চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ইফতার মাহফিলের নামে এসব কী হচ্ছে?

বিদায় অনুষ্ঠান ও নবীন বরণ অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি ও আলোচক হিসেবে আপনি উপস্থিত হয়ে বক্তৃতা প্রদানের সময়ে স্বাভাবিকভাবে অনুষ্ঠানের ভাবার্থ বিবেচনায় নিয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করবেন। বিশেষ করে বিদায়ী শিক্ষার্থীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুনামকে উত্তরোত্তর বৃদ্ধির মাধ্যমে নিজেদের সফল করার বিষয়ে কাজ করবে, কারণ শিক্ষার্থীরা স্ব স্ব জায়গায় সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করতে পারলে প্রতিষ্ঠানের ভাবগাম্ভীর্য স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পাবে।

বিপরীতদিকে নবীন শিক্ষার্থীদের প্রতি পরামর্শ থাকবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে নিয়ম শৃঙ্খলার মধ্যে অতিবাহিত হয়ে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠার জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা। পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন ও তাদের পরামর্শযায়ী শিক্ষা জীবন পরিচালনার জন্য অনুপ্রেরণা দেওয়া হয়ে থাকে। সেখানে ভিন্ন বিষয়ের অবতারণা স্পষ্টতই অনুষ্ঠানের শ্রীকে নষ্ট করে দেয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত প্রায় সকল অনুষ্ঠানেই অনুষ্ঠানের সাথে সামঞ্জস্য না রেখে বক্তব্য প্রদান অনুষ্ঠানের শ্রী নষ্ট করারই নামান্তর।

বিজ্ঞাপন

আমার বক্তব্যটি এখানে অত্যন্ত সুস্পষ্ট; কারণ আমরা যে কেউই যেকোন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের পূর্বে অনুষ্ঠানটির গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনুধাবন করে অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদান তথা অনুষ্ঠানের সামগ্রিক কার্যাদি সম্পন্ন করা উচিত। কিন্তু আমরা অনেকেই দায়িত্বশীল জায়গায় অবস্থান করেও গৃহীত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ব্যক্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে চলেছি প্রতিনিয়ত।

সম্প্রতি ফেসবুকে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, সেখানে দেখা যায় ব্যানারে ইফতার মাহফিলের বর্ণনা করা হলেও ইফতারের পূর্বে সিনেমার গান পরিবেশন করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা হয়। বিষয়টা মারত্মকভাবে বিধি-বিধানের পরিপন্থী। কেননা যেকোন কর্মই ঘটনার পরম্পরা বিবেচনায় নিয়ে সম্পাদন করা হলে সেখানে কারোর কোনরূপ অভিযোগ কিংবা বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া দেখানোর সুযোগ থাকে না। কিন্তু হরহামেশাই স্থান, কাল এবং আলোচ্যসূচি না দেখেই অনেকেই বক্তৃতা বিবৃতি দিয়ে অনুষ্ঠানের মূল ভাবার্থকে বুমেরাং করে থাকে।

সচরাচর দেখা যায়, ইফতারে অনুষ্ঠানে নানা শ্রেণীপেশার মানুষ অংশগ্রহণ করে এবং বক্তব্য দেয়ার সময়ে অনুষ্ঠানের উপজীব্যকে ভুলে গিয়ে নিজেদের খেয়াল খুশিমত বক্তব্য উপস্থাপন করে যা অনুষ্ঠানের মূল বিষয়বস্তু থেকে দর্শকদের মনোনিবেশ ভিন্ন খাতে ধাবিত করে। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলো রমজানের মাসে পালাক্রমে ইফতারের আয়োজন করে থাকে এবং বিষয়টি রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।

রমজান আসার সাথে সাথে বিভিন্ন দল, সংগঠন ও গ্রুপগুলো বড় রকমের অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে ইফতারের ব্যবস্থা করে থাকে। ইফতার অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পর পরস্পরের বিষোদগার করে থাকে এবং এই ন্যাক্কার সংস্কৃতি থেকে এখনো আমরা বেরিয়ে আসতে পারছি না। 

কিন্তু ইফতারের রয়েছে ধর্মীয়, সামাজিক ও বৈজ্ঞানিক অর্থবহতা। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ইফতারের নানাবিধ ফজিলত ও নেকের কথা বিভিন্ন জায়গায় বলা রয়েছে। এক হাদীসে রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন; যে ব্যক্তি এ মাসে কোন রোজাদারকে ইফতার করাবে, এর দ্বারা তার গুণাহ ক্ষমা করা হবে এবং তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হবে। আর রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব তাকে দান করা হবে অথচ রোজাদারের সওয়াব একটুও কমানো হবে না। সাহাবারা আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের মধ্যে সবার তো রোজাদারকে ইফতার করানোর মতো সঙ্গতি নেই! রাসুলুল্লাহ (সা:) বললেন; যে কেউ কোন রোজাদারকে একটি মাত্র খেজুর দিয়ে বা পানি পান করিয়ে অথবা এক ঢোক দুধ দিয়ে ইফতার করাবে মহান আল্লাহ তাকে এই সওয়াব দান করবেন। (সহিহ ইবনে খুজাইমা: ১৮৮৭’ বায়হাকি, শুয়াবুল ঈমান:৩৩৩৬, আত-তারগিব ওয়াত-তারহিব:১৭৫৩)। কাজেই বোঝা যাচ্ছে, একজন মুসলমানের জন্য অন্য মুসলমান রোজাদারকে ইফতার করানোর গুরুত্ব অপরিসীম এবং বিশেষ সওয়াবের ভাগীদার হওয়ার অর্থ বহন করে থাকে।

বিজ্ঞাপন

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়; অটোফেজি শরীরকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখে। অটোফেজি একটি গ্রিক শব্দ যার অর্থ হচ্ছে আত্ম ভক্ষণ বা নিজেকে খেয়ে ফেলা। শরীরে সারা বছরে সৃষ্ট হওয়া ক্ষতিকারক ও নিষ্ক্রিয় কোষগুলোকে খেয়ে ফেলে শরীরকে নিরাপদ ও সুস্থ রাখে অটোফেজি। বিষয়টা এমন, আপনি যখন সারাদিন পানাহার থেকে বিরত থাকবেন তখন কোষগুলো পুষ্টি চাহিদা মেটানোর স্বার্থে শরীরের মধ্যে অনিষ্টকারী উপাদান খেয়ে ফেলবে এবং বিপাকীয় ক্রিয়ায় শরীরের বর্জ্য বের করে দিবে। অর্থাৎ, গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভূত ফলাফল জানা যাবার পরে ইসলাম ধর্মের অনুসারী না হওয়া স্বত্ত্বেও অনেকেই রোজা পালন করে। অথচ, আমরা মুসলমানরা অনেকেই এ তথ্য না জেনে ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্য থেকে রোজা রেখেই নানাবিধ উপকার ও সুফল পাচ্ছি অজান্তেই। সুতরাং রোজা ও ইফতার দুটোরই অর্থবহ ও বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতিক ইফতারের পূর্বে এবং ইফতার চলাকালীন যে সংস্কৃতির দিকে ধাবিত হচ্ছি সেটি ইফতারের মূল যবনিকাপাত থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইফতারের ব্যাপক গুরুত্ব ও ঐতিহ্য রয়েছে। কিন্তু কালের পরিক্রমায় ও আধুনিকতার করাল গ্রাসে এবং সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে দিনে দিনে সামাজিকভাবে ইফতারের রীতি ও সংস্কৃতি ম্রিয়মান হয়ে আসছে। কিন্তু ইফতার এবং রোজা সামাজিকতার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হয়ে সমাজের প্রতিটি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ ও কল্যাণকর সমাজব্যবস্থার দিকে ধাবিত করে যেখানে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঐক্যবদ্ধ ও সমতার ভিত্তিতে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা সকলেরই লক্ষ্য থাকে। কিন্তু সে জায়গা থেকে আমরা প্রতিনিয়ত সরে আসছি নানাবিধ কারণে যা মোটেই শোভনীয় ও কল্যাণকর নয়। সার্বজনীন ইফতারে সমাজের সকল শ্রেণীপেশার মানুষের অংশগ্রহণ থাকার কথা। দল, উপদল এবং গ্রুপে বিভক্ত হওয়ার কারণে ইফতারগুলো এখন আর সার্বজনীতার রূপ দেখে না। সার্বিকভাবে ইফতারের সংস্কৃতি বিপরীত মাত্রা ধারণ করে থাকে বর্তমান সংস্কৃতিতে।

পরিশেষে, রমজানের মাসে ইফতারের সংস্কৃতি যথাযথভাবে বজায় রাখার জন্য সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা রাখতে হবে। ইফতারের চিরাচরিত সংস্কৃতি বজায় রাখতে পারলে সামাজিক নানাবিধ অনাচার, বিশৃঙ্খলা ও অপরাধ থেকে সমাজকে দূরে রাখা যায়। সম্মিলিত ইফতার পালনের মাধ্যমে পারস্পারিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতির যে বার্তা বহন করে সমাজের প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে এবং যার দরুণ সমাজের মধ্যকার অনুষ্ঠিত অপরাধ প্রবণতা অনেকাংশে কমে আসে এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় থাকে।

দুঃখের বিষয় হচ্ছে পবিত্র রমজান মাসেও ধর্ষণের মতো ভয়াবহ ও জঘন্য অপরাধের মতো ঘটনাও ঘটছে। সামাজিক শৃঙ্খলা ও সামাজিক আচারাদি যদি সমাজের সকল শ্রেণীপেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে উদযাপিত করা যায় তাহলে সহসাই সামাজিক অপরাধ থেকে সমাজকে কিছুটা হলেও মুক্তি দেওয়া সম্ভব হতো।

কাজেই, ইফতারকে বিজাতীয় সংস্কৃতির মাধ্যমে উদযাপন না করে দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত রীতিনীতির মাধ্যমে সামাজিকভাবে উদযাপন করা উচিত, যেখানে পরস্পরের মধ্যে বিষোদগার ও বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য না দিয়ে সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর বিশেষ করে ইফতারের ভাবার্থ বিবেচনায় নিয়ে সম্প্রীতির বার্তা ছড়াতে ইফতারের চিরায়ত ধর্মীয় সংস্কৃতিকে লালন করা উচিত। তাহলেই রমজান মাসে ইফতারের মাহাত্ম্য ও পবিত্রতা রক্ষার পাশাপাশি সমাজে বেশ একটা ইতিবাচক প্রভাবও পড়বে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)