চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আয়েশা সিদ্দিকার লড়াই দেশের নারীদের লড়াই

জার্মানি থেকে: রাষ্ট্রের কাছে, এই সমাজের কাছে আয়েশা সিদ্দিকার চাওয়াটা খুব কি বেশি ছিল? ছোটবেলায় বিয়ের অনুষ্ঠানে পুরুষ কাজীদের বিয়ে রেজিস্ট্রি করতে দেখে তার মনের কোণেও ইচ্ছে জেগেছিল বড় হয়ে তিনিও বিয়ে রেজিস্ট্রির কাজটি করবেন। তিনি সবার কাছে শুনেছেন বিয়ে পড়ানো বা রেজিস্ট্রি করার কাজটি শুধু পুরুষেরাই করে। আর এই কারণে সে আরও বেশি করে চেয়েছিল বিয়ে পড়ানো ও রেজিস্ট্রির কাজটি তিনি করবেন এবং দেশের প্রথম মহিলা কাজী হয়ে ইতিহাস গড়বেন।

ফুলবাড়ীর দারুল সুন্নাহ সিনিয়র সিদ্দিকিয়া মাদ্রাসা থেকে ফাজিল পাস শেষে সংসারের পাশাপাশি নিজেও স্বামীর মত হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাকে পেশা হিসেবে নিয়েছিল। আর কাজীর কাজটি করার সেই ইচ্ছেটা তার ছিলই, একদিন সে মহিলা কাজী হবে। আর ততদিনে আয়েশা অনেকের কাছে খোঁজখবর নিয়ে এই তথ্যটি খুব ভাল করে জেনে ফেলেছেন যে, এদেশে মেয়েরা কাজী তথা নিকাহ রেজিস্ট্রার হতে পারবে না বলে কোনো বিধিবিধান বা কথা কোথাও বলা নেই। তাই আয়েশা স্বামীর সঙ্গে কথা বলে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে ফুলবাড়িয়া পৌরসভার ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্ট্রারের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করলেন। নিয়মমাফিক যাচাই-বাছাই শেষে লাইসেন্স মঞ্জুরির স্থানীয় উপদেষ্টা কমিটি ২০১৪ সালে যে তিনজনের নাম আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল তার প্রথমেই ছিল আয়েশা সিদ্দিকার নাম। কিন্তু বিধি বাম। আইন মন্ত্রণালয় একজন নারীকে নিকাহ রেজিস্ট্রারের লাইসেন্স দিতে রাজি হলো না। ফলে আয়েশার স্বপ্ন পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়াল আইনের মারপ্যাঁচ।

বিজ্ঞাপন

নিকাহ রেজিস্ট্রার হতে গেলে কী কী যোগ্যতা থাকতে হবে সে প্রসঙ্গে ২০০৯ সালে আইন মন্ত্রণালয়ের জারি করা বিধিমালায় বলা আছে, প্রার্থীকে স্বীকৃত কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা মাদ্রাসা বোর্ডের নিবন্ধিত মাদ্রাসা থেকে কমপক্ষে আলিম পাস হতে হবে। বয়স হতে হবে ২১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। তিনি যে এলাকার কাজী বা নিকাহ রেজিস্ট্রার হতে চান, সেখানকার বাসিন্দা হতে হবে। উল্লিখিত শর্তাবলীর সবগুলোই আয়েশার আছে কিন্তু তারপরও কেন আইন মন্ত্রণালয় তাকে যোগ্য মনে করেনি?

২০১৪ সালে আয়েশার লাইসেন্সের আবেদন খারিজ করে দিয়ে আইন মন্ত্রণালয় বলেছিল, ‘বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নারীদের দ্বারা নিকাহ রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়।’ এরপর ওই বছরই সেকেন্দার আলী নামের একজনকে ফুলবাড়িয়া পৌরসভার ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্ট্রারের লাইসেন্স দেওয়া হয়।

আইন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে আয়েশা হাইকোর্টে রিট আবেদন করলে আদালত রুল জারি করেছিলেন। কিন্তু গত বছর সেই রুল খারিজ হয়ে গেলে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তই বহাল থাকে। নিকাহ রেজিস্ট্রার পদটি সরকারী কোন পদ নয়- সরকারের শর্তাবলী মেনে নিয়ে একটি নির্দিষ্ট এলাকার জন্য একজন সরকারের কাছ থেকে লাইসেন্স নিয়ে নির্ধারিত ফি আদায়ের মাধ্যমে বিয়ে নিবন্ধনের কাজটি সম্পন্ন করার কাজটি করেন।

কেন আইন মন্ত্রণালয়ের এমন সিদ্ধান্ত?
জানা যায়, আইন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে আয়েশা হাইকোর্টে রিট আবেদন করলে আদালত রুল জারি করেছিল। কিন্তু গত বছর সেই রুল খারিজ হয়ে গেলে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তই বহাল থাকে। বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের হাই কোর্ট বেঞ্চের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, প্রাথমিকভাবে দুজন মুসলিম যুগলের মধ্যে বিয়ে পড়ানোই একজন নিকাহ নিবন্ধকের কাজ, যা মূলত একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান। এতে আরও বলা হয় ,’শহরাঞ্চলে পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান না থাকায় সম্প্রতি মসজিদে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে, শারীরিক কিছু পরিস্থিতির কারণে একজন নারীর পক্ষে মাসের কোনো একটা সময় মসজিদে যাওয়া সম্ভব হয় না। ওই সময় একজন নারী বাধ্যতামূলক দৈনন্দিন প্রার্থনা থেকেও বিরত থাকেন।

শারীরিক এই অযোগ্যতা ধর্মীয় অনেক কার্যক্রম করতে তাকে অনুমতি দেয় না। আমাদের মনে রাখতে হবে, বিয়ে মুসলমানদের একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান, যা ইসলামের রীতিনীতি অনুযায়ীই হওয়া উচিৎ।’

রায়ের এই পর্যবেক্ষণ প্রসঙ্গে আয়েশা সিদ্দিকা গণমাধ্যমকে বলেন, পিরিয়ড একজন নারীর জন্যে কোনোরকমেই কোনো অযোগ্যতা হতে পারে না। এটি সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত। পর্যবেক্ষণে উল্লিখিত যুক্তিগুলো আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে না। আমি মনে করি উচ্চ আদালত এ রায় পুনর্বিবেচনা করবে। আয়েশার যুক্তি, একজন নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাজ হল বিয়ে নিবন্ধন করা। তাকেই বিয়ে পড়াতে হবে এমন নয়। এ বিষয়ে জ্ঞান রাখেন, এরকম যে কোনো মুসলমান বিয়ে পড়াতে পারেন৷ আর রেজিস্ট্রার সাক্ষীদের সইসহ সেই বিয়ে আইনসম্মতভাবে নিবন্ধন করে দেন।

বিজ্ঞাপন

আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দেয়া আয়েশার যে মন্তব্য সেই মন্তব্যের পক্ষে জোরালো সমর্থন পাওয়া যায় গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্টার মাহমুদুল হাসানের কথায়।

তিনি গণমাধ্যমকে এ ব্যাপারে নিজের অবস্থান পরিস্কার করে বলেছেন, ‘মেয়েদের নিকাহ রেজিস্ট্রার হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধর্মীয় বাধাও নেই। একটি নিকাহ নামায় বরের স্বাক্ষর, কনের স্বাক্ষর, বরের উকিলের স্বাক্ষর, কনের উকিলের স্বাক্ষর, ইমামের স্বাক্ষর, নিকাহ রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষরের আলাদা আলাদা ঘর আছে। তাহলে একজন নারী কেন নিকাহ রেজিস্ট্রার হতে পারবেন না?’

তিনি আরও বলেন, ‘নিকাহ রেজিস্ট্রার আর কাজী মূলত একই জিনিস। সামাজিকভাবে কাজী বলা হয়, আর আইন অনুসারে নিকাহ রেজিস্ট্রার বলা হয়।’

আয়েশা সিদ্দিকা খুবই যৌক্তিক এবং যা তার প্রাপ্য অধিকারের মধ্যে পড়ে সেরকম একটি চাওয়াই আশা করেছিল। কিন্তু এই রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের প্রচলিত বিধি বিধান এবং সেই বিধি বিধানের নেপথ্যে থাকা একটি শ্রেণি তাকে তার সেই প্রাপ্য অধিকার থেকে, চাওয়া থেকে সুকৌশলে বঞ্চিত করেছে।

স্বাধীনতার এত বছর পরে এসেও আয়েশা তার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। যেখানে দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সংসদের স্পীকার নারী, সরকারের প্রশাসন, শিক্ষা বিভাগ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, চিকিৎসা, প্রকৌশল থেকে শুরু করে আইন পেশায় নারীরা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন সেখানে নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাজে কেন নারীরা কাজ করতে পারবেন না তা নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি করতে একটি গোষ্ঠী মাঠে নেমেছে।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা যেখানে দেশের সকল সেক্টরে নারীর ক্ষমতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছেন সেখানে সরকারের একটি সুযোগসন্ধানী মহল চাইছেন না নারীরা বিবাহের কাজে এগিয়ে আসুক। এক্ষেত্রে তারা এ কাজের জন্য নারীকে উপযুক্ত মনে করছেন না তাদের শারীরিক অসুবিধার মতো একটি ঠুনকো কারণকে সামনে নিয়ে এসে যা খুবই হাস্যকর। কাজী তাকে বঞ্চিত করা হয়েছে আইনের কিছু বাধ্যবাধকতা দেখিয়ে যা ইতিমধ্যে সবার গোচরে এসেছে এবং নানা মহলে সমালোচিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল প্লাটফর্ম আয়েশা সিদ্দিকার এই অবস্থানের পক্ষে সোচ্চার হয়েছেন। কেউ কেউ আয়েশা সিদ্দিকার কাজী হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী মন মানসিকতায় পশ্চাৎপদদের ব্যাপারে বিরুপ মন্তব্য করেছেন।

বাংলাদেশের সংবিধানে নারী পুরুষের সমান অধিকারের কথা সুস্পষ্টভাবে দেয়া আছে। তারপরও আয়েশার নৈতিক চাওয়ার ক্ষেত্রে আইনি বাধা দূর হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। আর এ লক্ষে আয়েশা তার স্বপ্ন পূরণে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আর তার এ ব্যাপারে তাকে আইনি সহায়তা দিচ্ছেন ফাউন্ডেশন ফর ল’ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট ফাওজিয়া করিম। তিনি গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘রায়ের অনুলিপি হাতে পেয়েছি। এ রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করা হবে। তার জন্য ১২টি অনুলিপি জমা দিতে হবে। সেটারই প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।’

আয়েশা সিদ্দিকার এই লড়াইকে দেশের নারী সমাজ মনে করছে তাদের সম্মান আদায়ের লড়াই। একজন নারী হিসেবে আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি, আয়েশা সিদ্দিকা পুরুষতান্ত্রিক নোংরা মানসিকতার বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে জয়ী হবেন। আর তিনি জয়ী হলে সেই জয় হবে আমাদের সবার।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)