চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

উহানের জন্য ভালোবাসা

চীনের উহানে মহামারি চলছে। মনে হচ্ছে খুব পরিচিত কোনো গ্রামের চেনামুখগুলো সব মরে যাচ্ছে। বিভিন্ন বয়সী মানুষ মরছে। মৃত্যুর বিভীষিকার মধ্যে আছে অগণিত মানুষ। চীন পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল দেশ। দেড়’শ কোটির ওপরে মানুষ। দূর থেকে মনে হয় দুই এক লাখ মানুষ মারা গেলে কী এমন হয়! আসলে কি তাই?

প্রত্যেক মানুষই একক পরিধি ধারণ করে থাকে। সেই মানুষটিকে ঘিরে কত গল্প থাকে। কত কাজ থাকে। সেই মানুষটির পৃথক এক পৃথিবী থাকে। সেই পৃথিবীতে উষ্ণ হতে চায় আরো কত মানুষ। মানুষের পৃথিবীতে মানুষই সবচেয়ে দামী। মানুষ মানুষকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। উষ্ণতা বিনিময় করে টিকে থাকে। মানুষ নিজেকে ভালোবেসেই প্রতিনিয়ত দীর্ঘায়ু প্রার্থনা করে। সে যখন মরণব্যাধির কবলে পড়ে আর প্রতিটি মুহূর্তেই ভাবতে থাকে অল্পকিছু পরেই তার নিশ্চিত মৃত্যু। কী বিভীষিকাময় সেই ভাবনা, কী করুণ পরাজয়ের দুঃস্বপ্ন তার কাছাকাছি না গেলে বোঝা যায় না।

আমি পেশাগত কাজে দুইবার উহান গেছি। উহান অন্যরকম এক শহর। হুবেই প্রদেশের রাজধানী। মানুষগুলো চকচকে ঝকঝকে আর আধুনিক। জনবহুল চীনের বর্তমান প্রবণতা হচ্ছে রাস্তাঘাট বা শহরে খুব বেশি মানুষ দেখা যায় না। দৃশ্যত জনবহুল দেশটির জনবাহুল্য খুঁজে পাওয়া যায় না। সুবিশাল দেশে পরিশ্রমী আর বহু বনস্পতির নির্যাসপ্রিয় মানুষ নানা উপায়ে দীর্ঘায়ু লাভ করে থাকেন। যে কারণে আমাদের দেশে যখন কুড়িতে বুড়ির গল্প বলা হয়, চীনে তখন ‘আশিতেও তারুণ্যের হাসি’ দেখা যায়। বড় বেশি নিশ্চিন্ত মানুষ তারা। কারণ, সেখানে সমস্যার চেয়ে সমাধানের রাস্তা বেশি। নামমাত্র ভাত খেয়ে বা না খেয়ে শুধু সবজি আর আমিষ কাঁচা ও সেদ্ধ অসাধারণ প্রক্রিয়ায় খেয়ে সারাটি সময় হাল্কা থাকে মানুষ। দিন দুপুরে অলস ও বিষণ্ণ হয়ে ওঠে না। সেখানে ফার্মেসিতে বেশ কয়েক রকমের ওষুধ পাওয়া যায়। শারীরিক সমস্যায় মানুষ আগে হার্বাল, ইউনানির ওপর ভরসা করে। পরে যায় অ্যালোপ্যাথিতে। আমার একবার চীনের শ্যাংডং এ গিয়ে চরম ঠাণ্ডা অ্যালার্জিতে ধরলো। আমাদের দোভাষী বন্ধু সাদী রাত দশটার পর হোটেলের পাশে একটি ফার্মেসিতে নিয়ে গেলেন। দোকানী আমার কাছে অপশন জানতে চাইলেন, অ্যালোপ্যাথি না ইউনানি? আমি কৌতূহল থেকে বললাম ইউনানি। তিনি অল্প টাকায় একগাদা ওষুধ দিলেন। বললেন, এগুলোর কোনো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই। হার্ব থেকে তৈরি। যা হোক, সে ওষুধ এক ডোজ খেয়েই ঠাণ্ডা চলে গেল। আমার মনে হলো এমন কার্যকর আর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াহীন ওষুধ যদি আমাদের থাকতো!

করোনাবলছিলাম, উহানের চকচকে ঝকঝকে মানুষের কথা। চীনের অন্যান্য এলাকায় জরাগ্রস্ত, এলোমেলো, বিষণ্ণ মানুষ কমবেশি চোখে পড়লেও উহানে দেখিনি। উহানের মানুষ পরিপাটি। উহান তুলনামূলক অনেক দামী শহর। সেখানকার বিপণীকেন্দ্রে জিনিসপত্রের দাম অনেক বেশি। আমরা উহানের এক রঙিন ঝলমলে শপিংমল মলে কয়েকঘন্টা ঘুরেছিলাম। পৃথিবীর বড় বড় ব্রান্ডের পাশাপাশি চীনের দামী ব্রান্ডের পসরা সেখানে। মলের কিছুটা দূরেই বিশাল বিপণীকেন্দ্র। সেখানে হাজারো রকমের খাদ্যের পসরা। রাস্তা থেকে বেশ নীচে পথখাদ্যের দোকানগুলো ঘিরে অগণিত মানুষ। এর ফাঁকে ফাঁকেই গান বাদ্য আর নৃত্য চলছে তরুণ তরুণীদের। জানলাম, ছুটির দিন দুপুরের পর থেকেই খাদ্য ও বিনোদনের এই সমারোহ জমে ওঠে সেখানে। আমরা হারাম হালাল হিসেব করে চলি বলে অনেকটা গা ঘিনঘিন করে, উচ্চশব্দের গান কিংবা আমাদের অজানা অচেনা সুরে কান কালা হওয়ার জোগাড় হয় কিন্তু সত্যি ভালোলাগে উহানের মানুষের বিনোদনপ্রেম দেখে। তাদের সুখ দেখে আমরাও সুখী হয়ে উঠি।

বিজ্ঞাপন

হান নদীর টলটলে জলের পাশে দাঁড়িয়ে উহান ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল দেখি, নির্মাণ সৌকর্যে বারবার বিস্মিত হই। অসাধারণ দৃষ্টিনন্দন এক স্থাপনা। যেন সভ্যতার বিকশিত সময়ে নন্দনের সুস্থির প্রতিনিধিত্ব করছে ওই স্থাপনা। বিভিন্ন প্রদেশ থেকে আসা তরুণ তরুণীদের সঙ্গে উহানে বসে বন্ধুত্ব হয়। মনে পড়ে, হান নদীর পাড়ে এক স্মার্ট তরুণের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। ওর পড়াশোনা সিঙ্গাপুরে। চমৎকার ইংরেজি তার। আমাদের সঙ্গে বেশ বন্ধুত্ব হলো।

এতসব গল্পের সঙ্গে মনে পড়ে উহানের অধিবাসীর কথা। সব বয়সী মানুষের কথা। যাদের চিনিনা, কিংবা কখনো দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নেই তাদের কথাই বেশি মনে পড়ছে। আধুনিকতার চূড়ান্ত বিকশিত সময়ে, তথ্য প্রযুক্তির বৈপ্লবিক সাফল্যের যুগে অজানা অচেনা এক ভাইরাসে মানুষ মারা যাচ্ছে। সন্তান অনিরাপদ হয়ে উঠছে মায়ের জন্য, স্বামী অনিরাপদ হয়ে উঠছে স্ত্রীর জন্য, প্রেমিকা অনিরাপদ হয়েে উঠছে প্রেমিকের জন্য। আক্রান্ত মানব সন্তানকে কীভাবে দূরে সঙ্গনিরোধ করা যায়, সে ব্যস্ততা এখন ঘরে ঘরে। যখন এই লেখাটি লিখছি তখন উহানে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে প্রায় সত্তর হাজার মানুষ। মারা গেছে ১ হাজার ৬’শ ৬৫ জন। এই হিসাবগুলো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পরিবেশ করছে চীন কর্তৃপক্ষ। আমাদের দেশের মানুষ অনুমান করে আক্রান্তের সংখ্যা বহু বহুগুণ বেশি। মারা গেছেন হয়তো রিপোর্টেড সংখ্যার চেয়েও বেশি। তারপরও আতংক নয়, সচেতনতা। মানুষকে সচেতনতা নিয়েই বাঁচতে হবে, আবেগ ঝেড়ে মুছে মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সচেতন হয়ে থাকতে হবে। এই পৃথিবীতে প্রবাহিত অক্সিজেন যদি বুকের ভেতর প্রবেশ করে, তাহলে তা হোক সচেতনতার, হোক আস্থার, হোক বেঁচে থাকার পক্ষে এক কঠিন বিশ্বাসের।

করোনাউহান আমাদের দেশেও ছড়িয়েছে যথেষ্ট আতংক। আমরা আমাদের মতো করে ভাবছি। খুব কাছের স্বজন যদি করোনা ভাইরাসের মতো কঠিন কোনো জীবাণু আক্রান্ত হয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়, তখন আমাদের পরিস্থিতি কী হবে? আমিও যদি আতংকে থাকি নিশ্চিত মৃত্যুর, যাকে ভরসা করা যায়, এমন মানুষগুলোও যদি একই মহামারিতে মৃত্যুর মুখে পতিত হত, তাহলে কি হতো আমাদের? আমাদের দেশেও বহুরকম আলোচনা চলছে। একদল বলছেন, চীন ইসলাম বিদ্বেষের খেসারত দিচ্ছে। সেদিন মসজিদের মোনাজাতে প্রার্থনা করা হচ্ছিল, হে আল্লাহ্ মুসলমানদেরকে এই ভাইরাসের হাত থেকে রক্ষা করুন! এই মোনাজাত আমিও ধরেছিলাম। এক্ষেত্রে আমার নিজেকে কিছুক্ষণের জন্য স্বার্থান্ধ মনে হয়েছে।

উহান ভেতরে ভেতরে এখন বিপন্ন বিধ্বস্ত! শহরের নান্দনিক অট্টালিকাগুলো আছে, হয়তো সবখানেই মৃত্যুর বিভীষিকা। জানা অজানা কষ্ট ও শঙ্কার মধ্যে কঠিন জীবন কাটছে জনসাধারণের। প্রার্থনা করি, উহানবাসী মুক্ত হোক এই বিভীষিকা থেকে। উহানবাসীর হাসি এখন গোটা পৃথিবীর জন্য সবচেয়ে বড় বিজয় হতে পারে। করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের টিকা, ওষুধ আবিষ্কৃত হোক। মানুষ নিজেকে উদ্ধার করতে শিখুক সমূহ বিপদ থেকে। সভ্যতার এই বিকশিত ও উন্নত সময়ে মানুষ নিজের অসহায়ত্বের কথা স্মরণ করে চিরতরে নমনীয় হোক।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন