চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

উদ্যোক্তারা ঝুঁকছে বিদেশি ঋণের দিকে

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদেশি ঋণ দেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে

ঋণ দেয়ার লাগামহীন প্রতিযোগিতার কারণে বর্তমানে প্রতিটি ব্যাংকেরই চরম অর্থ সংকট চলছে। তাই তারা উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করছে। কিন্তু আমানতের সুদ বেড়ে যাওয়ায় বাড়ছে ঋণের সুদ হার। এতে বিপাকে পড়েছে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা। উচ্চ সুদ হার থেকে বাঁচতে তারা এখন বিদেশি ঋণের উপর নির্ভর হয়ে পড়ছে।

জানা গেছে, লাইবরের (লন্ডন ইন্টার ব্যাংক রেট) সঙ্গে অতিরিক্ত ৪ শতাংশ দিলেই বিদেশী ঋণ পাওয়া যায়। ফলে বিদেশী ঋণের সুদ পড়ছে সাড়ে ৬ শতাংশ। যেখানে দেশি ঋণে সুদ হার পড়ে ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি মিলে বেসরকারি পর্যায়ে বিদেশি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪৫০ কোটি ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় সোয়া লাখ কোটি টাকার (প্রতি ডলার ৮৫ টাকা হিসেবে) মতো। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৯ বিলিয়ন বা প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকাই স্বল্পমেয়াদি (এক বছরের কম মেয়াদে) ঋণ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বেসরকারি পর্যায়ে বৈদেশিক ঋণ বেড়ে যাওয়ায় দায় বাড়ছে দেশের ওপর। কারণ, এসব ঋণ হলো সরবরাহ ঋণ, যা হার্ড লোন হিসেবে পরিচিত। অর্থাৎ এ ঋণের সুদ নির্ধারণ হয় বাজার রেটে। এ কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব ঋণের সুদ তুলনামূলকভাবে বেশি হয়ে যায়।

আবার এসব ঋণ নেয়া হয় বিদেশি মুদ্রায়, বিনিয়োগ করা হয় স্থানীয় মুদ্রায়। পরিশোধও করতে হয় বিদেশি মুদ্রায়। সুতরাং এসব ঋণ বেশি হলে দেশের ওপর চাপ পড়ে। মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে। এ কারণে এসব ঋণ সীমার মধ্যে রাখাই উত্তম।

তারা আরও বলেন, যেহেতু উন্নয়ন হচ্ছে, জিডিপি বাড়ছে। তাই দেশের টাকা দেশেই থাকার কথা। যদি দেশে নগদ টাকার সংকট দেখা দেয় তাহলে বুঝতে হবে অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে। এটি সংশ্লিষ্টদের খতিয়ে দেখা উচিত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘মনে হয় তারল্য সংকট খুব বেশি নয়, কিছুটা থাকতে পারে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে ঋণের সুদ হার একটু বেশি, বিদেশে তুলনামূলক কম সুদে ঋণ পাওয়া যায়। ইংল্যান্ডে সুদ হার ৫ শতাংশের কম। তাই অনেকে বিদেশি ঋণে ঝুঁকি নিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

তারল্য সংকট দেখিয়ে অর্থ পাচার হচ্ছে কিনা বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত মন্তব্য করে ইব্রাহীম খালেদ বলেন, যেহেতু দেশে উন্নয়ন বাড়ছে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ ভাগ এর কাছাকাছি তাহলে টাকা তো দেশেই আছে। যদি দেশে উন্নয়ন না হয় তাহলে বুঝতে হবে টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। ফলে উদ্যোক্তারা বিদেশি ঋণে ঝুঁকছে।

তবে এসব ঋণে উৎসাহ দেয়া মোটেও ঠিক হবে না। বিদেশি ঋণ অনুমোদনের জন্য যে কমিটি রয়েছে তাদেরকে শক্ত হাতে এ বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে বলে জানান তিনি।

সাবেক তত্ত্বাবধারক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম।
সাবেক তত্ত্বাবধারক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবি মো. মির্জা আজিজুল ইসলাম চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, তারল্য সংকট তো ইদানিংকালের কিন্তু বিদেশে থেকে ঋণ নেয়ার প্রবণতা বেশ পুরোনো। এর কারণ হলো বিদেশি ঋণে সুদ হার কম, সাড়ে চার বা পাঁচ শতাংশ। কিন্তু দেশি ঋণে সুদ প্রায় ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ।

তবে এক্ষেত্রে দুটো ঝুঁকি বা নেতিবাচক দিক রয়েছে
এক. কারেন্সি মিস ম্যাচ। অর্থাৎ বিনিয়োগ করে অর্থ উপাজর্ন করতে হবে দেশি মুদ্রায় আর ঋণ পরিশোধ করতে হবে বৈদেশিক মুদ্রায়। এর ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, যে পরিমাণ বিনিয়োগ করা হবে সেটা থেকে যদি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন না করা যায় তাহলে সার্বিকভাবে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদার উপর চাপ পড়ে। ফলে মুদ্রা বিনিময়ের উপর চাপ পড়ে। এ কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়।

দুই. মেচিউরিটি মিস ম্যাচ। অর্থাৎ এই ধরনের ঋণ সাধারণত ২ থেকে ৩ বছরের জন্য নেয়া হয়। কিন্তু যদি এমনভাবে বিনিয়োগ করা হয় যে, ৫ বা ৬ বছর পর মুনাফা আসবে। তাহলে সেক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে। তখন অর্থনীতির উপর প্রচন্ড আঘাত আসতে পারে।

মির্জা আজিজুল ইসলাম আরও বলেন, পূর্ব এশিয়ায় ১৯৯৭-৯৮ সালে যে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছিল তার পেছনে মূল কারণ ছিলো এ বৈদেশিক ঋণ। আমাদের দেশে মনে হয় এ ঋণ এখন আতঙ্কজনক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তবে যেসব ক্ষেত্রে উপার্জন করা যাবে সেক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা উচিত।

বৈদেশিক ঋণ বাড়ছে কেন
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ২০১০-১১ অর্থবছরের দিকে যখন ব্যবসায়ীদের বিদেশী ঋণ আনার অনুমোদন দেয়া হয় তখন দেশীয় ব্যাংকগুলোর তারল্যসঙ্কট চলছিল। টাকার সঙ্কটের কারণে ঋণের সুদ হার বেড়ে যায়। তখন ব্যাংকগুলোও উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করে। ফলে ঋণের সুদ হারও বেড়ে যায়। তখন সর্বোচ্চ সুদের হার ছিল ১৪ টাকা। উচ্চ সুদে আমানত নিয়ে ১৮ থেকে ২০ শতাংশ হারে ঋণ দিতে থাকে ব্যাংকগুলো। এতে পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়। বেড়ে যায় মূল্যস্ফীতিও।

আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ের কারণে ব্যাংকগুলো চরম অর্থ সংকটে রয়েছে। এ সংকট মেটাতে উচ্চ সুদে অর্থাৎ গড়ে প্রায় প্রতিটি ব্যাংকই এখন ডাবল ডিজিটে আমানত সংগ্রহ করছে। কোনো কোনো ব্যাংক ১৪ শতাংশ পর্যন্ত সুদে আমানত নিচ্ছে। উচ্চ সুদে আমানত নেয়ায় স্বাভাবিকভাবেই ঋণের সুদহার বেড়ে গেছে। এমনি পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তারা বিদেশী ঋণের প্রতি ঝুঁকি নিচ্ছে।

যেভাবে বিদেশি ঋণে সুদ বেশি হতে পারে
বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা জানায়, এসব ঋণের সুদ আপাতত কম মনে হলেও কার্যকরী সুদহার আরো বেড়ে যাবে। যেমন- একজন বিনিয়োগকারী বিদেশ থেকে সাড়ে ৬ শতাংশ হারে ১০০ কোটি ডলার (৮৪ টাকা প্রতি ডলার হিসেবে) ঋণ গ্রহণ করল। এক বছর পর প্রতি ডলার ৯০ টাকা হলে প্রতি ডলারে টাকার মান কমে প্রায় ৭ শতাংশ। ডলারে ঋণ করে টাকায় ব্যয় করলেও ডলারে পরিশোধ করায় বিনিময় হারের কারণে সুদ ব্যয় বেড়ে হবে (৬.৫+৭) সাড়ে ১৩ শতাংশ। এভাবে কেউ ৫ বা ১০ বছর মেয়াদি বিদেশী ঋণ নিলে কার্যকরী হার অনেক বেড়ে যাবে। যেমন, ২০১৬ সালে প্রতি ডলার ছিল ৭৯ টাকা, বর্তমানে যা আমদানি পর্যায়ে ৮৫ টাকায় উঠে গেছে।