চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আমি পাবলিক প্রোপার্টি, আমার সন্তানরা নয়: এআর রহমান

এআর রহমান: সুর যার আনন্দ এবং কান্নার ভাষা

সুরের জাদুকর এআর রহমান। সুরই তার আনন্দ এবং কান্নার ভাষা। আয়ের বেশিরভাগ অর্থ তিনি ব্যয় করেন মিউজিক স্কুলের পেছনে। সুরই যার ধ্যান-জ্ঞান, সেই মানুষটির জন্মদিন বুধবার (৬ জানুয়ারি)। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে অস্কার জয় করে নেয়া এই তারকার বয়স হলো ৫৪ বছর।

বছর সাতেক আগে টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এআর রহমান জানিয়েছেন, সংগীত প্রতিভার বিষয়টি তিনি নিজে না বুঝলেও তার মা ঠিকই বুঝেছিলেন। এআর রহমানের বাবা সুর সমন্বয় করতেন। ৮ জন কম্পোজারের সঙ্গে দিন-রাত কাজ করতেন তিনি। এ আর রহমানের বয়স যখন মাত্র নয়, তখন তিনি বাবাকে হারান। এরপরের পাঁচ বছর এ আর রহমানের মা তার স্বামীর বাদ্যযন্ত্র ভাড়া দিয়ে খরচ চালিয়েছেন। অনেকেই পরামর্শ দিয়েছিলেন সেগুলো বিক্রি করে দেয়ার জন্য, কিন্তু তার মা বিক্রি করেননি। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার ছেলে আছে, ও দেখে রাখবে’। মায়ের সমর্থনেই কলেজের পড়াশোনা ছেড়ে সংগীতে মনোনিবেশ করেছিলেন এআর রহমান। শুধু বাদ্যযন্ত্র দেখে রাখেননি, সেগুলো দিয়েই পুরো পৃথিবীর সংগীত শ্রোতা মানুষকে বছরের পর বছর আচ্ছন্ন করে রেখেছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

ছয়বার জাতীয় পুরস্কার ছাড়াও একবার বাফটা এবং একবার গোল্ডেন গ্লোব পেয়েছেন এই কিংবদন্তী

এআর রহমান ভেবেছিলেন কয়েক বছর পরে আয় বাড়লে আবার শুরু করবেন পড়াশোনা। কিন্তু পরে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, আসল শিক্ষা গ্রহণ করতে হয় জীবন থেকে। জীবনের নানা পরিস্থিতি যা শেখায়, তা কলেজ কখনই শেখাতে পারে না।

‘মায়ের সাথে সম্পর্ক কেমন ছিল?’ উত্তরে এআর রহমান বলেন, সিনেমার মা ছেলের মতো সম্পর্ক তাদের ছিল না কখনই। কখনই মাকে জড়িয়ে ধরা হয়নি।

‘বাবাকে মনে পড়ে?’ প্রশ্ন করা হয় সুরকারকে। তিনি বলেন, ‘খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় মনে পড়ে। যেমন বোনের বিয়ের সময় মনে হয়েছিল। এসব দায়িত্ব কীভাবে পালন করতে হয় আমার জানা নেই। বাবা নেই, তাই বুঝি বাবা থাকা কত জরুরী। সন্তানদের নিয়ে দেশের বাইরে গেলে, আমি আমার চাইতেও বেশি একজন বাবার ভূমিকায় থাকি। তাদের দেখেশুনে রাখি। কিছু বিষয় নিয়ে অনেক ক্ষেপেও যাই অনেক সময়। বিশেষ করে যখন কেউ আমার সন্তানদের ছবি তুলতে আসে। আমি পাবলিক প্রোপার্টি, আমার সন্তানরা নয়।

‘রাতে কাজ করেন কেন?’ এআর রহমান বলেন, “আমার কাছে সেটাই সুবিধাজনক মনে হয়। আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি। ফজরের নামাজ পড়ি ভোরে। রাত ৩টায় ঘুমালে কিছুতেই ভোরে ওঠা সম্ভব হয়না। তাই নামাজ শেষ করে ঘুমাতে যাই। সকালটা নামাজ দিয়ে শুরু করলে সারাদিন অনেক শান্ত থাকি। আমি রেগে গেলে আমার স্ত্রী আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘আজকে মন-মেজাজ খারাপ কেন? সকালে নামাজ পড়োনি?’ ওর কথাই ঠিক।”

বিজ্ঞাপন

‘রাতে কাজ করাটা স্ত্রী মেনে নেন?’ উত্তরে বলেন, ‘বিয়ের আগেই এই বিষয়ে কথা হয়েছে। নাহলে অনেক আগেই বিচ্ছেদ হয়ে যেত। আমি তাকে বলেছিলাম, যদি ডিনারের প্ল্যান এবং গানের মাঝে একটি বেছে নিতে হয়, তাহলে আমি গানই বেছে নেব।

প্রশ্ন করা হয়, ‘সংগীতে আনন্দ পান, কীসে কষ্ট পান?’ ‘প্রতি গানের ক্ষেত্রেই কাজ শুরু সময় মনে হয় আমার সুর হারিয়ে গেছে। তখন খারাপ লাগে। একজন ভিক্ষুকের মতো, যিনি সৃষ্টি কর্তার কাছে প্রার্থনা করেন শূন্য পাত্র ভরে দেয়ার জন্য। প্রতিটি গানেই আমি সৃষ্টিকর্তার সাহায্য চাই।

‘লস আঞ্জেলসের জীবন কি আলাদা?’ উত্তরে বলেন, ‘হুম। সেখানে আমি গাড়ি ড্রাইভ করি, ডিম ভাজি করি। অনেক বাড়তি কাজ সেখানে।’

কথা প্রসঙ্গে এআর রহমান জানিয়েছেন তিনি কোন নির্মাতাদের সঙ্গে কাজ করতে ভালোবাসেন সেই প্রসঙ্গে। তার মতে, তাদের সঙ্গেই কাজ করে আনন্দ পান যারা তাকে বিশ্বাস করেন। স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দিয়ে কাজ চাপিয়ে দিলে, সেই কাজ ভালো হয় না। তবে মাঝে মাঝে অনেকেই কমফোর্ট জোন থেকে বের করে আনে, ফলে অনেক ভালো কোনো সুর তৈরি হয়। সুরকার জানান, তিনি মণি রত্নম, রাকেশ ওম প্রকাশ মেহরা, ইমতিয়াজ আলি, সুভাষ ঘাই, আশুতোষ গোয়ারিকর এবং আনন্দ এল রাইয়ের সঙ্গে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কারণ সংগীত সম্পর্কে এই নির্মাতাদের ধারণা ভালো।

‘আপনি কি কোনো তারকার ভক্ত?’ ‘আমি রজনীকান্তের ভক্ত। তার অনেক বিশ্বাসের সঙ্গে আমার বিশ্বাসের মিল আছে। জীবন থেকে শিক্ষা নেয়ার বিষয়টি আমি তার থেকেই শিখেছি।’

‘কোনো আফসোস?’ উত্তরে সুরকার বলেন, “মাইকেল জ্যাকসনের সঙ্গে কাজের একটি সুযোগ হারিয়েছি। তার সঙ্গে দুইবার দেখা হয়েছে- একবার, অস্কারের পরে এবং পরের বার, তিনমাস পর একজন এজেন্টের মাধ্যমে। প্রথম বার পরিচয় পর্ব এবং একে অপরের প্রশংসাতেই সময় কেটে গেছে। তার সামনে সহজ হতে সময় লেগেছে আমার। তিনি ‘জয় হো’ এর কর্ড নিয়ে কথা বলেছিলেন। জানিয়েছিলেন ভারতকে কত ভালোবাসেন তিনি।”

‘হলিউড আর ভারতে কাজ করার পার্থক্য আছে কোনো?’ এআর রহমানের মতে, ভারতে কাজ করা অনেক সহজ। হলিউডে কাজের খুব বেশি সুযোগ হয়নি, তারা বিশ্বাস করে অর্থ বিনিয়োগ করেননি। তবে সেটা নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই তার। হলিউডে দুই ভাবে কাজ করে, এক শ্রেণীর মানুষ যারা সুরকারকে বিশ্বাস করে। আরেক দল মানুষ আছেন যারা সুরকার এবং সুরকে নিয়ন্ত্রণ করেন নিজের ইচ্ছেমত। এক একটি ছবিতে শত মিলিয়ন ডলার খরচ করা হয়, তাই কোনো ঝুঁকি নেয়া কঠিন তাদের ক্ষেত্রে। আমি দুই পদ্ধতিরই প্রশংসা করি। সেখান থেকে স্ট্র্যাকচার শিখেছি। কিন্তু ভারতের ইন্ডাস্ট্রির জন্যই মানুষ আমাকে চেনে। ছবি: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস