চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আমাদের শঙ্কার দিনগুলোর কথা ভাবুন

বিশ্বে এই মুহূর্তে সব থেকে বড় সঙ্কটের নাম নভেল করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯। কয়েকদিন ধরে আমাদের দেশেও এই ভাইরাস খুব দ্রুত গতিতে ছাড়াচ্ছে। গত দু’দিনে দ্বিগুণ হারে বেড়েছে করোনায় আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। এই ভাইরাস সংক্রমণের বিস্তার নিয়ে উৎকণ্ঠায় রয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও।

সংক্রমণের এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হচ্ছে মৃত্যুহার। ‘ওয়ার্ল্ডমিটার’র তথ্য অনুযায়ী, অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা অল্প। এখন পর্যন্ত ১২৩ জন। বিষয়টি কিছুটা স্বস্তি দিলেও মৃত্যুর হার কিন্তু অনেক দেশের তুলনায় বেশি! স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, দেশে করোনায় মোট ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে মৃত্যুহার ৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ। যা সারাবিশ্বে মৃত্যুহারের প্রায় দ্বিগুণ। প্রাণঘাতি ভাইরাসে সারাবিশ্বে এখন পর্যন্ত মৃত্যুহার ৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

দেশভিত্তিক হিসাব করলে করোনায় মৃত্যুর হারে ইটালি ও যুক্তরাজ্যের পরেই রয়েছে বাংলাদেশ। ইটালিতে এখন পর্যন্ত মৃত্যুহার ১২ দশমিক ৪৬ শতাংশ। সোমবার পর্যন্ত দেশটিতে মোট আক্রান্ত ১ লাখ ৩২ হাজার ৫শ’ ৪৭ জন। এর মধ্যে ১৬ হাজার ৫শ’ ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

মৃত্যুহারে ইটালির পরেই যুক্তরাজ্যের অবস্থান। দেশটিতে করোনায় মৃত্যুহার ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ। সোমবার পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে ৫ হাজার ৩শ’ ৭৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর আক্রান্তের সংখ্যা ৫১ হাজার ৬শ’র বেশি।

এরপরেই যৌথভাবে তৃতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ ও স্পেন। ওয়ার্ল্ডমিটারের তথ্য মতে, সোমবার পর্যন্ত দেশ দু’টিতে কোভিড নাইন্টিনে মৃত্যুহার ৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ। স্পেনে ১ লাখ ৩৬ হাজারের বেশি রোগী করোনা আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের পরেই অবস্থনে রয়েছে ইউরোপের এ দেশটি।

ইউরোপের মধ্যে ইটালির পরেই যথাক্রমে স্পেন ও ফ্রান্স যেনো মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। স্পেনে ১ লাখ ৩৬ হাজার আক্রান্তের মধ্যে ১৩ হাজার ৩শ’ ৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে। ফ্রান্সে মোট আক্রান্ত ৯৮ হাজারের বেশি। এর মধ্যে ৮ হাজার ৯শ’ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশটিতে মোট মৃত্যুহার ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ।

করোনা দ্রুত সংক্রমণ ও আক্রান্তের সংখ্যায় শীর্ষে অবস্থান করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে এখন পর্যন্ত ৩ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। যা বিশ্বের মোট আক্রান্তের ২৭ শতাংশ। আর ১০ হাজার ৮শ’ ৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তের তুলানায় দেশটিতে মৃত্যুহার অনেকটাই কম, এখন পর্যন্ত ২ দশমিক ৯৭ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

কোভিড নাইন্টিনের উৎপত্তিস্থল চীনে মৃত্যুর হার ৪ দশমিক ০৭ শতাংশ। আর আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে বর্তমানে মৃত্যুহার ২ দশমিক ৮৪ শতাংশ। যা বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় তিন গুণ কম। ভারতে মোট ৪ হাজার ৭শ’র বেশি করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১শ’ ৩৬ জন করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

দেশে করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের আরেকটি শঙ্কার বিষয় হিসেবে দাঁড়িয়েছে স্থানীয়ভাবে সংক্রমণ বা কমিউনিটি ট্রান্সমিশন। সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন শুরু হয়ে গেছে। তার মানে এখন ভাইরাস সংক্রমণের তৃতীয় ধাপে (স্টেজ থ্রি) প্রবেশ করেছে। আর মাত্র একটি ধাপ পেরোলেই ইউরোপের দেশগুলোর মতো পুরোপুরি নাগালের বাইরে চলে যাবে। ফলে যেকোনো সময় মৃত্যুপুরী হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশ।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মেনে চলা। অর্থাৎ আক্রান্ত এবং সন্দেহজনক মানুষজন-সহ কেউ কারও সংস্পর্শে না আসা। কিন্তু সামাজিক বিচ্ছিন্নতাও পুরোপুরি মেনে চলছে না সাধারণ মানুষ। এই বিষয়ে আইনশৃংখলা বাহিনী ও সেনাবাহিনীকে আরও কঠোরভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। আর সচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়ে কাজ করতে হবে।

সোমবার রাজধানীতে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে করণীয় বিষয় নিয়ে স্বাস্থ্যখাতের পেশাজীবী সংগঠন ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে জরুরি বৈঠক করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, করোনা সংক্রমণের তৃতীয় ধাপে থাকা বাংলাদেশের জন্য আগামী ১০-১৫ দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে বাংলাদেশ মেডিসিন সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আহমেদুল কবীর জানিয়েছেন, দেশে সামনে কঠিন সময় আসছে। এখনই পুরো দেশে লকডাউন করা জরুরি। পুরো দেশ লকডাউন না করা হলে এই ভাইরাস আগামী ১০ দিনে ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে।

সভায় দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ জানিয়ে সরকারকে এখনই শক্ত অবস্থান নেবার অনুরোধ জানিয়েছেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের (নিমস) পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী দীন মোহাম্মদ ।

এবার ভাবুন আমাদের শঙ্কার দিনগুলো কিন্তু দিনদিন ঘনীভূত হচ্ছে। ভাইরাসের সংক্রমণ এভাবে চলতে থাকলে দুই-সপ্তাহে এক ভয়াবহ মৃত্যুপরীতে পরিণত হতে পারে বাংলাদেশ। দেশে এখনও আরো কিছু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আছে। সে বিষয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সজাগ দৃষ্টি কামনা করছি। আসুন আমরা দেশকে বাঁচাই, নিজেরাও বাঁচি। সবার সচেতনতাই পারে আমাকে আপনাকে রক্ষা করতে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)