চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আমলাদের রাষ্ট্রীয় প্রটোকল বনাম শিক্ষকের মেরুদণ্ড

সরকারি কর্মকর্তাকর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন স্কেল ঘোষণার পর থেকে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। তারা সিলেকশন গ্রেড বহাল ও আলাদা বেতন স্কেলের দাবিতে আন্দোলন কর্মসূচি পালন করে আসছেন। আন্দোলনকারী শিক্ষকদের অভিযোগ ৭ম থেকে ৮ম বেতন স্কেলে শিক্ষকদের অবস্থান কয়েক ধাপ নিচে নামিয়ে দেয়া হয়েছে!

আমলাদের করা রাষ্ট্রীয় প্রটোকল অনুযায়ী একজন সিনিয়র সচিব একজন বিশ্ববিদ্যালয় সিনিয়র প্রফেসরের চেয়ে চার ধাপ ঊর্ধ্বতন হিসেবে বিবেচিত হবেন। এটা নিয়ে শিক্ষকদের গুরুতর আপত্তি রয়েছে। তাদের বক্তব্য, একজন আমলা কিংবা সেনাপ্রধানের চেয়ে একজন শিক্ষকের গ্রেড কেন নিচে থাকবে?

বিজ্ঞাপন

ওদিকে, অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামোতে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে সারা দেশের সব সরকারি কলেজের শিক্ষকরাও আন্দোলনে নেমেছেন। বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারভুক্তদের অভিযোগ, সিলেকশন গ্রেড না থাকায় অধ্যাপকরা চতুর্থ গ্রেড থেকে অবসরে যাবে, এতে অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা উচ্চ পদগুলোতে আসবে, এটা বৈষম্যমূলক। দেখা যাচ্ছে, নতুন বেতন কাঠামোয় আমলাদের তুলনায় শিক্ষকরা বেতন ও মর্যাদায় পিছিয়ে পড়েছেন বলে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। এতে করে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

ইতিমধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রতিনিধিদের আলোচনা হয়েছে। এই আলোচনা অব্যাহত রাখতে হবে। এ ব্যাপারে উভয় পক্ষকে ইতিবাচক মনোভাব প্রদর্শন করতে হবে। বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষার পরিবেশ যেন কিছুতেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়-সে ব্যাপরে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

এমনিতেই আমাদের দেশে শিক্ষার মান অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। বঞ্চিত ক্ষুব্ধ শিক্ষকরা যদি আন্দোলনের পথে যান তাহলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে। যা পুরো জাতির জন্য হবে অত্যন্ত ক্ষতিকর। শিক্ষার পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এমন যে কোন পদক্ষেপ থেকে সচেতনভাবে দূরে সরে আসতে হবে। আর সরকারের উচিত শিক্ষকদের দাবি-দাওয়াগুলোকে অগ্রাধিকার ও সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করা। চাণক্য বলেছিলেন, ‘‘শিক্ষককে কখনও অবহেলা করা উচিত নয়। সৃষ্টি ও ধ্বংসের দুয়েরই বীজ লুকিয়ে রয়েছে শিক্ষকের মধ্যে।’’

বস্তুত একজন ছাত্রছাত্রীর জীবনে যোগ্য শিক্ষকের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষ শিক্ষকই পারেন তার ছাত্রকে নিশ্চিত রূপে আদর্শগত ভাবে রূপান্তর করতে। একজন যথার্থ শিক্ষকই পারেন তাঁর ছাত্রের মধ্যে যথাযথ মনন বুদ্ধি চিন্তাকে বাস্তব রূপে প্রতিফলিত করতে। এবং আগামী জীবনযাত্রায় প্রতিটি উপযুক্ত জীবিকা ও সৎ নাগরিক তথা মানুষ গড়ার কারিগর তাঁরাই।

ইউনেস্কো ও আইএলও সনদেও শিক্ষকের মর্যাদা নিশ্চিত করা হয়েছে। এই সনদ অনুযায়ী ‘শিক্ষক’ বলতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বরত থেকে ছাত্রদের সুশিক্ষা প্রদানের ব্যাপারে যারা নিয়োজিত থাকবেন, তাঁদেরকে বোঝানো হয়েছে। আর ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ বলতে বুঝানো হয়েছে শিক্ষকতা কাজের গুরুত্বানুসারে এবং সততার সঙ্গে সম্পন্নের যোগ্যতা ও পারদর্শিতার কারণে প্রদত্ত সম্মান ও আনুষঙ্গিক সুবিধাদি অন্যান্য পেশাজীবি সম্প্রদায়ের তুলনায় তাঁদের কাজের শর্তাদি, পারিশ্রমিক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাদির মধ্যে সামঞ্জস্যবিধান। কাজেই শিক্ষকদের দাবি-দাওয়া মেনে নেয়ার ব্যাপারে সরকারকে অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

পাশাপাশি শিক্ষকদেরও নিজেদের ভূমিকা বদলাতে হবে। তাদের নামে যেসব অভিযোগ আছে, এসব অভিযোগের দায় থেকে মুক্ত হবার জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। প্রয়োজন আত্মপোলব্ধি। আত্মশুদ্ধি।শিক্ষকরা লেখাপড়া করেন না, দলবাজি করেন, ক্লাস, পরীক্ষা, ইনকোর্স-টিউটরিয়াল, পরীক্ষার খাতা দেখা ইত্যাদি কাজে ফাঁকি দেন, টাকার ধান্দায় ব্যস্ত থাকেন-এমনি হাজারো অভিযোগ আজ শিক্ষকদের বিরুদ্ধে। শিক্ষকরা কি কখনও নিজেদের অবস্থার মূল্যায়ন করে দেখেছেন?

বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চমৎকার এক ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। স্বাধীন মেরুদণ্ডসম্পন্ন শিক্ষক হিসেবে তাদের বেড়ে উঠার সুযোগ যেন ক্রমেই অপসৃয়মান। গবেষণা কিংবা অধ্যয়নের পরিবর্তে দলাদলি করতে শিক্ষকরা উৎসাহিত হন বেশি। যেন কলোনিতে একটা বাসা পাওয়া যায়। তারা ব্যস্ত থাকেন ভর্তি পরীক্ষা কমিটির সদস্য হতে, পরীক্ষকের তালিকায় নাম ওঠাতে, কারণ তাতে তাঁর বাড়তি কিছু টাকা আসে।

প্রভাষক থেকে সহকারী কিংবা সহযোগী অধ্যাপক, সেখান থেকে অধ্যাপক হতে, হাউজ টিউটর, প্রভোস্ট, ডিন, প্রোক্টর, প্রোভিসি, ভিসি ইত্যাদি পদ পেতে মরিয়া শিক্ষকরা একবার শেখ হাসিনার আবার খালেদা জিয়ার দলের পক্ষে বিবৃতিতে সই করেন। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের নেতাদের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রেখে চলেন। শিক্ষক সংগঠনের সদস্য হতে মরিয়া চেষ্টা চালান। এই ধারার ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে, কিন্তু নিয়মের ভিড়ে ব্যতিক্রমকে অনেক সময় খুঁজেই পাওয়া যায় না। এই অমর্যাদার ব্যবস্থা পরিবর্তন করা না গেলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।

শিক্ষকদের বেতন ও মর্যাদা বাড়ানোর আন্দোলন নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয়। সমাজে মর্যাদা ও বেতন উভয়েরই দরকার আছে। তবে অন্যসব বিষয় বাদ দিয়ে শিক্ষকরা যদি শুধু নিজেদের অর্থ ও সম্মানের জন্য আন্দোলন করেন, সেটাও কেমন যেন চোখে লাগে! এটা ভাবতে কষ্ট হয়, আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারগুলোর যে এত দুরাবস্থা, শিক্ষার ও জ্ঞানের যে এত অবনমন তা নিয়ে আমাদের শিক্ষকদের তেমন কোন মাথাব্যথা নেই। গ্রন্থাগার বা শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য শিক্ষকদের আন্দোলন করতে কখনও দেখা যায়নি। গ্রন্থাগারের বই তো শিক্ষকদের একরকম খাদ্য হবার কথা। শিক্ষা গ্রহণের খরচ বাড়িয়ে সাধ্যের বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তা নিয়ে শিক্ষকদের কোন কথা নেই। অথচ শিক্ষার্থীরাই তো শিক্ষকদের সবচেয়ে আপনজন হবার কথা!

এই প্রশ্নগুলোরও মীমাংসা হওয়া দরকার। দরকার সংশ্লিষ্টদের মধ্যে খোলামেলা আলোচনা। একথা মনে রাখতে হবে যে, শিক্ষকদের সম্মান না করলে ভবিষ্যৎ আমাদের ক্ষমা করবে না। শিক্ষকদেরও এ জন্য যোগ্য হতে হবে। যুক্তিহীন উচ্চমন্যতা, আদর্শহীন দলবাজি, ক্লাস-পরীক্ষায় ফাঁকি, নীতিনৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে পদ-পদবি-প্রমোশন আর বাড়তি অর্থউপার্জনের ধান্দা-এসব থেকেও তাদের মুক্ত হতে হবে। আদর্শ শিক্ষা ও শিক্ষকতার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনে ‘কর্মবিরতি’ করতে হবে। শিক্ষকরাই মানুষ গড়ার কারিগর। খুবই উচিত কথা।

মানুষ হয়ে জন্মালেই ‘মানুষ’ হওয়া যায় না। সত্যিকারের ‘মানুষ’ হতে গেলে জানতে হয়, বুঝতে হয়, শিখতে হয়। এই জানা, বোঝা এবং শেখানোর কাজটাই শিক্ষাগুরুরা করেন। সে–ই ‘মানুষ’, যে বোঝে একা বাঁচা যায় না। বাঁচতে হয় সবাই মিলে। সে–ই ‘মানুষ’ যে জানে একা এগোনো যায় না। এগোতে হয় সবাইকে নিয়ে। শিক্ষার প্রতি, শিক্ষাগুরুর প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান না থাকলে জীবনের মূল মন্ত্রই জানা হয় না। নইলে শুধু ব্যক্তিজীবন নয়, থমকে যায় সমাজ, থমকে যায় সভ্যতা।

দুর্ভাগ্যের বিষয়, চারপাশে এমনই সব ঘটনা ঘটছে যা আমাদের হতাশ করছে, করছে উদ্বিগ্ন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেন এই পরিস্থিতি? এর শেষ কোথায়? শুধু প্রশ্ন তুললেই হবে না। শুধু পরস্পরকে দোষারোপ করলে হবে না। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষা অনুরাগীদের নিয়ে মুক্ত আলোচনার ব্যবস্থা হোক। আমাদের আশা, খোলামেলা আলোচনাতেই চিহ্নিত হবে অস্থিরতার শিকড়। তবেই উৎপাটিত করা সম্ভব বিশৃঙ্খলা। নইলে শুধু ভবিষ্যৎ নয়া, ক্ষমা করবে না বর্তমানও। ক্ষমা করবে না কেউ।

Bellow Post-Green View