চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আর কত নারী ধর্ষিত হবে এ সমাজে !

মানুষ চাইলেই বদলাতে পারে না। কোভিড ১৯ পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়নি। এর প্রতিষেধকও আসেনি। তবে অদৃশ্য এ ভাইরাসে তাড়িত মানুষ মৃত্যু ভয়ে বদলে যাবার তাগিদ অনুভব করেছিল ঘরে বন্দী হয়ে। কিন্তু সময়ের সাথে যখন মানুষ বুঝল করোনার সাথেই বসবাস করতে হবে; তখন গতানুগতিক  জীবনে ফিরে গেছে সকলে। পুরনো জীবনের অন্যায় অবিচার সমাজে আবার ফিরে এসেছে। আসলে এ পৃথিবী থেকে পারিবারিক, সামাজিক অনিয়ম অন্যায় দূর হলে স্বপ্নের পৃথিবীটা সত্যি হয়ে যেত। তাই হয়তো বিধাতা মানুষকে বদলে দিতে চায় না। কথাগুলো কাব্যিক  মনে হলেও জীবনের বড় নির্মম সত্য হলো, মানুষ ও সমাজ বদলে যায়নি। তার প্রমান বহন করছে প্রতিদিনের সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত নারীর যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের খবর।  লকডাউনকালীন সময়ে দেশে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সংবাদ অনেকটাই কম ছিল আনুপাতিক হারে সকল ক্ষেত্রে। তবে এ থেকে মানুষের বদলে যাবার মানসিকতা তৈরি হয়েছে তা বলার কোনো অবকাশ নেই।

গত বছরের আলোচিত ঘটনা নুসরাত হত্যার পর প্রত্যাশা ছিল ধর্ষণ শব্দটি এ সমাজ থেকে মুছে যাবে। সে ধারণা ভুল প্রমানিত হয়েছে। এমনকি ধর্ষণের বিচারে  দেশের আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান  থাকা সত্ত্বেও নারী ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত।

বিজ্ঞাপন

সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষক এহেন অপরাধ করে তা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে দ্বিধাবোধ করে না। কিংবা ভিডিও ধারণ করে নারীকে নির্যাতন করে দিনের পর দিন। যা গাজীপুরের এক ঘটনায় জানা যায়। আবার চট্টগ্রামে রাস্তায় স্বামীকে আটকে স্ত্রীকে গণধর্ষণের চাঞ্চল্যকর ঘটনায় স্তম্ভিত হয় সমাজ। এছাড়াও পারিবারিক. সামাজিক. রাজনৈতিক কোন্দলের জের ধরে ধর্ষণের খবর প্রকাশ হয় গণমাধ্যমে, যা থেকে বোঝা যায় শুধুমাত্র আইন দিয়ে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

বিজ্ঞাপন

এ অবস্থায় যে প্রশ্নটি বারবার উঠে আসছে তা হলো, সমাজে ধর্ষণের  ঘটনা কেন রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রকৃতপক্ষে এর অন্তরালের কারণ বহুবিধ। অন্যায় অবিচার বেআইনী এ কর্মটি নারীদের অনিরাপদ করছে ঘরে বাইরে। যার সব প্রকাশ হয় না বা বিচারের আওতায় আসে না লোকলজ্জার ভয়ে। আবার ইদানীংকালে তথ্য প্রযুক্তির অপব্যবহারের হুমকি দিয়ে দমন করে নির্যাতিত নারী ও তার পরিবারকে।  একই সাথে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবশালীদের দাপটে প্রশ্রয় পায় অপরাধীরা। প্রকৃতপক্ষে যৌন হয়রানি আর ধর্ষণ এখন সমাজের এমন এক ব্যাধি, যা নারীদের জীবনকে নরকময় করে তুলেছে বিকৃত রুচির কিছু মানুষ। এদের কাছে বিবেক, মনুষ্যত্ববোধ বলে কিছু নেই।

যার ফলে বর্তমানে নারীরা স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েও আতংকগ্রস্থ হচ্ছে নিরাপত্তা নিশ্চিয়তা নেই বলে। সুতরাং এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে আইনের পাশাপাশি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও সচেতনতা জরুরি। তা না হলে নারীদের যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের ঘটনা আইন দিয়ে রোধ করা সম্ভব নয়।

সচেতনতা নেই বলে ধর্ষণের সাজা কঠোরতা জানা থাকা সত্ত্বেও প্রতিনিয়ত নারী ধর্ষিত হচ্ছে। এ ঘৃণ্য  অপরাধের সাজা মৃত্যুদণ্ড হওয়ার পরেও থামছে না অন্যায় কাজটি। তার কারণ আইনী জটিলতাতে বিচার প্রলম্বিত হয়। আর এতে ধর্ষক মনে করে তার অন্যায় থেকে বাঁচার পথ আছে। তা ছাড়া বিচারকে ব্যাহত করতে পারিবারিক সামাজিক, রাজনৈতিক প্রভাব বা চাপ অনেক ক্ষেত্রে কাজ করে।  এতে করে  সমাজে ধর্ষণ নামের ব্যাধিটি যে বিষ ছড়াচ্ছে তা বুঝাতে হবে সকলকে। তাই এ ব্যাধিকে প্রতিরোধ করতে হলে সচেতনতার বিকল্প কোন পথ নেই।

বিজ্ঞাপন

সে সাথে বিশেষ আরেকটি কারণ হলো, মানুষের  নৈতিক অবক্ষয়। কু-রিপুকে সংযত করার চর্চা কমছে। ধর্মের অনুশাসন, বিধি-বিধানকে উপেক্ষা করার ফলে মানুষ বিপথে পরিচালিত হতে সাহস পায়। বলা হয়, আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির অবাধ বিচরণ মানুষকে নষ্ট করছে। এটা একটা দুর্বল যুক্তি। কারণ ভালো মন্দ বোঝার বিবেকবোধ মানুষের আছে। আর সে বোধকে যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয় তবে ধর্ষণের মত ব্যাভিচার কাজ করা সম্ভব নয়।

নারী-পুরুষ উভয়ের শালীনতা বোধটা থাকা খুব জরুরি। শারীরিক চাহিদা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। কিন্ত সে চাহিদা মেটানোর জন্য ধর্ষণের মত বর্বরোচিত কাজ বন্য পশুকে হার মানায়।

এ সূক্ষ্ম বোধগুলো জাগ্রত করতে হলে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রকে আরও বেশি সচেতন হতে হবে৷

দুঃখের বিষয় হলো, মেধা মননে এগিয়ে যাওয়া নারীকে এখনো ভোগ্যপণ্য হিসাবে একটি দেহ হিসাবে চিন্তা করার মানসিকতা বদলাতে পারিনি এ সমাজ। তাই পরিবারে নারীদের নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। আধুনিক সমাজে নারীরা ক্রমশ নিয়মের বেড়িতে আবদ্ধ হচ্ছে। কারণ যৌন হয়রানি ও ধর্ষণ নারীর সম্ভ্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

এ কারণে ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে তা নিয়ে সাময়িকভাবে সোচ্চার হয়, থেমে গেলে চলবে না। ধর্ষণের প্রতিরোধ করতে সবাইকে সচেতন হতে হবে যার যার অবস্থান থেকে। পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের মুখ্য দায়িত্ব হলো সচেতনমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে মানুষের নৈতিক চিন্তার পরিবর্তন করা। তা না হলে কেবল আইন দিয়ে ধর্ষণের মত জঘন্য অপরাধকে দমন করা সম্ভব হবে না। বরং প্রলম্বিত বিচার ব্যবস্থা ও ক্ষমতার ছত্রছায়ায় আইনের অপব্যবহারে ধর্ষকদের দৌরাত্ম্য বাড়বে আর নারীরা হবে ঘরে অবরুদ্ধ।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)