চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ইসলামের ইতিহাসের পথ ধরে মক্কা

আমি, আমার মা, ভাই ও ভাইয়ের বউ বেরিয়ে পড়লাম ওমরাহ করার উদ্দেশ্যে। ওমরাহ করার পাশাপাশি আমার ইচ্ছে ছিল ইসলামের স্মৃতি বিজড়িত এই দুটি শহর মক্কা ও মদিনা খুব ভাল করে দেখা। ছোটবেলা থেকে এসব এলাকা সম্পর্কে যা শুনেছি, যা পড়েছি , বারবার তা মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেছি। যারা হজ্জ্ব করতে যান, তারা বিভিন্ন ধরণের রিচ্যুয়াল নিয়ে এতটাই ব্যস্ত থাকেন যে, তাদের সময়ই হয়না চারপাশটা ভাল করে দেখার। কিন্তু আমরা এই সুযোগটা বের করে নিয়েছি। চেষ্টা করেছি ইসলামের ইতিহাসের পথ ধরে হাঁটার । সেখান থেকেই কিছু অভিজ্ঞতার কথা লিখছি।

জেদ্দার উদ্দেশ্যে সওদিয়া বিমানে চড়ার সময়ই লক্ষ্য করলাম পুরুষদের মধ্যে যারা ওমরাহ করার জন্য যাচ্ছেন, তারা প্রায় সবাই এহরাম পরে নিয়েছেন । ওমরাহ্ বা হজ্জ করতে হলে ছেলেদের এহরাম পরতেই হবে। নারীদের মধ্যে প্রায় সবাই চুল ঢেকে নিয়েছেন ।

এহরাম পরা ও সামলানো
আমার পাশের সিটে ১১/১২ বছরের দুই ভাই এহরাম পরেছে। খানিক পরই দেখলাম ওরা খালি গায়ে হাঁটাহাঁটি করছে। ওদের বাবা বারবার এহরাম ঠিক করে দিচ্ছিলেন। একসময় দেখলাম এহরামের উপরের অংশটা ওরা পেটের সাথে বেঁধে নিয়েছে। গা খালি। আর ওদের নিচের অংশের কাপড়টি বেল্ট দিয়ে আটকানো।

সারা রাত, মানে সাড়ে সাত ঘন্টা চলার পর, নামার আগে আমার ভাই গেল এহরাম পরতে। এহরাম পরার পর ওর অবস্থাও দেখলাম ঐ বাচ্চা দুটির মত। বারবার চাদর খুলে যাচ্ছে। নিচের অংশটা ঠিক রাখতে প্যান্টের বেল্ট খুলে লাগাল। লুঙ্গির উপর বেল্ট পরা আরকি। কিন্তু এই কাপড়ের টুকরাটা লুঙ্গির চেয়ে ভারী। লুঙ্গিতে সেলাই আছে, কিন্তু এতে তাও নেই। কাজেই বেল্ট ও কাজ করছেনা ঠিকমতো। এহরাম সেলাই ছাড়া দুই টুকরা কাপড়। বাঁধা ছাড়া আর কোন উপায় নাই একে সামলে রাখার।
এহরাম পরে জোরে জোরে হাঁটার সময় আমার ভাই নাকি হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরেছিল, যাতে নিচের অংশটা খুলে গিয়ে কোন বেইজ্জতি না হয়। যদিও চওড়া একটা বেল্ট দিয়ে শক্ত করে বেধে নিয়েছিল। সবাইকেই দেখলাম বেল্ট দিয়ে এহরাম বাঁধার চেষ্টা করেছে । আমার ভাইয়ের পরামর্শ হচ্ছে ওমরা বা হজ্জ করতে চাইলে এই এহরাম বাধা প্রাক্টিস করা উচিৎ। কারণ শহরের ছেলেরাতো আজকাল আর লুঙ্গি পরে না, পরে শটস অথবা প্যান্ট। কাজেই সেলাই ছাড়া এই বস্ত্র খন্ড সামলান বেশ কঠিন একটা ব্যাপার।

পবিত্র মক্কায় প্রবেশ
জেদ্দায় নামার পর দেখলাম হাজিদের মূল এয়ারপোর্ট থেকে একটু দূরের টার্মিনালে নিয়ে যাওয়া হল। ঐ টার্মিনালটি তেমন ঝকঝকে, তকতকে নয়। অনেক বাংলাদেশী কাজ করছেন সেখানে। কাজেই সিমসহ অন্য কোন সহযোগিতা পেতে কোনই অসুবিধা হবেনা।

মক্কা শরীফের চারপাশে পাথুরে পাহাড়, মরুভূমি, ছোট ছোট গুল্ম আর কিছু খেজুর গাছ। তেমন কোন গাছ গাছালি না থাকলেও বহু সুউচ্চ, সুসজ্জিত ভবন চোখে পড়ল। এর অনেকগুলোই হোটেল। সারাবছরই হাজি দিয়ে ভরা থাকে বলে আমাদের চালক জানালো।

আমরা যখন মক্কা শরীফে একেবারে কাবা’র কাছাকাছি পৌঁছলাম, তখন প্রায় সকাল ১০টা বাজে। জুম্মা শুরু হতে এখনো আড়াই ঘন্টা বাকি। সেখানে পৌঁছে দেখলাম লাখ লাখ মানুষ কাবা অভিমুখে যাচ্ছে।

আমাদের ড্রাইভার বলল, ১০টার পর এখানকার সব রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয়। আমাদের হোটেলটা ছিল কাবা শরীফের একদম সামনে। ফলে একটু দেরি হলে মাল-সামানা টেনে নিয়ে আমাদের হেঁটে এগুতে হতো।

সে যাক আমি শুধু ভাবছিলাম, যদি ওমরাহর সময় এত মানুষ হয়, তাহলে হজ্জ্বের সময় না জানি কী অবস্থা হয়। এখানে থাকার পর আমার মনে হয়েছে যাদের সাথে বয়স্ক মানুষ থাকবেন বা যাদের হাঁটতে কষ্ট হয়, তাদের উচিৎ কাবা শরীফের কাছাকাছি থাকা। নতুবা প্রখর রোদে হাঁটা বেশ কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে।

ওমরাহ মূলত খুব অল্প সময়ের একটি রিচ্যুয়াল। সাতবার তওয়াফ, সাতবার সাফা-মারওয়া দৌঁড়ানো, সামান্য চুল কাটা এবং ২ রাকাত নামাজ আদায়। এরপর সবাই তাদের নিজেদের মত করে ইবাদত করেন।

প্রথম পবিত্র কাবা শরীফ দর্শন
জুম্মা ছিল বলে তাড়াহুড়ো করে নেমেই গেলাম কাবা শরীফে। কিন্তু একি, তিল ধারণের জায়গা নেই কোথাও। আমরা চারতলা অথবা পাঁচতলায় উঠে গেলাম, ঠিক ঠাহর করতে পারলাম না, ভীড়ের কারণে। মাথার উপরে খাড়া সূর্য। মানুষের উপর মানুষ, ৭০/৮০ বছরের বুড়ো থেকে কোলের শিশু, কোন ভেদাভেদ নেই, আলাদা করে কোন পর্দার ব্যবস্থা নেই। কেউ নামাজ পড়ছেন, কেউ দোয়া, কেউ তাওয়াফ করছেন, কেউ কাঁদছেন, কেউবা শধুই কাবা’র দিকে তাকিয়ে আছেন। সবাই শুধু প্রার্থনা করছেন — এরকমই একটি পরিস্থিতি কাবা’র চারপাশ ঘিরে। কিছুক্ষণ পরপর জমজম পানি পান করার ব্যবস্থা রাখা আছে। আছে হুইল চেয়ার ও বসার চেয়ারের ব্যবস্থা। এমনকী হোটেলের রুম থেকেও হুইল চেয়ারে নিয়ে আসার ব্যবস্থা আছে।
যারা এখানে সারাদিন থাকবে বলে এসেছেন তারা খাবার দাবার সাথে নিয়েই এসেছেন। খাচ্ছেন, ঘুমোচ্ছেন, নিজেদের মধ্যে গল্প করছেন, দোয়া পড়ছেন, কোরআন পড়ছেন, নামাজ আদায় করছেন। এই এলাকার একমাত্র পাখি কবুতর, ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ছে। হয়তো আরও পাখি আছে, আমি দেখিনি। বাংলাদেশি আর পাকিস্তানি, আফগানি এবং বার্মিজরা সবধরনের কাজের সাথে জড়িত। কিছু ভারতীয় মুসলমানও আছে। আমাদের মুখে বাংলা শুনে অনেক বাঙালি এগিয়ে এসেছে সাহায্য করার জন্য। কাবা শরিফ এর চারপাশে এত বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিক যে আরবি-ইংলিশ কিছুই দরকার হচ্ছে না, বাংলাই যথেষ্ট। প্রকৃতপক্ষে মক্কা তীর্থযাত্রীদের শহর।

মক্কা-উমরাহ
উমরাহ করতে যাওয়া বাংলাদেশীদের একাংশ

নারী হিসেবে প্রথম জামাতে নামাজ
বাংলাদেশে, মানে আমাদের দেশে, নারীদের মসজিদে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত। তাই এত খোঁজখবর করে, এত নিয়ম মেনে, অনেক নারীই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও জামাতে নামাজ পরতে যান না। মক্কা-মদীনাতে দেখলাম সব মেয়েরা জামাতেই নামাজ আদায় করছেন। এমনকী আশেপাশের মার্কেটের সিঁড়িতে, ফুটপাতে পর্যন্ত বসে গিয়েছেন।

আমরাও বহু কষ্টেসৃষ্টে মসজিদের বাইরের খোলা জায়গায় বসতে পেরেছিলাম। তাও গার্ডরা এসে একে সরাচ্ছে, তাকে সরাচ্ছে, হাঁটার রাস্তা বের করার জন্য। তারা আরবিতে কথা বলছে দুনিয়ার সব দেশের লোকের সাথে। তবে ইশারা ভাষা বেশ কার্যকর বলে মনে হলো। এখানে আজানের সাথে সাথেই নামাজ শুরু হয়। তাই আগেই জায়গা দখল করতে হয়। ইমাম সাহেবের আজান খুব সুরেলা এবং সংক্ষিপ্ত। আমাদের পাড়ার আজানের মত একদমই নয়। আমরা যারা কখনো জামাতে নামাজ পড়িনি, তাদের জন্য এটা একটা আলাদা অভিজ্ঞতা। ইমাম সাহেব শুধু ফরজ অংশটুকুই পড়ান, বাকিটা যার যার মত করে পড়ে নেন। অনেকে শুধু ফরয নামাজটা পড়েই চলে যান। তবে গায়েবানা জানাজা পড়ানো হয় প্রতি ওয়াক্তে। আর যাই হোক ছবি তোলা কিন্তু থেমে নেই মানুষজনের।

পবিত্র কাবা শরিফের কাছাকাছি যাওয়া
কাবা শরিফের এলাকার মধ্যে মানে কাছাকাছি পৌঁছানো বেশ কঠিন একটা ব্যাপার। এই ওমরার সময়কার ভীড় দেখে, হজের সময় কি হয় আমি তা ভাবতেই পারছি না। কারণ এই সময়ও লাখ লাখ মানুষ রাতদিন মিলে ২৪ ঘণ্টা কাবা তাওয়াফ করতে আসছে। ভেতরে প্রবেশের জন্য তাই আমরা গভীর রাতকেই বেছে নিয়েছিলাম। তখন কিছুটা কম ভিড় থাকতে পারে বলে মনে করেছিলাম। কিন্তু না, সেসময়ও মানুষ উপচে পড়ছে। তাও ঠেলেঠুলে ঢুকে পড়লাম মসজিদুল হারামের ৮৮ নং গেট দিয়ে। নাম্বারটা মনে রাখলাম এজন্য যে, যেন বেরুনোর সময়ও এই গেট দিয়ে বের হই। তাতে পথ হারানোর ভয় থাকেনা।

মক্কায় নারীরা
মক্কায় নামাজের আগে মহিলারা

আমি একটু অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, রাস্তা দিয়ে হেঁটে এসে সরাসরি গেট দিয়ে ঢুকে, আমরা যখন জনস্রোত ধরে এগুচ্ছি কাবা’র কাছাকাছি যাব বলে, তখন দেখলাম কাবা শরীফ ঠিক এই সমতলে নয়, আরেকটু নীচে। মানে আমাদের সিঁড়ি বেয়ে একটি ফ্লোর নীচে নামতে হল। অথচ এই ব্যাপারটা আমরা জানতামই না।

গিয়ে দেখলাম মানুষ তাওয়াফ করছে। চারপাশে ভিড় করে নামাজ পড়ছে, দোয়া-দরুদ পড়ছে, কান্নাকাটি করছে। যে যেভাবে পারছে, সেভাবেই করছে। নারী-পুরুষ, দেশ-কাল, রঙ কোন ফারাক নাই। কেউ নামাজ পড়ছে, কেউবা তারই সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। কেউ ছবি তুলছে। সেলফিও বাদ নেই। আমরা যে নিয়মের কথা শুনে এসেছি ছোটবেলা থেকে, সেরকমভাবে কোথাও কোন কঠোর নিয়ম কানুন নেই। তবে দলছুট হলে বিপদ, পথ হারানোর আশংকা।

Advertisement

মক্কায় নামাজের ফাঁকে সেলফি

খোদ কাবা শরিফের সামনেও
একদিন রাত ১১/১২ টা নাগাদ আমরা কাবা শরিফে গিয়েছিলাম। কিন্তু ব্যাপক ভিড়ের কারণে আমরা আলাদা হয়ে পড়ি। আমার ভাই আমাদের খোঁজার জন্য যখন এদিক ওদিক ঘুরছিল, সেসময় একটা ছেলে ও মেয়ে এসে ওকে হিন্দিতে বলে যে ওরা স্বামী-স্ত্রী হায়দারাবাদ থেকে এসেছে। ছেলেটির পরনে এহরাম। আজকে ওমরা করার সময় ওদের হাতের ব্যাগটা হারিয়ে গেছে। তাই কিছু সাহায্য চাচ্ছে। ঐ ব্যাগেই ওদের টাকা, পাসপোর্ট সবকিছু চাইতে বেরিয়েছে। ওরা এসেছে করাচী থেকে। আমার ভাই ওদের ১৫ রিয়াল দিয়ে দিল।

কিছুদূর সামনে যাওয়ার পর ওর সামনে আরেকটি ছেলে এসে বলল আমি করাচি থেকে বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে এসেছি। বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়েছে বলে, তাকে হাসপাতালে নিয়েছি। এখন টাকা নাই। কিছু সাহায্য যদি দেন। এবার আমার ভাই ব্যাপারটা বুঝতে পারলো। এই বেটারা সব ঠক।

ও ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে বলল, “কি ব্যাপার? তোমরা কি আল্লাহর ঘরের সামনে ঠক ব্যবসায় নেমেছ? এখনি একজন সাহায্য চাইল, এখন তুমি চাচ্ছ ? অজুহাত একইরকম।” যেই না বলা, ওমনি ব্যাটা “মাফ কিজিয়ে, মাফ কিজিয়ে” করতে করতে কেটে পড়লো।

ভাই হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। খোদ কাবা শরীফের দরজায় দাঁড়িয়ে একদল লোক মানুষ ঠকাচ্ছে!!! না জানি এদের বুকের পাটা কতখানি। কিছু লোক দেশে ফিরে গিয়ে পুনরায় মানুষ ঠকানো শুরু করে সত্যি, কিন্তু এরাতো এক কাঠি এগিয়ে। কাজেই হজ্জ্ব বা ওমরাহ বা কুলখানি বা কবরখানা বা মিলাদ, যেখানেই যান বাটপাররা কিন্তু থাকবেই। মন নরম করে ঘুরে বেড়ানোর কোন সুযোগ নাই।

মক্কা-ক্বাবা
রাতের মক্কা

নারী হিসেবে আরব মুল্লুকে প্রথম ধাক্কা
আরব দেশের রুটি, তরকারি আর চাটনি খাব বলে আরবীয়দের দোকানে গেলাম। খেতে চাইতেই দোকানদার আরবীতে ক্রমাগত কি যেন বলতে লাগলো আর মাথা নাড়তে লাগলো। বোঝা গেল সে বলছে, এইখানে খাওয়া যাবে না। ইশারায় বললাম, ভাই কেন খাওয়া যাবে না? ঐ যে মানুষ খাচ্ছে? বলল, “নো উইম্যান, নো উইম্যান”, এই কথা বলেই নিজের কাজে চলে গেল।
তবে পরে একটি নন-আরব হোটেলে রুটি, ডাল, কাবাব খেয়েছি। এই দেশে তরকারির সাথে রুটি ফ্রি। চারিদিকে অনেক ধরণের হোটেল, নানাধরণের খাবার। তবে এই খাবারগুলো বেশ তৈলাক্ত এবং দাম মোটামুটি রকমের। আছে কেএফসি, পিজা হাট, ম্যাগডোনাল্ডাস সবকিছু।

মক্কা-রেস্টুরেন্ট
মক্কায় রেস্টুরেন্টের খাবার

পবিত্র মক্কার সেইসব স্মরণীয় স্থান
হযরত আবু বকরের বাসা, আমরা বেড়িয়ে পড়লাম গাড়ি ভাড়া করে ইসলামের ইতিহাসের জায়গাগুলো দেখবো বলে। এ প্রসঙ্গে বলে নেয়া ভাল, আমরা যে হোটেলে থাকতাম, তার পাশেই মক্কা টাওয়ার হোটেল, সেই হোটেলের ৪ অথবা ৫ তলায় রয়েছে মসজিদ আবু বকর। ধারণা করা হয় এখানেই ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা:) এর বাসস্থান ছিল। হযরত মুহাম্মদ (স:) এই বাসা থেকেই চুপিসারে, ফজরের সময় আবু বকর (রা:) কে সাথে নিয়ে বের হয়েছিলেন মদীনায় হিযরত করার জন্য ।

জাহেলিয়াত কবরস্থান
কাবা শরীফের পাশেই রয়েছে ’ জাহেলিয়াত কবরস্থান’ । ১৪০০ বছরের পুরোনো এই কবরস্থান একটি অন্ধকার যুগকে প্রতিনিধিত্ব করছে । ইসলাম প্রচারের আগে আরব দেশের কুপ্রথা অনুযায়ী কন্যা শিশুদের জন্মের পরই এখানেই জীবিত কবর দেয়া হতো । মনে করা হতো কন্যাশিশু লজ্জা আর অসম্মানের প্রতীক । তাই তাকে মেরে ফেলা হতো বা জীবিত কবর দেয়া হতো ।

মসজিদুল হারামের কাছে হলেও এই জায়গায় গড়ে ওঠেনি কোন বাসা-বাড়ি বা হোটেল। শোনা যায় শ্রমিকরা এখানে কাজ করার সময় নানা ধরণের অলৌকিক শব্দ শুনতে পেতো এবং ভয় পেয়ে কাজ ছেড়ে দিতো। তাই এখানে আর কোনকিছু গড়ে ওঠেনি। কবরস্থান হিসেবেই থেকে গেছে। ইসলামের প্রথম নারী শহীদ হযরত সুমাইয়া ( রা:) এর কবরও এখানে বলে জানা যায়।

তুর পর্বত
তুর পর্বত

তুর পর্বত
নীচ থেকে দেখলাম পাথুরে পাহাড় তুর। এই সেই তুর পর্বত, মক্কা থেকে মদীনায় হিযরত করতে যাওয়ার সময়, যেখানে একটি গুহায় তিনদিন লুকিয়ে ছিলেন আমাদের নবীজি এবং হযরত আবু বকর ( রা:)। রাতে তাঁদের খুব কাছেই অবস্থান করতেন, আবু বকরের ছেলে আবদুল্লাহ। খুব ভোরে ফিরে যেতেন গৃহে। তিনিই মক্কা থেকে কোরাইশদের খবরাখবর এনে রাসুল্ ( দ:) কে দিতেন। এত খাড়া একটি পাথুরে পাহাড়েও মানুষ উঠছে, সেই গুহা দেখার জন্য।

হেরা গুহা
এই সেই হেরা গুহা, যেখানে হযরত মুহাম্মদ (দ:) এর উপর অহী বা কোরআন নাযেল হয়েছিল সেই ৬১০ খৃষ্টাব্দে। নবীজির বয়স তখন মাত্র ৪০ বছর। নবীজি এই গুহায় ধ্যান করতেন। ২১০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই গুহার মুখ কেবলার দিকে এবং এই চূড়াটি খুব নির্জন একটি স্থান ছিল।

জাবল-এ-নূর বা আলোর পাহাড়ের এই গুহা মুসলমানদের জন্য একটি দেখার জায়গা। তাই হজ্জ্বের কর্মসূচির মধ্যে না থাকলেও হাজীরা ২ ঘন্টা পাহাড় বেয়ে হেঁটে হেরা পর্বতের গুহা দেখতে আসেন। আর ওমরাহ পালনকারীরাও তাই করেন।

শয়তান-পাথর নিক্ষেপ
শয়তানকে পাথর ছুঁড়তে হাজীদের যাত্রা

এছাড়া আমরা দেখলাম রামি আল জামারাত অর্থাৎ শয়তানকে পাথর ছোঁড়ার জায়গা। এখানেই হযরত ইব্রাহিম শয়তানকে পাথর ছুঁড়ে তাড়িয়েছিলেন বলে, আজো হাজিরা এসে এখানে শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করেন। এখানে তিন শয়তানের জন্য তিনটি পিলার রয়েছে । আসলে মানুষের মনের শয়তানকে দূর করার জন্যই এই রিচ্যুয়ালটি চলে আসছে। দেখলাম বিবি খাদিজার কবরস্থান। আরাফাতের ময়দান। মক্কাতে তিনদিন কাটিয়ে আমরা রওনা দিলাম মদীনার উদ্দেশ্যে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)