চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ইনডেমনিটি বাতিলের পর থেকে জাতির পিতা হত্যার বিচার শুরু

সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের চলছে পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া। দিনরাত অবিরাম পরিশ্রম করে যাচ্ছেন হাজারো বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সবেমাত্র দেশের উন্নয়ন কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেই ঘটতে থাকে নানা দূর্ঘটনা। অনেক কিছু সামাল দিয়েই এগিয়ে চলছেন জাতির পিতা। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে, যাকে পাকিস্তানের ঘাতক হায়েনার দল কোনো দিন হত্যার স্বপ্ন দেখেনি সেই জাতির পিতা খুন হন এদেশের হায়েনাদের হাতেই। আর সময়টি ছিল রক্তাক্ত ও বিভীষিকাময় ১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্ট। রাজধানীর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে ওই রাতে স্বপরিবারে হত্যা করা হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। এদেশের ঘাতকদের হাতে থেকে রেহাই পায়নি বঙ্গবন্ধু পরিবারের কনিষ্ঠ পুত্র শিশু রাসেল। স্বামীর সঙ্গে বিদেশ থাকায় প্রাণে বেঁচে যান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বোন শেখ রেহানা।

বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধুকে হারিয়ে জাতি তখন শোকাভিভূত। রাজধানীসহ সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের দাবিতে রাজপথ প্রকম্পিত হতে থাকে। এরই মধ্যে ২৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫ সালে নতুন একটি আইন জারি করা হলো। যার সারমর্ম হল বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার চাওয়া যাবে না। আর সেটি করা হলো আইনের মাধ্যমে। এদেশিয় ঘাতকরা জাতির পিতার হত্যার বিচার যাতে না হয় তা আইন করে বন্ধ করে দিয়েছিল। অবশ্য এতে তারা কিছুটা সফল হয়েছিল। কারণ আওয়ামী লীগের ১৯৯৬ সালের ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের কেউ বিচার চাইতে পারেনি।

সেই ঘৃণিত ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ সরকার। দেশের প্রধানমন্ত্রী হন তারই কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা। ওই বছরই ইনডেমনিটির মতো কালো অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়। প্রমাণ হয় কোন অন্যায় বা কালাকানুন চিরস্থায়ী হয় না। ১৫ই আগস্টের হত্যাকাণ্ডে রক্তের দাগ তখনও শুকায়নি। জাতির পিতাকে হত্যার ৪২ দিনের মাথায়, ২৬ সেপ্টেম্বর কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে খুনি খোন্দকার মোশতাক। অধ্যাদেশে যে কোনো আদালতে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার বিচারের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়।

‘দি বাংলাদেশ গেজেট, পাবলিশড বাই অথরিটি’ লেখা অধ্যাদেশটিতে খন্দকার মোশতাকের স্বাক্ষর রয়েছে। মোশতাকের স্বাক্ষরের পর আধ্যাদেশে তৎকালীন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এইচ রহমানের স্বাক্ষর রয়েছে।

অধ্যাদেশটিতে দুটি ভাগ আছে। প্রথম অংশে বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বলবত আইনের পরিপন্থী যা কিছুই ঘটুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টসহ কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না। দ্বিতীয় অংশে বলা আছে, রাষ্ট্রপতি উল্লিখিত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে যাদের প্রত্যয়ন করবেন তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হলো। অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।

সামরিক জান্তা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিচারপতি সাত্তার, জেনারেল এরশাদ এমনকি খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকলেও কোনো সরকারই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করেনি। বরং খুনিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত করা হয়েছে। সামরিক স্বৈরাচারের ভোট খেলায় খুনিদের এমপিও বানানো হয়ছে। কুখ্যাত এই অধ্যাদেশে দীর্ঘ ২১ বছর দৃশ্যত থমকে ছিল আইনের শাসন।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের দরজা খুলে যায়। এই ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সের ছুতো দিয়ে ২১ বছর বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার করা হয়নি। অবশেষে ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে সংসদ। পরে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট এবং আপিল বিভাগও ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিলের আইনকে বৈধ বলে রায় দেয়।
এরপরইয় দায়ের করা হয় জাতির পিতার হত্যা মামলা। আইনের আওতায় আনা হয় খুনিদের। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসে বাংলাদেশ।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তৎকালীন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ন্ত্রকারী হিসাবে আবিভূর্ত হন। সেসময় বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ১৯৭৬ সালের ২৯ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি সায়েম জেনারেল জিয়াউর রহমানের কাছে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল সায়েম রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং জিয়া রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সামরিক আইনের অধীনে দেশে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের দল বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশসহ চার বছরে সামরিক আইনের আওতায় সব অধ্যাদেশ, ঘোষণাকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনি বৈধতা দেওয়া হয়। সংশোধনীটি পাস হয় ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল। সংসদে উত্থাপিত আইনটির নাম ছিল ‘সংবিধান (৫ম সংশোধনী) আইন, ১৯৭৯’ এবং এই সংশোধনীর মাধ্যমে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে বৈধতা দেওয়ায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা দায়মুক্তি পেয়ে যায়। খোন্দকার মোশতাকের জারি করা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বৈধতা দেওয়া না হলে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল সামরিক আইন প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গেই ১৫ আগস্টের খুনিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যেত। জিয়াউর রহমানই ব্যবস্থা নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি ব্যবস্থা নেওয়া দূরে থাক, ভবিষ্যতে কেউ যাতে ব্যবস্থা না নিতে পারে সে ব্যবস্থা করে দিলেন এবং ঐ সময়ে একটি প্রোপাগন্ডা ছড়িয়ে গেল যে, যেহেতু এটি সংবিধানের অংশ হয়ে গেছে এটি আর পরিবর্তন হবে না এবং এই দোহাই দিয়েই জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরও বিচারপতি আবদুস সাত্তার, এইচ এম এরশাদ এবং ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এলেও ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি বাতিল বা রহিত করেননি। ফলে দায়মুক্তি পেয়ে খুনিরা ১৫ আগস্টের হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা প্রকাশ্যেই বলে বেড়াত। যা জাতি হিসাবে আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক।

প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে বলতে হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন, ভারতের মহাত্মা গান্ধী, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, রাজিব গান্ধী, পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান বেনজির ভুট্টো, শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট বন্দর নায়েককে গুলিতে হত্যার পর কোন দেশেই এমন ন্যক্কারজনক ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে বিচারের পথ রুদ্ধ করা হয়নি।

১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বরের ঐতিহাসিক দিনে সংসদে পাস হয় মানবতা ও সভ্যতাবিরোধী কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল বিল। ঘোচানো হয় ২১ বছরের জাতীয় কলঙ্ক। যার মাধ্যমে বাতিল হয়ে যায় কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ, খুলে যায় বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ।

সেসময়ের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ইচ্ছা করলে ১৫ আগস্টের খুনিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারতেন। কিন্তু জিয়া খুনিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দূরে থাক, অন্য কেউ যাতে ব্যবস্থা নিতে না পারে সে জন্য দায়মুক্তিকে আরো পাকাপোক্ত করতে দিতে অস্তিত্বহীন, অবৈধ আইনকে সংসদের আইনের মর্যাদা দেন। জিয়া পরবর্তী সময়ে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে মানবতা, মানবাধিকার, সভ্যতা, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারবিরোধী এই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে সংবিধানের অংশে পরিণত করে নজিরবিহীন রক্তমূল্য ও সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত সংবিধানকে কলঙ্কিত করেন।

বিজ্ঞাপন

হত্যার বিচার চাওয়ার পথ সাংবিধানিকভাবে রুদ্ধ করে দিয়ে জিয়া বাংলাদেশকে মানবাধিকার ও সভ্যতাবিরোধী অমানবিক, অসভ্য, জংলি রাষ্ট্রে পরিণত করেন। জিয়া খুনিদের দায়মুক্তি অধ্যাদেশ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেই থেমে থাকেননি, দূতাবাসে চাকরির যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও বিশেষ ব্যবস্থায় খুনিদের চীন, আর্জেন্টিনা, আলজেরিয়া, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, ইরান, কুয়েত, আবুধাবি, মিসর, কানাডা ও সেনেগালের বাংলাদেশ দূতাবাসে চাকরি দিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত করেন। জিয়াউর রহমানের পর বিচারপতি সাত্তার, জেনারেল এরশাদ এবং খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকলেও কেউই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করেননি। বরং জিয়া খুনিদের দূতাবাসে যে চাকরি দিয়েছিলেন, এরশাদ ও খালেদা জিয়া তাদের পদোন্নতি দিয়ে বাঙালি জাতির কলঙ্কের দায়কে দীর্ঘায়িত করেছেন। দায়মুক্তি পেয়ে ও দূতাবাসে চাকরি-পদোন্নতি পেয়ে খুনিরা ১৫ আগস্টের হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা প্রকাশ্যেই বলে বেড়াতেন।

১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর যেদিন ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ রহিত করার জন্য সংসদে আইন পাস হয়, সেদিন বিএনপি ও জামায়াতের সংসদ সদস্যরা সংসদে অনুপস্থিত থাকেন এবং খুনিদের বাঁচাতে ইনডেমনিটি বাতিলের বিরুদ্ধে হরতাল আহ্বান করেন। ইনডেমনিটি আইন বাতিলকে চ্যালেঞ্জ করে ১৯৯৭ সালে খুনি শাহরিয়ার রশিদ উচ্চ আদালতে যে রিট দায়ের করেছিলেন সে মামলায় শাহরিয়ার রশিদের আইনজীবী ছিলেন খালেদা জিয়া সরকারের মন্ত্রী অ্যাডভোকেট কোরবান আলী। এ মামলায় আদালত বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব উদ্দীন আহমেদকে নিরপেক্ষ পরামর্শ দেওয়ার জন্য আদালতের মিত্র তথা অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ দিলে তিনি ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে বৈধ আইন হিসেবে যুক্তি তুলে ধরেন। তার মানে, পরোক্ষভাবে জাতির পিতা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যাকে তিনি বৈধ মনে করেন।

এরশাদ খুনিদের রাজনৈতিক দল গঠন ও সংসদ সদস্য হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন, আর খালেদা জিয়া ’৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে খুনি শাহরিয়ার রশিদকে সংসদে বিরোধী দলের নেতা নির্বাচন করেছিলেন।

ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিলের পর বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের কাজ শুরু হয় ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবরে ধানমন্ডি থানায় একটি ফৌজধারী মামলা দায়েরের মাধ্যমে। ১৯৯৮ সালে যাবতীয় কার্যক্রম শেষে ৮ নভেম্বর ১৫ জন আসামিকে আদালত মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। আসামীপক্ষ উচ্চ আদালতে আপিল দায়ের করলে উচ্চ আদালত ১২ জনের মৃত্যুদন্ড বহাল রাখে। ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি এদের মধ্যে ৫ জনের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয় এবং ২০২০ সালে পলাতক ক্যাপ্টেন মাজেদ ধরা পরলে তার ফাঁসির রায়ও কার্যকর করা হয়। বিদেশে পলাতক অন্যান্যদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের রায় কার্যকর করার প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।

ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল আইন পাস হয় সেদিন বিএনপি হরতাল ডেকেছিল। তারা বলেছিল প্রতিহিংসা বাস্তবায়নের জন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে। অথচ সুযোগ থাকা স্বত্বেও কোনো ট্রাইবুন্যাল বা বিশেষ আদালত প্রতিষ্ঠা না করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে হত্যার বিচার চেয়েছেন দেশের প্রচলিত আইন ও আদালতে। এদেশে একজন সাধারণ নাগরিকের হত্যার বিচার যে প্রক্রিয়ায় হয় বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার বিচারও সেই প্রক্রিয়াই হয়েছে।

ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ (বাতিল) আইন, ১৯৯৬ একটি বৈধ আইন হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগ থেকে ঘোষিত হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর হত্যা মামলার তদন্ত ও বিচার দ্রুতগতি লাভ করে। মোট ২০ জন আসামির বিরুদ্ধে ঢাকার দায়রা জজ আদালতে বিচারকার্য শুরু হয়। আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।বিচারপতি

চার্জ গঠনের পর একজন আসামি হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করে মামলা থেকে অব্যাহতি লাভ করেন। রাষ্ট্রপক্ষ কর্তৃক আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল ১৯৯৮ সালের নভেম্বরে দেওয়া এক রায়ে ১৯ জন আসামির মধ্যে ১৫ জন আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে সবাইকে ‘মৃত্যুদণ্ড’ প্রদান করেন। অন্যদের খালাস প্রদান করেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৩৭৪ অনুযায়ী বিচারিক আদালত প্রদত্ত ‘মৃত্যুদণ্ড’ আদেশ অনুমোদনের জন্য হাইকোর্টে রেফারেন্স পাঠানো হয়। হাইকোর্ট বিভাগের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জ্যেষ্ঠ বিচারপতিগণ এই ডেথ রেফারেন্স শুনানিতে বিব্রত বোধ করেন। তাদের এমন অপ্রত্যাশিত মানসিকতা কিছুটা হলেও সর্বোচ্চ আদালতের ভাবমূর্তিতে কলঙ্কতিলক এঁকেছিল। অবশেষে বিচারপতি মো. রুহুল আমিন ও বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেে এই ডেথ রেফারেন্সের শুনানি হয়। শুনানি শেষে বেঞ্চের একজন বিচারপতি মো. রুহুল আমিন ১০ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখেন এবং একজন আসামির দণ্ডাদেশ পরিবর্তন এবং পাঁচ জনকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে খালাস প্রদান করেন। কিন্তু অপর বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ১৫ জন আসামিরই মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রেখে তা অনুমোদন করেন। এর ফলে সংগত কারণে ডেথ রেফারেন্সটি তৃতীয় বেঞ্চে গড়ায়। তৃতীয় বেঞ্চের বিচারক হিসেবে বিচারপতি ফজলুল করিম ১২ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশের সাজা বহাল রেখে তিন জনকে খালাস প্রদান করেন।

এরপর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে কারাগারে আটক দণ্ডিত পাঁচ জন পৃথক পৃথকভাবে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ‘লিভ পিটিশন’ দাখিল করলে আপিল বিভাগে ‘লিভ’ মঞ্জুর হয়। এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে যে, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠন করলে আপিল বিভাগে বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচারের শেষ ধাপ থমকে যায়। আপিল শুনানির জন্য আপিল বিভাগে প্রয়োজনীয়সংখ্যক বিচারক নিয়োগ না দিয়ে কৃত্রিমভাবে বিচারকসংকট তৈরি করে রাখা হয়।

অবশেষে দীর্ঘ আট বছর পর ২০০৯ সালে আবারও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে আপিল বিভাগে নতুন বিচারপতি নিয়োগের মাধ্যমে আপিল শুনানি সম্ভব হয় এবং ওই আপিলের নিস্পত্তি করা হয়। আপিল বিভাগের রায়ের পর পরই কারাগারে থাকা দণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ জনের ফাঁসির আদেশ কার্যকর হয় ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি। সাম্প্রতিক সময়ে আরও এক জন দণ্ডিতকে গ্রেপ্তার করে ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। জাতি কিছুটা হলেও কলঙ্কমুক্ত হয়েছে; অবসান হয়েছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও গ্লানি। দেশে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে আইনের শাসন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়েই জাতি দেখতে পেলো মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কার রাজাকার আলবদর বাহিনীর সদস্যদের বিচার। আর এক সময়ের তলাবিহীন ঝুড়ি খ্যাত বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। যে দেশের জনসংখ্যার মাথাপিছু আয় ছাড়িয়েছে ২৫শ’ ডলার।

পিতার দেখানো পথেই দেশের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন তারা কন্যা সুযোগ্য উত্তরসূরী জননেত্রী শেখ হাসিনা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন