন্য। ‘সদা থাকো আনন্দে, সংসারে নির্ভয়ে’। মাহফুজ আহমেদকে শ্রদ্ধা করি, ভালবাসি।

আমি স্বপ্ন দেখি তিনি একদিন সিনেমা নির্মাণ করবেন যেই সিনেমা সারা পৃথিবীর দর্শক নন্দিত হবে। সবাই বলবে, তিনি বাংলাদেশের পরিচালক। চলো তার সিনেমা আবারও দেখে আসি। তিনি আমাদের গর্ব। আর এই মানুষটির আগে আমি যদি না ফেরার দেশে চলে যাই এই পৃথিবী থেকে, সেইদিন মাহফুজ আহমেদ বলবেন, ‘আহারে একজন কাজ পাগল মানুষ ছিল, যে ভালবেসে কাজ করত, কাজকে ভালবাসতো, আমাকে ভালবাসতো। আমার পরিবারকে ভালোবাসতো। যার মন ছিল কৃতজ্ঞতায় ভরা।’

 

লেখক: চয়নিকা চৌধুরী, নির্মাতা