চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আমলাতন্ত্র: ডিম পারে হাঁসে খায় বাগডাশে

আমাদের কৈশরের উথাল-পাথাল করা দিনগুলোর সিংহভাগই দখল করে ছিল নচিকেতা এবং তার গান। ‘আমি সরকারি কর্মচারী’ গানটা শুনতে শুনতেই তাদের প্রতি এক ধরনের ঘৃণা তৈরি হয় কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আমি নিজেই একসময় সরকারি কর্মচারী হয়ে গিয়েছিলাম। সরকারি কর্মচারী বিষয়ে স্বয়ং বাংলাদেশের সংবিধানে বলা আছে “প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক কর্মচারী জনগণের সেবা করতে সচেষ্ট থাকবে”।

রাষ্ট্রীয়ভাবে এতবড় মশকরা মনে হয় শুধুমাত্র বাঙালির সাথেই করা সম্ভব। সোজা বাংলায় সরকারি কর্মচারীরা জনগণের চাকর কারণ তাদের দেয়া ট্যাক্সের টাকায় তারা বেতন পায়। এমনকি একজন রিক্সাওয়ালা বা দিন-মজুরও একটি বিড়ি বা সিগারেট কেনার সময় ট্যাক্স দিয়ে থাকে। তবে বাস্তবে ঐ কথাটার উল্টোটাই আমি আমলাতন্ত্রের সর্বত্র দেখতে পেয়েছিলাম। আমি নিজে টেকনিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে পড়াশুনা করে এসেছিলাম। স্বভাবতই পড়াশুনার বেশি চাপের কারণে মানুষজনের সাথে মেলামেশার খুব বেশি সুযোগ পাইনি। তাই সামাজিক আচার-আচরণ ভালোভাবে রপ্ত করতে পারিনি। তবে বইখাতা পড়ে যা শিখেছিলাম তাতেই মোটামুটি চলে যায়। তাই কখনও কোনো মানুষ কোনো সমস্যা নিয়ে এলে আমি প্রথমে মনোযোগ দিয়ে শুনি, তারপর সাধ্যের মধ্যে যতটুকু পারি সাহায্য করার চেষ্টা করতাম।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের আমলাতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় কিছু অদ্ভুত ব্যাপার সেই ব্রিটিশ আমল থেকে প্রচলিত। সত্যি কথা বলতে বাংলাদেশের সরকার ব্যবস্থা থেকে শুরু করে আমলাতন্ত্র এখন পর্যন্ত সেই মান্ধাতার আমলের আইন দিয়েই চলে। প্রথম শ্রেণীর সরকারি কর্মকরতাদের চাকরি স্থায়িকরণের তিনটা শর্ত আছে। প্রথমটা অন্ততপক্ষে দুই বছর চাকরি করতে হবে, দ্বিতীয়ত বুনিয়াদী প্রশিক্ষণ (ফাউন্ডেশন ট্রেনিং) শেষ করতে হবে আর তৃতীয়ত বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। বুনিয়াদী প্রশিক্ষণ আসলে বিভাগীয় পরীক্ষার পূর্ব প্রস্তুতি। সরকারি চাকরিজীবীদের বিভিন্ন প্রকার আইন কানুন শেখানোর পাশাপাশি শেখানো হয় প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে কোথায় কিরূপ আচরণ করতে হবে। আর সেইসব ক্লাস নিতে আসেন তখনকার সব ডাক সাইটে আমলা।তারা এমন সব প্রোটোকল নিয়ে আসেন যে নতুনরা বুঝে যায় তারাও একদিন এমন সম্মান ও প্রভাব প্রতিপত্তির অধিকারী হবে। এরপর কর্মক্ষেত্রে শুরু হয়ে যায় সেগুলোর প্রয়োগ।

এইবার কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা শেয়ার করা যাক। আমলাতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় কোনো কিছুতেই তারা বিশ্বাস করেন না তাই সব তথ্য সত্যায়িত করতে হয় এবং প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড সরকারি কর্মকর্তাদের এই বিশেষ ক্ষমতা আছে। আমি সানন্দে এই কাজটা করি। সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর আমার প্রথম পদায়ন দেয়া হলো ঢাকার সাভার উপজেলায়। সাভার জায়গাটার সৌন্দর্য আমাকে এখনও টানে। গ্রাম এবং শহরের একটা দারুণ মিশেল আছে সাভারের পরিবেশে। আবার পাশাপাশি অপরিকল্পতভাবে শিল্পায়নের ফলে সাভারের প্রায় সব নদীই দূষিত হয়ে গেছে। যাইহোক আমি বেশিরভাগ সময়ই বিভিন্ন সাইটে ঘুরে বেড়ায়। বাকী যে সময়টা অফিসে বসি সেটা চলে যায় সাইটের বিল চেক করতে আর মাসিক অগ্রগতির রিপোর্ট তৈরি করতে। এর মধ্যেই বিভিন্ন সময়ে সাধারণ লোকজন আসে তাঁদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সত্যায়িত করতে। সত্যায়ন করার নিয়ম হলো আসল কপি দেখে ফটোকপিতে দস্তখৎ দেয়া। আমাদের ব্যস্ততা এতোই বেশি থাকে যে আমি উনারা আসল কপি আনলেও সেটাতে একবার মাত্র চোখ বুলিয়ে সত্যায়ন করে দিই।

ধীরে ধীরে ব্যাপারটা কিভাবে যেন সারা উপজেলায় চাউর হয়ে গেলো। সবাই সত্যায়নের জন্য অন্য কোথাও না যেয়ে অপেক্ষা করে কখন আমি সাইট থেকে ফিরবো। বিভিন্ন দরকারে বিভিন্ন ধরনের লোক আসতে শুরু করলো সত্যায়িত করতে। একেবারে মেথর থেকে শুরু করে আর্মি, প্রবাসী পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণী পেশার লোকের সাথে তাই প্রতিদিনই দেখা সাক্ষাৎ হয়, হয় ভাবের বিনিময়। পাশাপাশি বিভিন্ন কথাবার্তার মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে সত্যায়িত করার বিষয়ে যেসব অভিজ্ঞতা শুনতাম তা মোটেও আমাকে স্বস্তি দিতো না। একদিন সকালে এক প্রবাসী এসেছিলেন মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এম আর পি) বানানোর জন্য কাগজপত্র সত্যায়িত করতে। আমার কাছে আসার আগে ভদ্রলোক উপজেলার মধ্যে অবস্থিত অন্য সবগুলো অফিসে গিয়েছিলেন। সেইসব কর্মকর্তারা না কি কেউ পেপার পড়ছিলেন, আবার কেউ চা পান করছিলেন কিন্তু বলে দিয়েছেন অন্য কোথাও যান। উনি সৌদি আরব থাকেন। আবার তিন মাস পর যাবেন। উনি আমার অফিসের দরজায় এসে জুতা খুলতে শুরু করেছিলেন দেখে আমি তাড়াতাড়ি উনাকে থামিয়ে দিয়ে ভিতরে আসতে বললাম। উনি ভিতরে আসার পর আমার ডেস্কের সামনে রাখা চেয়ারগুলোর দিকে নির্দেশ করে বসতে বললাম। মনে হলো উনি যেন আমার কথা ঠিক বুঝতে পারছেন না। আমি আবারও চেয়ারের দিকে নির্দেশ করলে উনি বসলেন এবং উপরের কথাগুলো বললেন। তা দূতাবাসগুলোতে কেমন সাহায্য সহযোগিতা পান আপনারা? বললো সাহায্য করে কিন্তু অনেক কাঠখড়ি পোড়ানোর পর। আমি তখন বললাম আপনারা, গার্মেন্টসের মেয়েগুলা আর চাষা মানুষগুলায়তো এই দেশটাকে শক্ত হাতে ধরে রেখেছেন। এই কথাগুলো শোনার পর ভদ্রলোক হাউমাউ করে কান্না শুরু করলেন। উনি বয়সে প্রায় আমার বাবার সমান। আমি অস্বস্তিবোধ করতে শুরু করলাম আর অপেক্ষা করছিলাম কখন উনি থামেন। একসময় উনি কান্না থামিয়ে বেরিয়ে গেলেন এবং যাওয়ার আগে একটা চিরকুটে উনার নাম, ফোন নং এবং ঠিকানা দিয়ে গেলেন এবং হাত নেড়ে নেড়ে বুঝিয়ে দিলেন কিভাবে যেতে হবে। মানুষ এত কমে সন্তুষ্ট হয় এবং মানুষকে আপন করে নেয়। এটা তার সামান্য উদাহরণ মাত্র।

বিজ্ঞাপন

এইবার আরও একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। তখন বাংলা লিংক মোবাইল কোম্পানিতে চাকরি করি। সারা বছরজুড়ে বাংলাদেশের এপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্ত দৌড়ে বেড়াই কিন্তু মাস শেষে ব্যাংক একাউন্টে বেতন আসার আগে সরকারের ঘরে ট্যাক্স চলে যায়। আবার বছর শেষে ট্যাক্স রিটার্ন জমা দেয়ার জন্য উকিলের কাছে দৌড়াতে হয় এবং ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বরের সার্টিফিকেট তোলার জন্য আলাদা আরও কিছু টাকা দিতে হয়। সেবছর কেন জানি ঘাড়ে ভূত চেপে গেলো। বন্ধু জর্জিসের সাহায্যে নিজে নিজেই ট্যাক্স রিটার্ন জমা দিলাম এবং টিন সার্টিফিকেট আনতে সেগুন বাগিচার রাজস্ব ভবনে হাজির হলাম। নির্দিষ্ট কক্ষে যেয়ে আমি আমার টিন সার্টিফিকেট চাইলাম। আমি তখনও ঘুষের ব্যাপারটা সেইভাবে জানি না বা জানলেও ঘুষ দেবো না এমনই একটা ভাবনা নিয়ে গিয়েছিলাম। উনারা আমাকে কোন প্রকার সহযোগিতা করলেন না বরং বিশাল একগাদা কাগজের পালা দেখিয়ে দিয়ে বললেন খুঁজে নিতে। আমি অনেকক্ষণ ধরে খুঁজে আমার আগের এবং পরের টিন নম্বরের রিটার্ন খুঁজে পেলেও আমারটা আর খুঁজে পেলাম না তখন বাধ্য হয়েই উনাদের বললাম খুঁজে দিতে সাথে এও বললাম যে যা খরচাপাতি লাগবে আমি দিবো। তখন উনারা আমাকে বললেল আপনি অমুক টেবিলে যেয়ে বসেন আমরা সার্টিফিকেট নিয়ে আসছি। আমি সেই টেবিলে যেয়ে বসার মিনিট পাঁচেকের মধ্যে সেই ভদ্রলোক আমার টিন সার্টিফিকেট নিয়ে হাজির হলেন। এখন সেই টেবিলের দায়িত্বে থাকা ভদ্রমহিলা আমাকে টাকা দিতে বললেন। আমি টাকা দিলেই শুধু উনি টিন সার্টিফিকেটে দস্তখৎ দিবেন না হলে দিবেন না। আমি তখন পকেট থেকে একটা একশ টাকার নোট বের করে দিলাম। উনি মাত্র একশ টাকার একটা নোট দেখে ভুত দেখার মতো চমকে উঠে বললেন এটা কি দিচ্ছেন সবাই তো দেড় হাজার করে দিচ্ছে। আমার তখন মেজাজ এমনিতেই খারাপ হয়ে আছে একটু আগের অযথা ভোগান্তির জন্য। আমি বললাম বছরজুড়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে টাকা আয় করি আর সরকারকে লাখ লাখ টাকা ট্যাক্স দিই এখন আবার আপনাদেরকে খুশি করতে হবে। উত্তরে উনি বললেন উনার দুই মেয়ে একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে তাদের অনেক খরচ। আমি তখন আরও রেগে গিয়ে বললাম দেখেন আপনার মেয়ের বেতন দেয়ার দায়িত্ব আমার না। এইবার উনি একটু নরম হলেন। আমি শেষ পর্যন্ত পাঁচশ টাকায় রফা করলাম। আমার পাশেই টেবিলটা ঘিরে আরো কিছু মানুষ বসেছিলো। উনারা আমার কর্মকাণ্ড দেখে এমন একটা হাসি মুখে ধরে রেখেছিলেন যে একজন শিশুর কর্মকান্ড দেখে খুবই মজা পাচ্ছেন।

এইবার আসি অতি সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতায়। দেশ ছাড়ার সময় সরকারি চাকরির নিয়ম যথাযথ মেনে দু বছরের অবৈতনিক ছুটি নিয়ে এসেছিলাম। এই সময়কালে আমি কোন প্রকার বেতন বা সরকারি সুবিধাদি নিই নাই তবে অনেক মানুষকে দেখেছি দেশে সরকারি চাকরি করছে কিন্তু আবার অন্য দেশের পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট বা নাগরিক কিন্তু সরকারি চাকরির বিধিমালা অনুযায়ী অন্য কোন দেশের নাগরিক হলে আপনি বাংলাদেশের সরকারি চাকরি করতে পারবেন না। যাইহোক গাছেরটা নেয়া তলারটা কুড়ানো অনেক সরকারি চাকরিজীবিই তথ্য গোপন করে চাকরি করে যাচ্ছেন। আমার ছুটি শেষ হবার পর এদেশের হাইকমিশনের মাধ্যমে আমার ইস্তফাপত্র সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিলাম। আমি হলফ করে বলতে পারি হাইকমিশন ঠিক সময়েই আমার ইস্তফাপত্র সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিলো কারণ তারা আমাকে একটা কপিও দিয়েছিলো ট্র্যাক করার জন্য। এরপর যতই সময় গড়িয়ে যায় আমার ইস্তফাপত্র সেই মন্ত্রণালয়ে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। আমি আবারও হাইকমিশনে যোগাযোগ করলে বলল এইবার ঐ মন্ত্রণালয়ে ইমেইল করবো আর তোমাকেও একটা কপি দেবো। যথারীতি হাইকমিশন আবারও ইমেইল করলো। এইবারও সেই একই দশা। তখন মনেপড়ে গেলো ছুটি অনুমোদনের সময়ের কথা। সেই প্রথম সচিবালয়ে যাওয়া। বাংলাদেশে যেখানে সরকারিভাবে পরিপত্র জারি করে অফিসগুলোকে কাগজহীন হতে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে সেখানে সচিবালয়ে পাশাপাশি কক্ষে বসা এক সচিবের কক্ষ থেকে অন্য সচিবের কক্ষে ফাইল যায় না মাসের পর মাস কখনও বছরের পর বছর। আমি নিজে যেয়ে বিভিন্ন জনকে “স্পিড মানি” দিয়ে ফাইলটাকে চালু রেখেছিলাম একটা ছুটি অনুমোদনের জন্য একটা লুপ অনুসরণ করতে হয়। দায়িত্বশীল কর্মকর্তা উপর বরাবর নোট দেন। আবার সেই উপরের কর্মকর্তা তার উপরের কর্মকর্তা বরাবর নোট দেন। এইভাবে সর্বোচ্চ উপরে যাওয়ার পর একই পথে আবার নিচে আসা শুরু করে। তখন সেই কর্মকর্তা অনুমোদন দেন। এভাবেই যেকোনো কিছু অনুমোদন পায় সচিবালয় থেকে। এইবার আমি দেশে নেই তাই আমার উপকারে এগিয়ে এলেন আমারই একজন সিনিয়র সহকর্মী। মাত্র দুবছর চাকরি করে অফিসের সবার সাথেই মোটামুটি একটা ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিলো। উনি দায়িত্ব নিয়ে আমার ইস্তফাপত্র অনুমোদন করিয়ে দিলেন। তাতেও প্রায় তিন মাস সময় লেগে গেলো তাই সরকারি চাকরি নিয়ে আমি একটা কথা সবসময় বলিঃ সরকারি চাকরি পাওয়া কঠিন কিন্তু যাওয়া অসম্ভব।

উপজেলা বা থানা পর্যায়ের একজন ভূমি নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা (এসি ল্যান্ড) পদোন্নতি পেয়ে একসময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউ এন ও) তারপর এডিসি, ডিসি হয়ে ভাগ্য ভালো হলে একসময় সচিবালয়ে পদায়ন পান। যদি সঠিক সময়ে সঠিক চামচামি করতে পারেন তাহলে প্রক্রিয়াটা আরও দ্রুত হয়। এরপর ভাগ্য ভালো হলে কোন একটা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পেয়ে যেতে পারেন। আমি আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতায় দেখেছি টেকনিক্যাল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বেশিরভাগ সময়ই এমন একজন সচিব পান যার শিক্ষাগত যোগ্যতা থেকে শুরু করে অভিজ্ঞতার সাথে সেই মন্ত্রণালয়ের দূর-দূরান্তেরও সম্পর্ক নেই। তখন সেই সচিব এমন সব হাস্যকর সিদ্ধান্ত নেন যা শুধু অবাস্তবই না একেবারে অবাস্তবায়ন যোগ্য। একটা উদাহরণ দিলে বোঝা যাবে। একবার প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিলেন বাংলাদেশের সব রাস্তা হবে রিজিড পেভমেন্ট মানে সিমেন্ট, খোয়া আর রড দিয়ে ঢালায় রাস্তা কিন্তু বাংলাদেশের আবহাওয়া এবং মাটির গুণাগুণ বিচার করলে সেটা মোটেও ঠিক সিদ্ধান্ত ছিল না৷ শুধুমাত্র সিটি কর্পোরেশন এবং থানা পর্যায়ের কিছু রাস্তাকে ঢালাই করা যেতে পারে তাও অনেক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে। আর একটা ব্যাপার হচ্ছে বাংলাদেশের বাজেটগুলো বাস্তবায়ন শুরুই হয় বর্ষাকালে যখন চারিদিকে বৃষ্টি আর থই থই পানি। এই সময় আপনি যতই ভালো রাস্তা বানান না কেন পরের বর্ষা আসতে সেই রাস্তা হারিয়ে যাবে৷ এইভাবে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা জলে চলে যায় কিন্তু এটা নিয়ে কোন মন্ত্রণালয়েরই মাথা ব্যথা নেই৷ সেই নির্দিষ্ট বিভাগ অনেকবার প্রস্তাবনা দিলেও সেইসব ফাইল আর আলোর মুখ দেখেনি৷ যাইহোক এমন আরও হাজারটা উদাহরণ দেয়া যাবে।

আমলাতন্ত্র নিয়ে আমি আরেকটা কথা বলি। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ কিন্তু সেটা মোটেও সত্যি নয়। আবার অনেক মনে করেন রাজনীতিবিদরা বা সরকার কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে বাংলাদেশের সকল ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছে এই আমলারা। পাঁচ বছর পর পর সরকার পরিবর্তন হলেও আমলাদের চাকরি কিন্তু থাকেই তারা শুধুমাত্র একটু বেশি সুবিধার স্থান থেকে কম সুবিধার স্থানে পদায়ন পান এই যা। অনেক ঘাঘু আমলা আবার গিরগিটির মতো চেহারা পাল্টে সুবিধা ধরে রাখেন। একটা সরকার পাঁচ বছরের জন্য একটা দেশের ইজারাদারের দায়িত্ব পান শুধু কিন্তু সব ক্ষমতা আমলাতন্ত্রের হাতেই থেকেই যায় তাই কোনো সরকারই আমলাদের খুব একটা ঘাটান না কারণ যেকোনো সময় তারা সরকার উল্টে দেয়ার ক্ষমতা রাখেন।

এতো এতো দুর্নীতির পরও একটা সিস্টেম টিকে আছে কারণ এখনও আমলাতন্ত্রের প্রত্যেকটা স্তরে একেবারেই হাতেগোনা এক দুজন সৎ কর্মকর্তা আছেন যারাই আসলে পুরো ভঙ্গুর সিস্টেমটাকে নিজ দায়িত্বে ধরে রেখেছেন। আর একটা ব্যাপার লক্ষণীয় এই সকল সৎ করকর্তাদেরকে দলমত নির্বিশেষে সবাই সমীহ করে চলেন এবং অকারণে ঘটান না কারণ সবাই জানে এই মানুষগুলোকে টাকার লোভ বা ক্ষমতার ভয় দেখিয়ে কেনা যাবে না।  আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি সেই মানুষগুলোর জীবনমান একেবারেই তথৈবৈচ কিন্তু এটা নিয়ে উনাদের কোন আক্ষেপ নেই। সবচেয়ে বড় কথা উনাদের ছেলেমেয়েরাও কিভাবে কিভাবে জানি বুঝে গেছে যেহেতু বাবা মা দুর্নীতি করেন না তাই তাদের বেশিরভাগ শখই অপূর্ণ থাকবে এবং তারা সেটা মেনেও নিয়েছে। উনারা আছেন বলেই এখনও আমরা মনেমনে স্বপ্নের “সোনার বাংলা” গড়ার স্বপ্ন দেখি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)