চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

এই ইংল্যান্ড যেন ক্রিকেটের ফ্রান্স!

বেলজিয়ামের শীর্ষ তারকা রোমেলু লুকাকু, যার শরীরে বইছে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের রক্ত। মা-বাবা দুজনই আফ্রিকান দেশটির মানুষ। এই দলেরই আরেক তারকা মুসা ডেম্বেলের বাবা আফ্রিকার দেশ মালির মানুষ। আর ঝাঁকড়া চুলের অধিকারী মারোয়ান ফেলাইনির মা-বাবা মরক্কোর।

এই রাস্তায় ফ্রান্স দলের হালহকিকত তো আরও এগিয়ে। সুপারস্টারের তকমা পাওয়া পল পগবার মা-বাবা গিনির। ফরাসিদের মাঝমাঠের প্রাণভোমরা এনগোলো কন্তের মা-বাবা মালির। বিশ্বকাপের সেরা তরুণ খেলোয়াড় হওয়া কাইলিয়ান এমবাপের বাবা ক্যামেরুন ও মা আলজেরিয়ার নাগরিক। ব্লেইস মাতুইদির মা-বাবা অ্যাঙ্গোলার, আর ডিফেন্সের অন্যতম ভরসা স্যামুয়েল উমতিতির জন্ম ক্যামেরুনে।

বিজ্ঞাপন

রাশিয়া বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের ২৩ জনের দলে ১৫ জনেরই শেকড় আফ্রিকার। বেলজিয়ামের ২৩ জনের ৯ জনের গোড়া ভিন্ন দেশে। শুধু এ দুটি দেশই নয়, রাশিয়া আসরে সেমিফাইনাল খেলা ইংল্যান্ড দলেও ছিল আফ্রিকান প্রতিনিধিত্ব। যেমন, ডেলে আলি (নাইজেরিয়া) ও দানি ওয়েলব্যাক (ঘানা)।

শুধু রাশিয়া বিশ্বকাপই নয়, ১৯৯৮ সালে ঘরের মাঠে প্রথমবার যখন ফ্রান্স বিশ্বকাপ জেতে, সেই দলেও ছিলেন ছয়জন ভিন্ন জাতি রক্তের ফুটবলার। ফেঞ্চ গায়ানা, সেনেগাল, ঘানা, আলজেরিয়া, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ ও ভানুয়াতু মিলিয়ে ‘৯৮’র ফ্রান্সে ২২ জনের দলে জিনেদিন জিদান, থুরামসহ ছয়জনই ছিলেন বিদেশি। ওই পুরো দলকে যদি দেহ ধরা হয়, তাহলে তার হৃদপিণ্ড ছিলেন আলজেরিয়ান রক্তের জিজু।

গত বছর অনূর্ধ্ব-২০ ফিফা বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয় ইংল্যান্ড। যে দলের অন্তত ছয়জন খেলোয়াড় ছিলেন যারা শুধু নাইজেরিয়ার হয়েই খেলতে পারতেন।

বলতে পারেন, ক্রিকেট বিশ্বকাপের এই আবহের মধ্যে এক বছর আগে শেষ হওয়া ফুটবল বিশ্বকাপ প্রসঙ্গ ঢুকল কীভাবে? কারণ তো আছেই!

ফুটবলে ফ্রান্স, বেলজিয়াম বা ইংল্যান্ডকে অনেকেই বৈশ্বিক একাদশ বা ‘মেহমানদের’ দল বলে থাকেন। সেটা বিশ্বকাপ জয়ের পর ব্রিটিশরাও হয়তো মেনে নিয়েছেন। বিশ্ব জয়ের পর ব্রিটেনের রাজপথে সমর্থকরা সুর করে একটি গানই গেয়েছেন, ‘উই আর দ্য ওয়ার্ল্ড!’

সে বিচারে ফুটবলে ফ্রান্স যা, ক্রিকেটে ইংল্যান্ডও তাই। এরকম ‘মেহমানদের’ নিয়েই তো ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ জিতল ইংলিশরা।

ইংল্যান্ড দলের ১৫ সদস্যের সাতজনের শরীরেই অন্যদেশের রক্ত। ফুটবল পাগলের দেশ চ্যাম্পিয়নও হল এক বিদেশি রক্তের নেতৃত্বেই।

বিজ্ঞাপন

চার বছর আগে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপে যখন বাংলাদেশের কাছে হেরে কোয়ার্টার ফাইনালেই ওঠা হয়নি ইংল্যান্ডের। তখন ধরেই নেয়া হয়েছিল, ওয়ানডে ফরম্যাটের মৃত্যু ঘটে গেছে সেদেশে। কিন্তু সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো উত্থান। যার নেতৃত্বে এক ভিনদেশি, নাম তার ইয়ন মরগান।

এই ইংল্যান্ড দলে শ্বেতাঙ্গ ইংলিশ খেলোয়াড় যেমন আছেন, তেমনি এমন পাঁচজন আছেন, যাদের জন্ম অন্যদেশে বা কোনো অভিবাসী পরিবারে।

দলের অধিনায়ক মরগানের জন্ম আয়ারল্যান্ডে, ফাইনালের ম্যাচসেরা বেন স্টোকসের জন্ম নিউজিল্যান্ডে, ফাইনালে সুপার ওভারে বল হাতে লড়া জফরা আর্চারের জন্ম উইন্ডিজের বার্বাডোজে, পুরো বিশ্বকাপে জনি বেয়ারস্টোর সঙ্গে ইংল্যান্ড দলকে ওপেনিংয়ে পথ দেখানো জেসন রয় এবং পেসার টম কারেন সাউথ আফ্রিকান বংশোদ্ভূত। আর মঈন আলি এবং আদিল রশিদের জন্ম পাকিস্তান থেকে যাওয়া অভিবাসী পরিবারে।

মরগান যে শুধু একজন আইরিশ-বংশোদ্ভূত ক্রিকেটার তা-ই নয়, তিনি ২০০৭ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপে আয়ারল্যান্ডের হয়ে খেলেছিলেন।

ইংল্যান্ডের এবারের বিশ্বকাপ দলে যে ফ্রান্সের মতো বহুদেশ ও সংস্কৃতির সমাবেশ, তা বলেছেন মরগানও। সেটাই দলকে একটা অন্যমাত্রা দিয়েছে বলেও মত তার। এই যেমন আদিল রশিদ ও মঈন আলি ইংলিশ নন, বিশ্বজয়ের পরে মুসলিম ধর্মাবলম্বী এ দুই ক্রিকেটার শ্যাম্পেন সেলিব্রেশনে অংশ নেননি। কিন্তু তাতে সতীর্থদের মধ্যে সখ্যতা এতটুকু কমেনি।

এই বিশ্বজয়ী ইংল্যান্ড যেন ১৯৯৮ আর ২০১৮ সালে ফুটবল বিশ্বকাপ জয়ী ফ্রান্স। দেশটির ’৯৮-এর নায়ক জিদান ছিলেন আলজেরীয় বংশোদ্ভূত। ২০১৮ সালের তাদের বিশ্বজয়ী নায়ক অ্যান্থনিও গ্রিজম্যানের শরীরে আবার বইছে স্পেনীয় রক্ত।

বিশ্বকাপ জয়ের আগেও কিন্তু ফ্রান্স দলে অন্যদেশের খেলোয়াড় ছিলেন। ৮১ বছর আগে, ১৯৩৮ বিশ্বকাপে ফরাসিদের রক্ষণ আগলেছেন সেনেগালের ডিফেন্ডার রাউল ডায়গনে। নীল জার্সিতে ১৮ ম্যাচ খেলা ডায়গনে পরে স্বাধীন সেনেগালের প্রথম কোচ এবং তারও পরে প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। ১৯৫৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের জার্সিতে খেলে সুপারস্টার হয়ে যান মরক্কোর জুস্ত ফোঁতেন। তবে এই বিখ্যাত ফুটবলাররা যেমন ফ্রান্সকে আগে বিশ্বকাপ জেতাতে পারেননি, তেমনি একই ছাপ ইংল্যান্ড ক্রিকেটের চেহারায়ও ছিল।

ইংল্যান্ড দলে ভিন্ন রক্তের ক্রিকেটার হিসেবে খেলে বিশ্ব মাতিয়েছেন অনেকেই। গড়েছেন বহু রেকর্ডও। তবে বিশ্বকাপটা দিতে পারেননি। যে দলে আছেন- সাউথ আফ্রিকার অ্যালান ল্যাম্প, জোনাথন ট্রট, কেভিন পিটারসেন, অ্যান্ড্রু স্ট্রাউস, রবিন স্মিথ, প্রয়াত বিখ্যাত ধারাভাষ্যকার টনি গ্রেগ, ম্যাট প্রায়র, ভারতীয়জাত কুমার দিলীপসিংজী, নাসের হুসেইন, কলিন কাউড্রে, ইতালির মিলানে জন্মানো টেড ডেক্সটার, ডোমিনিকার ফিলিপ ডিফ্রিটাস, নিউজিল্যান্ডের অ্যান্ডি ক্যাডিক, জ্যামাইকার ডেভন ম্যালকম ও জিম্বাবুয়ের গ্রাহাম হিক।

এরকম আরও অনেক নামই ইংলিশ ক্রিকেটে আছে। বিশ্বকাপের মাসখানেক আগে ৬৭তম বিদেশি খেলোয়াড় হিসেবে আর্চারের অভিষেক হয় ইংলিশ ক্রিকেটে।

ডায়গন-ফোঁতেনদের ব্যর্থতা ঢেকে জিজু-গ্রিজুরা যেমন ফ্রান্সের হিরো। তাদের মতো পুরো ইংল্যান্ডে পরিত্রাতা হিসেবে অবশ্যই উঠে আসছে স্টোকসের নাম। ফাইনালে লর্ডসের গ্যালারিতে তো শুধু একটাই সুর শোনা গেছে ‘স্টোকসি’ ‘স্টোকসি’। জিদান-গ্রিজম্যানরা যদি ফ্রান্স ফুটবলের ‘চার্লস দ্য গল বা ষোড়শ লুই হন’ তো ইংলিশ ক্রিকেটে এখন ‘লর্ড’ স্টোকস। যিনি শিগগিরই ‘স্যার’ উপাধি পেতে যাচ্ছেন বলে খবর।

Bellow Post-Green View