চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

উৎপলের মায়ের কান্না আর সিজারের মেয়ের প্রশ্ন 

১. আমার নিজের কোন বাড়ি নেই, অঢেল টাকা খরচ করে বাড়ি বানানোর মধ্যেও আমি নেই, যেভাবে দুই নম্বরী পথে টাকা কামালাম, সেইভাবে একটা বাড়ি কামানো মানে বাগানো যায় কিনা ভাবছিলাম। বন্ধু “ক” আমার বিরাট কামেল, বুদ্ধি গিজগিজ বিজবিজ, নিদ্রাদেবী দিশা পায় না প্রবেশের। বন্ধুর কাছে প্রস্তাব প্রসবের অর্ধেক হবার আগেই বুদ্ধি বাতলে দিলো, খোঁজ নে আশেপাশে হিন্দু বাড়ি আছে নাকি, একটু জায়গা টায়গা নিয়ে বাড়ি হলে ভালোই। পেলেই সেই বাড়ির মালিকের নামে ফট করে একটা ফেসবুক একাউন্ট খোল, কয়েকদিন ঝপাঝপ তার নাম দিয়ে দিবি কিছু উচ্চতর গালাগালি, এরপর ধর্ম রক্ষার ডাক। এরপর শুরু হবে মজা, তারপর কিছুদিনের মধ্যে তুই হবি বাড়ির মালিক, তবে হ্যাঁ, সবার আগে এলাকার প্রভাবশালীদের মালপানি খাইয়ে দিয়ে সাইজ করে রাখিস।

ইস! বললেই হলো চৌদ্দশিকের ভাত খেতে হবে তাইলে!

বিজ্ঞাপন

খেতে তো হবেই, কিন্তু তোকে না, খাইবে মালুদের। দেখিস না, রাকেশ, টিটু রায়, রসরাজ নির্দোষ প্রমাণ হলেও কেমন কারাগারে আছে। মামা এই তো সুযোগ হিন্দু বাড়ি পছন্দ তো আগ লাগাও আর বাড়ি কা মালিক বনো। আর যদি নাবালিকা বা সাবালক মেয়ে থাকে জোর করে মুসলিম বানিয়ে বিয়ে করে ফেল। কেউ কিছু বলার নেই। সবাই ব্যস্ত নিজেকে নিয়ে। কে আর কার কথা ভাবে। ফেসবুক আন্দোলনকারীরা দুইদিন ফেসবুকে বিপ্লব করে ফেলবে। কিবোর্ড ভেঙ্গে গরমাগরম স্ট্যাটাস দিবে। কিন্তু হবে যেই লাউ সেই কদু। নো চিন্তা জাস্ট ডু ফুর্তি। আমরা মিয়ানমারের মুসলিমদের জন্য কাঁদতে কাঁদতে অস্থির হব আর নিজের দেশি ভাইদের অন্য ধর্মের হবার কারণে অবহেলায় মুখ ফিরিয়ে নেব।

বুদ্ধি বিরাট পছন্দ হইল, তাইতো কেন আর ঝামেলা? হিন্দু বাড়ি খোঁজ দ্যা সার্চ শুরু। তালিকা দীর্ঘ হোক হিন্দু বাড়ি দখলের কারো কিছু যাবে আসবে না।মোবাশ্বের হাসান সিজার-প্রধানমন্ত্রী

২. “তোমার মেরুদণ্ডহীন সিস্টেমের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানলাম। বোকার মতো শিরদাঁড়াটা সোজা রেখে জীবনটা পার করার যে জেদ ছিল সেটা তোমার মেরুদণ্ডহীনতার তন্ত্রে হার মেনে গেল। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি থেকে এবং সিজিপিএ’র জন্য পড়াশোনা করে মেধাবী তকমা পাওয়া কিংবা দুর্ঘটনায় বা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর পর মিডিয়ার প্রচারের স্বার্থে মেধাবী খেতাব নেওয়ার কোন ইচ্ছা ছিল না। শুধু শুধু গাধার মতো কোন ইস্যু পেলে চেঁচিয়ে বারবার তোমার মেরুদণ্ডহীনতা বোঝানো ছাড়া বোধ হয় আমি আর কিছু পারতাম না।”

অর্ঘ্য বিশ্বাস পোলাটা একটা গাধা, না হইলে সিস্টেমের কাছে হার মেনে নিজের অমূল্য জীবনটা নষ্ট করে? যে ভিসি বউয়ের বিউটি পার্লারে আয়-ব্যয় নিয়ে ব্যস্ত থাকে সেখানে কী হতে পারে বা কী নিয়ম চলতে পারে বোঝে নাই। বিউটি পার্লারে নেয়ার দেয়ার কাজ, তিনি আসলে কি বস্তু তুমি কেন সেইটা বুঝলা না অর্ঘ্য। এই দেশে কি শিক্ষার দাম আছে নাকি আছে সাধারণ মানুষের মূল্য, সবার উপর তুমি হিন্দু তাহলে কেন কিসের আশায় তুমি জীবন দিলে? তুমিকি ভেবেছিলে সারা দেশের ছাত্র সমাজ বা বিবেকবান মানুষ তোমার মৃত্যুর কারণ জেনে ঝাপিয়ে পড়বে অন্যায়ের প্রতিকার চেয়ে? বোকা ছিলে ছেলে তুমি। যে দেশে দিনের আলোতে হত্যাকাণ্ড ঘটে ছুরিচাকু নিয়ে হত্যারত অবস্থায় একদল ছাত্র যখন আরেকটি ছেলের উপর ঝাপিয়ে পড়ে কুপিয়ে তাকে মারছে, কারা কারা মারছে তাদের পরিষ্কার চিত্র থাকলেও বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে, সেখানে তুমি কি বিচার আশা করেছিলে, কি বদল চেয়েছিলে জিজের জীবনের বিনিময়ে?পাগল ছেলে কারো দিন থেমে নেই, শুধু তোমার মায়ের, বাবার আর তোমার পরিবারের সময় থমকে গেছে। দেশে সিস্টেমের কাছে পরাজিত হয়ে মা-বাবাকে কাঁদিয়ে অন্ধ করে গেলে, খুব ভুল সময়ে জন্ম নিয়েছিলে, ভুল দেশে। তোমার মতো ইমাশনাল ছেলের জায়গা এইদেশে না। তোমাদের মতো ছেলেদের মুল্য কেউ দেবে না। তবে তুমি কিন্তু ঠিক বলেছো:

“তোমার মেরুদণ্ডহীন বিদ্বান সূর্য সন্তানেরা তোমার এত উন্নতি করছে সেখানে আমি তোমার কি উপকার করছি বল? তোমার টাকায় পড়ে, খেয়ে তোমার সিস্টেমের বিরোধীতা করছি, তোমার সাথে বেঈমানী করছি। দেখে নিও, আর করব না। সেদিন ভিসি স্যার এবং চেয়ারম্যান স্যারের কাছে মাফ চাইনি। আজ তোমার কাছে মাফ চাইছি। তোমার আর কোন ক্ষতি করব না। আর তোমার বিরোধীতা করব না। সোজা হওয়া এই মেরুদণ্ড ভেঙ্গে নোয়াতে পারব না। সেটা আমার দ্বারা হবে না। সেজন্য অন্য পথটা বেছে নিলাম। ভয় পেয় না। ধর্মান্ধতায় অন্ধ, ক্ষমতাবলে ভীত, অর্থ মোহে ঘুমন্ত এই বালির নিচে মাথা ঢুকিয়ে থাকা উটপাখি সদৃশ জাতি কোনদিনও তোমার ভেঙ্গে পড়ে থাকা মেরুদণ্ড সোজা করার চেষ্টা করে তোমাকে যন্ত্রণা দিবে না। আমার মতো যেসব বেয়াদবেরা তোমার সিস্টেম বাগের কারনে ভুল করে জন্মেছে তারাও আস্তে আস্তে তোমার সিস্টেমের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে। আশাকরি পৃথিবীতে তুমি তোমার উন্নতির ধারা বজায় রাখবে। ভাল থেক।”

খাপ খাইয়ে নেবে কি নিতে শুরু করে দিয়েছে রে ছেলে। আমরা একটা ভয়ংকর সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। জানি না এই ভীতিকর সময়ের ব্যাপ্তি কত লম্বা। দিনের পর দিন অন্যায়ের সাথে আপোষ করতে না পেরে অনেকে ঝড়ে যাবে, আমাদের কারো কিছু যাবে আসবে না, শুধু তালিকা দীর্ঘ হবে।

৩. উৎপলের খবর নেই, সিজারের খবর নেই, নিখোঁজের ১৩ দিন পরও নরসিংদীর এক নারী ও তার তিন মেয়ের খোঁজ মেলেনি। তাদের সন্ধান না পেয়ে ভীষণ উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন স্বজনরা। চাঁদপুরের মতলব উত্তর থানা এলাকার গৃহবধূ তানজিলা আক্তার (২৪) নিখোঁজ হয়েছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর থেকে গত চারদিন ধরে নিখোঁজ রয়েছেন মো. নোমান ওরফে বাঁধন (১৮) নামের এক মাদ্রাসাছাত্র। সাত মাস ধরে নিখোঁজ কিশোর সাঈদ (১৭) ও তার বন্ধু শাওন। খবর নেই আরো কত শত মানুষের।

দিনে দিনে তালিকা শুধু দীর্ঘ হয়ে চলেছে। কেউ নেই কোথাও আমাদের কথা বলার বা ভাবার। আমরা শুধু ঝিনুক নীরবে সহো, বলে চুপ করে থাকবো। আমি নিরাপদে আছি বলে গা বাঁচিয়ে মুখ ফিরিয়ে নেবো। আমরা বড় স্বার্থপর, নিজেরটা ছাড়া কিছু ভাবি না। উৎপলের মায়ের কান্না কেউ শুনবে না, সিজারের মেয়ের প্রশ্নের জবাব কেউ দেবে না। শুধু কান্না আর হাহাকার দীর্ঘ হবে। আমরা মুখ ফিরিয়ে জীবন যাপন করে যাবো। এই বড় স্বার্থপর সময়, এই সময় পাথর সময়।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

বিজ্ঞাপন