চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আমাদের দেশে আপাতত প্রতিবাদ নেই

লেখক-প্রকাশক শাহজাহান বাচ্চু দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হয়েছেন। সেটা নিয়েই এবার ফেসবুকে পোস্ট দিলেন কলামিস্ট ও উন্নয়নকর্মী চিররঞ্জন সরকার।

ফেসবুকে এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, দুর্বৃত্তের গুলিতে লেখক-প্রকাশক শাহজাহান বাচ্চু নিহত হলেন। নির্লোভ নিরহঙ্কার কিন্তু প্রতিবাদী এই মানুষটিকে গুলি করে হত্যা করা হলো, অথচ এই হত্যার বিরুদ্ধে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। আমরা সবাই ব্যস্ত নিজ নিজ কাজে, ধান্দায়! কে করবে প্রতিবাদ?

অবশ্য এটাও তো ঠিক, কি-ইবা হবে প্রতিবাদ করে? বিচার কি হবে? ঘাতকদের কি খুঁজে বের করা যাবে?

আমাদের দেশে আপাতত প্রতিবাদ নেই। হতাশা আর হতাশা! এক কালের প্রতিবাদী বিশিষ্টজনরা বর্তমানে ‘হিরণ্ময় নৈঃশব্দ্য’-এর ব্রত গ্রহণ করেছেন। বিদ্বজ্জনরা অমেরুদণ্ডী হয়ে উঠছেন, অপ্রাসঙ্গিকও হচ্ছেন। আর শাসকরাও বিদ্বজ্জনদের কেয়ার করে না।

অবশ্য কেয়ার করবেই বা কেন? শাসক জানে, বিদ্বজ্জনদের ক্ষমতা সীমিত। তারা রাজনীতিগতভাবে অস্পষ্ট এবং সে কারণে দুর্বল। এ-ও ঠিক, শাসকের রেজিমেন্টেড সত্তার সামনে তাঁদের অসহায়তাই ফুটে ওঠে। বিরোধী কোনও স্বরকে নস্যাৎ করতে, দল এবং প্রশাসনকে সুকৌশলে ব্যবহার করে শাসকেরা। কাজেই শাসক বনাম বুদ্ধিজীবীদের লড়াই অসম প্রকৃতির হতে বাধ্য।

এরপরে তিনি লিখেছেন, আমাদের দেশে সিভিল সোসাইটির আন্দোলন যে দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারছে না তার কারণ কী? এর একটা বড় কারণ, বুদ্ধিজীবীরাও এখন দলবাজ। শাসকের সঙ্গে আছেন সরকার পক্ষের বুদ্ধিজীবীরা। তারা শাসকের গুণ গাইবেন এটাই তো স্বাভাবিক। আরেকদল আছেন যারা সরকার বিরোধী। তারা কেবলই সরকারের দোষ ধরেন, খুঁত খোঁজেন। অবশ্য যারা শাসকদের অপকর্মের যুক্তিনিষ্ঠ সমালোচনা করতে চান, কোনও অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে চান, নানা কূট প্রশ্নের মাধ্যমে শুরুতেই প্রয়াসটিতে জল ঢেলে দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

কবিতা, গান, নাটক নিয়ে আমাদের গর্ব আছে, কিন্তু সমাজে তার প্রভাব কতটুকু? এ সব তো নিছকই ভদ্রলোক-সমাজের শৌখিন কালচারের বিষয়, শিক্ষিতদের সংস্কৃতি সম্পর্কে নিচুতলার মানুষের কোনও আগ্রহও নেই। তাঁরা চটুল নাচগান, নীল ছবি, ধর্মকর্ম, উৎসব-অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে মজে থাকেন। ভদ্রলোক জীবনের কালচার নিম্নবর্গের জনজীবন থেকে শত যোজন দূরে, দুইয়ের কোনও যোগ নেই।

লেখাপড়া জানা মানুষও আজকাল কবিতা পড়েন না, রবীন্দ্র-নজরুলের গানে মজে না, শিল্পকলায় নাটক দেখেন না। এ সময়ের ভদ্রলোক শ্রেণিও অনেকাংশে সিরিয়াস সাহিত্য-সংস্কৃতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। বিনোদনসর্বস্ব কালচারে মজে থাকাটাই বর্তমানে বেশিরভাগ মানুষের ধ্যানজ্ঞান।

ফিলিস্তিনের পয়গম্বরতুল্য কবি মাহমুদ দারবিশের কবিতা শুনতে সমাজের হাজার হাজার মানুষ দামাস্কাস বা কায়রোতে জড়ো হন, এ দেশে কি এমন সমাবেশ সম্ভব?

অবক্ষয়ে ঘুমিয়ে পড়া প্রতিবাদী সত্তাকে খুঁচিয়ে তোলার জন্য তেমন শঙ্খ ঘোষ কই, যিনি আমাদের প্রতিনিধি হয়ে বলবেন ‘আরো কত ছোটো হব ঈশ্বর/ভিড়ের মধ্যে দাঁড়ালে!/আমি কি নিত্য আমারও সমান/ সদরে, বাজারে, আড়ালে?’ কিম্বা ‘এক রাস্তা দুই রাস্তা তিন রাস্তা কেউ রাস্তা/রাস্তা কেউ দেবে না, রাস্তা করে নিন।/তিন রাস্তা চার রাস্তা সব রাস্তা সমান/ রাস্তা করে নিন।’ কিম্বা ‘একটু মশাই নড়ুন/ভিতর থেকে নড়ুন/ চাপ সৃষ্টি করুন…’; সমাজে এমন অভিজ্ঞাত কোথায় যার আঘাতে অভিঘাতে আমাদের সেই ঘুমন্ত সত্তা জেগে উঠে প্রতিবাদী হয়ে ঘুরে দাঁড়াতে চাইবে?

আমাদের অলস চৈতন্যের মাটিতে কাব্য-সাহিত্য-নাটক আর প্রতিবাদের বীজ বোনে না। শোনায় না কেউ জেগে ওঠার গান, ঘুরে দাঁড়ানোর গান।

সবশেষে তিনি লিখেছেন, আমরা এখন সব হারিয়ে পেয়েছি এক ফেসবুক। যেখানে নিজের ঢাক নিজেই পেটাই। এখন অবশ্য নিজের ঢাক নিজেরই পেটানোর যুগ। তাতে সব কদর্যতাই ঢাকা পড়ে যায় বলে ভাবা হয়। এ হল এক সেলফি সমাজ। চিৎকার করে সবাই বলছে আমায় দেখো, আমায় দেখো। এক দিকে অন্ধ মূঢ় ধর্মবিশ্বাস-কেন্দ্রিক সাম্প্রদায়িকতা আর অন্য দিকে অহং-অহং-অহং। সেই অহং-ব্যবস্থা গণতন্ত্রের কবরের মধ্যে এক আধুনিক রাজতন্ত্রের অতীতচারী দুরাশা হয়ে টিকে আছে।

আর আমরা ছোট হয়ে, ক্ষুদ্র হয়ে তুচ্ছ হয়ে বেঁচে আছি!

বিজ্ঞাপন