চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আমাদের উপলব্ধির বন্ধ্যাত্ব ও মুক্তির পথে অন্তরায়

যদি প্রশ্ন করা হয়, অন্যান্য প্রাণীর সাথে মানুষের পার্থক্য কোথায়? এক্ষেত্রে প্রথমেই বলতে হয় জীবন-যাপনের অংশ হিসেবে মানুষ অতিতকে মনে করে যেমন সুখ অনুভব করে কিংবা অনুশোচনা করে, তেমনি বর্তমানও মানুষকে উদ্বেলিত করে, আবার ভবিষ্যতও মানুষকে গভীরভাবে ভাবায়। তাই বলা হয় মানুষ এমন একটা প্রাণী যে একইসাথে তিনকালে বসবাস করে- অতীতকাল, বর্তমানকাল ও ভবিষ্যৎকাল। এখানেই অন্যান্য প্রাণীর সাথে মানুষের পার্থক্য। কারণ অন্যান্য প্রাণী শুধু বর্তমানে বাস করে। অতীত ও ভবিষ্যৎ নিয়ে এ সকল প্রাণীর কোন সচেতন প্রয়াস থাকে না। কিন্তু এ সকল ক্ষেত্রে মানুষের সচেতন প্রয়াস থাকে যা তার বুদ্ধিবৃত্তি ও মর্যাদাবোধের নির্দেশক।

মানুষের এই অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে মানুষের শ্রম। ব্যক্তির শ্রম এমন এক মহান কর্ম যার মাধ্যমে সে জগতকে বদলায় এবং সাথে সাথে নিজেকেও। ব্যক্তি ও জগতের মধ্যে একটি পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার সম্পর্ক বিদ্যমান যেখানে ব্যক্তির শ্রম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ শ্রম মানুষকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে। তাই স্বাভাবিকভাবেই মায়ের কাছ থেকে তার সন্তানকে আলাদা করা যেমন অন্যায় ও অমানবিক তেমনি ব্যক্তি থেকে তার শ্রমকে তথা শ্রমের ফসলকে আলাদা করাও অন্যায় ও অমানবিক। কিন্তু বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট মুক্ত বাজার অর্থনীতি’র নামে এই অমানবিক ব্যবস্থাকেই মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করেছে যা মানুষে মানুষে ব্যাপক বৈষম্য সৃষ্টি করে তাদের জীবনকে দূর্বিষহ করে তুলেছে। শ্রমিক শোষণ ও উদ্বৃত্ত মূল্যের আত্মসাৎ এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার একমাত্র চালিকাশক্তি।

বিজ্ঞাপন

এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ১৯৬০’র দশকে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি আয় করা ৫ জন মানুষের সাথে সবচেয়ে কম আয় করা ৫ জন মানুষের আয়ের পার্থক্যের অনুপাত ছিল ৩০ : ১, ১৯৮০’র দশকে তা গিয়ে পৌছায় ৬০ : ১ এ, এবং ১৯৯০’র দশকে ১৩৫ : ১ এ। বর্তমানে এটা যে রেকর্ড পরিমানে বেড়েছে এবং বাড়ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই অসহনীয় বৈষম্য সৃষ্টিকারী একটি ব্যবস্থা কি মানবজাতির সামগ্রিক কল্যাণ আনয়নে অনুসৃত পন্থা হতে পারে? ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ১৯৭০’র দশক থেকে বিশ্বব্যাপী নিও লিবারেল (তথাকথিত নব্য উদারতাবাদ) ধারণা’র ব্যাপক প্রচার শুরু হয় যা ‘ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মত প্রকাশের অধিকারকে’ ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মুক্ত বাজার অর্থনীতির পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করে। এক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয় বিষয় হল একটি নিও লিবারেল রাষ্ট্র তখনই ব্যক্তির মতপ্রকাশকে সহ্য করে যখন ব্যক্তি বিচ্ছিন্নভাবে কিংবা এককভাবে তার মত প্রকাশ করে, কিন্তু যখনই ব্যক্তিসমষ্টি সম্মিলিতভাবে কোন অবস্থান নেয় বা কোন শোষণের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করে তখনই রাষ্ট্র তার বিভিন্ন বাহিনী দিয়ে তা কঠোরভাবে দমন করে। অর্থাৎ ব্যক্তির মত প্রকাশের স্বাধীনতা ততক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্র অনুমোদন দেয় যতক্ষণ পর্যন্ত তা বৈষম্য ও আধিপত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে না দাড়ায় ।

বিজ্ঞাপন

তাই নিও লিবারেল রাষ্ট্র ‘ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মত প্রকাশের অধিকার’ এর নাম করে মূলত পদ্ধতিগতভাবে শ্রমিক শোষণ, ব্যক্তির সীমাহীন মুনাফা অর্জন ও মুক্তবাজার অর্থনীতির পৃষ্ঠপোষকতা করে। এক্ষেত্রে সংবিধানে উল্লেখিত “সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ বা জনগনের সম্মতি” এটি নিছক ফাপা স্লোগান মাত্র। ফয়েজ আলম লিখেছেন, “গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় জণগণই সকল ক্ষমতার মালিক-এ বক্তব্য এখন বিপদজনক ফাঁদ। পৃথিবীর বহুদেশেই জণগণ এমন এক আর্থ-সামাজিক অবস্থায় নীত যেখানে ‘জনসমাজ’ বলে একীভূত কিছুর অস্তিত্ব নেই।“ অনেকগুলো বিষয় যেমন রাজনীতি, ধর্ম, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয়তাবাদ ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে জনগণ পরস্পর বিরোধী ও চরম মাত্রায় অসহযোগী।

এ সকল রাষ্ট্রে জনগণের চেয়ে পুজি/অর্থ, সে সূত্রে দল, অস্ত্র, প্রচারণা অনেক বেশি সংগঠিত ও ক্ষমতাধর। এভাবে রাষ্ট্র ও রাজনীতি পুজিবাদী ব্যাবসায়ী ও সহিংসতা/দলবাজিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলে আশ্রয় পাওয়া কতিপয় আদর্শহীন ব্যক্তির দখলে। ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্র প্রতিনিয়ত পুজিবাদী ও মুষ্টিমেয় দলবাজ লোকের স্বার্থ সংরক্ষণ করে চলেছে। রাষ্ট্র একদিকে যেমন মানুষের খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ইত্যাদি মৌলিক অধিকারগুলো পূরণে অনিচ্ছুক বা অপারগতা দেখায়, তেমনি অন্যদিকে শিক্ষা, চিকিৎসা’র মত জনগুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোকে ব্যক্তিমালিকানায় ব্যবসায়ী পণ্য বানিয়ে পুজিপতিদের সীমাহীন মুনাফা করার সুযোগ দেয়। আর রাজনীতিবিদ ও জনগনের পারস্পারিক অবিশ্বাস ও দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে পুজিপতি ও ব্যবসায়ী শ্রেণী যদি রাজনীতিকে দখল করে তাহলে রাষ্ট্রের অবক্ষয় ও ব্যাপক সংখ্যক জনগনের দূর্দশা কোন পর্যায়ে পৌছায় বর্তমান বাংলাদেশ তার প্রমাণ।

চিন্তার বিষয় হল এরকম একটি বৈষম্যমূলক বাজার ব্যবস্থাকে আমরা কি করে স্বাভাবিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বলে মেনে নিয়েছি, গ্রহণ করেছি ও অনুসরণ করে চলেছি? কি করে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থা স্থূল পুজিবাদীদের স্বার্থ রক্ষা করছে ও এরকম বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখছে? এটা স্পষ্ট যে সরকার তার হীন স্বার্থ ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন সামরিক ও বেসামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করে। জনগনের টাকায় চালিত এসকল বাহিনীকে জনগনেরই প্রতিপক্ষ হিসেবে লেলিয়ে দেয়।

কিন্তু প্রশ্ন হল সরকার কি শুধুই বল প্রয়োগ করে ক্ষমতায় টিকে থাকে , নাকি অন্য পন্থাও অবলম্বন করে যা জণগণের সম্মতি আদায় করে সরকারকে শোষণমূলক চরিত্র নিয়েও দীর্ঘকাল ক্ষমতায় টিকে থাকার পথকে সুগম করে দেয়। এক্ষেত্রে আমরা ইতালির মার্ক্সবাদী চিন্তক আন্তোনিও গ্রামসি’র বক্তব্য স্মরণ করতে পারি। তিনি বলেন এক্ষেত্রে সংস্কৃতি’কে ব্যবহার করে মানুষকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। কারণ সংস্কৃতি ও সামগ্রিক সাংস্কৃতিক বোধ মানুষ ও সমাজের ভিত্তিমূল হিসেবে কাজ করে। গ্রামসি লিখেছেন, “সংস্কৃতি একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের জিনিস।

বিজ্ঞাপন

এ একটা সংগঠন, আমাদের ভিতরের অহংকারকে নিয়ন্ত্রণে আনা, আমাদের ব্যক্তিত্বের উপর কর্তৃক বিস্তার করা এবং একটা উন্নততর সচেতনতায় পৌছানো যার মাধ্যমে আমরা আমাদের ঐতিহাসিক মূল্য, জীবনে আমাদের স্বকীয় ভূমিকা এবং আমাদের নিজস্ব অধিকার ও কর্তব্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হই।“ তাই শুধু ক্ষমতা প্রয়োগ করে নয় বরং বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও সরকার জনগণের সম্মতি আদায় করে ও তাদের নিস্ক্রিয় করে রাখে। এখানে বিষয়টি এরকম যে, যারা সাংস্কৃতিক আন্দোলন-সংগ্রাম ও বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতার বিরুদ্ধে লড়াই করে জনগণের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট হবেন তাদের চিন্তাচেতনা ও সংস্কৃতির পরিমন্ডলকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলা হয় যে তারা কেবল নিজেকে নিয়ে, নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরেন। এখানে ব্যক্তির সামনে থাকে ভবিষ্যতের সুন্দর জীবনের হাতছানি যা তাকে অন্য সকলের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে জনগণের সামগ্রিক মুক্তি-প্রচেষ্টা তার কাছে অসম্ভব এবং বাতুলতা বলে মনে হয়।

এহেন বাস্তবতায় জনগণ যে সংস্কৃতির চর্চা করে সেখানে তাদের স্বকীয়তা বা নিজস্বতা বলে কিছু থাকে না। কারণ এ সংস্কৃতি হল অন্যের চাপিয়ে দেয়া সংস্কৃতি যা কারখানায় উৎপাদিত হয়। এ বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে জার্মান মার্ক্সবাদী থিওডর ডাব্লু অ্যাডর্নো “সংস্কৃতি কারখানা” (Culture Industry) শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, স্থান-কালের প্রেক্ষিতে সংস্কৃতির ভিন্ন ভিন্ন ধরণ বা স্বরুপ থাকে। কিন্তু বর্তমানে enlightenment বা আধুনিকতার নাম করে সংস্কৃতি কারখানায় উৎপাদিত হচ্ছে। একটি পণ্য যেমন কারখানায় উৎপাদিত হয়, তেমনি সংস্কৃতিও এখন বড় বড় কর্পোরেট অফিস, মিডিয়া হাউস, বিজ্ঞাপন সংস্থায় উৎপাদিত হচ্ছে। এখানে সংস্কৃতি সকলের জন্য গণ প্রায়। যেখানে আমি,আপনি, আমরা এই সংস্কৃতির একটি নিস্ক্রিয় (passive) ভোক্তা মাত্র। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে বছরের কোন দিনকে কোন রঙে রাঙিয়ে উদযাপন করা হবে তা ঠিক করে দেয় বিভিন্ন মিডিয়া হাউস ও মুনাফাখোর ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ ইন্ডাস্ট্রি বা “সংস্কৃতি কারখানা” আয়োজন করে আমাদের যা গেলাচ্ছে তা আমাদের কোন স্বাধীন সার্বভৌম অভিব্যক্তির বহিঃপ্রকাশ নয়, আমরা কেবল তা পরিসেবন করি ও তৃপ্ত হই। এই তৃপ্ত হওয়ার মাধ্যমে আমার/আমাদের যে স্বাধীন জীবনদর্শন গড়ে উঠতে পারতো যা আমার সার্বভৌম চিন্তার বহিঃপ্রকাশ তা রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।

কারণ এই কারখানার সংস্কৃতির উৎপাদিত পণ্যে আমরা আবিষ্ট! ফলে এই সংস্কৃতি কারখানা আমাদের চৈতন্য বিকাশের পথে কেবল অন্তরায়ই নয় বরং আমাদের চৈতন্যকে একটি দীর্ঘকালীন শিথিল ও নিস্ক্রিয় অবস্থানে পর্যবসিত করার একটি ঐতিহাসিক ষড়যন্ত্রও বটে। সংস্কৃতি কারখানা আমাদেরকে আবিষ্ট, পথভ্রষ্ট করে সার্বভৌম সত্তা প্রকাশে বাধার সৃষ্টি করে। এটাই হল আধুনিকায়ন তথা এনলাইটেনমেন্ট (enlightenment) এর ফাঁকি যা কিনা চিত্ত বিকাশের কথা বলেছে বটে কিন্তু বাস্তবে চিত্ত বিকাশকে রুদ্ধ করে। এই বিদ্যমান পরিস্থিতির সুবিধা নিয়েই রাষ্ট্র কোন প্রকার বাধা বিঘ্ন ছাড়াই তার স্বেচ্ছাচারিতা ও বৈষম্যমূলক শোষণকার্য চলমান রাখে।

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হল রাষ্ট্রের দুর্নীতি, বৈষম্য ও আধিপত্য সম্পর্কে আমরা সকলেই অবগত। কিন্তু আমরা কেন এর পরিবর্তন করতে পারছি না বা অদূর ভবিষ্যতে পরিবর্তনের সম্ভাবনাও দেখছি না। এর কারণ ব্যাখ্যায় ব্রাজিলীয়ান মার্ক্সবাদী পাওলো ফ্রেইরী’র বক্তব্য অত্যন্ত প্রণীধানযোগ্য। তিনি বলেন এক্ষেত্রে অত্যাচারের শিকার জনগণের চারিত্রিক দ্বৈততা ও দ্বিচারিতা দায়ী। “বিরাজমান বাস্তব অবস্থার দ্বান্দ্বিকতা দ্বারা যেহেতু তাদের চিন্তাচেতনার কাঠামো প্রস্তুত হয়েছে, তাই তারা এমনটি করে।” অত্যাচারের শিকার জণগণ মনে মনে এক ধরনের উভয় সংকটে ভোগে। বিষয়টি এমন যে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দ্বারা শোষিত জনগণ/ব্যক্তি নিজেই ক্ষমতার অংশ হতে চায়। প্রতিযোগিতা করে সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার প্রচেষ্টা কিংবা সরকারি উর্দ্ধতন কর্মকর্তা ও রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান ব্যক্তির সাথে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানান দেয়া এ ধরনের প্রবনতারই বহিঃপ্রকাশ। এখানেই ব্যক্তি বা জনগনের দ্বিচারিতা ক্রিয়াশীল। তাই তারা কোটা সংস্কার চায় কিন্তু তা শোষণের অবসানের জন্য নয় কিংবা মুক্ত মানুষ হবার প্রচেষ্টা নয় বরং ক্ষমতার অংশ হওয়া বা আরো স্পষ্ট করে বলা যায় জনগনের বস হবার প্রচেষ্টা। ফলস্বরূপ নিপীড়নমূলক বাস্তবতা অপরিবর্তিতই থেকে যায়।

তাহলে এই অলাতচক্র থেকে মুক্তির উপায় কি? প্রথম উপায় হল উপলব্ধিকে শানিত করা। যে অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থা ব্যক্তির শ্রমকে শোষণ করে, উদ্বৃত্ত মূল্য আত্মসাৎ করে পুজিবাদী ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখে, ব্যক্তি থেকে তার সৃষ্টিকে আলাদা করে, যে ব্যবস্থা মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক করে, নিজেকে ছাড়া অন্য সকলকে প্রতিযোগী ও প্রতিপক্ষ ভাবতে বাধ্য করে, একজনের ব্যর্থতার উপর অন্যজনের সফলতাকে নির্ভরশীল করে তোলে তাকে কি আমরা স্বাভাবিক ও অবসম্ভাবী অনুসৃত পন্থা ও অনুকরণীয় সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যবস্থা বলতে পারি? নাকি বলতে হয় এই ব্যবস্থা শাসকের হাতে জণগণকে পদ্ধতিগতভাবে শোষণ করার হাতিয়ার তুলে দেয় মাত্র। তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি তা হল যদি মুক্তি অর্জন করতে হয় তবে অত্যাচার ও শোষণের ধরণ ও বাস্তবতা বুঝতে হবে। এক্ষেত্রে অন্যায় অবিচার এমনিতেই একদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এ ধরনের আধিবিদ্যক ধ্যানধারণার পরিবর্তন আবশ্যক।

এটাও বুঝতে হবে যে, ভণ্ডামিপূর্ণ, আবেগময় এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক দয়াদাক্ষিণ্যে এই অচলায়তন থেকে মুক্তি অসম্ভব। বুঝতে পারা জরুরি যে, কোন কল্পনা-বিলাসের মাধ্যমে এর সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিংবা মহেশ বাবু টাইপ কোন সুপার হিরো এসেও এর সমাধান করে দিবে না। কেননা মানুষের এই বন্দিদশা কোন অন্ধকার কক্ষ নয় যে বৈদ্যুতিক সুইচ টিপে দিলাম আর সবকিছু আলোকিত হয়ে গেলো। সত্যিকার মুক্তির জন্য একটি দীর্ঘকালীন সংগ্রাম ও সক্রিয় সাংস্কৃতিক প্রয়াস চলমান রাখা জরুরী যা আমাদের উপলব্ধিগত যে বন্ধ্যাত্ব রয়েছে তার পরিবর্তনে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে, যেখানে ব্যক্তি একজন স্বাধীন সত্তা হিসেবে নিজের ধ্যানধারণা’র বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হবে। ব্যক্তিস্বার্থে সরকার বা ক্ষমতার ধামাধরা ব্যক্তিতে পরিনত হবে না, বরং মুক্তির জন্য সম্মিলিত প্রয়াসে উদ্ভূদ্ধ হবে। শিক্ষা এক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে, তবে তা অবশ্যই বর্তমানের বাজারমুখী ব্যবসায়ী শিক্ষা নয়।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)