চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ইভিএম আসলে কে চায়?

আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ বা ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত না হলেও ভবিষ্যতে জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করতে চায় নির্বাচন কমিশন। সিইসি’র এমন ঘোষণার পরও বিএনপির তরফ থেকে যেসব বক্তব্য আসছে, সেসব বিষয় আলোচনার আগে প্রচলিত একটা গল্প বলতে হবে।

গল্পটা হলো ‘কলকাতার সুস্বাদু মিষ্টি’: এক যুবক বন্ধুদের আড্ডায় বলছে, কলকাতার মিষ্টি অনেক রসালো এবং সুস্বাদু। এমন আরও প্রশংসার পর একজন বললো, তুই এটা কিভাবে জানলি? প্রশংসাকারী বললো- আমার ভাই গত মাসে কলকাতায় বেড়াতে গেছে। সেসময় দুজন লোক মিষ্টি খাচ্ছিল। তখন তারা বলাবলি করছিল, কলকাতার মিষ্টি খুবই সুস্বাদু। আমার ভাই আমাকে তার সেই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে, আমি সেখান থেকে জানি।

আওয়ামী লীগ নেতাদের কথায় বুঝা যায়, ইভিএম প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান আসলে অনেকটা একই রকম।

আওয়ামী লীগ নেতারা তাদের বক্তব্যে অভিযোগ করছেন, গল্পের ব্যক্তির ভাই মিষ্টি না খেয়েই তার ভাইয়ের কাছে এসে যেভাবে কলকাতার মিষ্টির স্বাদ বর্ণনা করেছে, আর সেখান থেকে শুনে তার ভাই; ঠিক একইভাবে ইভিএম সম্পর্কে বিএনপির অভিজ্ঞতা না থাকলেও তারা দেদারসে ‌‌‘তিক্ত স্বাদের ইভিএম’ এর বিরোধিতা করে যাচ্ছে। তাদের যদি জিজ্ঞেস করা হয় গত সিটি নির্বাচনে ইভিএম’র মাধ্যমে নেওয়া কয়টা কেন্দ্রে আপনারা এর বিরোধিতা করেছেন, এর সদুত্তর পাওয়া যাবে না। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের যেকোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে হবে, বিষয়টা অনেকটা এ ধরনের। অবশ্য বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শুধু বিএনপি নয়, প্রায় সব রাজনৈতিক দলের অবস্থান আসলে এটাই।

তবে এই ইস্যুতে বিএনপির ‘পজিটিভ দিক’ হচ্ছে- জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ইভিএম চায় না সেটা যেভাবেই হোক তারা এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। এখন প্রশ্ন হলো- বিএনপি যেহেতু জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম চায় না, তাহলে এই পদ্ধতিতে নির্বাচন আসলে কে চায়? সরকার নাকি ইলেকশন কমিশন?

এসব প্রশ্নের জবাব উঠে এসেছে আওয়ামী লীগের নেতাদের কথায়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন: ‘জাতীয় নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার আওয়ামী লীগের নতুন কোনো দাবি নয়। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে আমরা ইভিএম ব্যবহারের দাবি জানিয়েছিলাম। আমরা আমাদের দাবিতে এখনও অটল। তারপরও এ বিষয়ে ইসি যে সিদ্ধান্ত নেবে তা সরকার মেনে নিবে।

আওয়ামী লীগের আরও কয়েকজন সিনিয়র নেতা এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তাদেরই একজন দলটির উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য এবং বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। তার দাবি: ‘ইভিএম ব্যবহার সরকারের নয়, ইসির সিদ্ধান্ত। সিলেট ও রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইভিএম ব্যবহার করা হয়। এছাড়া পৃথিবীর এমন একটি দেশের নাম পাওয়া যাবে না, যেখানে নির্বাচন হওয়ার পর বিতর্ক ওঠেনি। এটি একটি স্বাভাবিক ঘটনা। তবে বিএনপি যেকোনো ভালো কাজেরই বিরোধিতা করে, সমালোচনা করে।’

Advertisement

এই বিতর্কের শুরু অনেক আগে থেকেই। বিএনপি বরাবরই ইভিএম প্রত্যাখ্যান করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক এ বিতর্কের শুরু সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার বিষয়ে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-আরপিও সংশোধনের জন্য কমিশনের সর্বশেষ বৈঠক। ওই বৈঠকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন-ইভিএম ব্যবহারে ভিন্নমত পোষণ (নোট অব ডিসেন্ট) করে ইসি’র সভা বর্জন করেছেন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। পরবর্তীতে তিনি জানান: ‘তিনটি কারণে তিনি এই নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন। কারণগুলো হলো- সব রাজনৈতিক দল ইভিএম ব্যবহারে সম্মত না হওয়া, অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, ইভিএম ব্যবহারে ভোটারদের অনীহা।’

এসব ঘটনা প্রবাহের পরিপ্রেক্ষিতে ইভিএম ইস্যু এমনই পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এ বিষয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে। বিমসটেক’র চতুর্থ শীর্ষ সম্মেলন শেষে ঢাকায় ফিরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনের প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী বলেন: ‘আমরা চাই প্রযুক্তির উন্নয়নের জন্য ইভিএমের ব্যবহার শুরু হোক। এটা ঠিক যে টেকনোলজি যেমন সুবিধা দেয়, তেমনি অসুবিধাও আছে। তবে তাড়াহুড়া করে এটাকে চাপিয়ে দেয়া যাবে না।’

প্রধানমন্ত্রীর কথায় স্পষ্ট যে, তিনি বা তার দল আওয়ামী লীগ ইভিএম চাইলেও এখনই জনগণের ওপর এই প্রযুক্তি চাপিয়ে দিতে চান না। এরই প্রতিফলন দেখা গেছে ইসির আরপিও সংক্রান্ত বৈঠকে। তারাও আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি। তাহলে এখন প্রশ্ন হচ্ছে- আগামী নির্বাচনে যদি ইভিএম বিষয়ে সিদ্ধান্ত না হয়ে থাকে, তাহলে তড়িঘড়ি করে ইভিএম কেনার জন্য প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে কেন? এই টাকা কোথা থেকে আসবে সেটাও এখনও সেভাবে বলা হচ্ছে না! ধারণা করা হচ্ছে, এই বিশাল অঙ্কের টাকার বেশিরভাগই আসবে বিদেশি ঋণ থেকে।

দুঃখজনক হলেও কঠিন বাস্তবতায় আমরা বছরের পর দেখে আসছি, সরকারি কেনাকাটা মানেই সীমাহীন দুর্নীতি এবং অনিয়মের ঘটনা ঘটে। প্রায় চার হাজার কোটি টাকার এমন একটি সিদ্ধান্তহীন প্রজেক্টে যে এমনটা ঘটবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং এখানে দুর্নীতি এবং লুটপাটের আশঙ্কা আরও বেশি। কারণ, এই প্রজেক্ট এমন সময়ে হাতে নেওয়া হয়েছে, যখন আওয়ামী লীগ সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের সময় একেবারে শেষ পর্যায়ে, এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদেও পড়তে পারে।

এসব প্রেক্ষাপটে যে প্রশ্নগুলো আসছে তা হলো-
১. আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত না আসলেও তড়িঘড়ি করে এখনই ইভিএম ক্রয়ের এই বাজেট কেন?
২. এই প্রজেক্টে দুর্নীতি হলে এর দায় কে নেবে? ক্ষমতাসীন আওয়ামী সরকার নাকি ইলেকশন কমিশন?
৩. ইলেকট্রনিক এই মেশিনগুলো স্বাভাবিকভাবেই দীর্ঘমেয়াদে এর ব্যবহারের সম্ভাবনা তেমন নেই। এছাড়া দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণে ইসির নিজস্ব ও প্রশিক্ষিত জনবল না থাকায় মেশিনগুলো অকেজো হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা আছে। চার হাজার কোটি টাকার মেশিন কিনে শুধু শুধু ফেলে রাখার প্রয়োজন কী?

এমন প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতারা বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের দিকে ঠেলে দিলেও সিইসি কে এম নূরুল হুদা বল ঠেলে দিয়েছেন সরকারের কোর্টে। তিনি বলেছেন: ‘সরকার চাইলে জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে।’ অর্থাৎ এখানে কোনো ধরনের অনিয়ম হলে দায় সম্পূর্ণ সরকারের। একইসঙ্গে তিনি আরও যেসব পয়েন্টে কথা বলেছেন, সেগুলোর মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই বলা যায়, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এত কম সময়ে ইভিএম পরিচালনার সক্ষমতা ও যথাযথ প্রশিক্ষণ ইসির সংশ্লিষ্টদের হবে না। আর রাজনৈতিক দলগুলোও এ বিষয়ে একমত না। এখন সরকার এবং ইলেকশন কমিশনকে পরিষ্কারভাবে বলতে হবে ইভিএম আসলে কে চায়।

এছাড়া এখন কেনা ইভিএম মেশিন দিয়ে ভবিষ্যতে নির্বাচন পরিচালনা করা যাবে না। কারণ এখানে রক্ষণাবেক্ষণের বিষয় রয়েছে যেটা ইসির পক্ষে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে না।  তাই প্রায় চার হাজার কোটির এই প্রজেক্টের নামে যেন জনগণের টাকা হরিলুট বা জলে ঢালা না হয়, সে বিষয়ে সরকার এবং ইলেকশন কমিশনকে আরও ভাবতে হবে। জনগণের টাকা জনগণের কল্যাণে ব্যয়ের বদলে এভাবে উদ্দেশ্যহীনভাবে একেকজনের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে যত্রতত্র খরচ হবে না বলেই মনে করি। একইসঙ্গে বিএনপিসহ সকল রাজনৈতিক দলগুলো বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা না করে এমন জাতীয় ইস্যুতে রাষ্ট্র এবং জনগণের স্বার্থে গঠনমূলক ভূমিকা রাখবে বলেই আশা করি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)