চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আমাদের সন্তান বেড়ে উঠুক প্রকৃতির সাথে

শীতের কুয়াশায় ঘেরা ভোরে গ্রামের ধানক্ষেতের আলপথ দিয়ে কতকাল আগে সর্বশেষ হেঁটেছেন? হাঁটতে হাঁটতে গাছ থেকে এইমাত্র নামানো হাঁড়ি থেকে খেজুরের রস খেয়েছেন, মনে পড়ে? পানি কমে যাওয়া বিলের ওপর গাছের ডালপালা ফেলে রাখার জায়গায় মাছ ধরতে দেখেছেন? কখনো পলো দিয়ে কখনো হাতিয়ে হাতিয়ে শোল, গজার, বোয়াল, শিং, মাগুর, সরপুঁটি, মেনি, কই, বাইমসহ নানা রকমের মাছ ধরার আনন্দ উপভোগ করেছেন?

প্রশ্নটা আপনার কাছে থাকল। আপনি হয়তো শহরে আছেন কয়েক যুগ ধরে। এখানে গড়ে তুলেছেন স্থায়ী আবাস। ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজে পড়ছে। বছরে একবারও যাওয়া পড়ে না গ্রামে। শহরের আলো-হাওয়া আর জৌলুসে বড় হচ্ছে আপনার সন্তানেরা। গ্রাম কী? সবুজ বিস্তীর্ণ মাঠ, বিল, ডোবা কী? খেজুর রস বলে কিছু আছে তাও জানে না হয়ত। বেড়ে উঠছে যন্ত্রের মধ্যে, যান্ত্রিক হয়ে। হাতের কাছে ল্যাপটপ, স্মার্ট ফোনসহ আরো কত্তো কি!

বিজ্ঞাপন

মানুষ বলতে আপনার সন্তানের কাছে মা-বাবা আর ভাইবোন। ওদের পৃথিবীজুড়ে এ ক’জনের বসবাস। সবকিছু এদের ঘিরেই। ভালমন্দ সব চার পাঁচজনকে নিয়েই। আর তাই তো গ্রাম থেকে কেউ হঠাৎ এলে আপনার সন্তানেরা ঠিক মেলাতে পারে না, কাছে টানতে পারে না, মোটকথা আপন করে নিতে সমস্যা হয়। সে জন্য গ্রাম থেকে আসা আপনার আপনজনও এদের কাছে ভিড়তে পারে না সহজেই। কারণ তখন ওরা ফোনে বন্ধুর সাথে কথার আদানপ্রদান নিয়ে ব্যস্ত, নয়তো ফেসবুকে ব্যস্ত, আবার কখনো ছবি দেখা নিয়ে ব্যস্ত। ‘কেমন আছো, ভালো আছি’- এইটুকুতে সীমাবদ্ধ থাকে কুশলবিনিময় পর্বটি।

আর এর ফলে কী হচ্ছে? আপনার গ্রাম থেকে আসা প্রিয়জনরা গোপনে কষ্ট পাচ্ছে। মুখ ফুটে কিছু হয়ত বলছে না। পাছে আপনি কষ্ট পেতে পারেন, এই ভেবে। এভাবে একসময় ওই মানুষগুলো আর আপনার সাথে দেখা করার জন্য শহরে আসার তাগিদ অনুভব করবে না। দিনে দিনে আপনি হয়ে পড়ছেন শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন।

এই যে আপনার সন্তান আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে, আপনার অজান্তে এটার কুপ্রভাব পড়ছে আপনার ওপরেই। আপনাকে তারা কতটুকু মূল্যায়ন করছে, আপনার বাবা মা ভাইবোন, যারা গ্রামে থাকে তাদেরকে বুঝতে পারছে না। নিজের ভেতরে নিজেকে নিয়ে সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকছে আপনার স্কুল বা কলেজ পড়ুয়া সন্তান। স্মার্ট ফোন তাকে দিচ্ছে অনেক অজানা তথ্য। যা তাকে কখনও শিহরিত করছে। আনন্দ দিচ্ছে। পুলকিত করছে।

আমরা মনে করি, আমাদের সন্তানেরা কেন পিছিয়ে থাকবে আধুনিক জীবনযাপন থেকে। কেন তারা স্মার্টফোন হাতে নেবে না। কেন তারা ল্যাপটপ ব্যবহার করবে না। কেন তারা হোয়াটসআপ, ইনষ্টাগ্রাম, ইমো, স্কাইপ বুঝবে না। না বুঝলে যদি সমাজে বেমানান হয়ে যায়? এ ধরনের আশঙ্কা, কখনো সমাজে সম্মান রক্ষারও জন্য হলেও ওগুলো সম্পর্কে তাদেরকে জ্ঞানার্জনে উদ্বুদ্ধ করি। মনে করি পাশের প্রতিবেশিকে তো গর্ব করে বলা যাবে, আমার ছেলে বা আমার মেয়ে স্মার্টফোনের সব খুঁটিনাটি বিষয়ে একেবারে পাকা, ‘আর বলবেন না ভাবি, সারাক্ষণ ওই নিয়ে ব্যস্ত থাকে ছেলেটা বা মেয়েটা!’-এটা বলতে পারার মধ্যে কী যে তৃপ্তি আমাদের! অথচ আমার বয়স্ক বাবা বা মা যখন গ্রাম থেকে শহরে আমার বাসায় বেড়াতে এলো দুদিনের জন্য, তখন যে সন্তানেরা ঠিকমতো কথাই বলল না তাদের সাথে, সেটা কোনো ব্যাপারই না আমার কাছে। এভাবেই বেড়ে উঠছে আপনার-আমার সন্তান।

বিজ্ঞাপন

আমার সন্তান ফেসবুকে কী শিখছে? গুগল, ইউটিউব ঘেঁটে কী দেখছে? ব্লু হোয়েল নিয়ে সারা বিশ্ব তোলপাড়। কি আছে ওই ব্লু হোয়েল নামক আসক্তিতে? কেন আমার সন্তান দিন নেই রাত নেই ফোনে ডুবে থাকছে? আমরা কি কখনো খবর নেই? কেন আমার সন্তানটি ক্রমশঃ ঝিমিয়ে পড়ছে? তা জানার আমরা প্রয়োজন মনে করি না। তারা আপনজন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, একদিন আপনাকেও ভুলে যাবে, আপনার সাথেও বেয়াদবি করতে দ্বিধা করবে না, এগুলো কি কখনও ভেবেছেন? তারা স্মার্টফোনের আসক্তিতে ভুলে ভালোবাসা মমতা আর পারিবারিক বন্ধন। শ্রদ্ধা সম্মান শব্দগুলো তাদের কাছে হয়ে গেছে খুব সেকেলে, পানসে।

কিছুদিন আগে এক পত্রিকায় দেখলাম মনোবিজ্ঞানীরা বলেছেন, স্মার্টফোন কিশোর মস্তিকের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বিষয়টা নাকি আগেই বুঝেছিলেন ষ্টিভ জবস আর বিল গেটস। ২০১২ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অ্যাপলের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করেন ষ্টিভ জবস। ২০১৪ সালে মাইক্রোসফট করপোরেশনের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে দাঁড়ান বিল গেটস। এক সাক্ষাতকারে বিল গেটস বলেছিলেন তার মেয়ের বয়স ১৪ হওয়ার আগ পর্যন্ত মুঠোফোন ধরতে দেননি। ২০০৭ সালে তার মেয়ে একটি ভিডিও গেমে আসক্ত হয়ে পড়লে বিধিনিষেধ আরোপ করেন। অপরদিকে ২০১১ সালে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে ষ্টিভ জবস বলেছিলেন তার প্রতিষ্ঠানে উদ্ভাবিত নতুন আইপ্যাড সন্তানদের ব্যবহার করতে দেননি। জবস বলেছিলেন, ‘আমার বাড়িতে সন্তানদের প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত রেখেছিলাম।’

গবেষকরা দেখেছেন বর্তমানে গড়ে ১০ বছর থেকেই শিশুরা ফোন ব্যবহার শুরু করে। যে শিশু কিশোররা দিনে গড়ে তিন ঘন্টা বা তার বেশি সময় ধরে ফোন ব্যবহার করে তাদের আত্মহত্যাপ্রবণ হয়ে ওঠার ঝুঁকি বেশি থাকে।

এই দুই বিশেষ ব্যক্তির কাছ থেকে মুঠোফোন বা আইপ্যাড সম্পর্কে যে ধারণা পাওয়া গেল তাতে আমরা কী বুঝলাম? তারা চাননি শিশুকিশোররা অল্প বয়সে স্মার্টফোন হাতে নিক। এত বড় বড় ব্যবসা গড়ে তোলায় যাদের অবদান তুলনাহীন, তারাই শিশুদের মুঠোফোন থেকে দূরে রাখার কথা ভেবেছেন। তারা নিশ্চয়ই এর কুফল সম্পর্কে বুঝতে পেরেছিলেন। আর আমরা?

আমরা চাই আমার আপনার সন্তান বেড়ে উঠবে ভালোবাসা আর মমতার ভেতর দিয়ে পারিবারিক বন্ধনে। তাদেরকে সোনালী মাঠ, সবুজ মাঠ আর বিস্তীর্ণ আকাশ দেখার সুযোগ করে দিব। এই শীতে সকালবেলা সর্ষেক্ষেতের পাশে যে আলপথ, তাতে যে রাতের ঝরা শিশির পড়ে থাকবে, তার ওপর দিয়ে খালি পায়ে হাঁটতে শেখাবো। অবশ্যই জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে পরিচয় থাকবে, তবে পারিবারিক মূল্যবোধ বাদ দিয়ে নয়। তা হলেই ওরা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠবে না। তা হলেই ওরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে উঠবে না। আপনজনের সান্নিধ্যে-ভালোবাসায় বেড়ে উঠবে সুন্দর মানুষ হয়ে। কে না চায় সুন্দর পারিবারিক বন্ধন!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)