চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

একজন আজিজ মোহাম্মদ ভাই!

গণমাধ্যমে তিনি পরিচিত আজিজ মোহাম্মদ ভাই হিসেবে। গত দুই দশক ধরে তিনি আলোচিত এবং সমালোচিত। কেউ তাকে বলেন মাফিয়া, কেউ তাকে ভাবেন গডফাদার কিংবা ডন, তার নামের সঙ্গে আছে শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার মামলা, আছে হত্যার অভিযোগ। মুম্বাই এর ডন দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলেও শোনা যায়।

এই ব্যক্তির নামে নানা অভিযোগ আর রসালো সব কাহিনি বাজারে প্রচলিত আছে। কিন্তু সেগুলোর সত্যাসত্য নির্ণয় করা যায়নি। আমাদের দেশের গণমাধ্যমে বহুবার তাকে নিয়ে বহু খবর ছাপা হয়েছে। কিন্তু সেসবই ছিল অভিযোগ, গুজব বা রটনা হিসেবে। তথ্যপ্রমাণ দিয়ে কেউ কখনও তাকে নিয়ে কোনো ইন-ডেপ্থ রিপোর্ট করেনি।

বিজ্ঞাপন

এই মহামহিম নাকি ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরে ভারতের গুজরাট থেকে স্বপরিবারে ঢাকায় আসেন। পারস্য বংশোদ্ভূত আজিজের পরিবার ‘বাহাইয়ান’ আদর্শে বিশ্বাসী। ‘বাহাইয়ান’ থেকে ‘বাহাই’, সেখান থেকে ঢাকাইরা নিজের উচ্চারণের সুবিধার জন্য ‘ভাই’ বলে ডাকা শুরু করে। এভাবে ‘ভাই’ পদাধিকার অর্জনকারী আজিজ মোহাম্মদ ১৯৬২ সালে পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় জন্ম গ্রহণ করেন।
কথিত আছে যে, আশির দশকের শুরুতে ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি মর্নিং সানের সম্পাদকের মেয়ে নওরিনকে জোর করে বিয়ে করে আলোচিত হন আজিজ মোহাম্মদ ভাই। ফলে তখন থেকেই সাংবাদিকদের কাছে আজিজ মোহাম্মদ ভাই একটি পরিচিত নাম। পরে তার বিরুদ্ধে এক সম্পাদককে শ্বাসরোধ করে হত্যার অভিযোগও ওঠে।

পারিবারিকসূত্রেই আজিজ মোহাম্মদ বেশ ধনাঢ্য ব্যক্তি। অলিম্পিক ব্যাটারী, অলিম্পিক বলপেন, এমবি ফার্মাসিটিউক্যাল, এমবি ফিল্ম, টিপ বিস্কুট, এনার্জি বিস্কুট ইত্যাদি তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এছাড়া মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, হংকং, সিঙ্গাপুরে তার হোটেল রিসোর্টের ব্যবসা আছে।

কিন্তু টাকার নেশা আজিজ মোহাম্মদকে পেয়ে বসে। তিনি ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পরেন। শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারির মামলায় তার নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে শেয়ার বাজার বিষয়ক বিশেষ ট্রাইবুন্যাল। নিজ কোম্পানি অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রির শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি মামলার আসামী তিনি। নানা কারসাজি করে শত শত কোটি টাকা তিনি শেয়ার বাজার থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে।

তিনি নব্বই দশকে অর্থলগ্নি করেন সিনেমাতে। ৫০টির বেশি সিনেমাতে তিনি বিনিয়োগ করেন। কথিত আছে, কালো টাকাকে সাদা করার জন্যই তিনি সিনেমায় লগ্নি করেন। প্রযোজনার তার সঙ্গে সালমানের পরিবারের সখ্য গড়ে উঠে। সালমানের স্ত্রী সামিরার সঙ্গে একটি অপ্রীতিকর ঘটনার জের ধরে আজিজ মোহাম্মদ ভাই ও সালমানের মধ্যে বৈরিতা সৃষ্টি হয়। এরপর রহস্যজনক মৃত্যু হয় সালমান শাহর। এই মৃত্যুর সঙ্গে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের হাত আছে বলে নানা মহল থেকে অভিযোগ ওঠে। যদিও তথ্য-প্রমাণের অভাবে সালমানের মৃত্যু আত্মহত্যা হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, আজিজ মোহাম্মদের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত বলেই এই হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ ধামাচাপা পড়ে যায়। শুধু সালমান নয় আরেক চিত্রনায়ক অকালপ্রয়াত সোহেল চৌধুরী হত্যাতেও তার নাম জড়িত। এই ঘটনাটি নিয়েও তখন পত্রপত্রিকায় বেশ আলোচনা হয়। ১৯৯৯ সালের ৩০ জুলাই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ এই ঘটনায় আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ নয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন।

এই হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগে পুলিশ তাকে গ্রেফতারও করে। যথারীতি তিনি অল্পসময়ের মধ্যেই ছাড়া পেয়ে যান। এই হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের বেশিরভাগই আন্ডারওয়ার্ল্ডের দুর্ধর্ষ সব সন্ত্রাসী। একটি খুনের ঘটনায় একসঙ্গে বেশ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর অংশ নেওয়া ছিল বিরল ঘটনা। যদিও সোহেল হত্যা মামলা হাইকোর্টের আদেশে স্থগিত হয়ে যায়। শোনা যায়, এই হত্যার মূলে ছিল তখনকার রমরমা ডিশ ব্যবসা। এই ব্যবসাটি সোহেল চৌধুরীর পরিবারের এক চেটিয়া অধীনে ছিল – যা আজিজের পরিবার দখল করে নিতে চেয়েছিল।
আজিজ মোহাম্মদ ভাইকে নিয়ে রকমারি গল্পের শেষ নেই। বারবার তিনি বিতর্কিত হন। কথিত আছে যে, এরশাদের প্রেমিকা মেরির প্রতি তিনি আকৃষ্ট ছিলেন, ফলে এরশাদ তাকে জেলে নিয়েছিলেন। পরে প্রিন্স করিম আগা খান স্বয়ং বাংলাদেশে এসে তাকে মুক্ত করান।

বিজ্ঞাপন

তার বিরুদ্ধে অসংখ্য গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ তাকে কয়েকবার গ্রেপ্তারও করেছে। কিন্তু কখনই তাকে জেলে আটকে রাখা যায়নি। প্রতিটি ঘটনাতেই তিনি ছাড়া পেয়ে গেছেন। তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। সে চেষ্টাও কেউ করেনি। এক অদৃশ্য ক্ষমতার জাদুবলে তিনি সব সময়ই ধরা-ছোঁয়ার বাইরে চলে যান। তার বিরুদ্ধে মারাত্মক সব অভিযোগ ‘গুজব’ হিসেবেই কেবল ডালপালা মেলে উড়ে বেড়ায়।

প্রশ্ন জাগে, এত এত অভিযোগ যার বিরুদ্ধে, তিনি কীভাবে কোন খুঁটির জোরে আজও জেলখানার বাইরে থাকেন? তার টাকার পরিমাণ কত? সেই টাকার জোর কত?

সত্যি, এই আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের শান-শওকাত দেখে মনের মধ্যে একটি দার্শনিক প্রশ্ন উঁকি মারছে: জীবনের মানে কী? বেঁচে থাকার লক্ষ্য কী? জানি, এসব প্রশ্নের কোনো সর্বজনগ্রাহ্য উত্তর নেই। আমরা আসলে কেউই জানি না আমরা কেন এই ধরাধামে এসেছি। কেন বাঁচছি? কিসের আশায়, কিসের নেশায়? মানুষ বাঁচে কত দিন? বড় জোর ষাট, সত্তর কিংবা আশি বছর? একশ বছর? এটা তো গেল বেশি দিন বাঁচার হিসাব।

এর বাইরে মানুষের জীবন খুবই অনিশ্চিত। ভ্রূণ অবস্থায় মায়ের পেটে, জন্মানোর সময় অথবা জন্মের পর যে কোনো সময় ঠুস করে দম ফুরাতে পারে। তারপরও আমাদের হুঁশ হয় না। আমরা ক্ষমতা দেখাই। দাপট দেখাই। আরেকজনের ভিটেয় কীভাবে ঘুঘু চরানো যায়—সেই ধান্ধা করি। লুটপাট করে, একে মেরে, তাকে ঠকিয়ে টাকার পাহাড় গড়ি। আমরা সীমার মধ্যে না থেকে সব সময় সীমা লঙ্ঘনের সাধনায় মশগুল হই।

প্রত্যেক ধর্মেই আছে, সীমালঙ্ঘন না করা। সীমা লঙ্ঘনকারীকে স্রষ্টা পছন্দ করেন না। আসলে সীমা লঙ্ঘনকারীকে কেউ-ই পছন্দ করেন না। তারপরও সবাই সীমালঙ্ঘনকেই যেন জীবনের অলিখিত উদ্দেশ্য বানিয়ে পথ চলে!
দু’দিনের দুনিয়ায় আমরা সবাই ক্ষণিকের অতিথি। অথচ আমরা কতকিছু নিয়ে মাথা ঘামাই। কত তুচ্ছ কারণে অপরের মাথা ফাটাই। আসলে এই পৃথিবীতে মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে জীবনবোধের সমস্যা। কীভাবে জীবনটা যাপন করব-সেই লক্ষ্য নির্ধারণে সমস্যা। কার এক লেখায় যেন পড়েছিলাম, আমাদের প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙার পর আপনি যদি মনে করেন জীবনটা খুবই সংক্ষিপ্ত, তাহলে দেখবেন, জীবনটাকে আপনি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পারছেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমরা প্রায় সবাই মনে করি, আমাদের হাতে প্রচুর সময় রয়েছে, জীবনের আয়ু সংক্ষিপ্ত নয়।

আমাদের প্রতি মুহূর্তে মনে করা উচিত, এ পৃথিবীতে আমাদের সময় খুব সামান্য। আজ থেকে ৫০ অথবা ৭৫ বছর পর কেউ হয়তো আমাকে আর চিনবে না। কাজেই এখন যা নিয়ে ভাবছি, মাথা ঘামাচ্ছি, এসব নিয়ে চিন্তা করে ঘুম নষ্ট করার দরকার কী! আমাদের প্রয়োজন টাকা, আমাদের প্রয়োজন সম্পদ, কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, এসব অর্জনেরও একটা সীমা আছে!

প্রত্যেকের বোঝা উচিত, ‘প্রয়োজন’ ও ‘লোভের’ মধ্যে পার্থক্য কী। জানা উচিত, ঠিক কোন জায়গাতে থামতে হবে এবং এটাও জানা উচিত, ‘আর নয়, অনেক হয়েছে’ কথাটা কখন বলতে হবে। যখন একটি পশু মারা যায়, সে একেবারেই মরে যায়। পশুদের এমন কোনো প্রজন্ম নেই যারা তাদের জ্ঞান পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সরবরাহ করতে পারে। কোনো পশুই বই লিখতে পারে না, যে বই বছরের পর বছর অন্য প্রাণীরা পড়তে পারে, কিন্তু মানুষ পারে। তাই মানুষের জ্ঞান আসলে ‘অ্যাকুমুলেটেড নলেজ’ মানে ‘সঞ্চিত জ্ঞান’। মানুষের এই শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে হবে মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায়, বাড়াবাড়ি না করে, অপরের দুঃখের কারণ না হয়ে, লুটপাটের মাধ্যমে অর্থধনসম্পদ না বাড়িয়ে!

কিন্তু আমাদের মধ্যে সেই বোধ নেই! সেই হুঁশও নেই। তাইতো সমাজে আজিজ মোহাম্মদ ভাইরা তৈরি হয়, বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়, নানা অপকর্ম করে পারও পেয়ে যায়! এই সব লোভী-নষ্ট-ভ্রষ্ট-পাপাত্মারা কি কখনই কোনো দণ্ড পাবে না?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View