চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

এই দেশে পলিটিক্যাল গেম আছে: নিজাম চৌধুরী

প্রবাসী উদ্যোক্তা নিজাম চৌধুরী এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক লিমিটেডের দুই বারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ তাকে দ্বিতীয় মেয়াদে চেয়ারম্যান পুনঃনির্বাচিত করে। নিজাম চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এ ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি একজন সফল প্রবাসী উদ্যোক্তা। ট্রেড ব্যালেন্স ইউএসএ কর্পোরেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান। নিজাম চৌধুরী ম্যাক্স পাওয়ার লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক, কুশিয়ারা পাওয়ার ও ডায়ামন্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের পরিচালক।এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবি সংগঠনের সাথেও জড়িত।

প্রশ্ন: প্রবাসীদের কল্যাণে তিনটি এনআরবি ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয়। সেই লক্ষ্য পূরণে কতোদূর এগিয়েছেন আপনারা?

বিজ্ঞাপন

নিজাম চৌধুরী: তিনটি ব্যাংক নন রেসিডেন্ট বাংলাদেশীদের জন্যে দেওয়া হয়েছে। তারা যখন বাংলাদেশে ফিরে আসবে অথবা মিডিল ইস্টের দেশগুলোতে কেউ থাকতে পারে না। বেসিক্যালি সেখানে তাদের ইমিগ্রেশনের কোন ব্যবস্থা নেই বলে ম্যাক্সিমাম রিটায়ারমেন্টের পরে চলে আসে অথবা চাকরি শেষ হলে চলে আসে। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো তারা যখন ফিরে আসে ১০-১৫ বছর পরে তখন লোকাল ব্যাংকগুলো তাদেরকে বলে, আপনাদের তো কোন ক্রেডিট লাইন নেই। আপনাদেরকে আমরা লোন দিতে পারবো না। যদিও এটা খুব দুঃখজনক বিষয়। যাদের পাঠানো টাকায় আজকে আমাদের ইকোনমি গর্ব করে বলি বাংলাদেশ ব্যাংকে রিজার্ভের ৩৩ বিলিয়ন ডলার। এর মেজর পোর্শন হলো তাদের পাঠানো টাকা। আয়রনিক্যালি এটি কেউ কোনদিন চিন্তা করতো না যে, আমরা প্রবাসীদের টাকায় ব্যাগ ইন করি বলে বেড়াই।

পলিটিশিয়ানরা আর প্রাইভেট সেক্টর সবাই বলি যে, আজকে গার্মেন্টস হলো সেকেন্ড লার্জেস্ট আর আমাদের রেমিটেন্স হলো নাম্বার ওয়ান। যে খাত থেকে আমরা ফরেন কারেন্সি আর্ন করি এবং এই মানুষগুলো যখন দেশে আসে তখন তাদেরকে ইগনোর করা হয় বিভিন্ন ভাবে। শুধু মাত্র ব্যাংক লোন এই দিক দিয়ে নয়? সব দিক দিয়েই তারা ইগনোর ছিল। ২০০৯ সালে আমি প্রথম মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে প্রস্তাব দেই এনআরবিদের জন্যে একটি ব্যাংক দেওয়ার। তখন তিনি আমাদেরকে বললেন যে, তোমরা এটি কিভাবে চালাবে বিদেশে থেকে। পরে আইসিআইসি ব্যাংকের উদাহরণ দেওয়ার পরে যেটি ১৯৭১ সালে ইন্ডিয়াতে নন রেসিডেন্স বাংলাদেশীদের দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেটা এখন বিশ্বের তৃতীয় লার্জেস্ট ব্যাংক এবং ইন্ডিয়ার সেকেন্ড লার্জেস্ট ব্যাংক। তাই প্রধানমন্ত্রীর দয়ায় আর তিনটা ব্যাংকের অ্যাপ্লিকেশন পড়েছিল মাত্র। তিনি তিনটাই অনুমতি দিয়ে দেন। এখন আমরা প্রবাসীদের জন্যে কি করছি? আমি অন্য দুটো ব্যাংকের কথা বলতে পারবো না- আমাদের ব্যাংকে আমি- বেসিক্যালি ৪ বছর আগে, এখন আমাদের ব্যাংকের বয়স ৬ বছর চলছে। আমি ১৭টি প্রডাক্ট তাদের জন্যে কাস্টমাইজড করে রেডি করেছি এবং সেগুলো আমাদের ওয়েব সাইটে দেওয়া আছে।

বিভিন্ন সময় পত্র পত্রিকাতে এবং টেলিভিশনে আমরা অ্যাড দিয়ে যাচ্ছি। প্রবাসীদের একটা সমস্যা আছে। তারা যখন এখানে আসে তারা ডিসকানেক্টেড থাকে। তারা অভ্যস্ত থাকে ওয়ান স্টপ প্রব্লেম সলিউশনে। এই ব্যবস্থা তো আমাদের এখানে পুরোপুরি সৃষ্টি হয়নি? তারপরেও আমি বলবো- গেলো ৪ বছরে ৬৪ হাজার প্রবাসী বাংলাদেশী ছোট বড় মাঝারি শিল্প নিয়ে এই দেশে এসেছে। তারা সবকিছুই যে আমাদের থেকে লোন নিয়েছেন তা কিন্তু নয়। তারা তাদের লোকাল পার্টনারদের সাথে অন্যান্য ব্যাংক থেকে লোন নিয়েছে আমরাও দিয়েছি। তবে আমি আশা করেছিলাম প্রবাসীদের বিশাল সাড়া পড়বে কিন্তু তা হয়নি। হয়নি দুই কারণে- একটা হলো মিডিল ইস্ট থেকে যারা ফিরে এসেছে এখন তারা খুব খারাপভাবে ফিরে এসেছে।এখন মিডল ইস্টের অবস্থা ভাল না। সৌদি আরবে আমাদের ২০-২৫ লক্ষ মানুষ আছে। তাদের অধিকাংশই এখন ফেরত আসছে। সেখানকার ইকোনমির মেলডাউনের কারণে। তারা এখানে এসে সেটেল্ড হতে সময় লাগবে। একটা ব্যবসা বাণিজ্যের চিন্তা করা এবং সেটেল্ড হওয়া সময়ের ব্যাপার। তবে আমি আশা করছি- অদূর ভবিষ্যতে এই ব্যাংকগুলো ভাল ভুমিকা রাখবে প্রবাসীদের কল্যাণে। বিশেষ করে নন রেসিডেন্স বাঙালিদের অর্থনীতিতে এই ব্যাংক বিশাল ভুমিকা রাখতে পারবে। আমরা তো মাত্র পরিচিত হচ্ছি তাদের কাছে।

প্রশ্ন: ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি উন্নয়নের প্রশংসা করেছে- এই বিষয়ে আপনারা মতামত কি ?

নিজাম চৌধুরী: এটি ফ্যান্টাসটিক প্রতিবেদন। আপনি দেখেন- আমাদের দেশে আমি সবসময়ই বলি ফাইন্যান্সিয়াল টকশো বা সেমিনার যে জায়গায়ই যাই। আমাদের দেশের মানুষ আমরা সবাই মিলে খুব নেগেটিভ। আমরা ভাল জিনিসগুলো দেখি না। কিন্তু ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম দেখছে আমাদেরকে। তাদের এই প্রতিবেদনের ভেতরে একবিন্দু খারাপ কিছু নেই। শুধু চ্যালেঞ্জেসগুলো থাকবে- আপনি যখন এগিয়ে যাবেন- ডেভলপড ইকোনমির দিকে যাবে, সাসটেইনিবিলিটির দিকে যাবেন চ্যালেঞ্জেস থাকবে। কিন্তু আমরা করি কি? আমাদের দেশের একটি সমস্যা আমরা সবাই- এটা আমাদেরকে বৃটিশরা দিয়ে গেছে মাথার ভেতরে- যাতে আমরা উপরে উঠতে না পারি। আমরা কি করি? নেগেটিভ- ছোট্ট তিলের মত কিছু হলে আমরা তাকে তাল বানিয়ে ফেলি। এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশ ইজ ডুয়িং এ ফ্যান্টাসটিক জব অ্যাজ পার অ্যাজ ইকোনমি কনসার্ন অ্যাজ পার অ্যাজ আওয়ার ভিশন। যে ভিশন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত আয়ের একটি দেশ। যার দিকে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি এবং খুব ভালভাবে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।

প্রশ্ন: এনআরবি ব্যাংক তীব্র তহবিল সংকটে ভুগছে- এই ব্যাপারটি কতোটা সত্য?

বিজ্ঞাপন

নিজাম চৌধুরী: এটি তো আমার জানা নেই। তীব্র তহবিল সংকট বলতে কি বোঝাতে চাইছেন আমাকে বুঝিয়ে বলতে হবে- এটা কি?

প্রশ্ন: তাহলে আপনাদের সাকসেস কি আছে?

নিজাম চৌধুরী: সাকসেস অবশ্যই আছে।

প্রশ্ন: প্রবাসীদের টাকা পাঠানো অনেকটা কমে গেছে?

নিজাম চৌধুরী: রেমিটেন্স কমছে তা তো ব্যাংকের সমস্যা না? এটি হলো প্রবাসীদের চাকরির সমস্যা বাইরে। যেমন, মিডিল ইস্টে আমাদের প্রবাসীদের অবস্থা তেমন ভাল না। এমনকি যারা ব্যবসা করেন তাদের অবস্থাও খুব বেশি ভাল না। ওখানে চেঞ্জ হচ্ছে। আবার আরামকোতে তেলের উপরে যে হামলা হয়েছে তারপর থেকে ইকোনমি আরও ডাউন হচ্ছে। এই আপস এন্ড ডাউন থাকবেই ইকোনমিতে। আপনি সব সময়ই সবকিছু ভাল দেখবেন তা ভাবার অবকাশ নাই। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো- এই ব্যাংকগুলোকে যে উদ্দেশ্যে সরকার দিয়েছে। সেগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। ওভার নাইট কোন সাকসেস দেখবেন না। আর আমি এখানে কিছু অ্যাড করতে চাই আমাদের ইকোনমির ব্যাপারে- আপনি যে মূল বিষয়টা রেখেছেন, আর্থিক খাতের শৃংখলা আমাদের উন্নতির জন্যে কতোটা দরকার? আর্থিক খাতের শৃংখলা দেশের উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। যদি আর্থিক খাতের শৃংখলা না থাকতো তাহলে আজ আমরা এই জায়গায় আসতে পারতাম না।আপনি দেখেন, প্রাইভেট সেক্টরের ব্যাংকগুলোকে সবাই সমালোচনা করে কিন্তু আজকে টোটাল ইনভেস্টমেন্টের ৭৬ পারসেন্ট আমরা।

সরকারি ব্যাংকগুলোর তেমন ইনভেস্টমেন্ট নাই? তাদের হাজার হাজার কোটি টাকা পড়ে আছে কিন্তু একটা লোন ফাইল অ্যাপ্রুব হতে তিন চার মাস সময় লাগে। আমরা এক সপ্তাহে বা ১৫ দিনে লোন দিয়ে দেই। ইটস ডিপেন্ডিং অন দ্যা কাস্টমার। আমরা যদি মনে করি-দিস কাস্টমার ইজ সলিড কাস্টমার অ্যান্ড হিজ ট্যাক রেকর্ড, প্রিভিয়াস ফ্যাক্টর এন্ড ফিউচার ভিশন ইজ গুড- তখন আমরা তাকে লোন দিয়ে দেই। এখানে সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো- আমাদের মনোপলিনেসটাকে সরিয়ে দিতে হবে। যদি আমরা বিদেশী ইনভেস্টমেন্টগুলো নিয়ে আসতে পারি যেমন, আমাদের এফডিআর ইনক্রিজ হয়েছে ১.৪ বিলিয়ান ওভার দ্যা ইয়ার। এভাবে যদি আমরা এটাকে ডাবল করে দিতে পারি এবং ফরেন লোনগুলো যদি আনতে পারি। বড় বড় কোম্পানীগুলো কিন্তু দেখেন পাওয়ার সেক্টরে ম্যাক্সিমাম লোন কিন্তু ফরেন লোন। ফরেন লোনগুলো যখন আমরা নিয়ে আসতে পারবো লাইবল প্লাস ওয়ানে অর্ধেক রেটে বাংলাদেশে।তখন কিন্তু কম্পিটিশনে এখানে কিন্তু টাকার উপরে চাপ কম পড়বে। অন দ্যা আদার হ্যান্ড আমরা বাইরে থেকে আনলাম। সব কিছু মিলিয়ে লোকাল টাকা দিয়ে খুব বেশি এগিয়ে যাওয়া সম্ভব না।

আপনার টোটাল টাকা কতো টাকা? বারো তেরো লক্ষ কোটি টাকা। ইউ ডোন্ট হ্যাভ লট অব মানি। আপনি মেগা প্রজেক্ট করছেন। হিউজ হিউজ মেগা প্রজেক্ট- বিলিয়ন্স অব ডলার মেগা প্রজেক্ট। ঠিক আছে- বুঝলাম বাইরে থেকে টাকা আসছে। কিন্তু আপনাকে টুয়েন্টি টু থার্টি পারসেন্ট ডাউন পেমেন্ট দিতে হচ্ছে। আর আমাদের মেগা প্রজেক্ট পদ্মা সেতু নিজের টাকা হচ্ছে। আগে বঙ্গবন্ধু সেতু করার সময়ে বিভিন্ন জিনিসের উপরে টোল বসানো হয়েছিল। কিন্তু এখন তাও নাই। সব কিছু মিলিয়ে আমি যদি এক কথায় আপনাকে বলি- ইজ ইন এ ওয়াইড ডিরেকশন। ব্যাংকিং খাতে শৃংখলা আগের তুলনায় অনেক বেশি ফিরে এসেছে- এটি অতি সত্য কথা। সেন্ট্রাল ব্যাংক, সরকারি ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় সব কিছু মিলিয়ে একটি ইন্ট্রিগ্রেটেড পলিসি নিয়ে ইয়াং ছেলেমেয়েরা বাংলাদেশ ব্যাংকে এসেছে- দে আর ডুয়িং এ ফেনোমেনাল জব, ফ্যান্টাসটিক জব।

আমাদের এখন পজিটিভ কথা বলে জাতীকে এগিয়ে নিতে হবে। বেশি নেগেটিভ বললে মানুষ কিন্তু হতাশ হয়ে যাবে। ইনভেস্টররা অন্য দিকে চলে যাবে এবং ইনভেস্ট করবে না। টাকা পাচারের কথা আমরা বলি না? টাকা পাচার তখনই হবে যখন এখানে ইনভেস্টের ভাল পরিবেশ না থাকবে। পরিবেশ আছে কিন্তু কথা বলার মাধ্যমে খারাপ করার চেষ্টা করছে। একটা গোষ্ঠী আছে আমাদের এখানে যারা বাংলাদেশের ভাল দেখতে পারে না।এই বিষয়টি সব সময়ই আমাদেরকে স্মরণ রাখতে হবে। এই দেশে পলিটিক্যাল গেম আছে। আমাদের দেশে পরশ্রীকাতরতা একটা শব্দ আছে।

একে অপরের উন্নতি দেখতে পারে না। জাতী হিসাবে ঠিক একইভাবে আমাদের আশপাশের দেশগুলো- ইন্ডিয়া, ভুটান, নেপাল, মিয়ানমার, পাকিস্তান – এদের সবার চেয়ে আমরা ভাল করছি। এই সব কি তারা ভাল চোখে দেখছে? ইমরান খান তার বক্তব্যে বলে ফেললো- আমরা ত্রিশ লক্ষ লোক তাদের মেরে ফেলেছি কিন্তু তারা তো ইকোনমিতে আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে।আরেকটা জিনিস অ্যাড করি। এবার জাতীসংঘে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে ছিলাম। সেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী টপ প্লেসে ছিলেন। তিনি ভ্যাকসিন হিরো পুরস্কার পেয়েছেন। ইয়াং স্টারদেরকে ইউনিসেফের জয়েন কোলাবরেশনে ট্রেনিং দেওয়ার জন্যে তিনি পুরস্কৃত হয়েছেন। চার পাঁচটা বড় ধরণের সভাতে চেয়ার করেছেন। এর চেয়ে বড় পাওয়া জাতী হিসাবে আর কি থাকতে পারে? এই সব কিছুও নিয়ে আসতে হবে। আমাদের ইয়াং জেনারেশন যা আমাদের জনসংখ্যার অর্ধেক তাকে এন্থোজিয়াস্টিক করতে হবে। তা না হলে আমাদের ভবিষ্যত অনেক খারাপ।

Bellow Post-Green View