চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আলো-আঁধারের খেলা

২৩ আগস্ট। রাত সাড়ে ৮টা। ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসাপাতাল। কার্ডিওলজি মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ গোবিন্দ্র চন্দ্র রায়ের চিকিৎসাধীন ১ নং ওয়ার্ডের ৭৪ নাম্বার বেডে (মেডিসিন ইউনিট-৫) বসে আছেন বাবা। কর্মসূত্রে আমি ঢাকায় থাকি। গিন্নি রান্নাবান্না করে দিয়েছেন বাবা-মার জন্য। হটপট খুলে মা খাবার দিতে ব্যস্ত। প্রথমে একটা খবরের কাগজের ওপর খাবারের থালা রাখলেন। তারপর এক এক করে ভাত, ভাজি, ইলিশ মাছের ঝোল দিলেন। চকচক করে উঠল বাবার চোখ। মস্তিস্কে রক্তক্ষরণে অনেক কিছু ভুলে গেলেও ইলিশ মাছের কথা ভুলতে পারেননি তিনি, স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে পারেননি আমাকেও।

বেডের পাশে আমি দাঁড়ানো। আমার দিকে তাকিয়ে বাবা জিজ্ঞাসা করলেন, তুই খাবি না? আমি বললাম, বাসায় গিয়ে খাব। তোর বাসা কোথায়? আমি বললাম, হাসপাতালের পাশেই। চোখে-মুখে বাবার হতাশা। আমার বাসা না চেনার অপরাধে নিজেকে অপরাধী মনে হলো তাকে। ২১ তারিখ রাত ২টার পর ঘুম থেকে জেগেই বাবার স্মৃতিভ্রম ধরা পড়ে। সকালের ফোনে মা সবকিছু জানান। বাবার কিছু কিছু ভুলে যাওয়া স্মৃতি নিয়ে আমি আমার এক ডাক্তার বন্ধুর সঙ্গে কথা বলি। ও জানায়, স্বল্পাকারে মস্তিকে রক্তক্ষরণ হতে পারে। দেরি না করে গ্রাম থেকে বাবাকে ঢাকায় নিয়ে আসি। নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দেখালে ডাক্তার পরামর্শ দেন সিটিস্ক্যানের। সঙ্গে সঙ্গে সেটা করানো হয়। বন্ধুর কথাই সত্যি।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

বাবার মস্তিকে রক্তক্ষরণ হয়েছে। তবে সামান্য, কিন্তু জায়গাটা খুবই খারাপ। ডাক্তার আশ্বাস দেন, দু’তিন মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ সুস্থ না হলেও ৮০ থেকে ৯০ ভাগ সেরে উঠবেন তিনি। বাবা হার্টের সমস্যায় ভুগছেন সাত বছর। চিকিৎসা নিচ্ছেন হার্ট ফাউন্ডেশনের কার্ডিওলজি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এক ডাক্তারের কাছে। ভালোই চলছে দিনকাল। হঠাৎ করেই অনাহুতের মতো রাতে বাবার মস্তিকে রক্তক্ষরণ।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে বাবার বেডটা বারান্দার এক কোণায়। চারপাশে আলো-আঁধারির খেলা। অধিকাংশ বেডেই রোগী। তাদের জীবনেও খেলা করছে আলো-আঁধারির ছায়া। কোনো রোগীর স্বজন কাঁদছে। কোনো রোগীর স্বজন ভালো হয়ে সকালে চলে যাবে বলে হাসছে। উৎকট একটা গন্ধ ভাসছে বাতাসে। গুমোট ভাব। চেচামেচি তো আছেই। সরকারি হাসপাতাল। রোগী এলে তাকে ফেরত দেয়া যাবে না। বেডে জায়গা না হলে ফ্লোরে রেখে চিকিৎসা দিতে হবে।

পরিবেশ যতই নোংরা থাকুক, যতই বিদঘুটে গন্ধ ভাসুক চারপাশে, নিউরোসায়েন্সের তদবির থাকার কারণে বাবাকে সহজেই ভর্তি করা গেছে। কিন্তু বেড পেতে অনেকটা ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। ওয়ার্ড মাস্টার কিংবা নার্সরা খালি বেডের খবর রাখেন না। খবর থাকে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের (খালা) কাছে। বিনামূল্যের বেডেও ওনাদের টাকা দিতে হয়, এটা অলিখিত নিয়ম, যাকে বলে বখশিস। মানুষ খুশি হয়ে বখশিস দেন। আমি অসুস্থ বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে দুশ’ টাকা ধরিয়ে দিলাম খালার হাতে।

চোখ বাঁকা করে আমার দিকে তাকালেন খালা। বললেন, এমুন ভালা এট্টা বেড দিলাম, মাত্র দু’শো টেহা? আমি কথা বাড়ালাম না। আরও একশ’ টাকা ধরিয়ে দিলাম। চলে গেলেন খালা। তবে খুশি হয়ে নয়, রাগে কটমট করতে করতে। ভর্তির পর অনেকক্ষণ কোনো ডাক্তার না আসাতে নার্সদের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। ওনারা একটা কক্ষের ঠিকানা দিয়ে আমাকে ডাক্তার ডেকে আনার পরামর্শ দিলেন। আমি নির্দিষ্ট কক্ষে গেলাম। কয়েকজন বয়সে তরুণ ডাক্তার খোশগল্প করছেন। কিছুটা দ্বিধা নিয়ে জানালাম বাবার কথা। তাদের ভেতর থেকে একজন বললেন, আপনি যান আমরা আসছি।

দোতলা থেকে নিচতলায় এসে আমি অপেক্ষা করতে থাকি তীর্থের কাকের মতো। প্রায় চল্লিশ মিনিট পর দু’জন ডাক্তার এলেন। সবকিছু শুনলেন। পরীক্ষার কাগজ-পত্র দেখলেন। হার্টের জন্য কী কী ওষুধ খান তাও দেখলেন। নিউরোসায়েন্স হাসপাতাল থেকেই এ্যাসপ্রিন জাতীয় ওষুধটা বন্ধ করে দিয়েছেন ডাক্তার। বলেছেন, ওটার জন্যই নাকি বাবার মস্তিস্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে। সব মিলিয়ে সোহরাওয়ার্দী হাসাপাতালের ডাক্তাররাও কিছু ওষুধ লিখলেন। কতগুলো পরীক্ষা করাতে হবে তাও লিখলেন। বললেন, কাল টেস্টের রিপোর্ট পাবার পরই তারা ওষুধ ফাইনাল করবেন। আমি বাইরের দোকান থেকে ওষুধ কিনে দিয়ে সেদিনের মতো বিদায় নিলাম হাসপাতাল থেকে।

পরদিন সকালে মাকে ফোন করে বাবার খবর নিয়ে হাজির হলাম ৯টার দিকে। মা সাফ জানিয়ে দিলেন, তোর বাবা এই নোংরা পরিবেশে থাকবেন না। আমি মিডিয়াকর্মী হওয়ার বদৌলতে একটা কেবিনের আশায় আমার সিনিয়রদের দিয়ে হাসপাতালের পরিচালকের কাছে ফোন করালাম। ওনারা দেখা করতে বললেন পরিচালকের সঙ্গে। পরিচালক প্রায় অধিকাংশ সময় দশ-পনেরো গুণগ্রাহী বেষ্টিত থাকেন, মিটিংয়ে থাকেন, রাউন্ডে থাকেন। বহুবিধ ব্যস্ততার কারণে তার সঙ্গে সেদিন দেখা করতে পারলাম না। আমার কেবিন পাবার আশাও নিরাশায় পরিণত হলো। বাবার উদ্বেগ বাড়তে থাকল। আমি আশস্ত করলাম এই বলে যে, আগামীকাল কেবিন হবে। এর ভেতর বাবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে নতুন অভিজ্ঞতার সন্মুখীন হলাম।

গত রাতেই বাবার ইসিজি করানো হয়েছে। তবে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল থেকে নয়, পাশের হৃদরোগ হাসপাতাল থেকে। তবে কি সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে কোনো ইসিজি মেশিন নেই! কোনো ডাক্তার কিংবা নার্সের কাছে তা আর জিজ্ঞাসা করা হয়নি। হয়তো এটা জানা আমার অনধিকার চর্চা হতে পারে তাই। পরীক্ষার কাগজ-পত্র হাতে নিতেই এক খালা উড়ে এসে হাজির হলেন আমার সামনে। হাসি মুখ নিয়ে বললেন, রোগীর টেস্ট করাইবেন? দাঁড়ান আমি হুইল চিয়ার নিয়ে আসতাছি। খালা দ্রুত চলে গেলেন। আমি তার ব্যবহারে অবাক না হয়ে পারলাম না। চোখের পলকে পাশে থাকা হুইল চেয়ার এনে আমাকে বললেন, দ্যাখেন, টেহা জমা দিতে লম্বা লাইন, টেস্ট করতেও তাই।

বিজ্ঞাপন

আপনে আইজ দিনের মইধ্যেও দুইডা একসাথে করাইতে পারবেন না। টেস্টের টেহাগুলান ও কাগজ-পত্তর আমারে দ্যান। সবার আগেই আপনের কাম হইয়া যাইব। খালার হাসিমাখা মুখের ভাষা এবার আমার কাছে স্পষ্ট হলো। পরক্ষণেই চিন্তা করলাম, তাই তো, সরকারি হাসপাতাল। হাজার রোগী, হাজার হাজার টেস্ট। আমি একদিনে এতোগুলো পরীক্ষা লাইন ধরে করাতে পারব না। খালার কথায় আমি রাজী হয়ে গেলাম। বিবেককে বিসর্জন দিলাম। সরকারের কোষাগারের টাকা তুলে দিলাম খালার হাতে। আমি অসহায়। আমি জিম্মি। আমার বাবার চিকিৎসার কথা আমাকে আগে ভাবতে হবে। তারপর সরকারের কথা।

আমি কোনো মহামানব নই যে বাবার চিকিৎসায় অবহেলা করে দেশপ্রেমিক সাজব। আমি সাধারণ মানুষ। আমার সত্তরোর্ধ বাবার চিকিৎসার প্রয়োজন, আর আমি সেটাই চাই। বৈধ-অবৈধ আমার কাছে এখন অর্থহীন। মাকে বসিয়ে রেখে আমি খালার পেছন পেছন গেলাম। অবাক– রক্ত, আল্ট্রাসনো, এক্সরে সবই লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকা রোগীর আগে আমার বাবার সুযোগ হলো। খালার সঙ্গে পরীক্ষাগারের দায়িত্বে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির সুসম্পর্ক। কয়েক মুর্হূত ফিসফিস করে কথা বলতেই সমস্যার আসান।

বাবাকে নিয়ে ফিরে আসার সময় খালা গর্ব ভরে বললেন, সবার আগে আপনের রিপোর্ট পাইবেন। বিকালেই ডাক্তার দেখাইতে পারবেন। বাবাকে নিয়ে ওয়ার্ডে ঢুকতেই আরেকজন রোগীর স্বজন খালার পেছন ধরল। কোনো রকম বাবাকে বেডে দিয়েই তিনি চলে গেলেন ওই স্বজনের রোগীর পরীক্ষা করাতে।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের বিপরীতে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার। সেখান ডাক্তাররা অধিকাংশ রোগীর মূত্র পরীক্ষার জন্য পাঠাচ্ছেন। আমার বাবার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হলো না। আমি ডাক্তারের কাছে জিজ্ঞেস করলাম, পরীক্ষাটা এ হাসপাতালে হয় না? উনি বললেন, ফলাফল ভালো আসে না। তাছাড়া ৪০% কমিশন পাচ্ছেন অসুবিধা কি? আমি মুখ বুজে তার কথা মেনে নিলাম। আমি জিজ্ঞাসা করলাম না, যদি মূত্র পরীক্ষার মেশিনে ভালো ফলাফল না আসে তাহলে এমন মেশিন কেন হাসপাতালে রাখা হয়েছে?

সন্ধ্যার আগেই বাবার অধিকাংশ রিপোর্ট হাতে পেয়ে গেলাম। ছুটলাম ডাক্তারদের কাছে। তাদের ভেতর থেকে একজন সবকিছু দেখে আরেকটা টেস্ট করার জন্য লিখে দিলেন। টেস্টটা সোহরাওয়ার্দীতে হবে না। করাতে হবে হৃদরোগ হাসপাতাল থেকে। বাবার হাঁটা-চলায় অসুবিধা। নার্সদের সঙ্গে পরামর্শ করে সিরিঞ্জে রক্ত নিয়ে এবার আমি নিজেই হাজির হলাম হৃদরোগ হাসপাতালের পরীক্ষাগারে। টেস্টটিউবে রক্ত ঢালতে ঢালতে কর্তব্যরত ব্যক্তি বললেন, তিন’শ টাকা দিন। আমি তিনটি এক’শ টাকার নোট তার হাতে দিয়ে বললাম, রিপোর্ট যদি আটটার ভেতর পেতাম আমার খুব উপকার হতো।

উনি বললেন, ঠিক আছে, পেয়ে যাবেন। আমি বললাম, আমাকে তাহলে রশিদটা দিন। উনি অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকালেন। তারপর নির্বিকার ভাবে বললেন, রশিদ হবে না। কেন? রশিদ দিলে রাত বারোটার পর রিপোর্ট নিতে হবে। অসুস্থ বাবাকে নিয়ে টেনশন, পরিশ্রম, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে এমনিতেই ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে আছি। বলতে গেলে আমার মাথায় তখন আগুন জ্বলছে। ওই মুহূর্তে বিবেকও গলা টিপে ধরল আমাকে। তারপরও মাথা ঠাণ্ডা রেখে বললাম, এখনই আপনাকে টাকার রশিদটা দিতে হবে এবং রিপোর্টও আপনি আটটার ভেতরে দেবেন। কর্তব্যরত ব্যক্তিটি আমার দিকে বড় বড় চোখে বললেন, মানে? আমি যেটা বলেছি সেটাই আপনাকে করতে হবে।

পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে দেখে পাশে কম্পিউটারে বসে থাকা ব্যক্তি আমার সামনে এসে বললেন, দাদা, আমি আপনাকে রশিদ দিচ্ছি। আপনি একটু শান্ত হয়ে দাঁড়ান। আগের ব্যক্তি পকেট থেকে চল্লিশ টাকা ফেরত দিলেন। পরের ব্যক্তি দিলেন টাকার রশিদ। ঠিক আটটার সময়ই রিপোর্ট পেয়ে গেলাম। পরদিন শুক্রবার। হাসপাতাল বন্ধ থাকবে। তাই ওইদিনই ডাক্তারদের রিপোর্ট দেখিয়ে ওষুধ লিখিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেলে।

পরদিন সকাল ছয়টা কুড়িতে আমার ফোন বেজে উঠল। মায়ের ফোন হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে মা বললেন, তোর বাবাকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক খোঁজাখুঁজি করেছি। কোথাও নেই তোর বাবা। আমি এখন কী করবো? (চলবে)

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)