চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ই-আর্কাইভে বিদেশী পত্রিকায় মুক্তিযুদ্ধ

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সারাবিশ্বকে নাড়া দিয়েছিল। শীতল যুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বৃহৎ গণহত্যা, স্বাধিকারের জন্য লড়াই, পৃথিবীর সর্ববৃহৎ রিফিউজি ক্রাইসিস-নানান কারণে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সারা বিশ্বে প্রভাব ফেলেছিল। আর এর বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখতে পাই, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রকাশিত আন্তর্জাতিক পত্র-পত্রিকায়।

কিন্তু বিশ্বের নানান দেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংবাদপত্রে প্রকাশিত এসব রিপোর্ট আমাদের দেশে সহজলভ্য নয়।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ডিজিটাল পাবলিক লাইব্রেরি মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ মুক্তিযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইংরেজিতে প্রকাশিত পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রকাশিত প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার ৮৫৬ টি সংবাদ, ফিচার, চিঠি তথা কনটেন্ট সংগ্রহ করেছে।

কিছুদিন আগে আমেরিকা, কানাডা, যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড থেকে মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রকাশিত প্রায় ৩০ হাজার নিউজ কনটেন্ট সংগ্রহ করে অনলাইনে উন্মুক্ত করেছে নাগরিক উদ্যোগ মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ।

এই নিউজ কনটেন্টের সংগ্রাহক ও মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভের প্রতিষ্ঠাতা আমেরিকা প্রবাসী তরুণ আইটি পেশাজীবী সাব্বির হোসাইন।

মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভের পেছনের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন: মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভের কাজ শুরু করি ২০০৭ সালে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক তথ্যের কনটেন্ট সংগ্রহের কাজ করার মধ্য দিয়ে এর যাত্রা শুরু। পরে ২০১৪ সালে পরীক্ষামূলক ওয়েব পোর্টাল হিসেবে আমরা আত্মপ্রকাশ করি। জাহিদ খান ও শিহাব খান সহপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। পরে মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে খুলনার মুক্তিযোদ্ধা শেখ মো. কাশে, ট্রাস্টি হিসেবে দেওয়ান মাবুদ, সভাপতি হিসেবে শান্তা আনোয়ার যোগ দিয়েছিলেন। ২০১৬-র শেষে মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ মুক্তিযুদ্ধের সময় সারাবিশ্বে প্রকাশিত নিউজ রিপোর্ট ডিজিটাইজেশান করে সংরক্ষন করার কাজ করছে। আন্তজার্তিক পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধের রিপোর্ট সংগ্রহের প্রকল্পটি মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ শুরু করেছিল ২০১৭ সালে। মোট ১ লাখ ২৪ হাজার ৮৫৬ টি কনটেন্ট সংগ্রহ করা হয়েছে। এগুলোকে আমরা পাঁচ খন্ডে ভাগ করেছি কাজ করছি। সম্প্রতি আমরা প্রথম খন্ড প্রকাশিত করেছি। প্রথম খন্ডে মোট কনটেন্টের সংখ্যা ২৬ হাজার৭৯২ টি। প্রথম খন্ডে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার আঞ্চলিক পত্রিকাগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ থেকে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক পত্রিকার রিপোর্ট সমগ্রের প্রথম খন্ডে মূল অর্জিনাল ডেটার সাইজ প্রায় ৫ টেরাবাইট, যা পাঠকদের পাঠের সুবিধার জন্য কমপ্রেস করে মোট ১১৯ জিবিতে আনা হয়েছে।

সাব্বির জানালেন, মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ পাঠক-গবেষকরা বিনামূল্যে ব্যবহার করতে পারেন। আমাদের সকল কনটেন্ট ডিজিটাইজ করা। তাই, ইন্টারনেট ব্যবহার করে মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ যেকোন জায়গা থেকে ব্যবহার করা যায়। ই-আর্কাইভে আছে কয়েক হাজার বই, হাজার খানেক ভিডিও ফুটেজ-ডকুমেন্টারি-অডিও ক্লিপস, মুক্তিযোদ্ধাদের সকল তালিকা, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক পত্রিকা ও ছবি।

বিজ্ঞাপন

দারুণ সাড়া পাচ্ছেন জানিয়ে সাব্বির হোসাইন বললেন, মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভের ওয়েবসাইটে প্রতিদিন ১৫ হাজার পাঠক আসেন। গবেষণার কাজেও আমরা সহযোগিতা করছি। দেশ-বিদেশ থেকে প্রচুর গবেষককে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছি আমরা।

সাব্বির হোসাইন

মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ নাগরিক উদ্যোগ। হাজারো মানুষের অবদান আছে মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভে। সব কাজের মত এখানেও প্রতিবন্ধকতা আছে, মানুষের স্বতঃস্ফুর্ত সহযোগিতাও আছে।

বিদেশি পত্রিকার কন্টেন্ট সংগ্রহ করার চিন্তা কিভাবে এলো জানতে চাইলে সাব্বির হোসাইন বলেন, “রুয়ান্ডা, কম্বোডিয়া, বসনিয়া গণহত্যার তথ্যগুলো খুব পূর্ণাঙ্গ ও সুসংগঠিতভাবে সংগ্রহ করা আছে। এসব গণহত্যা সম্পর্কে যে কেউ জানতে চাইলে সহজেই তা পেয়ে যায়। কিন্তু আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে দলিল-দস্তাবেজ, বই, পত্রিকা কাটিং ইত্যাদি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, এখনো তা সহজলভ্য নয়। নিউইয়র্কের একটি লাইব্রেরির আর্কাইভে আমি ১৯৭১ সালের কিছু পত্রিকা দেখি। তারপর ভাবলাম বিদেশি পত্রিকায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক নিউজগুলো সংগ্রহ করে রাখি। হয়তো ভবিষ্যতে কাজে দেবে। সেই ভাবনা থেকে সংগ্রহ করা শুরু করি। তারপর আমেরিকার অনেক পাবলিক লাইব্রেরি থেকে পত্রিকা সংগ্রহ শুরু করি। পাবলিক লাইব্রেরিতে আবার সবকিছু পাওয়া যায় না। আমরা কিছু পত্রিকা বিভিন্ন বাণিজ্যিক আর্কাইভ থেকে ক্রয় করেছি। যেমন: লেক্সাস নেক্সাস, আমেরিকান নিউজপেপার আর্কাইভ, ব্রিটিশ নিউজপেপার আর্কাইভ থেকে আমরা বহু কন্টেন্ট সংগ্রহ করেছি। পরে সেগুলো বাংলাদেশের মানুষদের জন্য ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণ করে প্রকাশ করেছি।”

মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভের ওয়েব পোর্টালে (www.liberationwarbangladesh.org) পত্রিকা বিষয়ক এই বিশাল সংগ্রহের প্রথম খণ্ড সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া আছে।

মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভের প্রতিষ্ঠার পেছনে লক্ষ্যের কথা জানতে চাইলে সাব্বির বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত চেতনাতে বলীয়ান বাংলাদেশের অচলায়তন ভাঙবে না। আমরা চেয়েছি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ক কনটেন্ট প্রান্তিক পর্যায়ে ইন্টারনেট প্রযুক্তির মাধ্যমে পৌঁছে দিতে। এতে করে মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সহজলভ্য হবে। মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস-চেতনা সম্পর্কে সচেতন করা ও ইতিহাস বিকৃতি রোধ করাই ছিল আমাদের মূল লক্ষ্য।

মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অনেকটা পাবলিক লাইব্রেরির ধারণায়। অর্থাৎ এখানে পাঠকরা বই, পত্রিকা, দলিল-দস্তাবেজ ইত্যাদি অনলাইনে পড়তে পারবেন, কিন্তু ডাউনলোড করতে পারবেন না। সাব্বির হোসাইন বলেন, “২০০৭ সাল থেকে মূলত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক দুর্লভ বই, ছবি ও পত্রিকা কাটিং সংগ্রহ করতাম। পরে ২০১৩ সালে যখন গণজাগরণ মঞ্চে রাজাকার বিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে— তখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিছু দুর্লভ বইয়ের প্রয়োজন পড়ে। একটি বইয়ের নাম মনে আছে— মুশতারী শফী’র লেখা রক্তে ঝরা দিন। তখন এ বইটির খোঁজ করছিলাম, কিন্তু কোনো লাইব্রেরিতেই পাইনি। লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, তার কাছেও মাত্র এক কপি আছে। তখন এক বন্ধু জানালো এ বইটি শুধু ঢাকার নীলক্ষেতে পুরাতন বইয়ের একটি দোকানে পাওয়া যাবে। আমি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে এ বইটি সংগ্রহ করি। তখন ভাবলাম— মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যারা কাজ করেন বা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে পড়তে আগ্রহী তাদের কাছে এরকম দুর্লভ বইয়ের প্রয়োজন নিশ্চয়ই আছে। এরকম ভাবনা থেকেই মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভের সূচনা হয়।”

তবে বই, পেপার কাটিং ইত্যাদি ডিজিটাইজ করলেও তা কেউ ডাউনলোড করতে পারবেন না মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ থেকে। এ বিষয়ে সাব্বির হোসাইন বলেন, যেহেতু বইয়ের ব্যাপারে কপিরাইটের বিষয় আছে তাই আমরা পাবলিক লাইব্রেরির ধারণা অনুসরণ করলাম। পাবলিক লাইব্রেরিতে যেমন কেউ গিয়ে যে কোনো বই পড়তে পারবেন কিন্তু বাড়িতে নিয়ে যেতে পারবেন না, ঠিক একইভাবে আমাদের ওয়েবসাইটে ঢুকে যে কেউ শুধুমাত্র অনলাইনে পড়তে ও দেখতে পারবেন কিন্তু ডাউনলোড দিতে পারবেন না।

পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের তথ্য ও ইতিহাসের যে বিকৃতি ঘটেছিল— তা রুখে দিতে ইন্টারনেট প্রযুক্তির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক তথ্য প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ।