চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আলো-আঁধারের খেলা: বাবার খোঁজে পথে পথে

২৫ আগস্টের সকাল। চারপাশে কি ভূমিকম্প হচ্ছে! বেডরুমের একটা ছবির দিকে তাকালাম। না, ছবিটা দুলছে না। আমি কাঁপছি। মার ফোন পেয়ে আমার সারা শরীর কাঁপছে। চোখ বন্ধ করলাম। লম্বা একটা শ্বাস নিলাম। নিজেকে স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা। মনকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম, বিপদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমার শক্ত থাকতে হবে। বাবা-মার একমাত্র সন্তান আমি। এই মুহূর্তে আমাকে দিশেহারা হলে চলবে না। আমি প্যান্ট পরে গেঞ্জিটা গায়ে দিয়ে বেরোনোর সময় মেয়েদের ঘুম থেকে জাগিয়ে গিন্নিকে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে আসতে বললাম। রিকশায় যেতে যেতে কয়েকজন পরিচিতকে ফোন করলাম।

সকালবেলা, কেউ ফোন ধরলেন, কেউ ধরলেন না। যারা ফোন ধরলেন তাদের তাড়াতাড়ি আসতে বললাম হাসপাতালে। রিকসাঅলাকে তাড়া দিচ্ছি জোরে চালাতে। রিকশা চলছে। আমার কাছে মনে হচ্ছে কে যেন পাথর বেঁধে দিয়েছে রিকশার সঙ্গে। রিকশা আর আমি কিছুতেই যেন এগোতে পারছি না। সাতটার দিকে হাসপাতালে পৌঁছালাম। তড়িঘড়ি করে বাবার বেডের কাছে যেতেই মায়ের কান্না আরো বেড়ে গেল। মা অঝোরে কাঁদছেন। পাশের বেডের রোগীর দুজন স্বজন এগিয়ে এসে জানালেন, তারা হাসপাতালের প্রায় সব জায়গায় খুঁজেছেন, কোথাও পাননি। আমি মায়ের কাছে জানতে চাইলাম আসলে ঘটনাটা কী? মা বললেন, আমি সারারাত জেগে বসেছিলাম। সকাল পাঁচটার দিকে তোর বাবার পায়ের কাছে শুতেই ঘুমিয়ে পড়ি। ছয়টার দিকে ঘুম ভেঙে আর তোর বাবাকে দেখিনি। বাথরুম, বরান্দা খুঁজেছি। কোথাও নেই তোর বাবা। আমি এখন কি করবো! আমি মাকে স্বান্তনা দিয়ে বললাম, চিন্তা কোরো না মা, আমি তো আছিই।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

মায়ের বয়স হয়েছে। তার ডায়াবেটিস, হার্টের সমস্যাসহ শরীরের গিঁটগুলোতে প্রচণ্ড ব্যথা। ভালো করে হাঁটতেও পারেন না। তার ওপর গত পরশু দিনভর জার্নি করেছেন। একজন সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে যায় এত ক্লান্তিতে। সারা রাত জেগে ভোরের দিকে মায়ের ঘুম আসবে এটাই স্বাভাবিক।

বাবার বেডে মা বসে আছেন। আমি মাকে ধরে দাঁড়িয়ে আছি। আমার এখন কী করণীয়? গিন্নি এসে হাজির হলো। একটু পরে আমার অফিস কলিগ মাহবুব ভাই ঢুকলেন। গিন্নিকে মায়ের কাছে রেখে আমি আর মাহবুব ভাই বাইরে গেলাম। চারপাশের রাস্তা, দোকান-পাট খুঁজলাম, মোবাইলে বাবার ছবি দেখিয়ে জনে জনে জিজ্ঞাসা করলাম। কোনো তথ্যই পেলাম না। করণীয় নিয়ে একজন সিনিয়র কলিগকে ফোন করলাম। তিনি প্রথমে থানায় ডায়েরি (জিডি) করতে বললেন। আমি আর মাহবুব ভাই ছুটলাম শেরেবাংলানগর থানায়। কর্তব্যরত পুলিশ কর্মকর্তা জানালেন, ডায়েরি করতে হলে নিখোঁজ ব্যক্তির ছবি লাগবে। আমি বললাম, আমার মোবাইলে আছে। তিনি বললেন, প্রিন্ট করা ছবি ছাড়া হবে না। মেসেজের মাধ্যমে তারা নিখোঁজ ব্যক্তির ছবি পাঠাবেন। আমাদের থানাগুলোতে কি মোবাইল থেকে ছবি নেয়ার কোনো প্রযুক্তি নেই? আর মেসেজ করতে হলে তো প্রিন্ট করা ছবি স্ক্যান করে তারপর ছবি পাঠাতে হয়। বিষয়টা আমার কাছে কেমন জানি বিদঘুটে মনে হলো।

আমি থানা থেকে বের হয়ে আশপাশের দোকানগুলোতে খোঁজ নিলাম। শুক্রবার হওয়ায় অনেক দোকানই খোলেননি। ছবি প্রিন্টের দোকান খুললেও অনেক বেলা হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা করার সময় আমার হাতে নেই। মাহবুব ভাইকে সঙ্গে নিয়ে আমি শ্যামলীতে চলে গেলাম। ওভার ব্রিজের নিচে একটা দোকান খোলা পেলাম। ওরা শেয়ারিট দিয়ে ছবি নিয়ে আমাকে আটটি ছবি প্রিন্ট করে দিলেন। আবার ছুটলাম শেরেবাংলানগর থানায়। যিনি ডায়েরি লিখবেন তাকে পাওয়া গেল না। থানাতেই আছেন তবে অন্য কোনো কাজে। আমার আচরণে তাড়াহুড়া। ভেতরটা তছনছ হয়ে যাচ্ছে বাবা নিখোঁজ হওয়ার প্রচণ্ড দমকা হাওয়ায়। বেশকিছুক্ষণ পরে কর্তব্যরত পুলিশ কর্মকর্তা আসলেন। খাতাটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, ডায়েরিটা লিখতে। আমি এর আগে কোনোদিন এমন পরিস্থিতির শিকার হইনি। ডায়েরি কীভাবে লিখতে হয় তার কোনো অভিজ্ঞাও আমার নেই। আসলে কি থানায় ডায়েরি করতে গেলে অভিযোগকারীকেই কি অভিযোগগুলো লিখতে হয়- নাকি এটা দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তার কাজ? বিষয়টি আমার অজানা। আমি পুলিশ কর্মকর্তাকে বিনয়ের সঙ্গে আমার অপারগতার কথা জানালাম। তিনি কিছুটা বিরক্ত হলেন আমার ওপর। পাশে বসে থাকা আরেকজন কর্মকর্তা এগিয়ে এলেন আমার অভিযোগ লিপিবদ্ধ করতে। প্রায় চল্লিশ মিনিট সময় পার করে ডায়েরির একটি কপি নিয়ে আমি হাসপাতালে ফিরলাম। ততক্ষণে আমার আত্মীয়-স্বজন বাবা নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে গেছেন। তারা ফোন করছেন। খোঁজ-খবর নিচ্ছেন।

৭৬ বছর বয়স্ক দুর্বল বাবা হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে কত দূর পর্যন্ত যেতে পারেন? নাকি কোনো বাসে উঠে কোথাও চলে গেলেন। কিন্তু খালি গা আর লুঙ্গি পরা বাবাকে কেউ বাসে তুলবে বলে মনে হয় না। বেশ কিছুক্ষণ আগেই আমার অফিস কলিগ শোয়েবকে নিয়ে গিন্নি পুরো হাসপাতাল চষে ফেলেছে। প্রতিটা ওয়ার্ড, বাথরুম, বারান্দা, আশপাশ সব। কোথাও নেই বাবা। শুধু এইটুকু খবর উদ্ধার করতে পেয়েছে- বাবা হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে বাঁপাশের ছোট্ট পথ ধরে একটা দোকানে গিয়ে সিঙারা চেয়ে খেয়েছেন। তারপর কোন দিকে গেছেন তা কেউ বলতে পারেন না। ফোন বেজে উঠল। সিনিয়র কলিগ ফোন করেছেন। রিসিভ অপশনে চাপ দিতে তিনি বললেন, তুমি হাসপাতালের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ চেক করো। অনেক কিছু জানতে পারবে।

বিজ্ঞাপন

আমার মোবাইলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তার নাম্বার রয়েছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে তাকে ফোন করলাম। প্রথমবার রিং হয়ে গেল। ওপাশ থেকে কোনো সাড়া শব্দ নেই। আমি ভদ্রতার মাথা খেয়ে দ্বিতীয়বার ফোন করলাম। এবার তিনি রিসিভ করলেন। তবে কণ্ঠ শুনে মনে হলো তিনি তখনো আরামের বিছানা ছাড়েননি। আমি বাবা নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারটি তাকে জানালাম। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখানোর ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করলাম। তিনি এবার কিছুটা বিরক্ত হলেন। প্রথমে দোষ দিলেন এই বলে যে, আপনাদের রোগী আপনারা দেখে রাখতে পারেন না। তারপর শুক্রবার অফিস বন্ধ থাকার অজুহাতে ফুটেজ দেখানো সম্ভব নয় বলে ফোনের লাইনটা কেটে দিলেন।

হাসপাতাল থেকে আমার বাবা নিখোঁজ হয়েছেন। আমার বাবা ওই কর্মকর্তার কেউ নন। কিন্তু হাসপাতাল থেকে রোগী হারিয়ে যাওয়াতে কি ওই কর্মকর্তা বা কর্তৃপক্ষের কোনো দায়িত্ব নেই? আমার মতো অসহায় স্বজনরা যখন রোগী এনে হাসপাতালে ভর্তি করে তখন ডাক্তার, নার্স, সিকিউরিটি গার্ড, পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে একজন রোগী হাসপাতাল থেকে নিখোঁজ হয়ে যায়? বাবা নিখোঁজ হওয়ার সব দায়ই কি আমাদের ওপর বর্তাবে?

আমার ভেতর রাগ, ক্ষোভ, হতাশা, কান্না সব দলা পাকিয়ে গেছে। যে বাবাকে সুস্থ করতে ঢাকাতে নিয়ে এলাম, সেই বাবাকেই কিনা শেষ পর্যন্ত হারিয়ে ফেললাম! দুই কোটি মানুষের এই শহরে স্মৃতিশক্তি হারানো বাবাকে আমি কীভাবে খুঁজে পাব? তারপরও আমাকে মাথা ঠাণ্ডা রেখে দুঃসময়ের মোকাবিলা করতে হবে। বাবাকে খুঁজে পেতেই হবে।

দুপুর গড়িয়ে বিকাল। প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে। ছাতাতেও মানছে না। রাস্তায় এক হাঁটু জল। তার ওপর রাস্তা খোঁড়াখুড়ির মহাযজ্ঞে দিশেহারা শহরবাসী। তারপরও আমি মা, গিন্নি ও অফিস কলিগদের হাসপাতালে রেখে সোজা চলে এলাম কর্মক্ষেত্রে। ততক্ষণে আমাদের চ্যানেলে নিখোঁজ বাবার স্ক্রল যাচ্ছে। আমি কম্পিউটারের সামনে বসে প্রত্যেকটা জাতীয় দৈনিকের ই-মেইল আইডিতে বাবার নিখোঁজ সংবাদ, ছবি ও থানার ডায়েরি পাঠিয়ে দিলাম। ফেবুতে বাবার ছবি দিয়ে আকুতি জানালাম বন্ধুদের কাছে। যদি এভাবে বাবাকে খুঁজে পাওয়া যায়।

সন্ধ্যার দিকে আবার ফিরে এলাম হাসপাতালে। আকাশের কষ্টের বৃষ্টি আমার চোখেও। থানা থেকে ফোন এল- আপনার ডায়েরি নাম্বারটা ভুল হয়েছে। ১৭২৩ এর জায়গায় ১৭২৪ হবে। আপনি একটু সংশোধন করে নিন। কিন্তু ততক্ষণে পত্রিকা অফিসগুলোতে ১৭২৩ নাম্বারই চলে গেছে।

হাসপাতালে এসে হাজির হয়েছে আমার স্বজনেরা। খোঁজাখুঁজি তখনো থেমে নেই। থেমে নেই মায়ের কান্নাও। রাত ন’টার দিকে গিন্নির ছোট ভাই সঞ্জয় ও বোন জামাই বিকাশকে নিয়ে বাসায় ফিরলাম। কয়েকজন থাকলেন মায়ের কাছে। আধা ঘণ্টার মতো দামি সময় নষ্ট করে সারা রাত বাবাকে খোঁজার প্রস্তুতি নিয়ে দশটার দিকে আবার বেরোলাম আমরা তিনজন। (চলবে)

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)